"হৃদয়ে বাংলাদেশ" এ শ্লোগানে বাংলাদেশের অন্যতম স্যাটেলাইট চ্যানেল "চ্যানেল আই" তার বিভিন্ন ধরনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল দর্শকের ভালোবাসা অর্জন করেছে। চ্যানেলটির বেশির ভাগ অনুষ্ঠানই ইউনিক। কিন্তু আজ একটি অনুষ্ঠান দেখে নিতান্তই হতাশ ও ব্যথিত হলাম।
আজ দুপুর বারটার দিকে চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ করেই চোথে পড়ল ব্যাপারটি। বিশাল একটা মঞ্চের পেছনের পর্দায় বাংলাদেশের পতাকার মাঝখান দিয়ে বারবার ভারতের পতাকা ভেসে উঠতে দেখে থমকে দাড়ালাম চ্যানেল আই-তে। অনুষ্ঠানের নাম 'সুরদরিয়া-এপার ওপার'। দুই বাংলার শ্রেষ্ঠ ৩০ জন গানের শিল্পীদের নিয়ে প্রতিযোগিতা। অনুষ্ঠানটি ভারতের মূল ভূমিকাতেই নির্মিত। বিচারকের আসনে আছেন বাপ্পা লাহিড়ী আর বাংলাদেশের রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। উপস্থাপনায় বাংলাদেশের তানিশা আর ভারতের কে যেন, নামটা জানতে পারিনি। এপার বাংলা-ওপার বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ ৩০ জন গায়ক গায়িকার মধ্যে নাকি শ্রেষ্ঠতমকে নির্বাচন করা হবে। দু একজন বাদে অধিকাংশকেই মনে হলো আনাড়ি শিল্পী, জানিনা কোন ক্রাইটেরিয়ায় এদেরকে বাছাই করা হয়েছে।
একটু পর পর গান গাইছে শ্রেষ্ঠ (?!) শিল্পীরা। তারই মাঝে অতি আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করলাম ভারতীয় উপস্থাপক বারংবার নিয়মিত বিরতিতে বলছেন একই ডায়ালগ।
"দেশ, কাল, সীমানা কোন পরিচয় নয়। আমাদের পরিচয় ভাষায়। সেই ভাষার গান নিয়েই আমাদের আয়োজন।"
পেছনে বিশাল স্ক্রীণে বারবার ফুটে উঠছে বাংলাদেশের পতাকার মাঝ দিয়ে ভারতের পতাকা।
একটু পরপর নিচে টেলপে দেখা যাচ্ছে "দুই বাংলার গানের মিলন মঞ্চ"। "দুই বাংলার মহামিলনের আয়োজন"।
বাপ্পা লাহিড়ী একটা একটু পরপর গান গাইছেন, তার বিষয়বস্তুও আশ্চর্য রকম ভাবে এক। যেন তিনি দুই বাংলাকে মিলিয়ে দেয়ার সঙ্গীত ছাড়া জীবনে আর কিছু লিখেননি। উপস্থাপক-উপস্থাপিকা যথারীতি বাপ্পাকে 'বাপ্পাদা' বলে ডাকছিলেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের মেয়ে তানিশা বারবার রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে 'বন্যাদি' বলছিলেন, যা শুনাচ্ছিল অত্যন্ত দৃষ্টিকটৃ। কারন বাংলাদেশেরই কোন এক টিভি চ্যানেলে এই স্বনামধন্য শিল্পীকে উপস্থাপক তানিশাই পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে 'আপা' বলে সম্বোধন করেছিলেন। আপা বা দিদি, সেটা কোন সমস্যা নয়। কিন্তু তিনি যদি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন, তাহলে নিজের দেশে যেটা স্বাভাবিক রীতি, একটি প্রতিনিধিত্বশীল অনুষ্ঠানে সেটাই তো করনীয়। কই বাপ্পাকে তো একবারও ভুলে বাপ্পা ভাইয়া ডাকা হলোনা। আসলে কিসের মিলন ঘটাবার মহা আয়োজন চলছে, সেটাই আমার কাছে আশ্চর্যজনক মনে হল, কারন ভারতীয় উপস্থাপক যখন ৪/৫ মিনিট পর পর "দেশ, কাল, সীমানা কোন পরিচয় নয়। আমাদের পরিচয় ভাষায়। সেই ভাষার গান নিয়েই আমাদের আয়োজন" ডায়ালগ দিতে থাকেন, তখন এটাই তো বোঝা স্বাভাবিক নয় কি যে, তিনি শ্রোতাদের ইনডাইরেক্টলি বক্তব্যটি মেমোরাইজ করাচ্ছেন। তাদের মন মস্তিস্কে তা ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন।
'এপার বাংলা-ওপার বাংলা' শব্দগুলোর সাথে আমি কখনই সদ্ভাব রাখতে পারিনি। সোজা কথায় আমার বিবেক সায় দেয়না। অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের বিশেষ একটি গোষ্ঠি প্রায়শই এ কথাগুলো উচ্চারন করেন। এমন ভাব যেন একই দেশের দুটি প্রান্ত। অথচ একটি হল বিশাল দেশের একটি অঙ্গ রাজ্য আরেকটি বিশ্বের বৃকে ঠাই করে নেয়া ১৫ কোটি মানুষের স্বাধীন দেশ। এ যেন পাহাড়ের সাথে ঢিবির তুলনা।
কেউ কেউ বলবেন, এটি ভালো উদ্যোগ। সব কিছুতে নেগেটিভিটি দেখানো ঠিক নয়। হতে পারে ভালো উদ্যোগ। যারা ভারতের নামে কোন বিরোধিতা শুনতে রাজি নন,এমনকি টিপাইমুখ বন্ধ করে বাংলাদেশকে শুকিয়ে মারার পরিকল্পনা জানবার ব্যাপারে ভারতের পক্ষে স্ট্যান্ড নেন, শুধু এ যুক্তিতে সাত খুন মাফ করে দেন যে তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় সাহায্য করেছে, আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, তারা হয়তো ইতিমধ্যেই মাইনাস আর একরাশ গালিও বরাদ্দ করে দিয়েছেন। কিন্তু তাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, কোন পুলিশ যদি নির্যাতনকারীর হাত থেকে কারও অপহৃত কন্যাকে উদ্ধার করতে সাহায্য করে। কয়েক বছর পর যদি বলে, "যেহেতু তার জীবন রক্ষায় আমার বিরাট অবদান, তাই এখন থেকে তাকে আমার খুশী মতো চলতে দিতে হব, আমার পছন্দ মত বিয়ে দিতে হবে কিংবা তার বিয়ের পর তার বেডরুমটা ব্যবহার করতে দিতে হবে।" আপনি কৃতজ্ঞতা চিত্তে তখন কি তার কথা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেবেন? ভারতের প্রতি সহানুভুতি কিংবা ভালোবাসা তো নিজের দেশের প্রয়োজনেই। কিন্তু তা যদি নিজের জন্মভূমিকেও ছাঁপিয়ে যায়, কি করে তাতে বিবেক সায় দিতে পারে?
অনুষ্ঠানের বক্তব্য কিংবা নিচের টেলপের কথাগুলোকে যারা এত হালকা ভাবে নেন, তারা হয়তো বলবেন, আমি অন্ধ দেশপ্রেমে ভুগছি। হয়তো তাই। আমার ভাবনা ভিন্ন। কি শিখবে এ অনুষ্ঠান থেকে কি নেবে আমাদের নতুন প্রজন্ম?
এতো গেল থিউরী। খোদ ভারতেই শতাধিক জাতি গোষ্ঠি আছে, ভাষাও আছে তার চাইতে দ্বিগুন। ভারতের চারপাশেই তার প্রধান ভাষা হিন্দি ভাষাভাষী আরো অনেক দেশ আছে। জীবনে কোনদিন দেখেছেন বা শুনেছেন, হিন্দি নিয়ে এত মাতামাতি কিংবা আশেপাশে দেশগুলোতে সীমানা নয়, ভাষা নিয়ে অত্যাধিক মাতামাতি। তামিল ভাষা নিয়ে শ্রীলঙ্কাকে ভারতের সাথে একীভূত হবার প্রচ্ছন্ন আহবান জানাতে।
একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ কিভাবে সাংস্কৃতিকভাবে আরেকটি অপেক্ষা কৃত দুর্বল দেশের মানুষকে তার আদর্শে বদলে নেয়, তার ইপর প্রভাব বিস্তার করে, সেটি অজানা থাকবার কথা নয়। যারা বলেন, কি করে? সেটি বুঝেন না, তাদের জন্য কিছুই বলার নেই। শুধূ বলব, কষ্ট করে এখানে দেখুন এটি পড়েন।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০০৯ দুপুর ১২:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


