somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

কেমন আছে গ্রামের মানুষঃ

১৬ ই অক্টোবর, ২০১০ সকাল ১০:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কেমন আছে গ্রামের মানুষঃ

পাঠক, কেমন আছে গ্রামের মানুষগুলো? কিভাবে কাটছে তাদের দিন? ইতোমধ্যে কি কি পরিবর্তন এসেছে তাদের সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক জীবনে বা মূল্যবোধে-তা ই আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। যদিও আমি মাত্র ২/৩ দিনে গ্রামের সার্বিক পরিস্থিতির খুব যে ভেতরে প্রবেশ করতে পেরেছি তা নয়। তবে বারবার যেন মনে হয়েছে আসলেই কি আমাদের কর্মকান্ড গ্রামমুখী? গ্রামের মানুষগুলো কি উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সম্পৃক্ত? বাংলাদেশের গ্রামগুলোর ভবিষ্যৎ কি? তাদের জন্য শহুরে মধ্যবিত্ত প্রভাবিত সংস্কার বা উন্নয়ণ কর্মসূচি কতটুকু কার্যকরী?

আমাদের দেশের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী গ্রামে বাস করেন। কিন্তু গত দুই-তিন দশকের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখি-দেশের এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে রাষ্ট্র কাঠামোর কাছে উপেক্ষিত হয়ে আসছেন। এই উপেক্ষা হয়তো শুধু গত দুই-তিন দশকের ইতিহাস নয়, আরো বহুকাল ধরেই হয়ে আসছে। কিন্তু গত দুই-তিন দশকে এই অবস্থা এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে গ্রামবাংলা আমাদের দেশের মূলধারায় আর সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারছে না। গ্রামবাংলার মানুষ রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াতে একদিকে রাষ্ট্র যেমন গ্রামবাংলার মানুষের পরিবর্তিত মনোকাঠামো সম্পর্কে অবগত হতে পারছে না, তেমনিভাবে উপেক্ষিত এই জনগোষ্ঠীর মনে 'রাষ্ট্র তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে' এই আস্থা ক্ষীণতর হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র তাদের এই সমস্যা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং এর সমাধানের জন্য কোন প্রয়াস সৃষ্টি করছে না।

রাষ্ট্রের সাথে গ্রামের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর এইসব বিচ্ছিন্নতা, সেটা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়েছে এবং তার নিদর্শন দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অথনৈতিক এই সকল ক্ষেত্রেই দেখতে পাওয়া যায়। গত দুই-তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি গড়ে বার্ষিক প্রায় ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবৃদ্ধির একটি বিরাট অংশ এসেছে কৃষিখাতে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে, কৃষিখাতের আধুনিকায়ণ হয়েছে, কৃষি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু কৃষকের ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের কোন উন্নয়ণ হয়নি। দেশের প্রবৃদ্ধির ফলাফল আমরা দেখতে পাই সব নগর-কেন্দ্রিক উন্নয়নে। গত দুই-তিন দশকে আমাদের শহরগুলোতে জীবনযাত্রার মান বেড়েছে বহুগুণ, কিন্তু গ্রামগুলো এবং তার মানুষগুলো রয়েছে সেই পূর্বতন তিমিরে। ফলে কৃষকের সন্তান আর কৃষিজীবী হতে চায় না। তারা হয় শহরমুখী। কিন্তু দেশের অর্থনীতি এমনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না যে শহরায়নের এই প্রক্রিয়াকে তা আত্মস্থ করতে পারে। উন্নয়নের সুফল গ্রামে পৌঁছাতে পারছে না। সৃষ্টি হচ্ছে শহরমুখী জনস্রোত। তথাপি গ্রাম থেকে শহরমুখী এই জনগণকে রাষ্ট্র দিতে পারছে না নুণ্যতম অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য।আবার শহরে যারা উন্নততর জীবনযাত্রা উপভোগ করছে, তাদের সাথে এই উপেক্ষিত ও বঞ্চিত জনসাধারণের সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবধান। সৃষ্টি হচ্ছে বিশাল মূল্যবোধের পার্থক্য। এই উপেক্ষিত জনসাধারণের মনে এই ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে যে, রাষ্ট্র তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে ততোটা ইচ্ছুক নয়, যতোটা ইচ্ছুক অধিকতর বিত্তবানের স্বার্থ সংরক্ষণে। এই হতাশা পুঞ্জীভূত হচ্ছে আরো এই কারণে যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জমির খন্ডায়নের সাথে সাথে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে পারছে না। এই হতাশার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে রাষ্ট্রের এক জনবিচ্ছিন্নতা যেখানে গ্রামবাংলার বিশাল জনগোষ্ঠীর মানসপট থেকে রাষ্ট্রের প্রভাব ক্ষীণতর হয়ে পড়ছে।

অবশ্য একথা বলা আবশ্যক যে কোন পুঁজিবাদী সমাজে কৃষিভিত্তিক থেকে শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হওয়া অর্থনীতিতে এই দৃষ্টান্ত বিরল নয়। কিন্তু সেখানে রাষ্ট্রের একটি কার্যকর ভূমিকা থাকা দরকার এই অভাবক্লিষ্ট জনসাধারণকে মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য। রাষ্ট্রের এই ভূমিকা প্রতিফলিত হবে তার দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে।দু:খজনকভাবে সত্যি কথা হচ্ছে যে, আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি এই ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।সকল রাষ্ট্রেরই সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রের দারিদ্র বিমোচণ কর্মসূচির অন্তত কিছু কার্যকারিতা থাকবে এবং থাকবে উদ্দেশ্যের স্বচ্ছতা যা দেশের ভাগ্যাহত জনগণকে তাদের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনে আশাবোধ সঞ্চার করতে।কিন্তু রাষ্ট্রের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচীর আশার বাণী জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে পারছে না। ব্যাপক দুর্নীতি ও পর্যাপ্ত সুশাসনের অভাবে এই কর্মসূচির ছোঁয়া গ্রামবাংলায় প্রবেশ করতে পারছে না। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে উপযুক্ত কোন প্রতিষ্ঠান নেই যা এইসব জনগণের আস্থাভাজন হয়ে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারে।ইউনিয়ন পরিষদ, নিম্ন আদালত, আইন রক্ষাকারী সংস্থাসমূহ, জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে উচ্চতর প্রশাসন-সর্বত্রই এই নিয়মহীনতা পরিলক্ষিত হয়।এইসব বিপুল হতাশাজনক পরিস্থিতি গ্রাম বাংলার জনগণকে রাষ্ট্রবিমুখ করে তুলছে, আর রাষ্ট্র হয়ে পড়ছে জনবিচ্ছিন্ন।

রাষ্ট্রের এই জনবিচ্ছিন্নতার আরো একটি বড় কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক বৈকল্য। আঞ্চলিক পর্যায়ে হোক, আর জাতীয় পর্যায়ে হোক, দেশের রাজনীতির এই দৈন্যদশা খুবই দৃষ্টিকটু। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক বাস করেন গ্রামে। কিন্তু রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে এবং পর্যায়ে তাদের কোন প্রতিনিধিত্ব আমরা দেখতে পাই না। অতীতে আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ এসেছেন গ্রাম থেকে। কিন্তু আজকাল আমরা এমন একজন সংসদ সদস্য খুঁজে পাবো না যারা গ্রামে বাস করেন। জাতীয় রাজনীতির কথা বাদই দিলাম, এমনকি একজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খুঁজে পাওয়া দুরূহ হবে যিনি গ্রামে বাস করেন। রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমিক, কৃষক ও ক্ষেত মজুরদের প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ছে। রাজনীতিতে এই প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণের অভাবে গ্রামের মানুষের মনে রাষ্ট্র আস্থা সঞ্চার করতে পারছে না। ফলে ক্রমান্বয়ে তারা রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

গ্রামের মানুষকে উপেক্ষা এবং রাষ্ট্রের এই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া একদিনে হয়নি। ক্রমাগত উপেক্ষা গ্রামবাংলার মানুষকে হতাশার যে অন্ধকারে নিয়ে গিয়েছে তার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তারা ঝুঁকে পড়েছে যুক্তিহীন প্রতিক্রিয়াশীল বিশ্বাসে। যদিও এ বিপথগামী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখনও নগণ্য, তবুও রাষ্ট্র যতদিন জনবিচ্ছিন্ন থাকবে, জনগণ যতদিন তার স্বার্থ সংরক্ষণে রাষ্ট্রের প্রতি পর্যাপ্ত আস্থাশীল হতে পারবে না, এই প্রক্রিয়া ততদিন বলবৎ থাকবে। রাষ্ট্রকে জনগণের পরিবর্তিত মানসপট উপলব্ধি করতে হবে এবং দেখাতে হবে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা। নতুবা আমাদেরকে হয়তো অনেক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ১০:২০
২৯টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×