somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

পুরান ঢাকায় ঈদ

১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পুরান ঢাকায় ঈদ

আমাদের পরিবার মুলত ঢাকাইয়া নয়। কিন্তু অনেকেই এমনকি অনেক ব্লগারও আমাকে/আমাদেরকে ঢাকাইয়া মনে করেন(ব্লগারগণের অনেকের ধারনার কারন, আমি এখন পর্যন্ত ঢাকার উপড় ২৫/২৬ টা পোস্ট দিয়েছি)। আরো মনে করার কারন, ১৯৩২ সন থেকে ১৯৫৬ সন পর্যন্ত আমাদের একান্নবর্তী পরিবার বাসকরতেন ওয়ারীর র‌্যংকিং স্ট্রীট। আমার বাবা একান্নবর্তী পরিবার থেকে ১৯৫৬/৫৭ সনে ধানমন্ডিতে চলে আসেন। কিন্তু পরিবারের অন্যান্য অনেক সদস্যই স্বাধীনতা যুদ্ধ কালীন সময় পর্যন্ত ঐ এলাকায়ই থেকেগিয়েছিলেন। বড় চাচার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য এখনো গেন্ডারিয়া, ওয়ারীতে বাসকরেন। দূর সম্পর্কীয় বেশ কয়েকজন আত্মীয় নাজিরা বাজার, লালবাগে থাকেন। যার কারনে আদি ঢাকাইয়াদের সাথেও আমাদের একটা সৌহার্দ্যপুর্ণ সম্পর্ক এখনো বিদ্যমান। তেমনই কয়েকজন অরিজিনাল ঢাকাইয়া মুরুব্বীদের সাথে ঈদের দিন দেখা করতে যাই। যদিও আদি ঢাকাইয়ারা আমাদেরকে বলে "বাংগালী"(হয়ত উনারা নিজেদের ইংরেজ ভাবেন)!

উর্দু রোডের আদি বাসিন্দা নাজিমুদ্দীন সাহেব।তাঁর একটু সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরছিঃ-তিনি প্রখ্যাত শিল্পপতি-উজালা হারিকেন, উজালা গ্লাশ, ইরা গ্লাশ, হরদেও গ্লাশ, নাজিমুদ্দীন সেমাই, বিভিন্ন প্রকার পানের জর্দা, রুপসী/রুপবান টিন ফ্যাক্টরীর মালিক। চাচার বয়স প্রায় নব্বই বছর। চেহারা সুরত মাশআল্লাহ সৈয়দ মুজতবা আলীর আফগান ভৃত্য "আবদুর রহমানের বাংলাদেশী সংস্করন"! তাঁর সন্তান সংখ্যা পুরো একডজন।সেই একডজন সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন অত্যন্ত সিস্টেমেটিক ওয়েতে। অর্থাৎ, প্রথম মেয়ে,তারপর ছেলে, আবার মেয়ে তারপর ছেলে-এই ধারাবাহিকতার কোনো ব্যত্যয় হয়নি। উনার ছোট মেয়ে মরিয়ম আপাকে 'ইয়ে করে বিয়ে' করেন আমার কাজিন খালেদ ভাই। খালেদ ভাই আর মরিয়ম আপুর বিবাহ পুর্ব প্রণয়কালীন সময় চিঠি আদান-প্রদানের পিওন/রানারের গুরু দ্বায়িত্ব আমিই বিশ্বস্ততার সাথে পালন করেছিলাম(তবে গোপনে গোপনে সব চিঠিই আমি খুলে পড়তাম-সেই অভিজ্ঞতা আমিও ব্যক্তি জীবনে কাজে লাগিয়েছিলাম)। নাজিমুদ্দীন চাচা বৃটিশ শাসন দেখেছেন, দেখেছেন পাকিস্তানী আমল। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে নয়াবাজার পুড়ে যেতে দেখেছেন। দেখেছেন পাশের বাড়ির ছেলেটিকে মুক্তিযুদ্ধে চলে যেতে, দেখেছেন মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধে কিশোর ভাইটিকে প্রকাশ্য দিবালোকে পাক বাহিনীর হাতে নির্মম ভাবে প্রান হারাতে। ঐ পরিবারের সাথে এখনো আমাদের সুসম্পর্ক। আমরা পারস্পরিক সব অনুষ্ঠান-উতসবে একাত্ম হয়ে যাই এখনো। ঈদের সময় আমি এখনো তাঁকে সালাম করতে যাই-এবং সালামীও পাই! ঈদের দিন তিনি সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী, মাথায় নবাবী টুপি পরে "সিংহাসন টাইপের" একটি চেয়ারে বসেন। যারা দেখা/সালাম করতে যান-তাদের দীর্ঘ আলিংগন শেষে ঈদ সালামী দিবেন(সালামী দেবার জন্য টাকার একটা বান্ডিল রাখা থাকে টেবিলের উপড়),তারপর আতর লাগিয়ে দিয়ে বলবেন-"আগের জমানার শানশওকত অহন নাইক্কা। খানা খিলাও, মিঠাই খিলাও"! ঈদ এলে তার মনে পড়ে পুরনো সব কথা। ঈদ বলতেই নাজিমুদ্দীন চাচার মনে পড়ে জানি দোস্ত ফজুর সঙ্গে চকের মেলায় ৪ আনায় ভড়া পেট মিস্টান্ন খেয়ে সারাদিন হৈ-হুল্লোর করে কাটানো দিনগুলোর কথা। তখন একটা অভিজাত উতসব ছিল-রেসকোর্স ময়দানে ঘোড়দৌড় দেখা এবং সৌখিনদের অংশ নেয়া। পুরান ঢাকা সেই প্রাচীন জনপদ মোগল আমলে যা পেয়েছিল প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা, এখনও তার বুকে ধরে রেখেছে হারানো দিনের কিছুটা সৌরভ। লালবাগ, বংশাল, চক বাজার, সিদ্দিকবাজার, আলুবাজার, সদরঘাট, ওয়াইজঘাট, নবাবপুর, ইসলামপুর, ধোলাইখাল, নারিন্দা, লোহারপুল পর্যন্ত অঞ্চল নিয়ে ঢাকার যে বিশাল এলাকা সেখানে এখনও অতীতের কিছুটা ছোঁয়া রয়ে গেছে। বিশেষ করে ঈদ উৎসবে এখনও এখানে খুঁজে পাওয়া যায় নিজস্ব ঐতিহ্যের স্পর্শ।

নাজিরা বাজারের বনেদী বংশের সন্তান মীর মোকতার আলী(লেঃজেঃ(অবঃ)মীর শওকত আলীর চাচা)। ১৯২০ সালে তার জন্ম। তাঁর বাড়ি গেলে শোনাবেন পুরানো দিনের ঈদের গল্প। ঈদের মিছিল ছিল বিখ্যাত। মোগল আমল থেকেই ঈদের শাহী মিছিলের রেওয়াজ গড়ে ওঠে। ব্রিটিশ আমলেও ঈদের শাহী মিছিলে ছিল প্রচুর জাঁক জমক। চকবাজারের শাহী মসজিদে ঢাকার নায়েবে নাজিমরা ঈদের নামাজ পড়তে আসতেন। মোগল আমলে ধানমন্ডিতে ছিল শাহী ঈদ গা-যেখানে ঢাকার শিক্ষিত আর অভিজাত শ্রেনীর মানুষ নামাজ আদায় করতেন। তবে লালবাগ শাহী মসজিদ আর চকবাজারের শাহী মসজিদের ঈদের জামাত ছিল বিখ্যাত। সেই ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছেন পুরান ঢাকাবাসী। শবেবরাত থেকেই এই এলাকায় শুরু হয়ে যায় ঈদ উৎসবের প্রস্তুতি। রোজার শেষে যত এগিয়ে আসে ঈদের দিন ততোই জমজমাট হয়ে ওঠে ঈদের বাজার। মৌলভীবাজার চক বাজার আর ইসলামপুরের পাইকারী দোকানগুলোতে কেনাবেচার আসর জমে।

আমাদের আর এক চাচা ঢাকার বিখ্যাত ইয়ার মোহাম্মদ খানের বৃদ্ধা স্ত্রী ফজিলা চাচী পান খাওয়া ফোকলা দাঁতে হেঁসে হেঁসে জানালেন শাওয়ালের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যেত পটকা ফুটানো আর আনন্দ উৎসবের ধুম। চকের ঈদের মেলা ছিল বিখ্যাত। ঐতিহ্যবাহী এ মেলা চলতো তিন দিন। চকের কেন্দ্রীয় অংশে জমে ওঠা মেলা কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল ঘেষে ছড়িয়ে যেত উর্দুরোড পর্যন্ত। উনারাও পর্দা ঘেড়া ঘোড়ার গাড়ি চড়ে যেতেন সেই মেলায়। কি- না পাওয়া যেত সেই মেলায়! মাটির পুতুল, নানা রকম খেলনা, মুখোশ, বাঁশি, ডুগডুগি, ঢোল, কদমা,বাতাসা, মুড়লি,কুলপি কটকটিসহ নানা রকম পণ্যের সমাহার আর শিশুদের কলহাস্যে মুখর হয়ে উঠতো মেলা। মেলার মূল অংশে চলতো নাগরদোলার হুল্লোড়। চকের মেলার সেই জৌলুস আর নেই। মেলার পরিসরও হয়ে পড়েছে সীমিত। বর্তমানে বিভিন্ন মহল্লায় ছোট ছোট মেলা বসে। রাস্তায় খেলনার পসরা নিয়েও বসতে দেখা যায় অনেককে।

চকের মেলার জৌলুস ম্লান হয়ে গেলেও "চান রাতের" আনন্দ এখনও রয়েছে। মীর মোকতার চাচার স্ত্রী ফজিলা চাচীর এখনো মনে পড়ে চানরাতের কথা। চানরাতে চলতো মেহেদী বাটার ধুম। বাড়ির মেয়েরা এক সাথে বসে হাতে মেহেদী লাগাতেন নানান নকশায়। ঈদের রান্নার আয়োজনও শুরু হয়ে যেতে চান রাতেই। মসলা বাটার সঙ্গে চলতো গান আর হাসি ঠাট্টা। মেহেদী বাটার এই রেওয়াজ হারিয়েই গেছে প্রায়। যদিও ঢাকার "আমরা ঢাকা বাসী" সংগঠন এখনো অনেক ঘটা করেই মেহেদী উতসব পালন করেন।

পুরান ঢাকার ঈদের আরেকটি ঐতিহ্য আতর মাখা। প্রতিবছর ঈদের আগে জমজমাট হয়ে ওঠে আতরপট্রি। দরবারিখাস, মিশকাম্বার, মেশক-জাফরান, গোলাপখাস কত রকম নাম এসব আতরের । আমার দাদাজান আর আব্বার এই সব আতর সংগ্রহ করার নেশা ছিল। ওনাদের সংগৃহীত বিভিন্ন প্রকার আতর ভর্তি শিশি এখনো আমাদের পরিবারের কারোকারোর কাছে আছে। ঈদের দিন সকালে আতরমাখা তুলা কানের ভাঁজে গুঁজে জামাতে ঈদের নামাজ পড়া ছিল ঢাকাবাসীর নিজস্ব স্টাইল। আর পুরান ঢাকার ঈদের খাবার? মোগল আমল থেকেই পুরান ঢাকার খাবারের সুনাম রয়েছে। ঈদের জর্দা, সেমাই, ফিরনি, নেহারী, সুতি কাবাব, পোলাও, বিরানী, কোর্মা, রেজালার গল্প তো একদিনে শেষ হবে না।

পুরানো ঢাকা আর নতুন ঢাকার যোগাযোগ রক্ষাকারী বিশাল নর্থ সাউথ রোড কিছুটা হলেও পাল্টে দিয়েছে পুরানো ঢাকার দৃশ্যপট। পুরানো ঢাকাতেও এখন হরদম তৈরি হয়েছে এ্যাপার্টমেন্ট। তবু পুরানো ঢাকার লেন, বাই লেন, উঁচু খিলান দেয়া বাড়ি, লালবাগ দুর্গ, আহসান মঞ্জিল, ওয়াইজঘাট এখনও আমাদের মনকে নিয়ে চলে নবাবী আমলে। আর ঈদের দিনটিতে তো আরও বেশি করে মনে পড়ে ঐতিহ্যবাসী পুরানো ঢাকার সেইসব সোনালি দিনের কথা।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ ভোর ৬:৪৮
৩৪টি মন্তব্য ৩৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ক্রাউড ফান্ডিং-এর সুযোগ তৈরি করে সরকারী লাভজনক প্রজেক্টে জনগণের বিনিয়োগ নিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৩১

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, তা বুঝা যাচ্ছে। নাহলে, খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে জনগণকে অনুরোধ করতেন না। আমার মন হয়, দেশের মানুষের কাছেই অনেক সম্পদ আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×