(লেখাটি পিলখানা ঘটনার কিছুদিন পরেই লেখা। শুধূ শেয়ার করার জন্য। আমি ঢালাওভাবে সাংবাদিক বা মিডিয়াকে দোষারোপ করিনি। শুধূমাত্র অনভিজ্ঞ ও আবেগ নির্ভর রিপোর্টিং এর বিরোধিতা করেছি)
২৫ ফেব্রুয়ারী পিলখানায় বাংলাদেশের ইতিহাসে নজীরবিহীন বিডিআর বিদ্রোহ (কিলিং মিশন?) শুরু হবার পর পর থেকেই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা বিপুল উৎসাহে কাভারেজ দিতে থাকেন। সমগ্র জাতি উদ্বিগ্ন চিত্তে অধির আগ্রহে বসে ছিল চ্যানেলগুলোর সামনে নতুন খবর পারার আশায়। বিডিআরের বিভিন্ন এ্যাকশনের দৃশ্য চ্যানেলগুলোতে লাইভ দেখানো হয়। বিদ্রোহী বীরদের(?) সাক্ষাৎকার নেবার প্রচেষ্টায় অবিরাম ছিল কিছু কিছু মিডিয়ায়। হাতে লেখা চিঠি, বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল দিয়ে তাদের সাক্ষাৎকার আর বঞ্চনার পক্ষে লাইভ রিপোর্টের শেষে নিজস্ব বক্তব্য দিয়ে বিডিআরের পক্ষে. আর্মির বিপক্ষে একটি জনমত তৈরীর চেষ্টাও চলে প্রথম দিকে। এটি সত্য যে ১/১১ এর পর সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার উচ্চাভিলাষের কারনে বাংলাদেশের সাধারন মানুষ দুইটি বছর নিরব বঞ্চনার স্বীকার হয়। এ কারনে আর্মির উপর ক্ষোভ থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। এই ক্ষোভ থেকেই মূলত প্রথম দিকে সাধারন মানুষ যে বিডিআরকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে গেছে, তা ঘটনার দিন বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের কথা শুনেই বুঝতে পেরেছি। এর কারণ যতটা না বিডিআরের প্রতি ভালোবাসা আর সহানুভূতি ছিল, তার চাইতেও ছিল আবেগ নির্ভর, দু বছরের বঞ্চনা, মূল্যবৃদ্ধির নিষ্পেষন, আর দুর্নীতি দমনের নামে আর্মির উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারনে।
কিন্তু যিনি বা যারা মানুষকে আস্থায় রেখে সত্য তথ্যটি দেবার শপথ করে এ পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন, তার কাছে আবেগ প্রত্যাশিত নয় বরং বাস্তবতাকেই তুলে ধরবার জন্য তিনি সচেষ্ট হবেন। দুর্যোগকে উস্কে দেয়া নয় বরং তাকে প্রশমিত করবার জন্য সকল প্রচেষ্টা চালাবেন। সাংবাদিক ভাইদের ক্যামেরার চোখ দিয়েই জাতি দেশকে দেখতে পায়, তার আহরিত তথ্যে সমৃদ্ধ হয় হয় জাতির মস্তিষ্ক। কিন্তু তিনি যখন আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন, তখন জাতিও অন্ধ হয়ে পড়ে, ভালো-মন্দ না ভেবেই প্রবল বেগে ধাবিত হয় গড্ডালিকা প্রবাহে।
বিদ্রোহের পেছনে কে দায়ী? বিডিআর না আর্মি- সেটি আমার আলোচনার বিষয় নয়, কে উস্কানী দিয়েছে কিংবা নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছে, সেসব আলোচনাতেও যেতে চাইনা। কেননা তা তদন্তেই বেরিয়ে এসেছে। তবে শুধু বঞ্চনাই যে এ ক্ষোভের পেছনে দায়ী নয়- তা তো জাতির সামনে পরিষ্কার। কিন্তু বেদনার সাথে বলতে হয়, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা সেদিন বিদ্রোহীদেরকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, ব্যতিব্যস্ত ছিলেন তাদের হিরোয়িক বক্তব্যগুলো কাভার করার জন্য । দেখানো হলো, বিডিআর সৈনিক সরাসরি ক্যামেরার দিকে এইম করে গুলি করছে। বারংবার সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী লেখাটিকে হাই লাইট করা হচ্ছিল। কিন্তু বিডিআরের সকলেই কি দায়ী ছিল এতে? ইমেজ তো নষ্ট হয়েছেই, এই জাতীয় প্রচারে মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানটির ইমেজ কোন তলানীতে গিয়ে ঠেকছে, সেটি কি একটু ভাবার প্রয়োজন ছিলনা? অথচ একজন সাংবাদিককেও বলতে বা তাদের প্রশ্ন করতে দেখতে পেলাম না যে ভেতরের অফিসাররা কেমন আছেন, কি অবস্থায় রাখা হয়েছে? ভেতরে আটকে পড়া শত শত নারী শিশুগুলো কেমন আছে? যে দুঃসহ আতঙ্কের আবহ তাদের ঘিরে রেখেছে, তার সৃষ্টিকর্তারা কি করছে নিরপরাধ মানুষগুলোকে নিয়ে? নিজেদের দাবী নিয়ে কেন তারা গুলি ছুড়ে বাইরের সাধারন মানুষগুলোকে হত্যা করছে? তাতে যা হবার হলো। সাধারন মানুষ ভালবেসে বিদ্রোহী খুনে গুলোকে খাবার-পানি দিল, র্নিদ্ধিধায় পালিয়ে যাবার জন্য টি শার্ট আর লুঙ্গী দিয়ে সাহায্য করল।
প্রতিটি ক্ষণে মিডিয়ার ঝোঁক ছিল প্রতি মুহুর্তের ড্রামাটাকে সম্প্রচার করা। অথচ যে কোন পক্ষকে হাইলাইট করার পূর্বে এটি তো সাংবাদিকতার স্বতঃসিদ্ধ নীতি, ব্যালেন্স করা। কোন বক্তব্য কারও বিরুদ্ধে যাবার পূর্বে, কারও বিরুদ্ধে জনমত তৈরী করবে এমনটি মনে হলে, সেই পক্ষের বক্তব্যও তুলে ধরা। সেটি কি করেছে আমাদের মিডিয়াগুলো? কিছু সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রচারিত হল, তারাও মুখস্থ বিদ্যার মতো করে সরাসরি কিছু ফেইলিউর আউড়ে গেলেন, বললেন বিডিআর বঞ্চনার স্বীকার। কিন্তু একবারও সরকারের কাছে তারা সাবেক জ্ঞাতি ভাইদের নিরাপত্তার দাবী কেন জানালেন না? কিছু হলেই তো মিডিয়াগুলো তথাকথিত সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কাছে গিয়ে ধর্না দেয়, তার ফলাফল ১/১১ দেখেছে। কিন্তু এ ঘটনার পর কেন মিডিয়া সাবেক কর্মকর্তাদের মুখ থেকে এই দাবী সরকারের কাছে পেশ করালো না? পরে তারা আবার নিজের ভুল স্বীকার করে বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে বিদ্রোহকে সমর্থন করে উস্কে দেয়ায় আগের দিনের অযাচিত বক্তব্যের জন্য সাজা হওয়া উচিত নয় কি? খুব বেশি হলে ২/৩ হাজারের মত খুনী বিদ্রোহী কোন মহলের ইন্ধনে এ নৃশংসতায় অংশ নিয়েছে, অথচ বাকী ৬০ হাজার বিডিআর সেনা কেন এ ঘটনার দায়ভার নেবে?
ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোতে নৃশংস হত্যাকান্ডের পর রং মাখিয়ে, মায়া দরদ মাখা ভাষায় রিপোর্ট করা হচ্ছে অথচ সে সময়ে তাদের কারো কারো রিপোর্টই একে উস্কে দেয়ার জন্য কি যথেষ্ট ছিলনা ? সারা দেশের বিডিআর ক্যাম্পে এই উস্কানী ছড়িয়ে দেবার জন্য এতটুকু দায়ভার কি তাদের নেই?
একই ঘটনা ঘটেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বিক্ষোভের সময়ও। নির্যাতিত ছাত্র সমাজ কিংবা সাধারন মানুষের আন্দোলনকে মিডিয়ায়ই ব্যাক-আপ দেবে, এটাই প্রত্যাশা। তারা সেটি করেও থাকে। কিন্তু ভাংচুরের দৃশ্য, গাড়ি পোড়ানো, সেনাবাহিনীর গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া, একজন ছাত্র কর্তৃক সেনাবাহিনীর জোয়ানকে লাথি দেয়ার ছবি সারা বিশ্ব জুড়ে প্রকাশ করে কতটুকু ফায়দা হয়েছে এদেশের? এ যেন দেশের টাকায় কেনা গাড়ি কিভাবে ভাঙতে হয়, পেট্রোল ঢেলে কিভাবে গাড়ি পোড়াতে হয়- তার হাতে কলমে শিক্ষা দেয়ার অবিরাম প্রয়াস। করুনা হয়, তারাই আবার বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশের মানুষকে বদলে দেবার কথা বলেন। হায় সেলুকাস! কি বিচিত্র সুশীল সমাজ।
যা পাওয়া যায়, সবটুকু প্রকাশ করাই কি স্বাধীনতা? সেলফ সেন্সরশীপের গাল ভরা বুলি যে মিডিয়া গুলো দিয়ে থাকে, তাও বা সেময়ে কোথায় গেল? আসলে এসব কিছুই দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক। দেশের প্রতি যাদের কোন কমিটমেন্ট নেই, একটি ঘটনা প্রচারের পর আফটার এফেক্ট কি হতে পারে, সে সম্পর্কে যাদের কোন ধারণা নেই, তারাই কেবল পারেন দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিতে। আগামী প্রজন্ম কি মেসেজ নেবে, এসব দৃশ্য থেকে? একটি শিশুর মনোস্তাত্তিক বিকাশে এটি যে কত বড় ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে, তা কি আমরা কেউ ভেবে দেখেছি? অবশ্য গরীব এই দেশে যেখানে তিন বেলা খাবারই পাই না, সেখানে আবার মনোস্তাত্তিক বিকাশের গাল ভরা বুলি টেনে আনা তাদের কাছে হাস্যকরও বটে!
যদি সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ লেখাটি তাদের স্বাধীনতার উপর অন্যায় আক্রমণের প্রচেষ্টা। তবে তারাই যে সঠিক ছিলেন, এক মুহূর্তের জন্য সেটাই মেনে নিলাম। তাহলে আপনারা বিডিআরকে যে হিরো প্রমাণে ব্যস্ত ছিলেন, সেটাও যে সঠিক ছিল, অন্তত সেটি স্বীকার করুন। একটি শৃঙ্খলা পূর্ণ বাহিনী যে কোন দাবী দাওয়ার জন্য ট্রেড ইউনিয়নের মতো বিক্ষোভ করতেই পারে, তাতে সমর্থন দিন। এ ঘটনার ভয়াবহতাকে বাড়িয়ে দেয়াটা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য মোটেও কোন ক্ষতিকারক বিষয় নয়, সেটি মেনে নিন। কয়েকটি দাবীর জন্য শত মানুষকে মেরে তারা কোন অপরাধ করেনি, বরং তাদের এটিকে উৎসাহিত করা চলে- অন্তত এটি স্বীকার করুন। জাতি তিন দিনের শোক পালন করে ভুল করছে- তার অযৌক্তিকতা নিয়ে রিপোর্ট করুন। নৃশংসতার স্বীকার পরিবারের শোকের ধারাবাহিক রিপোর্ট করে ভুল করছেন-সেটি মেনে নিন। তাহলে এই নিবন্ধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেব। জানি সাংবাদিক বন্ধুরা সেটি পারবেন না।
এটি সত্য অধিকাংশ মিডিয়া কর্মী, বিশেষ করে যারা বর্তমানে যারা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে কাজ করছেন, অধিকাংশেরই সাংবাদিকতার হাতে খড়ি অল্প কয়েকদিনের। সবাই যে সাংবাদিকতা পড়ে এসেছেন, এমনটিও নয়। অনেকে শুধুমাত্র ইন্টার মিডিয়েট পাস করে এ পেশায় এসেছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতাকে আমি ছোট করে দেখছিনা, তবে এটি একটি ফ্যাক্টর। কিন্তু তার চাইতেও বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে, ১.প্রশিক্ষণ, ২.অভিজ্ঞতা আর ৩.দেশের প্রতি কমিটমেন্ট। বিশেষ আগ্রহে ছাত্র জীবনে সাংবাদিকতার ক্লাস করতে গিয়ে শুনেছিলাম, এ তিনটি হচ্ছে সাংবাদিকতার প্রাণ। আর এ তিনটি জিনিসের অভাব এখন প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুভূত হচ্ছে, প্রকট হয়ে ধরা পড়ছে চোখে। অবশ্য এখন যারা ফিল্ড লেভেলে কাজ করছেন, এ জাতীয় অভিজ্ঞতা হয়তবা এবারই তাদের জন্য প্রথম। আশির দশকের পরে এমন ঘটনাও খুব একটা ঘটেনি। কিন্তু ইতিহাসের পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকলে হয়তবা তারা এ সমস্যাকে কাটিয়ে উঠতে পারতেন। তবে আশাহত হবার মতো বিষয়ও রয়েছে। যারা অভিজ্ঞ, সিনিয়র; বার্তা কক্ষকে নিয়ন্ত্রন করছেন, তারাও তো কথা রাখতে পারেননি। জুনিয়র সাংবাদিকরা না হয় রিপোর্ট তৈরী করেছে, কিন্তু সিনিয়ররা সামান্য সেন্সর করে করে তা দেখাতে পারতেন না? সবকিছুকে লাইভ টেলিকাস্ট করলেই তাতে চ্যানেলের জনপ্রিয়তা বাড়েনা, এটি তাদের উপলদ্ধিতে আনতে হবে। নারী নিগ্রহের ছবি আর অপরাধের বর্ণনা দেয়া আর সে দৃশ্য লাইভ তুলে ধরা কি এক হলো? তারা সে অপরাধের বর্ণনা দেবেন নাকি ঘটনাকে রসালোভাবে তুলে ধরবেন, সে স্বাধীনতা অন্য কোন ব্যক্তির থাকতে পারে কিন্তু যিনি নিজেকে সাংবাদিক বলে দাবী করেন তার থাকতে পারেনা। বিবেকের চাইতে বড় সেন্সর আর কে আছে?
বিডিআরের এ ঘটনায় প্রচার মাধ্যমের ভূমিকায় নুরুল কবীর, এবিএম মুসাসহ অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিকও টেলি মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নজীর বিহীন নৃশংসতার সমর্থক না হয়েও সেদিনের অনভিজ্ঞ ভূমিকায় প্রচারনা বিদ্রোহীদের পক্ষে চলে যাওয়ার ঘটনা সমগ্র সাংবাদিক সমাজকেই লজ্জায় ফেলে দিয়েছে। আমি সাংবাদিক নই কিন্তু তারা যে লজ্জায় পড়েছেন সেটা অন্তত বুঝতে পারি। অভিমানের বহিঃপ্রকাশের মাত্রা লেখায় একটু বেশি হয়ে গেলেও তাদের অবদান বা সম্মানের প্রতি আমি আস্থাশীল। আমার অনেক বন্ধু সাংবাদিক আছেন যারা এ প্রায়শই এমন অনেক বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। আগামী দিনে এ লজ্জায় যেন আবার না পড়তে হয় সেজন্য এখন থেকেই হামবড়াই মনোভাব ত্যাগ করে শিক্ষা গ্রহণের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। শিক্ষার জন্য কোন বয়স বা চুড়ান্ত বলে কিছু নেই। এদেশের নামী, সাংবাদিকতার দিকপালদের কাছ থেকেই শিখতে হবে সময় ও পরিস্থিতিকে কিভাবে সঠিক ভাবে বিশ্লেষন করতে হয়? কি করে বুঝতে হয় মানুষের অব্যক্ত অনুভূতি আর ভাষাকে, কিভাবে প্রশমিত করতে হয় উত্তাল ঢেউকে। সমস্যার চাইতে মানবিকতাটাই সবার আগে তুলে ধরতে হবে। ক্যামেরার সামনে নিজের চেহারা দেখানো সাহসের ব্যাপার কিন্তু সত্যিকারের বীরই পারেন সহস্র প্রতিকূলতার মাঝেও পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

