ঘুম নিয়ে যত কথাঃ
ভাল থাকার জন্য ভাল ঘুম হওয়া খুব দরকার। তবু এমন আমার মত বহুজনই আছেন আমাদের মাঝে, যাদের ঘুম মোটেও ভাল হচ্ছে না। ঘুমজনিত অন্য সমস্যায় ভুগছেন অনেকে। এ বিষয়ে আমেরিকার একদল ডাক্তারের একটি গবেষনালব্ধ নিবন্ধন থেকে আমি কিছু অংশ অনুবাদ করে আপনাদের সামনে তুলে ধরছিঃ-
আমেরিকায় সেদেশের জাতীয় নিন্দ্রা ফাউন্ডেশনের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে বড়দের শতকরা ৬০ জনই সপ্তাহে দুয়েক রাত বা তার বেশি ঘুমের সমস্যায় ভুগে থাকেন। শতকরা ৪০ জনের বেশি লোক মাসে অন্ততঃ দুয়েকদিন অতি-দিবা নিদ্রালুতায় আক্রান্ত হয়ে দৈনন্দিন কাজে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রতিসপ্তাহে দুয়েকদিন এ ধরনের সমস্যায় পড়েন তেমন আছেন শতকরা ২০ জন। আমেরিকায় অন্ততঃপক্ষে ৪ লাখ লোক ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। অথচ প্রাপ্তবয়স্কদের শতকরা ৬০ ভাগ তাদের চিকিৎসকের কাছ থেকে এ নিয়ে কোন জিজ্ঞাসাবাদই শোনেননি। শতকরা ২০ ভাগের কম ব্যক্তি এ নিয়ে অভিযোগ করেছেন। নিম্নমানের ঘুমের জন্য কখনো কখনো চড়ামূল্য দিতে হয়। লাখো মানুষ যুঝে চলেছেন সজাগ থাকার জন্য- বাড়িতে, স্কুলে, চাকরিক্ষেত্রে অথবা রাস্তায় গাড়িতে। ক্লান্তির কারণে প্রতিবছর ১ লাখ পুলিশ-কতিথ হাইওয়ে সংঘর্ষ ঘটছে। এর ফলে ৭১ হাজার মানুষ আহত হচ্ছে। মৃত্যু ঘটছে ১,৫০০ জনের শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই। উত্তরে আমেরিকায় বড়দের ৫% ভাগ প্রি অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত। শিশুদের ভিতর এ হার ২-৩% তবে যেসব শিশুদের নাক ডাকে, তাদের ভিতর প্রি অ্যাপনিয়া রোগী আছে ১০-২০%।
ঘুম থেকে যেসব সমস্যা হয়ে থাকেঃ
১. অবসট্রাকটিভ প্রি অ্যাপনিয়া ২. অ্যাডভান্স্ড ফেজ স্লিপ সিনড্রোম ৩. ব্রুক্সিজম ৪. ডিলেড ফেজ স্লিপ সিনড্রোম ৫. ফাইব্রোমায়ালজিয়া (ফাইব্রোসাইটিস সিনড্রোম) ৬. গ্যাস্ট্রো ইসোফেজিয়াল রিফাক্স ৭. ইডিওপ্যাথিক সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম হাইপার সমনিয়া ৮. ইনসমনিয়া বা অনিদ্রা ৯. মুড ডিজর্ডার ১০. নারকোলেপসি ১১. নাইটমেয়ারস ১২. নকটারনাল ইনিউরেসিস ১৩. প্যানিক ডিসর্ডার ১৪. পিরিওডিক লিম্ব মুভমেন্ট ডিজর্ডার (নকটার্নাল মায়োকোনাস) ১৫. রেম স্লিপ বিহ্যাভিয়ার ডিজর্ডার ১৬. রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম ১৭. রিদমিক লেগস সিনড্রোম ১৮. শিপ্ট ওয়ার্ক স্লিপ ডিজর্ডার ১৯. স্লিপ ইন ইটিং ডিজর্ডার
২০. স্লিপ হাইপার হাইড্রসিস ২১. স্লিপ প্যারালাইসিস ২২. স্লিপ টকিং বা কথা বলা ২৩. স্লিপ টেররস বা ভয় পাওয়া ২৪. স্লিপ ওয়াকিং এবং স্লিপ ইটিং ২৫. স্নোরিং বা নাক ডাকা।(পাঠক উল্যেখিত এই সব অসুখের বিষয়বস্তু কিন্তু আমি কিছুই জানিনা বা বুঝিনা-আমি শুধু নিজের মতকরে অনুবাদকের কাজটুকুই করেছি)।
নিদ্রাকালীন শ্বাসরুদ্ধতা বা স্লিপ অ্যাপনিয়াঃ
অ্যাপনিয়া-এই গ্রীক শব্দটির অর্থ শ্বাসহীনতা। স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে তিন রকমঃ-
১. নাক ও গলায় বাধাজনিত ২. মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রিত এবং ৩. মিশ্র ধরনের।
এই তিন প্রকারের মধ্যে বাধাজনিত অ্যাপনিয়ার রোগী সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। যে-কারণেই হোক অ্যাপনিয়া চিকিৎসা না করালে ঘুমের ভিতর রোগীর শ্বাস বার-বার কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকে। কখনো কখনো সারা রাতে শত শত বারের জন্য এমন হতে দেখা যায়। কখনো এই শ্বাসহীনতা এক মিনিট বা তারও বেশি স্থায়ী হতে পারে।
বাধাজনিত বা অবসট্রাকটিভ প্রি অ্যাপনিয়া শ্বাসতন্ত্রে গলার পিছন দিকের অংশে নরম টিস্যুগুলোর বুজে যাওয়ার প্রবণতা থেকে উৎপন্ন হয়।
মস্কিষ্কের কারণে যখন অ্যাপনিয়া হয়, তখন কোন প্রতিবন্ধক থাকে না, বরং যেসব মাংসপেশী শ্বাস নেবার কাজ করে তারা সংকেত পাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকে। মিশ্র কারণে অ্যাপনিয়া হলে দুটো প্রক্রিয়াই জড়িত থাকে এক সাথে। প্রতিবার অ্যাপনিয়া হলে মস্তিষ্ক অল্প সময়ের মধ্যে রোগীকে জাগিয়ে দেয়। যাতে করে সে শ্বাস টানতে পারে। কিন্তু এভাবে তার ঘুম হয়ে পড়ে দারুণভাবে খণ্ডিত এবং নিম্নমানের।
ডীপ স্লিপ বা গভীর ঘুমে প্রবেশের আগেই রোগী জেগে যায়। নিদ্রাকালীন শ্বাসরোধ রোগে ভুগছেন অনেকেই, বড়দের মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রসার যেমন ব্যাপক, তেমনি এ রোগটিরও। আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেল্থ-এর মতে বার মিলিয়ন রোগী আছে সেদেশে। পুরুষদের এ রোগ হবার ঝুঁকি বেশি। যাদের ওজন অতিরিক্ত এবং যাদের বয়স চল্লিশোর্ধ, অ্যালকোহল, এবং ঘুমের ওষুধ সেবনের অভ্যাস যাদের আছে, তাদের ঝুঁকি বেশি থাকে স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হবার। কিন্তু যে কেউ যেকোন বয়সে এমন কি শিশুরাও এ রোগের শিকার হতে পারে। কিন্তু আজও জনগণ ও স্বাস্থ্য সেবাপ্রদানকারী উভয়ের সচেতনতার অভাব রয়েছে বলে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগটি ধরা পড়ছে না এবং রোগটি চিকিৎসা ছাড়াই থেকে যাচ্ছে। চিকিৎসা না করালে তার ফলাফল যে মারাত্মক হতে পারে, তা আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি। এ রোগ থেকে সৃষ্ট অক্সিজেনের অভাবের ফলে উচ্চ রক্ত চাপ, অন্যান্য হৃদরোগ, স্মৃতি বিকলতা, মুটিয়ে যাওয়া, যৌন অক্ষমতা, এবং মাথা ব্যথার উদ্ভব হতে পারে। তাছাড়া কর্মক্ষেত্রে অদক্ষতা এবং মোটর গাড়িতে দুর্ঘটনার জন্য এ রোগকে দায়ী করা যায়। আশার কথা, স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগ নির্ণয় এবং এর চিকিৎসা এখন সম্ভব। কয়েকভাবে এর চিকিৎসা করা যায় এবং নতুন চিকিৎসা কৌশল খুজে বের করার জন্য গবেষণাও চলছে।
উপসর্গঃ
অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগীদের উচ্চ শব্দে নাক ডাকে। তাদের নাক ডাকার ধরনটি হয় অস্বাভাবিক। থেমে থেমে এবং হাঁপানির মতো করে শ্বাস ছেড়ে তারা নাক ডাকে।
অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে আছে-
(১) দিবাভাগে মাত্রাতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব(২) স্মৃতি বিভ্রম(৩) হতাশা(৪) বদমেজাজ(৫) উচ্চ রক্তচাপ(৬) হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা(৭) মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং(৮) হার্ট অ্যাটাকরোগ নির্ণয়ঃ
ঘুমের বিভিন্ন স্তর পর্যবেক্ষণ, অ্যাপনিয়া রোগ নির্ণয়, অ্যাপনিয়ার মাত্রা ও গুরুত্ব নির্ধারণ এবং সেইভাবে চিকিৎসার পরিকল্পনা করার জন্য এখন বিভিন্ন শহরে বিশেষায়িত স্লিপ ল্যাবরেটরির ব্যবস্থা আছে। ঢাকার গুলশানের "জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ হাসপাতাল" সম্পতি একটি " স্লিপ ডিসঅর্ডার কিনিক" শুরু করেছে।
চিকিৎসাঃ
স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসার সাধারণ পদক্ষেপগুলো হচ্ছে, অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে ফেলা; অ্যালকোহল, ধূমপান, অতিরিক্ত চা-কফি পান ও ঘুমের ঔষধ সেবন এড়িয়ে চলা; একপাশে কাত হয়ে শোয়ার অভ্যাস করা এবং নাক বন্ধ থাকার সমস্যা কমাতে ঔষধ ব্যবহার করা। এর চেয়ে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে সি,পি,এ,পি বা কনটিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার বা একনাগাড়ে শ্বাসতন্ত্রে বায়ুর চাপ বাড়িয়ে রাখার যান্ত্রিক ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থাটি বেশ কার্যকর। এতে ঘুমের সময় একটি মাস্ক বা মুখোশ পরিয়ে দেয়া হয় এবং উচ্চ চাপের বাতাস বইয়ে দিয়ে শ্বাসতন্ত্রকে খোলা রাখা হয়। বিভিন্ন রোগীর জন্য দরকার হয় বিভিন্ন আকারের মাস্ক আর বিভিন্ন মাত্রার চাপ। এগুলো নির্ধারণের জন্য চিকিৎসকের সহায়তা নেয়া প্রয়োজন। রয়েছে মুখ খুলে রাখার জন্য মুখগহবরে ব্যবহার্য যন্ত্র। রয়েছে ইউ,পি,পি,পি অর্থাৎ ইউভুলোপ্যালাটো ফ্যারিঙ্গোপ্লাষ্টি নামক ই এনটি অপারেশন।
এতে সার্জন গলার পিছন অংশে ইফভুলো বা আলা জিহ্বা, তালু ও গলনালীর কোমল টিশুগুলোকে অপসারণ করে শ্বাসতন্ত্রের প্রতিবন্ধকতা দূর করে থাকেন।
স্লিপ অ্যাপনিয়া নির্ণয়ের জন্য স্লিপ সেন্টারগুলোতে ঘুমন্ত অবস্থায় দেহের নানা বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়। ঘুমের প্রকৃতি, চোখের নড়াচড়া, মাংসপেশীর তৎপরতা, হৃদযন্ত্রের গতি, নিঃশ্বাসের জন্য প্রয়াস, বাতাসের গতি এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা এইসব উপাদান মনিটর করা হয়। এভাবে প্রি অ্যাপনিয়া যেমন নির্ণয় করা যায়, তেমনি এর গভীরতাও বোঝা যায়। কখনো কখনো ১ম রাত থেকেই চিকিৎসা শুরু করা যায়।
উপসংহারঃ
এ কথা এখন সঙ্গত কারণেই বলা যায়, স্লিপ অ্যাপনিয়ার উপসর্গগুলো জেনে রাখা জনসাধারণের জন্য যেমন জরুরী তেমনি প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা যারা প্রদান করে থাকেন, সেই ডাক্তার সাহেবদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার সকল রোগীকে, কেমন হচ্ছে তাদের ঘুম। তারা কি ঘুমাচ্ছেন নিরাপদে?
সৌযন্যঃ মাসিক সাস্থ্য বু্লেটিন। মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল। সিংগাপুর।।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ১১:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


