অভিবাসীরা কেমন আছেন?
ভিটেমাটি বন্ধক রেখে বিদেশ যেতে গিয়ে যারা সর্বস্ব খুঁইয়েছে আদমবেপারীর হাতে, বিমান বন্দর অবধি পৌঁছতে পারেনি কিংবা যারা বড়োজোর বিদেশে বিমান বন্দর পর্যন্ত পৌঁছে পত্রপাঠ বিদায় হয়েছে-সেইসব ভাগ্যহীনের কথা তো বলাই বাহুল্য: তবে যারা যেতে পেরেছে, ছোটোখাটো কাজও বাগাতে পেরেছে, কমবেশি টাকাও পাঠিয়েছে দেশে-তারা সবাই কি খুব সুখে আছে? প্রিয়জনদের হতাশ করতে চায় না বলেই হয়তো অনেকে টেলিফোনে কৃত্রিম কণ্ঠে বলে:"আমি ভালো আছি, তোমরা কোনো চিন্তা করো না"। কিন্তু, ঠিক কতোটুকু ভালো আছে তা নিরেট ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ টের পায় না। মেঘ ফুঁড়ে ছোট বিমানের জানালায় বসে স্বপ্নের যে সৌধ তাদের মনে রচিত হয় তা যে গজদন্ত মিনার কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সাথে সাথেই তা উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু তখন "ফিরিবার পথ নাহি"। তাই শত সংকটের ভেতরেও পথ চলতে হয়। টিকে থাকতে হয় মাটি কামড়ে। অনেকে কক্ষচ্যুত হয়ে ছিটকে পড়ে। অকালে বাড়ি ফেরে ব্যর্থতার বিশাল বোঝা নিয়ে।
যারা টিকে থাকে, তাদের অনেকের অস্তিত্ব সর্বদা ঝোলে চিকন সুতোয়। তাই তাদের মনে জমে আছে কতো দুঃখ, কতো বেদনা, কতো ক্ষোভ-অভিমান আর অনিশ্চয়তা তার জরিপ করা সহজ নয়। কাজ করতে করতে নিজের অজান্তেই চোখ ছলছল করে ওঠে। সহকর্মীদের দৃষ্টি এড়িয়ে চলে যেতে হয় আড়ালে। তারপর নিরব কান্না শেষে আবারো কাজে ফেরা। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায়। নতুন উদ্দীপনায়। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। নির্বান্ধব প্রীতিহীন পরিবেশে আকণ্ঠ ডুবে থাকা কাজে।
বিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সুবিস্তীর্ণ। কমবেশি এক কোটির কাছাকাছি মানুষ কাজ করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই বিপুল জনগোষ্ঠী তাদের মেধা ও শ্রম বিক্রি করে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে স্বদেশে। দেশের অলস-অকর্মণ্য ছেলেটিও বিদেশে ওভারটাইম খাটছে কাঁচা টাকার মোহে। হাত-পা-ঝাড়া মানুষটিও দায়িত্ব নিচ্ছে অসুস্থ বাবা মায়ের, কলেজ-পড়ুয়া ভাইয়ের কিংবা অবিবাহিত বোনের। অভিবাসীদের আর্থিক সমর্থন নিঃসন্দেহে হাসি ফোটাচ্ছে সংশ্লিষ্ট পরিবারের মুখে। দেশের উন্নতির চাকা ঘুরছে। সরকারের চাপ কমছে।
কিন্তু অভিবাসীদের মুখে হাসি ফোটাবার ব্যবস্থা কি আমরা নিতে পারছি? যাদের শ্রমে ও ঘামে অর্জিত টাকা আমাদের জাতীয় আর্থিক শক্তির এক বিরাট উৎস তাদের পর্যাপ্ত প্রযত্ন কি আমরা নিতে পারছি? দূতাবাসে রয়েছেন চোস্ত কর্মকর্তা। রেমিট্যান্সের নিত্য হিসেব এখানকার আমলাদের ঠোঁটস্থ। কিন্তু সেই রেমিট্যান্সের উৎসের কল্যাণে তারা যেন অনেকটা উদাসীন। এদিকে অভিবাসীরা যে সঙ্কটোত্তরণে নিজেরাই এগিয়ে আসবে সে সুযোগও কম। অতএব,"পেটে খেলে পিঠে সয়"-পলিসি ছাড়া তাদের গত্যন্তর কি?
কি করতে পারি আমরা অভিবাসীদের কল্যাণের জন্যে? প্রথমত এবং প্রধানত যে সকল দেশে আমাদের শ্রমবাজার বিস্তৃত, সে সকল দেশের সাথে বিশেষ সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন প্রাজ্ঞ কূটনৈতিক তৎপরতা। পররাষ্ট্র নীতির সাফল্যের ওপর আমাদের শ্রমবাজার সুসংহত ও সম্প্রসারিত হতে পারে। শ্রম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশে আমাদের শ্রমিকদের ভিসা কিংবা ওয়ার্ক পারমিটের সমস্যাগুলোর সরকারি তৎপরতায় খুব সহজেই সমাধান হতে পারে। তবে বিদেশে দক্ষ, সৎ এবং আইননিষ্ঠ জনশক্তি পাঠানোর কোন বিকল্প নেই। মুষ্টিমেয় কিছু অপরাধপ্রবণ মানুষের জন্যে বিশ্ব শ্রমবাজারে বাংলাদেশী শ্রমিকদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আইনের চোখকে ফাঁকি দেয়ার জন্যে অনেক দাগী অপরাধী মোটা টাকার বিনিময়ে ভিসা বাগিয়ে সুবিধা মতো কোন দেশে ঢুকে পড়েছে এবং সেখানকার পরিবেশও নষ্ট করেছে বলেও অভিযোগ আছে। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। শ্রম বাজারে পেশাদিরত্ব ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারলে তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
কতিপয় দুষ্টলোকের কারণে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার নষ্ট হতে দেয়া কোনোমতেই সমীচীন নয়। পলাতক অপরাধীদের ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করতে হবে আর নতুন জনশক্তি প্রেরণের ক্ষেত্রে চিরুনী-বাছাই করতে হবে। কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তিকে অধিক হারে পাঠাতে হবে। ননটেকনিক্যাল জনশক্তি খুব দ্রুত উপযোগিতা হারিয়ে ফেলে। সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষায় প্রাথমিক ধারণা থাকাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক কথায়, বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির পুরো ব্যাপারটি সুসমন্বিতভাবে খোদ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হওয়া আবশ্যক। মধ্যস্বত্বভোগীর হস্তক্ষেপে এক্ষেত্রে কোনো অবাঞ্চিত আপোষ প্রশ্রয় পেলে তার পরিণাম হবে বিপর্যয়কর।
বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ। ততোধিক সম্ভাবনাময় এর জনশক্তি। এরা পরিশ্রমী। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে খুব সহজেই এরা ঝলসে উঠতে পারে দক্ষতর মানবসম্পদ হিশেবে। আমাদের সামরিক ও বেসামরিক জনশক্তি ইতোমধ্যেই বিশ্বে যথেষ্ট নাম কুড়িয়েছে। মেধা ও দক্ষতায় প্রতিবেশি দেশগুলোর তুলনায় কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই আমাদের বাংলাদেশ। দিন বদলের সনদ বাস্তবায়িত করতে হলে অভিবাসী জনশক্তির ক্ষমতায়ন ও সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। যোগ্য, সৎ এবং আইননিষ্ঠ জনশক্তি বিনির্মাণ, তাকে বিদেশ প্রেরণের ক্ষেত্র প্রস্তুতকরণ এবং ব্যাংকের মাধ্যমে সরল সুদে আর্থিক সহায়তাদানের মাধ্যমে সরকার অভিবাসী জনশক্তি খাতে বিপ্লব সাধন করতে পারে। সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে সত্যিকার অভিবাসী হিতৈষী ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদেরকে আন্তরিকভাবে কল্যাণকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে(যা আমাদের কুটনীতিকদের মধ্যে একেবারেই নেই!)। তাহলে অভিবাসীরা পায়ের নিচে শক্ত মাটির অস্তিত্ব অনুভব করবে। অভিবাসী জনশক্তির ক্ষমতায়ন সময়ের দাবি। সবিশেষ গুরুত্বে এর মূল্যায়ন অতি আবশ্যক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

