somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

হায় পলাশীঃ

০৯ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ সকাল ১১:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হায় পলাশীঃ

পলাশী-ট্রাজেডির দু'শো পঞ্চাশ বছর গেল পেরিয়ে। এ দিনের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা-বৈঠক হয়েছে, লেখালেখিও হয়েছে। সেখানে এসেছেন এবং আসবেন সিরাজউদ্দোলা ও তার সঙ্গীরা, যারা প্রাণ দিয়েছেন বাংলার স্বাধীনতার জন্য। এসেছেন এবং আসবেন মীরজাফর এবং তার বিশ্বাসঘাতকতার দোসররাও। এসেছেন এবং আসবেন এ মাটিতে ইংরেজ প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠাকামী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রবার্ট ক্লাইভ। কিন্তু তেমন সরবে আসেননি-আসতে পারেননি এই দুর্ভাগা নারী। ইতিহাসে বরাবরই উপেক্ষিতা রয়ে গেছেন তিনি।

সিরাজকে হত্যা করে নবাব হলেন মীর জাফর আলী খান। হলেন নয়, বানানো হলো। বানালেন ক্লাইভ। এবং ক্লাইভের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কারাগারে পুরলেন সিরাজউদ্দৌলার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ১৫ বছরের মির্জা মাহদীকে। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে এই বালককে যাবতীয় নিষ্ঠুরতার সাথে হত্যা করলেন মীর জাফর। কারাগারে পুরলেন সিরাজের মা আমিনা বেগম, নানী আলীবর্দী খাঁর পত্নী সরফুননেসা এবং লুৎফুন্নেসা ও তার চার বছরের শিশু কন্যাকে। সিরাজের খালা আমিনা বেগমের সহোদরা ঘসেটি বেগম, যিনি সিরাজ-উৎখাত ও হত্যায় ছিলেন মীর জাফরের সহযোগী, তাকেও তিনি রেহাই দেন না। পুরেন কারাগারে। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থাকলেও সিরাজ পরিবারের সদস্যারা যেন মূর্তিমান আতংক হয়ে মীর জাফরকে খুবলাচ্ছিল। সুতরাং এই ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পেতে তিনি তাদেরকে রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে দূরে বহুদূরে এককালের মোগল সুবা বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীর নগরের (আজকের ঢাকা) গা ঘেঁষে বেয়ে চলা বুড়িগঙ্গার ওপারে জিনজিরার প্রাসাদে নির্বাসনে পাঠালেন। নামে প্রসাদ। আদতে কয়েদখানারও অধম।

বিপর্যয়ে নতুন মাত্রাঃ

সিরাজউদ্দৌলার হত্যার পর লুৎফুন্নেসার জীবনে যে বিপর্যয় নেমে আসে তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত করে জিনজিরা। মীর জাফর সিদ্ধান্ত দিলেন লুৎফুন্নেসা ও তার কন্যা, শাশুড়ি-সিরাজ মাতা আমিনা বেগম, খালা-আমিনা বেগমের সহোদরা ঘসেটি বেগম এবং সিরাজের নানী আলীবর্দী খাঁ পত্মী সরফুন্নেসাকে নির্বাসনে পাঠানো হবে জিনজিরায়। ১৭৫৮ সালে নবাব পরিবারের এই সদস্যাদের ঠাসাঠাসি করে তোলা হলো একখানা সাধারণ নৌকায়। তাদের খাওয়া-দাওয়া বাবদ সামান্য অর্থ দেয়া হতো। আর এ অর্থও আসতো অনিয়মিত। ফলে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন যাপন করতেন এসব পরিবারের নারীরা। ১৭৬৩ সালে রেজা খানকে জাহাঙ্গীরনগরের নায়েব-সুবাদার করা হলো। তিনি নবাব পরিবারের এই নারীদের জন্য সামান্য ভাতা বরাদ্দ করেন। এ অর্থে তাদের দারিদ্র্যের উপশম হয় না। ক্লাইভ অবশ্য এই নারীদের মুক্তি দিয়ে মুর্শিদাবাদে আনতে নির্দেশ দিলেন। সাত বছর পর ১৭৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জিনজিরার বন্দীখানা থেকে মুক্তি পেয়ে মুর্শিদাবাদে এলেন লুৎফুন্নেসা, তার কন্যা ও আলীবর্দী খাঁর পত্নী সরফুন্নেসা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লুৎফুন্নেসা ও তার কন্যার ভরণ পোষণে মাসিক ৬০০ টাকা ভাতা বরাদ্দ করলো।

ভাগ্য বিড়ম্বিত আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগমঃ

কাইভের নির্দেশে লুৎফুন্নেসাকে মুর্শিদাবাদে আনা হলেও আনা হয় না আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগমকে। কাইভের এ নির্দেশের বিরুদ্ধে যাবার দুঃসাহস ছিল না "ক্লাইভের পোষা গাধা" মীরজাফরের।
লুৎফুন্নেসার মুর্শিদাবাদে ফেরার অনেক পরের কথা। ১৭৮০ সাল। পুত্র মীরনের সাথে সলাপরামর্শ শেষে পুত্রেরই একান্ত বাধ্যগত জানবাজ কয়েকজন অনুচরকে পাঠালেন জিনজিরায়। বেড়াতে নেবার নামে দুই বেগমকে নৌকায় তুলে নির্জন মাঝ নদীতে ডুবিয়ে দিল মীরনের অনুচররা। সলিল সমাধি ঘটলো সিরাজ-মাতা এবং খালার।

ভেঙ্গে পড়া লুৎফুন্নেসাঃ

বিপর্যস্ত জীবনে ব্যথা-বেদনা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা যেন অনুষঙ্গ হয়ে গেল লুৎফুন্নেসার। মুর্শিদাবাদে আসার কয়েক বছর পর একদমই ভেঙ্গে পড়লেন। মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। কিন্তু রাজকীয় ঠাঁটবাটে মেয়ের বিয়ে দেয়া আর হবে না। হলোও না। মেয়ের বিয়ে হলো অতি সাধারণ ঘরানায়। জামাই মীর আসাদ আলী খান। পর পর চারটি কন্যা সন্তানের জনক হলেন তিনি। তবু তো একরকম কাটছিল তার জীবন। এবার কিন্তু থমকে গেল। জামাই মীর আসাদ আলী খান মারা গেলেন হঠাৎ। সামলে উঠতে না উঠতে এলো আরেকটি আঘাত। ১৭৭৪ সালে বিধবা কন্যা তাকে ছেড়ে চিরদিনের এমন এক দুনিয়ায় গেলেন যেখান থেকে আর ফেরা যায় না। বিধবা কন্যার মৃত্যুতে এবার একদমই ভেঙ্গে পড়লেন। ৬০০ টাকায় চার-চারটে পিতৃ-মাতৃহারা নাতনীকে নিয়ে জীবন যে চলছিল, তা নয়। কিন্তু একে একে চারজন বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠতে দেখা দিল সমস্যা।

১৭৮৭ সালের মার্চ মাসে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিশের কাছে ভাতার অংশ বাড়িয়ে দেয়ার জন্য আবেদন করলেন। আবেদনপত্রে তিনি বললেন "নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুতে এবং তার যাবতীয় মালামাল এবং সম্পদ লুণ্ঠিত হওয়ায় এবং বিশেষ করে আমারটাও, আমি বার বার চরম নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছি, ঝড়-ঝঞ্ঝার প্রবল তরঙ্গ বইয়ে দেয়া হয়েছে আমার ওপর"। লুৎফুন্নেসার আবেদন নাকচ করে দিলেন লর্ড কর্নওয়ালিশ। ওই ভাতা বাদে মাসে তিনি আরো ৩০৫ টাকা পেতেন কোরআন পাঠক, দান-খয়রাত ও খোশবাগে আলীবর্দী খাঁ ও সিরাজউদ্দৌলার সমাধির দেখ-ভালের জন্য। ১৭৯০ সালের নভেম্বর মাসে স্বামীর কবরের পাশে নামাজ পড়ারত অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দুর্ভাগা এই নারীর শেষ শয্যা রচিত হলো স্বামীর কবরের পাশে। ।

শেষ কথাঃ জিনজিরা প্রাসাদ এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগঃ

যে শ্রবন রহিত, বধির-তার শ্রবনেন্দ্রিয়ে কদাপিও পৌঁছবে না জিনজিরা প্রাসাদ তথা জিনজিরা কয়েদখানার প্রতিটি ইঁটে মিশে থাকা লুৎফুন্নেসা, আমিনা বেগম, সরফুন্নেসা আর ঘসেটি বেগমের বুক ভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস আর ফোঁপানো কান্নার আওয়াজ। ইতিহাসের ছাত্র কান পাতলে তা শুনতে পায়। বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই বেদনাবিধূর অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় কিন্তু নাড়া দিতে পারেনি আমাদের প্রত্নতত্ত্ব নামক বিভাগকে! এক বর্গ কিলোমিটার জুড়ে ছিল এই প্রাসাদের চৌহদ্দী। দখলবাজরা ইঞ্চি ইঞ্চি করে তার সবটাই গিলে ফেলেছে। একদিন দেখা যাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে জিনজিরা প্রাসাদ। তখন হয়তো হুঁশ হবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের।

প্রিয় পাঠক, সময় করে একবার দেখে আসুন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের পরিবারবর্গের শেষ আশ্রয়স্থলের স্মৃতিচিনহটুকু।

তথ্য সুত্রঃ
(১)প্রাচীণ ঢাকার ইতিহাস
লেখকঃ নাযির হোসেন
(২)ঢাকার কথা
লেখকঃ রফিকুল ইসলাম
(৩) পলাশীর ট্রাজেডী
লেখকঃ মাসুদুল হক

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ১১:২৩
৩৮টি মন্তব্য ৩৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×