অধরা!
টেলিফোন বাজে.........। রাজীবের ধরতে ইচ্ছে করে না। বেড সাইড টেবিলে কর্ডলেস ফোন। তার পাশে টেবিল ঘড়ি। চোখ তুলে ঘড়ির দিকে তাকায় রাজীব। সকাল সাড়ে আট। ঘুম ভেঙ্গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। তারপরও বিছানায় ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে। সকালের এই আয়েশটুকু দুর্লভ? ছুটির দিন এই আয়েশটুকু পুরো মাত্রায় উপভোগ করে রাজীব। মৌটুসী ঘুম থেকে উঠে গেছে অনেক আগেই। কিচেনে কাজ করছে। ঠিক নয়টায় গরম এককাপ চা নিয়ে ও এসে বিছানায় বসবে। আলতো করে আঙ্গুল বুলিয়ে দেবে রাজীবের মাথায়। রাজীব ইচ্ছে করেই চোখ খুলবে না। মৌটুসীর এই উষ্ণতাটুকু অনুভব করবে। কিছুক্ষণ পর মৌটুসী ওর কাঁধে মৃদু ঝাঁকি দিয়ে বলবে-ওঠো, চা ঠান্ডা হচ্ছে।
রাজীব আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে চা-র কাপ হাতে নেবে। এই এক কাপ চা দাম্পত্য জীবনের অনাবিল এক সুখ!
টেলিফোন এখনো বাজছে। রাজীব বুঝে ফেলে দাম্পত্য জীবনের সুখময় এই মুহূর্ত আজ বিঘ্নিত হবে। বিরক্তি লাগে ওর। তবু টেলিফোন ধরে না। কিচেন থেকে মৌটুসী গলা উঁচিয়ে বলে-
ফোনটা ধরছো না ক্যানো?
অগত্যা হাত বাড়িয়ে বেড সাইড টেবিল থেকে কর্ডলেস রিসিভার টেনে নেয় রাজীব। গলায় বিরক্তি নিয়ে বলে-হ্যালো?
ওপাশ থেকে কোন কথা শোনা যায় না। নিঃশ্বাস পতনের শব্দ ভেসে আসে। রাজীব গম্ভীর গলায় বলে-হ্যালো? কে বলছেন?
“খুব বিরক্ত হয়েছো, তাই না?”
ওপাশে এক মহিলার গলা রিন রিন করে বেজে ওঠে। চেনা মনে হয়। কিন্তু রাজীব ঠিক আন্দাজ করতে পারে না। কিন্তু মহিলাটি পরিচিত। না হলে এভাবে সরাসরি কথা বলতো না। কে মহিলা? বিছানায় শুয়ে শুয়েই কথা বলছিলো রাজীব। এবার উঠে বসে। একটা বালিশ টেনে নেয় কোলের উপর। গলায় বিরক্তি কমিয়ে বলে:-স্যরি! কে বলছেন আপনি?
“রাজ” তুমি আমাকে চিনতে পারছো না। ২০ বছর খুব দীর্ঘ সময়-তাই না রাজ?"
মুহূর্তেই ধক্ করে ওঠে বুকের ভেতর। “রাজ”! এই নাম ধরে একটি মেয়ে খুব আদুরে গলায় এক সময় ওকে ডাকতো। দীর্ঘ ২০ বছর পর এই ডাক ওকে মুহূর্তের জন্য আনমনা করে দেয়। নিশ্চুপ বসে থাকে রাজীব। ওপাশেও কোন কথা নেই। এক সময় রাজীব বলে:-তুতন, তুমি কি দেশে ফিরেছো?
"যাক। শেষ পর্যন্ত চিনতে পারলে! "
কোন জবাব দেয় না রাজীব। চুপ করে থাকে। ও পাশ থেকে তুতন বলে:-"গত সপ্তাহে দেশে ফিরেছি।"
-তুমি আমার টেলিফোন নাম্বার পেলে কোথায়?
"খুব অবাক হয়েছো?"-বলে শব্দ করে হাসতে থাকে তুতন । "
হাসলে তুতনকে খুব সুন্দর লাগতো। ঝিলিক খেলে যেতো ফর্সা দাঁতে। উজ্জ্বল হয়ে যেতো গভীর দুই চোখ। গালের দুপাশে টোল পড়তো। তুতন হাসলে এখনো কি এরকম হয়? টোল পড়ে ওর গালে? তুতন হাসি থামিয়ে বলে:-
"ইচ্ছে থাকলে ঢাকায় কারো টেলিফোন নাম্বার জোগাড় করা কোন কঠিন বিষয় না। তাছাড়া তুমি তো এখন বিখ্যাত মানুষ।"
-বিখ্যাত মানুষ মানে?
"লেখালেখি করে নাম করেছো। মিডিয়াতে কাজ করছো। অনেকেই তোমাকে চেনে।"
-অনেক খবর নিয়েছো দেখছি।
"কিছুটা নিয়েছি বৈকি?"
মৌটুসী চা নিয়ে আসে। কাপ নামিয়ে রাখে রাজী্বের সামনে। বলে-কার ফোন ?
রাজীব জবাব না দিয়ে নিঃশব্দে হাসার চেষ্টা করে। মৌটুসী হাত বাড়িয়ে ওর মাথার চুল এলো মেলো করে দেয়। তারপর চলে যায় কিচেনে। ও পাশ থেকে তুতন বলে:-"কে? তোমার বৌ?"
-হ্যাঁ।
"তুমি খুব সুখেই আছ। না চাইতেই বৌ এসে চা দিয়ে যায়। আমি তোমার বৌ হলে এরকম সুখ পেতে না"-বলে আবারো হাসতে থাকে তুতন।
"তোমার বৌ দেখতে কেমন? নিশ্চই আমার চে সুন্দরী। কি নাম তোমার বৌ'র?"
-মৌটুসী।
"বাহ্ ! সুন্দর নাম তো। আসল নাম? নাকি তোমার দেয়া নাম?"
- তুতন, তুমি কি আর কিছু বলবে?
"কথা শেষ করতে চাও?"
-হ্যাঁ।
"ভয়ে?"
-কিসের ভয়?
"বৌ'র? বৌ সন্দেহ করবে?"
-না। মৌটুসী ও রকম মেয়ে নয়।
"বাব্বা! তোমার কপাল বটে! বৌ কে খুব ভালোবাস, না? তোমার চা ঠান্ডা হচ্ছে। চা ’য়ে চুমুক দাও।"
চা’য়ে চুমুক দেয় রাজীব। চা সত্যি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিলো। তুতন হঠাৎ খুব নরোম গলায় ডাকে-"রাজ"!
-শুনছি।
"তুমি কিন্তু একবারও জিজ্ঞেস করোনি। আমি ক্যামন আছি।"
-নিশ্চয়ই ভালো আছ। তোমার তো ভালো থাকারই কথা।
তুতন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। এপাশ থেকে নিঃশ্বাসের শব্দ ভারী শোনায়। তুতন বলে:-
"তোমার মনে আছে?"
-কি?
"একসময় তুমি আমাকে একটা নাম ধরে ডাকতে।"
"তানী"! এই নামে রাজীব প্রথম যেদিন ওকে ডাকে, তুতন অবাক হয়ে বলেছিলো:-"তানী! এটা কার নাম? "
-তোমার।
"আমার!"
-হ্যাঁ। তোমার।
"আমার নাম তো তুতন।"
- তুতন সবার জন্য। “তানী” শুধু আমার জন্য।
"কি সাংঘাতিক! তুমি তো আমার মাথা খারাপ করে দেবে।"
-তোমার মাথা খারাপ হবে না। তুমি খুব ঠান্ডা মেয়ে।
"ঠান্ডা মেয়ে মানে?"
-মানে বুদ্ধিমান।
শুনে তুতনের ভ্রুঁ মুহূর্তের জন্য কুঁচকে গিয়েছিলো। তারপর নিঃশব্দে হেসে বলেছিলো:-
"তুমি কি আমার প্রশংসা করলে? নাকি তিরস্কার!"
-তিরস্কার করবো তোমাকে! সে সাহস আমার নেই।
আজও মনে আছে রাজীবের-এক পড়ন্ত বিকেলে কোন কথা না বলে চুপ করে বসেছিলো তুতন। ভাঁজ করা হাঁটুর উপর চিবুক ছিলো ওর। টি.এস.সির মাঠে সবুজ ঘাস খুঁটছিলো আলতো করে। চোখ না তুলেই ডেকেছিলো:- রাজ!
-বলো।
"তুমি একটু সামনে ঝুঁকে ঐ নাম ধরে আমায় আরেকবার ডাকবে?"
রাজীব ঝুঁকে এসেছিলো সামনে। খুব নরোম গলায় ডেকেছিলো:-"তানী!"
টেলিফোনের দু’পাশেই কোন কথা নেই দীর্ঘ মুহূর্ত। তুতনই একসময় নিরবতা ভাঙ্গে।
"চুপ করে আছো কেন?"
-আমার তো কিছু বলার নেই।
"আমার কথা শুনে তুমি কি নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়েছো?"
-না।
"তোমার চা কি শেষ হয়েছে?"
-না।
"ঠান্ডা হয়ে গেছে নিশ্চয়ই।"
-তোমার কথা শেষ হয়েছে?
"তুমি কি এখন টেলিফোন রেখে দিতে চাও।"
-হ্যাঁ।
"আমার একটা অনুরোধ রাখবে?"
-বলো।
"আমি তোমাকে একবার দেখতে চাই।"
-মানে?
"ভয় নেই। তোমার বাসায় আসবো না। অন্য কোথাও। তুমি কি একবার আসবে?"
-না।
"প্লীজ রাজ!"
-না।
"আমাকে তোমার একবার দেখার ইচ্ছে হয় না?"
-না।
"আমি তোমাকে শুধু কাছ থেকে একবার দেখতে চাই। প্লীজ রাজ! না করো না।"
তুতন'র গলা ধরে আসে। ফোঁপানোর শব্দ শোনা যায়। বোশেখের দমকা বাতাসের মত রাজীবের ভেতরটা হঠাৎ এলোমেলো হয়ে যায়। কেন আজ সকালে টেলিফোনটা ধরলো সে? মৌটুসী ফোন রিসিভ করলে নিশ্চয়ই এরকমটা হতো না। বিশ বছর পর কেন তুতন এসে ঝড় তুলতে চাইছে ওর জীবনে? ও কি আগের মতোই খেয়ালী এক নারী? এটাও কি ওর বিচিত্র এক খেয়াল? যে জেদ আর ঘৃণা দীর্ঘ দিন লালন করে এক সময় তুতনকে ভুলে গেছে রাজীব, তা আজ আবার উঁকি দেয়। পাশাপাশি টেলিফোনের ও পাশে যে মেয়েটি ফুঁপিয়ে উঠেছে, মুহূর্তের জন্য তার প্রতি এক ধরনের করুনা অনুভব করে।
তুতন ফিস ফিস করে ডাকে:-রাজ!
-ঠিক আছে। আমি আসবো। বলো, কোথায়?
"টি.এস.সি। সেই সড়ক দ্বীপে।"
-কখন আসতে চাও তুমি?
"এখন নয়টা বাজে। এগারোটায়।"
-এগারোটায় পারবো না। বারোটায়।
"ঠিক আছে।"
-রাখছি তাহলে।
"সত্যি আসবে তো?"
-আসবো।-বলে টেলিফোন নামিয়ে রাখে রাজীব। তখনি চোখ যায় মৌটুসীর দিকে। কখন যে ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল করেনি। এগিয়ে এসে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে মৌটুসী। বলে:-কার সাথে এতক্ষণ কথা বললে?
রাজীব মৌটুসীর দিকে তাকায়। ও কি টের পেয়েছে কিছু? চোখ দেখে বোঝা যায় না। মৌটুসী বলে:-কি হলো? কার সাথে এতক্ষণ কথা বললে?
-তুমি চিনবে না। আমার এক কলিগ।
মিথ্যে কথা বলতে গিয়ে বিব্রত বোধ করে রাজীব। চোখ নামিয়ে নেয়। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায় মৌটুসী। বলে:-ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি নাশতা দিচ্ছি-বলে চলে যায় মৌটুসী।
(আগামী পর্বে শেষ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


