বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয় দেশই তাদের মধ্যেকার সম্পর্ককে বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক সম্পর্ক হিসাবে দেখে থাকে। উভয় দেশের মধ্যেই অভিন্ন ইতিহাস, প্রথাগত ও ধর্মীয় সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে; যদিও দুটি দেশের মধ্যে অতীতে তিক্ত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। ১৯৭১ সালের হৃদয়বিদারক ঘটনাই দুটি দেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টি করে। ১৯৭৪ সালের ২২ই ফেব্র“য়ারী পাকিস্তান বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৭৪ সালের ২৩ ও ২৪ ই ফেব্র“য়ারী লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে যান। সেই সময় শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টোর মধ্যে দ্বি পাকি সম্পর্ক উন্নয়নে আলোচনা হয়। একই বছরের ২৭ ই জুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো বাংলাদেশে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় আসেন। মূলত তখন থেকেই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু হয়।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের েেত্র র্বতমানে চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রথমটি হলো ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের মা চাওয়ার বিষয়টি, দ্বিতীয়টি বাংলাদেশ অবস্থানরত বিহারী সমস্যা, তৃতীয়টি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পদ বন্টন এবং চতুর্থটি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বানিজ্যিক সম্পর্ক।
১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানে যে গণহত্যা চালানো হয়েছিল তার জন্য পাকিস্তান সরকার দু:খ বা অনুতাপ (জবমৎবঃ) প্রকাশ করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে মা চায়নি। ১৯৯৮ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ঢাকা সফরকালে ১৯৭১ সালের গণহত্যার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের প থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তোলা হলে এটাকে তৎকালীন সময়ের একটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীল ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেন। ২০০২ সালের পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি পারভেজ মোশাররফ ঢাকায় এসে ১৯৭১ সালের ঘটনার জন্য দু:খ প্রকাশ করেন। পারভেজ মোশাররফের দু:খ প্রকাশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সন্তোষজনক হিসেবে গ্রহন করে। তবে মোশাররফ ঢাকা ত্যাগের পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় বলে আমরা পাকিস্তানের সরকারের কাছে মা চাইতে বলেছিলাম তাদেরকে দু:খ প্রকাশ করতে বলা হয়নি। পাকিস্তানের নাগরিক সমাজের ৫১ টি সংগঠন ২০০২ সালে ১৯৭১ সালের ঘটনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে মা চায়। এসব সংগঠনগুলোর প থেকে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ঘটনার বিষয়ে তার অবগত ছিলো না এবং এ বিষয়টির জন্য পাকিস্তান সরকারের বাংলাদেশের কাছে পূর্বেই মা চাওয়া উচিত ছিল। মা চাওয়ার বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের ভাষ্য হলো, ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ বাংলাদেশী হত্যা ও ২ লাখ নারী ধর্ষন হয়নি । এ পরিসংখ্যানটি বাস্তবে আরো অনেক কম। তাদের মতে, বাংলাদেশ সরকার যদি হত্যা ও ধর্ষনের প্রকৃত তালিকা দেয় এবং বাংলাদেশ যদি তাদের জাতীয় অনুষ্ঠানগুলিতে পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব ব্যাপকভাবে প্রচার না করে তাহলে মা চাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবে।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি বাংলাদেশ পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়নের পথে একটি বাধা হয়ে কাজ করছে সেটা হলো বিহারী সমস্যা। ১৯৭১ সালে যে সকল বিহারী ভারত থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে আসে এবং সে সকল বিহারী বাংলাদেশে অবস্থান করছিলো তার পরিমান হলো ৫,৪০,০০০। তারা কেউই বাংলাদেশের মূল ধারার সাথে মিশতে পারে নি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিহারীরা পাকিস্তানের প অবলম্বন করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। স্বাধীনতার পর তারা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেনি এবং প্রায় সকলেই পাকিস্তানে ফিরে যেতে চেয়েছে। ১৯৭২ সালের ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে বসবাসরত পাকিস্তানীদের ফিরিয়ে নেবার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকার চুক্তি করলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয় নি। কারণ এ বিশাল পরিমান জনগনকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার মতো অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অবস্থা পাকিস্তানের ছিলো না। ১৯৮২ সালে ১,২৭,০০০ পাকিস্তানী জনগণকে তারা ফিরিয়ে নেয়। ১৯৮৫ সালে সৌদি ভিত্তিক “রাবিতা আল-আলম আল্-ইসলামী” নামক একটি সংগঠনের সহায়তায় বাংলাদেশে বসবাসরত পাকিস্তানীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেবার ব্যাপারে একটি চুক্তি হয়। ১৯৯২ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ বাংলাদেশে বসবাসরত পাকিস্তানীদের ফিরিয়ে নেবার ব্যাপারে একটি চুক্তি স্বার করলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এর কারণ হলো নওয়াজ শরীফের পরে বেনেজির ভূট্টো মতায় এসে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানীদের ফিরিয়ে নেবার ব্যাপারটি পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেন। ১৯৯৮ সালে নওয়াজ শরীফ পুনরায় শরীপফ রাবিতার সাথে স্বারিত চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। কিন্তু পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধুর জনগণ পাকিস্তানীদেও নিজ দেশে ফিরিয়ে নেবার ব্যাপাওে বিরোধিতা করে। বেলুচিস্তানের সরকার বাংলাদেশে বসবাসরত পাকিস্তানীদেও নিজ দেশে বসবাসের সুযোগ দেবার কথা বললেও প্রয়োজনীয় আর্থিক সংকটের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৪ সালের জানুয়ারী মাসে লাহোর হাইকোর্ট এক ঘোষণায় বলে, বাংলাদেশে যে সকল পাকিস্তানী বসবাস করছে তারা বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশে বসবাসরত পাকিস্তানীদেও নিজ দেশে পূনর্বাসন করার জন্য নওয়াজ শরীফের সরকার এশটি পাইলট প্রকল্প গ্রহন করেছিলো, যেখানে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের ৮ টি জেলায় ১০ মিলিয়ন রূপি ব্যায়ে ৫০,০০ ইউনিটের এশটি আবাসন প্রকল্প তৈরির ব্যবস্থা গ্রহন করেছিলেন। বাংলাদেশের পাকিস্তানী নাগরিকদেও বসবাস নিয়ে যে সমস্যা তার সমাধানের জন্য কোন সরকারই পুরোপুরি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসেনি। এ সমস্যার সমাধান কঠিন মনে হলেও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সম্পদ বন্টনের বিষয়টি বাংলাদেশ পাকিস্তান সম্পর্কের েেত্র আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পূর্বে পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার যে ব্যাংক মূলধন ও গতিশীল সম্পদ প্রদানের েেত্র বাংলাদেশের সাথে বৈষম্য করেছে তার পরিমান হলো ৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু পাকিস্তানের এই সম্পদ সঞ্চয় করার েেত্র সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিলো পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ। বাংলাদেশ সরকার মনে করে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তির উপর করে এই সম্পদ বন্টন করা উচিত। এই উপাদানগুলো হলো-(ক) জনসংখ্যা: জনসংখ্যার উপর ভিত্তি করে মোট সম্পদের অর্ধেক বাংলাদেশকে প্রদান করা। (খ) সম্পদের বন্টনের ভিত্তিতে: তৎকালীন পাকিস্তানের মোট যে সম্পদ ছিলো তাকে দু’ভাগে বিভক্ত করে অর্ধেক বাংলাদেশকে প্রদান করা। (গ) বৈদেশিক মুদ্রার ভিত্তিতে: ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে তার অর্ধেক পূর্ব পাকিস্তানকে দেয়া (ঘ) সম্পদের অনুপাতে: ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যে সকল সম্পদ অর্জিত হয়েছে তার অর্ধেক পূর্ব পাকিস্তানকে দেয়া। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের যে সকল হস্তান্তরযোগ্য সম্পদ বা স্থাপনা নির্মিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে যেগুলো হস্তান্তরযোগ্য সেগুলো শুধু বাংলাদেশ পাবে। আর যেগুলো হস্তান্তরযোগ্য নয় সেগুলো বাংলাদেশ পাবে না। বাংলাদেশ নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইকবাল আহমেদ খানকে সম্পত্তি বন্টনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি বলেন, ‘দু’দেশের সম্পত্তি ভাগ-বন্টন ও দেনা-পাওনার সম্পর্কে পাকিস্তান সরকার আলোচনা করতে চাইলেও বাংলাদেশ শুধু সম্পত্তির বিষয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। দু’দেশ যখন একত্রিত ছিলো তখনতো শুধু সম্পত্তি ছিলো না দেনাও ছিলো। সম্পত্তির বিষয়ে আলোচনা হলে দেনা নিয়ে কেন আলোচনা হবে না। এ কারনে দীর্ঘদিন এ বিষয়টির সমাধান হচ্ছে না।
বানিজ্যিক েেত্রও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেকটা প্রতিকূল। বাংলাদেশ যেখানে প্রতি বছর ৩০.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য পাকিস্তানে রপ্তানী করে (২০০১-০২সালের হিসাব অনুযায়ী), সেখানে পাকিস্তান বছরে ৯০.৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পন্য রপ্তানী করে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বানিজ্য ঘাটতি এতো বেশি হবার কারণ হলো, বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যে যে দ্বি পাকি অর্থনৈতিক ও বানিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে তার অধিকাংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। যদি দুটি দেশ দতার সাথে বানিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে নীতিনির্ধারন করতে পারে তাহলে বানিজ্য ঘাটতি অনেকটা কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যেকার সম্পর্কে এ চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সমাধান করা সম্ভব হলে দুটি দেশের মধ্যেকার সম্পর্ক উন্নয়নে অন্য কোন বাধা থাকবে না। পারস্পরিক সহমর্মিতা ও আন্তরিকতা নিয়ে দু‘দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে নীতি নির্ধারণ করতে পারলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক আরো দৃঢ় করা সম্ভব হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

