গোটা বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করে যে মানুষটি চুপ মেরে বসে রইলেন, আমাদের সেই বিদ্রোহী কবি, প্রেমিক কবি, সাম্যবাদের কবি, বিশ্ব মানবতার কবি, গণমানুষের কবি, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে আমার ছাত্র বেলা থেকেই। কিন্তু বিশাল সাহিত্য রাজ্যের অধিপতিকে পাঠক সমাজে তুলে ধরার দুঃসাহস ও সামর্থ আমার কখনই ছিলনা এখনো নেই। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবাদে কবি সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য আমার জানার মধ্যে আসে। এই জানা-অজানা তথ্য গুলোকে সন্নিবেশিত করে কবিকে আপনাদের মাঝে তুলে ধরার লোভ সামলাতে না পারায় আমার এই লিখা।
১৮৯৯ সালের ২৫ শে মে, ১১ই জৈষ্ঠ্য ১৩০৬ বঙ্গাব্দে তিনি ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বর্ধমান জেলার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার ডাক নাম ছিল দুঃখু মিয়া, নজর আলী, তারাখেপা ও নুরু। বাবা কাজী ফকির আহম্মদের দ্বিতীয়(?) স্ত্রী জাহেদা খতুন। তিন ভইয়ের দ্বিতীয় তিনি। অন্যরা হলেন কাজী সাহেদজান ও কাজী আলী হোসেন। উম্মে কুলছুম নামে তার এক বোনও ছিল।
তার পূর্ব পুরুষগণ বাগদাদ হতে দিল্লী আসেন, তারপর পাটনা ও বর্ধমান হয়ে চরুলিয়ায় বসবাস শুরু করেন। ১৯০৮ সালে কবির বয়স মাত্র ০৯ বত্সর তখন আকর্ষিক ভাবে তার বাবা মারা জান। বাবা ছিলেন স্থানীয় গোরস্থানের (হাজী পালোয়ান মাজারের) খাদেম ও মসজিদের ইমাম। সংসারের হাল ধরতে কিশোর নজরুলকে স্থানীয় মক্তবের শিক্ষকতার দায়ীত্ব নিতে হয় । কিশোর নজরুল এখন শিক্ষক। কিন্তু তাতেও সংসার চলে না। তাই তিনি চাচা কাজী বজলে করিমের ভ্রাম্যমান লোক নাট্যশালা বা লেটোতে যোগ দিয়ে গান, গীতিনাট্য রচনা করে তাতে সুরারোপ করতে শুরু করেন।
এই লেটোতে কাজ করতে করতেই কবি বাংলা ভাষার প্রতি আকর্ষিত হতে থাকেন, সংস্কৃত ভাষা ও হিন্দু ধর্ম সন্পর্কেও জ্ঞান লাভ করেন। লেটোতে থাকা কালে তিনি চাষার সং, শকুনিবধ, রাজা যুধিষ্ঠির সং, রাজপুত্রের সং ইত্যাদ্দি রচনা করেন। মধুসূদনের ‘বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ ও ‘মেঘনাদ বধ’ এর নাট্য রুপ দেন তিনি। সেখানেও তিনি বেশি দিন থাকলেন না ১৯১০ সালে লেটো ছেড়েদেন এবং ঐ বত্সরেই তিনি রানীগঞ্জের সীয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হন। পরে মাথরুন উচ্চ ইংরেজী স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে স্থানান্তরিত হন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক আর এক কবি, কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিকের কাছে পড়তে শুরু করেন। কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিক বুঝতে পারেন নজরুলের অসাধারণ প্রতিভার কথা। কিন্তু স্কুলের খরচ দিতে না পারায় তাকে আবার কবিয়ালদের দলে যোগ দিতে হলো। তাতেও আয় অপ্রতুল হওয়ায় তিনি প্রসাদপুরে একজন খ্রীস্টান রেলওয়ে গার্ডের বাসায় মাসিক এক টাকা বেতনে পাঁচকের কাজ করতে শুরু করেন। তার পরে আসানসোল এস. বক্স নামের চা-রুটির দোকানে কাজ নেন। শহরের তিন তলা এক বাড়ির সিড়িঁর নীচে দুঃখু মিয়া থাকতে শুরু করলেন। রুটির দোকানে কাজ তাই প্রতিদিন তাকে কাক ডাকা ভোরে উঠতে হত, কাজ শেষ হত প্রায় মধ্য রাতে। এই হাড়ভঙ্গা খাটুনিতে একদিন তার গায়ে আসে প্রচন্ড জ্বর। সকালে কাজে যেতে পারেনি দুঃখু মিয়া। সিডিঁর নীচেই অচেতন হয়ে প্রলাপ বকছিল ছেলেটি। বাসার মালিক পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর কাজী রফিজউল্লাহ সিড়িঁ বেয়েঁ নেমে আসলে বুঝতে পারেন ছোট্ট একটি ছেলে তার সিড়িঁর নীচে প্রচন্ড জ্বরে কাতরাচ্ছে। বাড়ির পরিচারিকাকে ডেকে তাকে কিছু খাবার দিতে বলে তিনি অফিসে চলে গেলেন। সেদিন থেকে দুঃখু মিয়া নিঃসন্তান দারোগা দম্পতির বাসায় থাকতে শুরু করেন। দারোগা বাবু কাজী রফিজুল্লাহ কবি প্রতিভার সন্ধান পেলে তাকে গ্রামের বাড়ী ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুরে কাজীর সিমলা গ্রামে পাঠান। সেখানে দারোগা বাবুর বড় ভাই কাজী সাখাওয়াত উল্লা থাকতেন। ১৯১৪ সালে দরিরামপুর স্কুলে কবিকে ৭ম শ্রেণীতে ভর্তি করানো হয় । অজানা কোন এক কারনে তিনি শেষ পর্যন্ত দারোগা বাবুর বাড়ী ছেড়ে অন্য এক বাড়ীতে থেকে দরিরামপুর স্কুলে ৭ ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে ছিলেন। এখানেই তিনি বাংলা, আরবী, ফার্সী ভাষায় বুত্পত্তিগত জ্ঞান লাভ করেন। ১৯১৫ সালে আবার তিনি রানীগঞ্জের সীয়ারসোল রাজ স্কুলে ফিরে যান এবং ৭ম শ্রেণী হতে পড়তে শুরু করেন। বার্ষিক পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করায় তাকে একবারে নবম শ্রেণীতে ভর্তি করানো হয়। এবং রাজবাড়ী (জমিদার বাড়ী) থেকে মাসিক সাত টাকা বৃত্তি পেতেন শুরু করেন। এই স্কুলের চার জন শিক্ষক দ্বারা তিনি প্রভাবিত হন। তারা হলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে সতীশ চন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী চেতনা নিবারণ চন্দ্র ঘটক, ফারসি সাহিত্য হাফিজ নুরন্নবী, সাহিত্যে নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েও প্রিটেস্ট পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ না করে তিনি দেশমাতৃকার টানে ১৯১৭ সালে ৪৯ নং বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদেন। সেই সুবাদে রেজিমেন্ট লাইব্রেরীতে তিনি প্রচুর খ্যাতনামা লেখকদের সাহিত্যকর্ম অধ্যয়নের সুযোগ পান। রেজিমেন্টের মৌলভির কাছে তিনি উর্দু ভাষার উপর জ্ঞান লাভ করেন। সেখানে তার লেখনি চলতে থাকে বেশ দ্রুততার সাথে। তিনি কর্পোরর থেকে হাবিলদার পদে উন্নিত হন এবং তার ব্যাটালিয়নের কোয়াটার মাস্টারের দায়ীত্ব পালন করেন। তার প্রথম লিখা ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’(১৯১৮)। ১৯১৯ সালের জুলাই মাসের বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ প্রকাশিত হয়। এখানে উল্লেখ্য যে কবির বাল্য বন্ধু তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধায় শুরুতে কবিতা লিখতেন আর গদ্য লিখতে ভালবাসতেন নজরুল। কিন্তু পরবর্তিতে দু’বন্ধুকে দেখি বিপরিত মেরুতে। ১৯২০ সালে তিনি সেনাবাহিনীর চাকুরী ছেড়ে দিয়ে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতিতে যোগদেন। এবং কলকাতার ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যকর্মীদের সাথে বসবাস শুরু করেন। এ সময় তিনি সাহিত্যিক মুজাম্মেল হক, আফজালুল হক, কাজী আব্দুল ওয়াদুদ ও মো: শহীদুল্লাহর সংস্পর্সে আসেন। ১৯২০ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘বাধঁণহার’ ‘সাতিল আরব’ ‘খেয়া পারের তরণী’ প্রকাশিত হয়। কবি নজরুল ১৯২১ সালে মো: শহীদুল্লাহ-র সাথে শান্তিনিকেতনে যান এবং কবি গুরু রবীন্দারনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা করেন (বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় এর সাথে তিনি প্রথম ঠাকুর বাড়ীতে গিয়েছিলেন) । ১৯২২ সালে ২৬ শে সেপ্টেম্বর ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধাচারণ করে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশিত হলে কবিকে প্রথম বারের মত জেলে যেতে হয়। একই বত্সর বিদ্রোহী, প্রলয় উল্লাস, অগ্নিবীণা, রচনা করেন। ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট মাসে কবির সম্পাদনায় ‘ধুমকেতু’ নামের একটি পাক্ষিক প্রকাশিত হয়। সে বত্সর তার ছোট্ট গল্প সংকলণ ‘ব্যাথার দান’ ও রচনা সংকলণ ‘যুগবাণী’ প্রকাশিত হয়। ২৩ নভেম্বর যুগবাণী সরকার বাজেয়াপ্ত করে এবং কুমিল্লা হতে কবিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯২৩ সালের ৭ ই জানুয়ারী কবি ম্যাজিস্ট্রেট এর কাছে লিখিত জবানবন্দি প্রদান করেন। পরবর্তিতে সেই জবানবন্দী ‘রাজ বন্দির জবানবন্দী’ হিসেবে সাহিত্যে পরিচিতি লাভ করে। ১৬ জানুয়ারী ম্যাজিস্ট্রেট তাকে এক বত্সর কারা দন্ড প্রদান করে। আলিপুর জেলে কারাবাস কালে ১৯২৩ সালের ২২ শে জানুয়ারী কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ তার ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি কারারুদ্ধ নজরুলকে উত্স্বর্গ করেন। কবি বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের দস্তখত করা এক কপি বসন্ত নিয়ে হাজির জেলে। কবি জেলে এই সংবাদ পেলে তাত্ক্ষনিক ভাবে ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতাটি রচনা করেন। ১৯২৩ সালের ১৪ই এপ্রিল তাকে হুগলী জেলে স্থানন্তর করলে রাজ বন্দির প্রতি দুর্ব্যহারের জন্য তিনি টানা ৪০ দিনের অনশন শুরু করেন। কবির শারিরীক অবস্থা অবনতি হতে থাকলে কথা শিল্পী শরত্চন্দ্র নিজে এসে এবং রবীন্দ্রনাথ তার বার্তার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের সার্থে তাকে অনশন ত্যাগ করতে অনুরোধ করেন। ২২শে মে জেল সুপার সরোয়ারর্দী কবির সাথে দেখা করে তার দাবি মেনে নিয়ে অনশন ভাঙ্গাতে রাজি করান। হুগলী জেলা কারাগারে থাকতেই তার বিখ্যাত গান ‘শিকল পরার ছল মোদের শিকল পরার ছল’ রচনা করেন। ১৯২৩ সালের ১৮ জুন তাকে বহরমপুর কারাগারে স্থানন্তর করা হয়। সেখানে তিনি আরো একটি বিখ্যাত গান ‘জাতের নামে বজ্জাতী, সব জাত জালিয়াতি খেলছে জুয়া’ রচনা করেন।
এক বত্সর তিন মাস কারাবাসের পর ১৯২৩ সালে ১৫ ডিসেম্বর তিনি মুক্তি পান। ঐ বত্সর অক্টোবর মাসে প্রকৃতিকে ভালবেসে তিনি দোলন ‘চাপাঁ রচনা’ প্রকাশ করেন। তার বিখ্যাত ‘পুজাঁরিনী’ এ কাব্যের একটি পরিনত কবিতা। ১৯২৪ সালের ২৫ শে এপ্রিল তিনি অনেক প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে হিন্দু মহিলা প্রমিলা সেনগুপ্তা (দুলিকে) বিয়ে করেন। কবির শশুরের নাম ছিল শ্রী বসন্ত কুমার সেনগুপ্তা। শাশুড়ী শ্রীমতি গীরি বালা দেবী। তবে এটি ছিল তার দ্বিতীয় বিয়ে(?)। তার প্রথম বিয়ে হয়েছিল কুমিল্লার মুরাদ নগরে ১৮ই জুন ১৯২১ সালে সৈয়দা খাতুন নার্গিসের সাথে (?)। প্রমিলাকে বিয়ের পর তিনি হুগলীতে বসবাসের মাধ্যমে একটু সংসারী হতে মনোনিবেশ করেন। সংসারের খরচ মেটাতে তিনি এবার মিডিয়া জগতে প্রবেশ করেন। ১৯২৫ সালে বিখ্যাত গ্রামফোন কম্পানি ‘হিজ মাস্টার ভয়েজ’ তার গানের প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে। ঐ বত্সরেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদেন। এবং গানের মাধ্যমে ভারতবাসীকে স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্সাহিত করেন। ১৯২৫ সালের মে মাসে কংগ্রেস আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি ‘ঘোররে ঘোর আমার সাধের চাকা ঘোর’ গানটি গেয়ে শুনান। সে সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জণ ও মহত্মা গান্ধী। বত্সরের শেষের দিকে তিনি রাজনৈতিক কারনে কুমিল্লা, মেদীনিপুর, হুগলী, ফরিদপুর, বাকুড়িয়া ভ্রমন করেন। এবং প্রভেন্সিয়াল কংগ্রেসের সদস্য হন। ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর কবির সম্পাদনায় ‘লাঙ্গল’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাম রাজনীতির মুখপত্র হিসাবে ‘লাঙ্গল’ সমাদৃত হতে শুরু করে। এই সময় নিপিডিঁত শ্রমিকদের নিয়ে তিনি ‘সাম্যবাদী’ কবিতাটি রচনা করেন। ‘রিক্তের বেদন’ ‘চিত্তনামা’ ও ‘পুবের হাওয়া’ ‘ছায়ানট’ ‘সম্রাট’ প্রকাশিত হয়। ‘চিত্তনামা’ ১৯২৫ সালে ১৬ জুন দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জণ দাসের আকর্ষিক মৃতুর উপর লিখা বিনয়াবনত শ্রদ্ধাবোধ। ১৯২৬ সালে তিনি কৃষ্ণ নগরে বসবাস শুরু করেন। সে বত্সর নভেম্বর মাসে তিনি পূর্ব বাংলা থেকে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য পদে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন এবং পরাজিত হন। সে সুবাদে তিনি বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলায় ভ্রমণের সুযোগ পান। এবং বাংলার মেহনতি মানুষ গুলো সম্পর্কে এক বাস্তব মুখী ধারনা জম্মে। কৃষ্ণ নগরে বসবাস কালে তিনি প্রচুর বাংলা গজল লিখেন বাঙালী মুসলমানদের কাছে গান শুনার একটা আবেদন সৃষ্টি করে ছিলেন। শুধু বাংলা গজল নয় তিনি শ্যামা সঙ্গীত সহ প্রচুর ভজন রচনা করে ছিলেন। ১৯২৭ সালে তার কবিতা সংগ্রহ ‘ফণি মনষা’ এবং উপন্যাস ‘বাধঁন হারা’ প্রকাশিত হয়। ১৯২৮ সালে গ্রামফোন কম্পানি হিজ মাস্টার ভয়েজে তিনি গান রচয়িতা, সুরকার, গীতিকাব্য রচয়িতা ও পরিচালক হিসাবে যোগদান করেন। একই বত্সর তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওতে যোগ দেন ও সিন্ধু হিন্দোল, সঞ্চিতা, বুলবুল ও জিঞ্জির প্রকাশিত হয়। এবং ১৯২৯ সালে চক্রবাক প্রকাশিত হয়। সে বত্সর কবির প্রথম সন্তান অরিন্দম খালিদ বুলবুল মারা যায় এবং তৃতীয় সন্তান কাজী অনিরুদ্ধ বা লেলিন বা নিনি জম্ম গ্রহণ করে। ১৯২৯ সালে কবি তিন দিনের সফরে রজশাহীতে আসেন এবং রাজশাহীর কাদিরগঞ্জের হাজী লাল মহম্মদ সাহেব এর বৈঠক খানায় ছিলেন। এবং টাউন হলে তাকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। দ্বিতীয় পুত্র সান-ইয়াত-সেন বা সনি কাজী বা সব্যসাচী। বুলবুলের সজ্জা পাশে বসেই নজরুল কবি ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াত গুলোর বাংলা অনুবাদ করেন। ঠিক সে সময়ে তার জীবন দর্শন পরিবর্তন হতে থাকে। তিনি আধ্যাত্মিক চিন্তায় প্রবেশ করেন। এই ১৯২৮-২৯ সালে তার বিখ্যাত গান ‘ভুলি কেমনে..’ ‘দু’ফোটা চোখের জল ও কাজল চোখে’ খ্যতিমান গায়িকা আঙ্গুর বালা কন্ঠ দেন। ১৯২৮ সালে আলবার্ট হলে তাকে জাতীয় কবি উপাধি প্রদান করা হয়। ১৯২৯ সালে ভারতের জাতীয় প্রচার মাধ্যম অল ইন্ডিয়া রেডিও প্রথম কবিকে নিয়ে সরাসরি অনুষ্ঠান করেন। ঐ একই বত্সর অর্থাত ১৯২৯ সালের ১০ ডিমসম্বর কবিকে সর্ব ভারতীয় বাঙালীদের পক্ষ থেকে কলকাতা আলবার্ট হলে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। সংবর্ধনায় উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞানি প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস ও ব্যারিস্টার ওয়াজেদ আলী। ব্যারিস্টার ওয়াজেদ আলী নিজে মান পত্র পাঠ করেন। নেতজী তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আমরা যখন যুদ্ধ যাব তখন তার গান গাইব, যখন কারাগারে থাকব তখন তার গান গাইব।’ কবি সে দিন বলে ছিলেন, ‘আমি বাংলার হলেও আমি শুধু বাংলার নই আমি সারা বিশ্বের। ১৯৩০ সালে তার ‘মৃত্যুক্ষুধা’ প্রকাশিত হয়। একই বত্সর তার কারাগার নাটকটি ১৮ দিন অভিনিত হবার পর সরকার বন্ধ করে দেয়। ফলে নজরুলের জন প্রিয়তা আরো বেড়ে যায়। ৩০ সালেই ‘প্রলয় শিখা’ প্রকাশের জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়। সে বত্সর ১৬ ডিসেম্বর তার ছয় মাস কারা দন্ড হয়। হাইকোর্টে আপিলের আবেদন করলে তাকে জামিন দেওয়া হয়। ১৯৩২ সালে ‘মহুয়া’ কলকাতা বেতারে প্রচারিত হয়।৩২ সালের ২৫-২৬ ডিসেম্বর আলবার্ট হলে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি কবিকে সংবর্ধনা প্রদান করেন। সন্মাননা হিসেবে সমিতির পক্ষ থেকে কবি কায়কোবাদ নজরুল ইসলামকে একটি সোনার কলম ও দোয়াত উপহার দেন। সে বত্সর হিজ মাস্টার ভয়েজ ছেড়ে দিয়ে মেগাফোনে যোগদেন। পরের বত্সর মেগাফোন থেকে আবার হিজ মাস্টার ভয়েজ এ ফিরে আসেন। ১৯৩৪ সালে তিনি সিনেমা জগতের সাথে মিলিত হন। তার প্রথম অভিনিত সিনেমা ‘ধ্রুব’ সেখানে তিনি নারদার চরিত্রে অভিনয় করেন। এক এক করে ‘গ্রহফের’ ‘বিদ্যাপতি’ ‘গোরা’ ‘নন্দিনি’ ইত্যাদ্দি সিনেমায় অভিনয় করেন। ১৯৩৫ সালে তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে কলকাতা বেতারে যোগোদন। এই সময় ‘হারামণি’ ‘মেলামিল’ ‘নবরাগ’ ‘মালিক’ প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। এটিই ছিল তার সঙ্গীত রচনার স্বর্ণ কাল। হিজ মাস্টার ভয়েজ ও মেগাফোন ছাড়াও টুইন কলোম্বিয়া, হিন্দুস্থান, সেলোলা, প্যানোলিয়া ও ভি.এল.ও তে কাজ করে ছিলেন। নজরুল প্রায় তিন হাজার গান রচনা ও সুরারোপ করেন। ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা গেলে সেই দিনেই ‘রবিহারা’ ‘সালাম অস্ত রবি কবিতা লিখেন এবং রবিহারা কবিতাটি নজরুল নিজে কলকাতা কেন্দ্র হতে আবৃত্তি করেন। ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে তার অসুস্থ্যতার বিষয়টি ধরা পড়ে। ৯ জুলাই কলকাতা বেতারে ছোটদের জন্য অনুষ্ঠানে কবি গল্প শুনাবেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন কবি বন্ধু নৃপেনকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। দু-এক কথা বলতেই থেমে গেলেন। কবি চেষ্ঠা করছেন কথা বলার কিন্তু কথা বলতে পারছেন না। শুরু হল কবি জীবনের করুণ আর এক অধ্যায়। প্রথমে হোমিও প্যাথিক চিকিত্সা করানো হয়। কোন ভাবেই আরোগ্য হচ্ছে না। ১৯৪২ সালের শেষের দিকে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার কারনে তাকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ইউরোপের কোন দেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এই অবস্থায় ১৯৫২ সালে কবি ও কবি পত্নীকে রাচিঁর মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। চার মাস তিনি রাচিতেঁ ছিলেন। নজরুল চিকিত্সা কমিটি নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। বিখ্যাত রাজনীতিবীদ শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি এতে সহযোগীতা করেন। অবশেষে ১৯৫৩ সালের ১০ মে উন্নত চিকিত্সার জন্য লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হন। লন্ডনে তিনজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রাসেল ব্রাউন, উইলিয়াম সেজিয়েন্ট ও ম্যাককিস্কা সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি মেডিক্যাল টীম গঠন করে নজরুলের চিকিত্সা শুরু করা হয়। ডাক্তারা প্রত্যেকে ২৫০ পাউন্ড করে ফি নিয়ে ছিলেন। উচ্চ মেডিক্যাল টীম রেপোর্ট দেন কবি এক মানসিক দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত। এই মেডিক্যাল রেপোর্ট ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হলে প্রায় সকলেই এক মত হন যে, এই রোগ নিরাময় সম্ভব নয়। অবশ্য ম্যাককিস্কা একটি অপারেশন করতে চাইলে, বণ বিশ্ববিদ্যলয়ের অধ্যাপক রোয়েন্টগেন ম্যাককিস্কের এই অপারেশনের বিরোধিতা করেন। পরবর্তীতে সেরিব্রাল এনজিওগ্রাফি করানো হয়। নোবেল বিজয়ী চিকিত্সক জুলিয়াস ওয়েগনারের অন্যতম ছাত্র ড: হ্যান্স হফ-র (ভিয়েনা) অধীনে ভর্তি করা হয়। ড: হ্যান্স হফ বলেন, কবি ফিক্স ডিজিজ নামক একটি নিউরণ ঘটিত সমস্যায় ভুগছেন। এই অবস্থা থেকে তাকে ফেরানো অসম্ভব। সে সময় পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ড: বিধান চন্দ্র রায় ভিয়েনায় গিয়ে ড: হ্যান্স হফের সাথে দেখা করে কবি সন্পর্কে বিস্তারিত জেনে ১৯৫৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর রোম হয়ে কবিকে দেশে ফিরে নিয়ে আসেন। এ বিষয়ে ড: অশোক বাগচি একটি প্রবন্ধ লিখে ছিলেন ১৯৫৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর কলকাতার দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় ‘ভীয়েনায় নজরুল’ নামে। তিনি উল্লেখ করে ছিলেন যে উইরোপের অন্যান্য দেশে কবি নজরুলের চিকিত্সা ফি না লাগলেও ব্রিটিশ চিকিত্সকরা নজরুলের চিকিত্সার জন্য বড় অংকের ফি চেয়েছিল। ১৯৪২ থকে ১৯৭৬ সুদীর্ঘ ৩৪ বত্সর তিনি এভাবেই চুম করে বসে রইলেন। এর মধ্যে বাঙালীরা জন্ম দেয় স্বাধীন এক ভুখন্ড বাংলাদেশ। বাঙালী জাতির মহা নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ভারতের সাথে আলোচনার মাধ্যমে ১৯৭২ সালের ২৪ মে স্বপরিবারে কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। পরের দিন ১১ জৈষ্ঠ কবির ৭৩ তম জন্ম দিন সারাদেশে রাষ্ট্রীয় ভাবে পালিত হয়। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মান সূচক ডি.লিট উপাধী প্রদান করেন। ১৯৭৫ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে তাকে একুশে পদক দেওয়া হয়। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে জগত্তারিণী ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৯ সালে ডি.লিট প্রদান করে। ১৯৬০ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মভুষণ উপাধি প্রদান করে। এসব উপাধী তাকে কোন ভাবেই প্রভাবিত করেনি, কেননা তিনি যে অচেতন কবি। অবশেষে ঘনিয়ে এলো সেই ক্ষন ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট রবিবার সকাল ১০টা ১০মিনিট ঢাকার পি.জি হাসপাতালে শেষনি:শ্বাস ত্যাগ করলেন বাংলার বুলবুল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল। তার কথা মত তাকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের কেন্দ্রীয় মসজিদের পার্শে ঐদিন বিকেল ৫টা ৩০মিনিটে ।
নজরুল জন্মের ১১২ তম দিবসে দেখতে চাই আন্তর্জাতিক পরি মন্ডলে কবির অবস্থান। অনেক পরে হলেও আমাদের দু:খু মিঞা বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরি মন্ডলে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এ বিষয়ে অগ্রণী ভুমিকা পালন করছে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙালীরা। কবিকে নিয়ে বিভিন্ন দেশের বাঙালী কমিউনিটিতে সেমিনার, সেম্পোজিয়াম হচ্ছে। জার্মান অধ্যাপক ও মায়েজ ভান্ডারী গবেষক হ্যান্স হান্ডার নজরুলকে নিয়ে গবেষনা করছেন। জার্মানীর হ্যালে বিশ্ববিদ্যালয় ও হাইডেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডি ও সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট ছাত্রদের কবি নজরুলকে নিয়ে লিখা পড়ার ব্যবস্থা করেছেন। ক্যালোফর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি-র নর্থ রিড বিভাগে ও ইউনিভার্সিটি অফ কার্টিগার্ড কবি নজরুল বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে। চাইনিজ প্রফেসর রাই কান ইউয়ান, ইতালিয়ান ফাদার রিগান ও করেলো কবি নজরুলকে নিয়ে গবেষণা করছেন। এছাড়াও ফ্রান্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল বিষয়ে কাজ করছে। রাশিয়া, স্পেন, সুইডেনেও অনেক ইউনিভার্সিটি নজরুল ইসলামকে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। ইউরিভার্সিটি ম্যাসাটুসের অধ্যাপক ড: ইউস্টার্ন ল্যগলী নজরুল ইসলামের উপর একটি পূর্ণাঙ্গ বই লিখেছেন। জার্মানীর এক জন মহিলা কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছেন। ইরান সরকার নজরুল ইসলামকে নিয়ে বেশ বড় ধরনের কাজ করতে বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনা করছে।
তথ্য প্রযুক্তি ও মিডিয়ার সুবাদে আমারা নজরুল ইসলামকে দ্রুত আন্তর্জাতিক পরি মন্ডলে তুলে ধরতে পারি। এবং যে সমস্ত ব্যাক্তি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ইতোমধ্যেই কবিকে নিয়ে কাজ শুরু করেছে তাদের সাথে আমাদের সরকার ও নজরুল কেন্দ্রীক প্রতিষ্ঠান গুলো (নজরুল একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট) একটু সমন্বয় করেলেই আমার মনে হয় বিদ্রোহী কবিকে নিকট ভবিষতে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তুলে ধরা সম্ভব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


