১৯৯৭ সাল। কলেজ পড়ুয়া টগবগে তরুন আমি। ভ্রমনের নেশা সেই ছোট্ট বেলা থেকেই। হঠাৎ অফার এল বড় মামার তরফ থেকে। বাবু, যাবে নাকি সুন্দরবন? কানকে যেন বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না ! বড়মামা খুলনা জর্জ কোটোর সিনিয়র এডভোকেট, একঘেয়েমির কবল থেকে মুক্ত পেতে প্রতি বছর বার এসোসিয়েশন এর তরফ থেকে সকল এডভোকেট'রা মিলে বিশাল এক লঞ্চ ভাড়া করে যায় সুন্দরবনে। তাদের ট্যুর থাকে কমপক্ষে চারদিন। এমন লোম হর্ষক ট্যুরের জন্য আমি যেন আজীবন অপেক্ষা করে ছিলাম, তাই বড় মামার অফার লুফে নিলাম ক্রিকেট প্লেয়ারদের মত।
আগেভাগে দোতালা লঞ্চের ডেকে বিছনা চাদর বিছিয়ে জায়গা বুকিং দিয়ে এলাম। সংগে টুকি টাকি কিছু জিনিসপত্র আর ক্যামেরা। বয়সে সবাই মুরব্বি গোছের। জুনিয়র পোলাপান বলতে আমাকে সহ আরো তিন চার জন হবে। সান্তনা এতটুকুই 'নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল'।
রাতের বেলায় শুরু হল আমাদের শুভ যাত্রা। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিনা। খুব ভোরে যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন আমরা গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করেছি। আমার এক দুর সম্পর্কের মামা বন বিভাগের প্রধান হওয়ায় কাষ্টমসের কোন ঝামেলাই হয় নাই। সংগে ছিল তিনজন নাম করা শিকারী এবং ৬/৭ টি দোনলা বন্দুক। নিরাপত্তার কোন সমস্যাই ছিল না। লঞ্চে ছিল এক ড্রাম খাবার পানি, এক ঝাঁকা ফার্মের মুরগী, প্রচুর ডিম এবং আনুসাঙ্গিক তৈজসপত্র।
গহীণ জঙ্গলের ভিতর প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল ছোট ছোট খালের তীরে অনেক বড় বড় সারস পাখি। দু'একজন উকিল বন্দুকবাজ লঞ্চ থেকে হাতের এইম পরীক্ষা করতে ভুল করল না। তাদের এইম দেকে বুঝে গেলাম এরা সবাই যাদরেল শিকারী! কারন গুলি হল ঠিকই কিন্তু সারস পাখি কিছুই টের পেল না শব্দ ছাড়া। আমার সন্দেহ হতে লাগল, বাঘের সামনে পড়লে এদের নিশানা ঠিক থাকবে তো?
সকালে হাতমুখ ধুতে গিয়ে বুঝতে পারলাম লবনাক্ত পানি কাকে বলে। সৌখিন মানুষগুলো খাবার পানি দিয়ে হাত মুখ ধোয়ার কাজ সেরে নিলেন সেই সাথে দুপুরে গোসলও। ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারি নাই শেষ দু'দনি খাবার পানি কপাল থেকে উঠে যাবে! সৌখিন মানুষগুলো এতগুলো যাত্রীর খাবার পানি সাবাড় করতে লাগল তাদের শরীর ধৌত করে। কেউ প্রতিবাদ করল না। মিষ্টি পানি দিয়ে হাত ধুয়ে দুপুর বেলার খাবার লঞ্চেই সেরে নিলাম। পড়ন্ত বিকালে আমাদের লঞ্চ আরো গভীরে প্রবেশ করল। চারিদিকে পাখির কলকাকলি এবং নির্জনতাকে খান খান করে দিয়ে ডেকে ওঠা বুনো পশু মনের মাঝে এক অজানা অনুভুতির জন্ম দিতে লাগল। সংগে আসা শিকারী এবং আমার সাহসী মামা একটা নির্জন এলাকায় নেমে গেলেন। তাদের উদ্দেশ্য কি তা আপনারা বুঝতেই পারেছেন। তিন চার মাইল দুরে গিয়ে আমরাও জঙ্গলে নামার জন্য বায়না শুরু করলাম। চার পাঁচটি বন্দুক নিয়ে সন্তোর্পনে রওনা হলাম। বেশ রোমাঞ্চিত শরীর, জঙ্গলের ভিতর কেউ বাঘের নাম মুখে নিতে পারবে না এটাই প্রধান শর্ত। তাই বাঘকে সবাই মামা বলেই সম্বোধন করছিল। এত গহীন জঙ্গল যে আকাশে সুর্যের আলো পর্যাপ্ত থাকলেও মনে হচ্ছিল রাত হয়ে গেছে। পা টিপে টিপে তিন মাইলের মত ভিতরে প্রবেশ করলাম, কিন্তু বাঘ মামা কোথায়? হরিণই বা কোথায়? চোখের সামনে এমন ঝোপঝাড় যে মনে হয় এর পিছনে লুকিয়ে আছে সুন্দর বনের ঐতিহ্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার। হঠাৎ বুনো পাখির চেচামেচি এবং বন খাসির জঙ্গল কাঁপিয়ে এলোমেলো দৌড় বুকের মধ্যে কাঁপন ধরিয়ে দিত। ধীরে ধীরে সন্ধা নেমে এল তাই ফিরতি পথ ধরলাম। হঠাৎ সামনে পড়ল এক বিশালাকৃতির কাল কেউটে সাপ। আমাদের দেখে ফনা তুলে দাড়িয়ে গেল। সত্যিকারের নিশানা পরীক্ষার সময় হয়েছে তাই সিনিয়র উকিল এখলাস উদ্দিন নিজেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বিশ হাত দুর থেকে গুলি ছুড়লেন। হায়রে নিশানা! তিন হাত দুরে একটা কেওড়া থেঁতলে গেল। ভয় পেয়ে সাপটা সামনের দিকে পালাতে শুরু করল। আবারো গুলি, বুঝতেই পারছেন সে গুলি কোথায় লাগল। বাধ্য হয়ে এক সাহসী তরুন হাতে থাকা একটা লাঠি নিয়ে তেড়ে গেলেন সাপের দিকে। সপাং করে বাড়ি মারলেন কোমর পেঁচিয়ে। স্থীর হয়ে গেল প্রাণীটা, তবে ফনা তুলে ফোস ফোস করতে ভুলল না। দ্বিতীয় আঘাত মাথার উপর, নিমিষেই নিথর হয়ে গেল ও শরীর। লাঠির মাথায় উঁচু করে লঞ্চে নিয়ে এলাম। ওজন পাঁচ/ছয় কেজির কম না এবং লম্বায় আট থেকে দশ ফিট মতো হবে।
রাতের বেলায় লঞ্চ থেকে নীচে নামা নিষেধ। তাই সবাই খাবার খেয়ে বিছানায় চলে গেলেন। হঠাৎ রাত তিনটার দিকে মৃদু হৈ চৈ শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল।
লাফ মেরে উঠে পড়লাম। ভীড় ঠেলে সামনে গিয়ে দেখি ইয়া বড় বড় সাইজের দুই হরিণ! সবাই আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠল। সকাল হবার আগেই চামড়া ছুলে মাংস কাটার কাজ শেষ। লাঞ্চ টাইমে সবার মনে এক অদৃশ্য আনন্দ, হরিণের মাংস দিয়ে ভোজ হবে আহ্ জিহ্বে জল এসে গেল অনেকের। হরিণের পেটে গরু কিংবা ছাগলের মতো ভুড়ি নাই। তাই প্রচুর মাংস আসে একটা হরিণ থেকে। ইচ্ছা মতো খেতে লাগল সবাই তবে খেতে গরুর মাংসের মতো স্বাধ নয়। তার পরেও নতুন স্বাধে কেউ কেউ আয়েশি টান মারলেন।
পরিনতিঃ এক বয়স্ক উকিল দুপুরে ঘুমিয়ে আছে লুঙ্গি পরে। কেউ বসে বসে তাস খেলছে কেউবা করছে খোশ গল্প। হঠাৎ দেখি উকিল সাহেব ঘুমের মধ্যে ফিচকিরির মতো করে লুঙ্গি মেরে দিয়েছে। তড়িঘড়ি করে উঠতে গিয়ে পাশের এক ভদ্রলোকের গায়ে লেগে গেছে। দুরে বসে হাসব নাকি কাঁদব ঠিক বুঝতে পারলাম না। সমবয়সী যারা ছিল তারা মুখ টিপে টিপে হাসতে শুরু করছে ইতিমধ্যেই। ভদ্রলোক লজ্জায় ঐ অবস্থায় বাথরুমে চলে গেলেন। ওনার প্রস্থান সবার মধ্যে মৃদু হাসি উচ্চ হাসিতে পরিনত হল।
আমাদের লঞ্চ এরই মধ্যে দুবলার চরের উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করেছে। পতিমধ্যে এক নির্জন স্থানে কিছু মানুষের সমাগম দেখে আমাদের লঞ্চ দাড়িয়ে পড়ল। সেই সুযোগে আমরা নেমে কিছু ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। হঠাৎ একজন জেলেপ্রকৃতির লোক হাউ মাউ করে কেঁদে মামার পায়ের কাছে গড়িয়ে পড়ল।
--স্যার আমাকে উদ্ধার করেন, আমি আজ চার পাঁচমাস মেজর সাহেবের হাতে বন্দি! আমার বউ বাচ্চারা না খেয়ে আছে। স্যার আমাকে এদের কবল থেকে বাঁচান।
বেশ কিছু লোক ওনার পিছন পিছন ধেয়ে এল এবং ওকে ধরে জোর করে টেনে হিচড়ে নিয়ে চলল।
-- ভাই দাড়ান; কি সমস্যা? আপনারা ওনাকে জোর করে ধরে রেখেছেন কেন?
-- স্যার, মেজর সাহেব আমাদের কাছে ওকে জিম্মি রেখে গেছে, এখন যদি আপনাদের সাথে ও চলে যায় তাহলে আমাদের গুলি করে সাগরে ভাসিয়ে দিবে, আপনার মেজর সাহেবকে চিনেন না;
আমাদের সাথে আসা শিকারী মামার হাত ধরে টেনে লঞ্চের কাছে নিয়ে এলেন..
-- স্যার এদের সাথে জড়ালে আমরা সুস্থ ভাবে ফিরতে পারব না। এই মেজর সাহেব গোটা সুন্দরবনের দস্যুদের কন্ট্রোল করে। স্যার চলেন ফিরে যাই।
পিছন ফিরে দেখি জিম্মির করুন আর্তনাদ! আমাকে একবার ছেলেটার মুখ দেখতে দেন। ওরা না খেয়ে আছে, আমি ছাড়া ওদের কেউ নেই!!!!!!!(হাউ মাউ করে কান্না দেখে আমার চোখের কোনে পানি চলে এল)
ভাবছি কে এই মেজর সাহেব? কেনইবা এদের বন্দি করে রেখেছে?
এখান থেকে পালানোর কোন পথই নাই। একদিকে সাগর অন্যদিকে কুলকিনারা হীন জঙ্গল। পতিমধ্যে রয়েছে পদে পদে বিপদ;
বিষন্ন মনে লঞ্চে উঠে এলাম। ঐ দিন রাতেও চলল হরিণ শীকারের পালা। একটা হরিণকে গুলি লাগিয়েছে কিন্তু আহত হরিণটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সাকালে আমরা সবাই মিলে শিকারের স্থানে নেমে খোঁজা খুঁজি করলাম। গুলির চিহ্ন এবং হরিণের পায়ের দাগ সবই দেখা গেল কিন্তু আহত হরিণটা কোথায়? ঘন্টাখানেক খোঁজার পরে দেখা গেল একটা কাশবনের মধ্যে পড়ে আছে। ওটাকে নিয়ে লঞ্চে চলে এলাম। খুঁজতে খুঁজতে সকাল ১০টা বেজে গিয়েছিল। হঠাৎ লঞ্চের এক যাত্রী তার হাতের বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে নৌ-বাহীনির লঞ্চ এদিকে আসছে বলে চিৎকার করে উঠল। সবাই একবার বাইনোকুলারে চোখ লাগিয়ে অনেক দুরে সেমনই একটা আঁচ করল। ভীত সন্ত্রস্ত যাত্রীগণ কি করবে দিশা করতে না পেরে আগে ভাগে শিকার করা হরিণটাকে পানির মধ্যে পায়ে ইট বেঁধে ডুবিয়ে দিল।
আস্তে আস্তে স্বচ্ছ হয়ে উঠল সেই অদৃশ্য বস্তু। হায় আপসোস ! ওটা ছিল একটা মাছ ধরার নৌকা;
ইতোমধ্যে আমাদের খাবার পানি শেষ হয়ে গেছে। সকালে নাস্তা সেরে এক উকিল সাহেবের ব্যক্তিগত পানির বোতল চুরি করে তৃষ্না মিটালাম। কিন্তু দুপুরে? গলা শুকিয়ে কাঠ, কাচ্চি বিরাণী পেটে পড়েই তৃষ্না যেন তিনগুন বেড়ে গেল। নদীর পানি এত লবন যে রাতের বেলা লঞ্চের পিছনে যে টিউবয়েল আছে তা থেকে পানি চাপলে, পানি পড়ার সময় জোনাকি পোকার মত আলো দৌড়াতে থাকে। মুখে নিলে তিতা লাগে।
সবার অনুরোধে মোংলার দিকে লঞ্চ মুখ ঘুরিয়ে দিল। প্রায় সাড়ে চার ঘন্টা পরে মোংলা থেকে তৃষ্না নিবারন করলাম। চার দিনের ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরলাম ঠিকই তবে মনের মাঝ থেকে সেই রোমাঞ্চকর মূহুর্ত কিছুতেই ভুলতে পারলাম না। আজো ভেসে ওঠে সেই হরিণটাকে নদীতে ডুবিয়ে দেবার দৃশ্য !!!
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


