এমন একটা সময় ছিল যখন বিটিভিতে মাসে একটা সিনেমা হত। রবি অথবা বুধ বার রাত নয়টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। দর্শকবৃন্দের চোখে ঘুম এলেও চোখ টানা দিয়ে টিভির সামনে বসে থাকতেন। যে বাড়িতে টিভি থাকত সে বাড়িতে ঐ দিন সন্ধা থেকেই বেশ উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করত। টেলিসামাদের ভেংচি কাটা কৌতুক দেখে ঘর সহ মানুষ হেসে উঠতাম। রাজ্জাক কবরী বা আলমগীর সাবানার ঠান্ডা ণৃত্য বেশ ভালই লাগত। সাদ কালো টিভিতে সেই আমালের সাদাকালো ফ্লিম নিঃসন্দেহে মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেত।
এর পরে চালু হল মাসে চারটি ছবি দেখানোর পালা। ঘরে সংগৃহীত ছিল টিভি অনুষ্ঠানের গাইড। কবে কি ছবি তা পূর্বে থেকেই সেখানে লেখা থাকত। তখনকার টিভির অনুষ্ঠানগুলো যেন সবার ঠুটস্ত ছিল। কবে ম্যাকগাইভার কবে কোন ধারাবাহিক নাটক কবে ইত্যাদি কবে ছায়াছন্দ এ সবই ছিল যেন লেখা পড়ার একটা অংশ। সিনেমার সময়ও বেশ পরিবর্তন হল। তখন রাতের পরিবর্তে ছবি দেখতো বিকালে। সোহেলরানা, জসীমের ছবি হলে আনন্দের সীমা থাকত না। দেলদারের বিশেষ কোন ডায়লগ সবার মুখে মুখে ঘুরে বেড়াত বেশ কয়েকদিন। যেমন ধরুন "খাপের খাপ লাইগ্যা গেছে" এই টাইপের ডায়লগ। নায়কদের কোমর দুলিয়ে নাচ দেখে অনেকেই একটু বিরক্ত হতেন। কারন ণৃত্য বলতে কোমরে হাত রেখে ডান-বাম বা সামনে পিছনে-ছাড়া আর তেমন কোন বিশেষ ভঙ্গি দেখা যেত না। গ্রামের সকল বয়সি ছেলে মেয়েদের দেখা যেত সিনেমার সামনে ভীড় জমাতে। সিনেমা হলের তখন রমরমা অবস্থা।
এর পরে এল রঙ্গিন যুগ। নতুন নতুন নায়ক নায়িকার আবির্ভাব। নাঈম-শাবনাজ, সালমানশাহ-মৌসুমিদের ভিষন কদর। উঠতি বয়সি ছেলে মেয়েদের প্রেম করার কৌশল শেখানোয় এসকল ছবির জুড়ি মেলা ভার। সেই সাথে পরিবর্তন হতে লাগল পোশাকের। তবে ণৃত্যের কোন পরিবর্তন চোখে ধরা পড়ত না। ক্যামেরার গ্লাস রঙিন হওয়ায় নায়িকাদের অংগের ভাঁজগুলো খুব নিখুঁত ভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করাই ছিল পরিচালকের মুখ্য উদ্দেশ্য। সকল শ্রেণীর দর্শক একত্রে বসে ছবি দেখা কমিয়ে দিতে থাকল। উঠতি বয়সিরা টিভির সামনে হা করে তাকিয়ে থাকলেও মুরব্বীরা বেশ অস্বস্থি বোধ করত। তখনো সিনেমা হলের রমরমা অবস্থা।
এলো ডিসের যুগ। মানুষের ঘরে ঘরে স্যাটেলাইটের কল্যানে হিন্দি ছবি দেখার ধুম পড়ে গেল। ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে লাগল বাংলা সিনেমার দর্শক। নতুন নতুন নায়ক নায়িকা এল ঠিকই তবে তাদের শরীরের কসরত দেখানো ছাড়া অভিনয়ে তেমন সুবিধা করতে পারল না। এদিকে বাংলা সিনেমার পরিচালকবৃন্দ হিন্দি সিনেমার সাথে তাল মিলতে গিয়ে সব যেন জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলল। সিনেমার কহিনী গান সব কপিরাইট হতে লাগল। সবই নকল করতে পারলেও ণৃত্যের সেই কোমর দুলানির কোন পরিবর্তন হল না। মুরব্বী শ্রেণীর দর্শক সিনেমা দেখা কমিয়ে নাটকের দিকে মন দিতে শুরু করলেন। সিনেমা হলেও দর্শক কমতে শুরু হল। বলিউডের সাড়া জাগানো ছবিগুলো যেন দর্শক সব ছিনিয়ে নিয়ে গেল এই বাংলা থেকে। মাঝে মাঝে দু'একটা ছবি সামাজিক হলেও বেশীরভাগই ছিল অসামাজিক এবং অশ্লীল দৃশ্যের সমাহার। মানুষের ঘরে ঘরে তখন টিভি চলে গেছে। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া বোঝা যেত না। বিটিভিতে ছবি দেখানোর হার আগের তুলনায় বেড়ে গেলও দর্শকদের বিটিভির চ্যানেল ঘুরানোর হার আশংকা জনক হারে হ্রাস পেতে শুরু হল। সেই সাথে মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করল সিনেমা হলগুলো। ভদ্র শ্রেণীর দর্শক তখন হলে গিয়ে সিনেমা দেখাকে প্রেস্টিজ মনে করা শুরু করল।
কালের পরিবর্তনে আজ হলিউডের রাজত্ব, বলিউড ছুটছে হলিউডের পিছনে তাদের টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে। আর ঢালিউড তথা আমাদের দেশ ছুটছে বলিউডকে নকল করতে কোন প্রকার আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া। পরিশেষে চিত্র জগতে তৈরী হচ্ছে এক একটা ছিঃ নেমা। যা দেখতে গেলে ওযু পর্যন্ত বিনষ্ট হয়ে যায়। আজগুবি কাহীনি আর ল্যাংটো নাচের দৃশ্য মানুষকে সিনেমা হল থেকে সম্পূর্ণ রূপে ঘর মুখি করে দিয়েছে। বিটিভিও মানুষ এখন দেখে না, সব কিছু পাল্টেছে ঠিকই পাল্টায়নি নায়ক নায়িকাদের নাচের সেই চির পরিচিত কোমর ঢুলানি নাচের।
যে সব সিনেমা হলের সামনে থাকতো রমরমা ভীড় সেখানে আজ মাছিদের উৎপাত। যা কি না সিনেমা হলের মালিকদের হা করা গালে যায় আর আসে। এমন করুন পরিনতির পরিবর্তনে বেশ কিছু টিভি নাটক নির্মাতারা সামাজিক ছবি উপহার দিয়ে কিছুটা হলেও দর্শকদের সিনেমা হলমুখি করার চেষ্টা করলেও তার হার নেহাতই কম।
বাণিজ্যিক ছবির সেই ডাক-সেটে নির্মাতাদের ব্রেনে যেন কোন সামাজিক ছবি গল্প স্থান পায় না। তাদের মাথা থেকে কেহ যেন সব টেকনোলজি চুরি করে নষ্টালজি ঢুকিয়ে দিয়েছে।
এত প্যাচাল পাড়লাম কেন জানেন? হঠাৎ করে টিভির চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে চোখে পড়ল কোন একটা চ্যানেলে বর্তমান জামানার এক নাম না জানা নায়কের ছবি প্রদর্শিত হচ্ছিল। স্বল্প বাসনার নায়িকা একটা গানের দৃশ্যে নানান ভঙ্গিমায় তার শরীরের স্পর্শকাতর জায়গা দেখিয়ে দর্শকদের মন রঞ্জনে ব্রত সেই সাথে নায়ক মহাশয়ের সেই চির পরিচিত কোমর ঢুলানি ণৃত্য যেন নুতন আর পুরাতনের মিকচার। গা ঘিন ঘিন করে উঠল.....
পরিচালক সাহেবরা কি পারবেন না সামাজিক বাস্তবমুখি ছবি তৈরী করতে? আরো কি পারবেন না নায়কদের ণৃত্য শেখাতে? যদি না-ই সম্ভব হয় তাহলে সিনেমা থেকে ঐ কোমর ঢুলানি এবং উলঙ্গ ণৃত্যের দৃশ্যটা বাদ দিলে কি কোন বিরাট ক্ষতি হবে?
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১২ বিকাল ৩:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


