বাংলাদেশ গরীব নয়, আমাদের উন্নত হবার অমিত সম্ভাবনা রয়েছে
আজকাল সকল শ্রেনীর মানুষের মধ্যে একটা হতাশা লক্ষ করি। সকলেরই ধারনা-আমাদের দেশটা রশাতলে গিয়েছে! আমাদের আর কোনো আশা নেই, আমাদের ভবিষ্যত অন্ধকার-ইত্যাদি নিরাশার কথা, হতাশার কথা শুনতে শুনতে কান পঁচে যাবার যোগার! কিন্তু আমি ঐসব নৈরাশ্যবাদীদের দলে নই। আমি সব সময়ই আশাবাদী মানুষ। সকল নিরাশার মাঝেই আমি আশার আলো খুঁজি।
বিশ্ব দরবারে আমাদের পরিচয় বৈদেশিক সাহায্য নির্ভর একটি দরিদ্র দেশ হিসাবে। ইতিমধ্যে আমরা লক্ষাধিক কোটি টাকা ঋণ করেছি। আমাদের দেশের বেশির ভাগ লোকই বাস করে দারিদ্র্যসীমার নীচে। ক্ষুধার জ্বালায় আত্মহত্যা, সন্তান হত্যা কিংবা বিক্রি করা ইত্যাদি বহু ঘটনাও আমাদের সমাজে বিদ্যমান। এক কথায় মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এ মৌলিক অধিকারসমূহ আমরা সকলের জন্য নিশ্চিত করতে পারিনি। অভাব আমাদেরকে এতটাই গ্রাস করেছে যে, আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা যেন শুধু অভাব আর অসহায়ত্তের এক করুন প্রতিচ্ছবি। তারপরেও আমি বলি, 'আমরা গরীব নই। বেনিয়া দাতা গোষ্ঠী আর জনবিচ্ছিন্ন শাসকবর্গের স্বার্থান্বেসী ষড়যন্ত্রেই আমাদেরকে গরীব করে রাখা হয়েছে।' কে রেখেছে? কেন রেখেছে? সে প্রসঙ্গে বিস্তারিত ব্যখ্যায় নাগিয়ে আমরা যে গরীব নই সে বিষয়ে কিছু যুক্তি উপস্থাপন করছি।
আমার মতে একটি উন্নত জাতি বা দেশের জন্য জাতিগতভাবে কিছু মৌলিক গুণ বা উপাদান থাকতে হবে, যেগুলো হলো- জাতিগতভাবে বড় হওয়ার ইচ্ছা শক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ, নিজস্ব মেধা ও জনশক্তি। আশার কথা উপরোক্ত গুণগুলোর সব কটিই আমাদের রয়েছে। তারপরেও আমরা ধুকে ধুকে মরছি শুধু সামগ্রীক নৈতিক দুর্বলতা, সততার অভাব ও অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আমাদের মধ্যে সততার অভাব খুব বেশী। দুর্নীতি আর অনাচার আমাদের কি পরিমাণ ক্ষতি করেছে তার একটি চিত্র তুলে ধরছি। পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি আমাদের বৈদেশিক সাহায্যের মাত্র ৪০% প্রকৃত কাজে ব্যয় হয় বাকী ৬০% চলে যায় দুর্নীতি ও অপচয়ের করাল গ্রাসে। আবার জাতীয়ভাবে আমাদের দুর্নীতি ও অপচয়ের পরিমাণ মোট বৈদেশিক সাহায্যের ৪০%। এ তথ্য থেকে বুঝা যায় যে, আমরা যে পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণ করি সমপরিমাণ অর্থ দুর্নীতি ও অপচয়ের মাধ্যমে ক্ষতি করি। সুতরাং দুর্নীতি ও অপচয় রোধের মাধ্যমে আমরা সহজেই বৈদেশিক সাহায্য ছাড়াই চলতে পারি।
এ দেশের মিঠা পানি ও লোনা পানি উভয়ক্ষেত্রেই রয়েছে মৎস্য সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার। যার পরিকল্পিত এবং সুসম ব্যবহার করে দেশীয় চাহিদা পূরণের পরেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সাদা স্বর্ণ নামে খ্যাত চিংড়ি ইতিমধ্যে বিশ্ব বাজারে সুনাম অর্জন করেছে। খনিজ সম্পদের কথা কি বলব? এক প্রাকৃতিক গ্যাসের সুষ্ঠু ব্যবহার করতে পারলে নিজস্ব জ্বালানি চাহিদা মিটিয়ে আরো ২০/২৫ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় সম্ভব যা দিয়ে আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট সংকুলান করা যায় অনায়াসেই। গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর ধারে কাছে তৈল ক্ষেত্র পাওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। এদেশে রয়েছে অতি উৎকৃষ্টমানের একাধিক কয়লা খনি, যা দিয়ে কয়লাভিত্তিক শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি কয়লা রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেতে পারে। এছাড়াও রয়েছে চুনাপাথর, কঠিন শিলা, চীনামাটিসহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদ। এমনকি আমাদের সাগর পাড়ে যে বালু তাতেও মিশানো রয়েছে জেরিকনের মত মূল্যবান খনিজ পদার্থ।
আমাদের দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে অভিশাপ নয় বরং আশির্বাদ মনে করি। আমাদের দেশের এত সস্তা শ্রম! যদি মেধা ও শ্রমকে সমন্বয় করে কাজে লাগানো যেত তাহলে হয়তো আমরা বিশ্ব বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ না হোক অন্তত: বিশ্ব বানিজ্যে একটা প্রভাব ফেলতে পারতাম। আমাদের ঔষধ শিল্প ও তৈরি পোশাক শিল্প তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কুঠির শিল্প ও হস্তশিল্প থেকেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন খুবই সহজসাধ্য ব্যাপার। এমনকি শুধু জনশক্তি রপ্তানি করেও আমরা প্রতি বছর লক্ষ কোটি টাকা অর্জন করতে পারি। শুধু শ্রমিক নয়, এদেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন অর্থাৎ মেধাবী জনশক্তিও রয়েছে প্রচুর। যাদের উদ্ভাবনী কৌশল বিশ্ববাসীকে রীতিমত বিস্মিত করে তোলে। এই মেধাবীদের কয়েজনের নাম উল্যেখ নাকরলেই নয়। যেমন সদ্য পাটের জন্ম রহস্য উদ্বঘাটনকারী জীববিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম। প্রায়াত বিজ্ঞানী ডঃ কুদরত-ই-খুদা, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, ডঃ আবদুল খালেক, নোবেল বিজয়ী ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস, ম্যাগসাস পুরস্কার বিজয়ী ডঃ আবেদ সহ আরো অনেক গুণীজন।
এদেশেরই অর্ধ শিক্ষিত টেকনিশিয়ান দ্বারা বিদেশ থেকে আমদানীকৃত লক্ষ টাকা দামের পণ্য নিজস্ব প্রযুক্তিতে হাজার টাকায় উৎপাদন করার কৌশল ও উদ্ভাবিত যন্ত্রের সচিত্র প্রতিবেদন মাঝে মধ্যেই পত্র-পত্রিকায় ছাপানো হয়। যদি এ মেধাবী লোকগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া যেত, যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে এদেরকে মূল্যায়ন করা হত, তাহলে হয়তো এদেরকেই কাজে লাগিয়ে বিদেশ থেকে আমদানী করা পণ্য সামগ্রী অর্ধেক দামে দেশেই উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করে আমরা ধীরে ধীরে একটি শিল্প বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যেতে পারি- যার ফলশ্রুতিতে পুরা দেশের চেহারা পাল্টিয়ে দেয়া যেতে পারে।
আমাদের উপরোক্ত সম্পদ ও সম্ভাবনাসমূহের কারণেই বলেছি যে, আমরা গরীব নই। আমরা ইচ্ছা করলেই ঘুরে দাঁড়াতে পারি। কথায় বলে ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। তাই ঘুরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা পোষণ করতে হবে। অর্থাৎ দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সকল জনতাকে দল-মত নির্বিশেষে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রথমেই ঠিক করতে হবে জাতীয় নেতৃত্ব। সঠিক নেতা নির্বাচনের সাথে সাথে সকল দুর্নীতি, অপচয়, আলস্য এবং জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কাজের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। উক্ত গণআন্দোলনকে পরবর্তীতে রূপ দিতে হবে উন্নয়নের গণবিপ্লবে। যে দেশের মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন থাকে। সে দেশে ভালো কিছু করার জন্য টাকার অভাব কখনই হবে না। প্রয়োজন শুধু উদ্যোগ নেয়ার। খনিজ সম্পদসমূহের উত্তোলন/ বিপণনও করতে হবে নিজস্ব অর্থায়নে এবং যতদূর সম্ভব দেশীয় প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে। আমার বিশ্বাস, আমরা যদি লক্ষ্য স্থির করে নিজস্ব সম্পদ, মেধা ও জনশক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আগামী ১০ বছরের মধ্যেই আমরা মধ্যম মানের উন্নত দেশে পরিণত হতে পারব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

