somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্ত করো ভয়.....................................(সংগৃহীত)

০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০১০ সকাল ৯:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মুক্ত করো ভয়
নিজেকে কেবল একা না ভেবে অসংখ্য জনের সঙ্গে এক হ’য়ে অনেক শক্তির আধার ভাবাই সঙ্গত। অসংখ্য জন, অসংখ্য জীবন আর অসংখ্য মানুষের জীবনালেখ্যেই তো মানব-সংসারের সৃষ্টি। বস্তুতপক্ষে ব্যক্তির আলাদা আলাদা জীবনের সমাহারেই মানুষের সমাজ। সেই সমাজের ভিত্তি হলো সুনীতি ও শুভমানসচেতনায়। মানুষের যৌথ সৃষ্টির ফলাফলই হচ্ছে এই পৃথিবী- প্রগতি ও সভ্যতা। সুনীতি, শুভমানস, আপন-অস্তিত্ব ও সত্তাকে রক্ষা ক’রে জীবনকে জাগ্রত রাখতে হয়। আনন্দময় করতে হয়। কিন্তু আমরা নৈতিকতার নাগপাশ কেটে কেন প্রতিদিন অনৈতিক করে ফেলি আমাদের জীবনধারাকে। কোন্ ভয় থেকে, কোন্ অশুভ-অদৃশ্য অপশক্তির দাপটে সবকিছু বিসর্জন দিয়ে ফেলি। অপরের অকল্যাণ-অমঙ্গল চিন্তায় আমার কল্যাণ আমার সুন্দর কোথায়? এই প্রশ্ন ক’রে নিজেকে কেন বার বার বিহ্বল, বজ্রবিদ্ধ করতে পারি না? তাহলে ভীতিটা কিসের? ভয়টার উৎসই বা কোথায়? লোকের ভয় আছে? রাজার কিংবা রাষ্ট্রশক্তির ভয় আছে? কেন আমরা কবিগুরুর মতো উচ্চারণ করতে পারি না!
‘‘এ দুর্ভাগা দেশ হতে হে মঙ্গলময়
দূর করে দাও তুমি সর্ব তুচ্ছ ভয়-
লোক ভয়, রাজভয়, মৃত্যু ভয় আর
দীনপ্রাণ দুর্বলের এ পাষাণভার।”

মানুষের সভ্যতায় নৈতিক ধর্ম ও দর্শন কয়েক হাজার বছর কাজ ক’রে গেছে। কিন্তু আজকাল নয়া-দুনিয়ার সমাজও রাষ্ট্রে বিজ্ঞান সেখানে ওতপ্রোত হয়েছে বিপুল মাত্রায়। বিজ্ঞান বোধ করি সেই সামাজিক ও রাষ্ট্রিক অর্থে কোনো বিপ্লবের বার্তা বহন ক’রে আসে না। বিজ্ঞান আসে বস্তুর ভেতরের অণু-পরমাণু- সময়ের, কালের মুহূর্তকণার পরম্পরার সত্য সন্নিবেশ সাধনের মধ্য দিয়ে। বিপ্লব সমাজ-দেশ-রাষ্ট্র এবং পৃথিবীকে রক্তাক্ত করে। বিজ্ঞান সেখানে মানব সমাজের ভেতর গতি সঞ্চার করে। পৃথিবীকে ধাতববস্তুর আধারে গতিশীল করে তোলে ক্রমাগত। জীবনানন্দ দাশ সমাজে ও রাষ্ট্রে বিপ্লবের প্রত্যাশা করে একদা বলেছিলেন:

“বিপ্লব, অবিশ্যি, শান্ত ভাবেও হতে পারে- অনেকখানি সময় লাগিয়ে ছোট-মাঝারি কিস্তিতে; বহু শত বৎসর পরে যোগফলে মহাবিপ্লবের চেহারাটা অনুমান করা যাবে। বড় বিপ্লব দিয়েই শুরু হতে পারে- ততটা শান্ত ভাবে নয়- বেশি মানবীয় শক্তি খরচ করে নয়। যে সভ্যতা দর্শনের আঁধার-খননে আবছা হয়ে ছিল এতকাল, তাকে যুক্তির পথে চালিয়ে নিয়ে ক্রমেই আলোকিত করে তুলবার জন্যে- পৃথিবীর সকলেরই নিঃশ্রেয়সের জন্যে এই বিপ্লব। অনেকেই এই রকম কথা বলছে। কিন্তু বিপ্লব আসেনি এখনও।”

আমি এখানে কবি জীবনানন্দ দাশের কোটেশনটি ব্যবহার করলাম খুব বড় একটা বিপ্লবের কথা চিন্তা না ক’রে। ছোট-ছোট, মাঝারি ধাঁচের বিপ্লবের কথা ভেবেই। কেননা বড় বিপ্লব করা খুব সহজসাধ্য নয়। একেবারেই খুব বড় ব্যাপার। সমাজ-রাষ্ট্র ভীষণ উলট-পালট খেয়ে যায়। রক্তাক্ত হয়ে যায় রাষ্ট্রের অস্তিত্বের মনোভূমি। সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান যখন থেকে ভেঙে পড়ে- তখনই অবক্ষয়ের অপবাতাস ও অবভাস বইতে শুরু করে, সেটা রোধ করা খুবই মুশকিল হয়ে পড়ে শেষঅব্দি। কখনও কখনও অসম্ভবও হয়ে পড়ে। সমাজ আলংকারিকরা সমাজকে যত অলঙ্ক্রিয়ায় সজ্জিত করার জন্যে অলঙ্করিষ্ণু হয়েই উঠুক না কেন সমাজটা তো অলংকারযুক্ত হবে না। একবার নৈতিক ক্ষরণ-পতন শুরু হয়ে গেলে মানব সমাজদেহ নানা প্রকার নিরাময়হীন ব্যাধি-আক্রান্ত হয়। এর ধন্বন্তরী উপশমও ঘটে না। আমাদের সমাজ-জীবনে একটা মূল্যবোধের অবক্ষয় শুরু হয়ে গেছে সমাজবিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন প্রায়শই। নৈতিকতা অপসৃত হচ্ছে- অপসৃযমানতার বিষম ধস নেমেছে। ব্যক্তি-জীবনে সমাজ-জীবনে এই যে ধস-অবক্ষয় এটাকে ঠেকাতে হবে শাণিত কোনো সঙ্গীন কিংবা অস্ত্রের মাধ্যমে। সেই মোক্ষ-নিঃশ্রেয়স শস্ত্রপানি কোথায়? আমাদের ভেতরকার নৈতিক শস্ত্রপানি বা সৈনিকটাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। মানব স্বভাব অর্থাৎ সব মানুষের স্বভাবের প্রকৃতি প্রায় একই। এ জন্যে Earl of Chesterfield তাঁর পুত্রকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, 'Human nature is the same all over the world.' এ চিঠিটি ছিল ১৭৪৭-র ২রা অক্টোবরে লেখা।

আমরা, আমাদের সময়, সমাজ অনৈতিকতার অন্ধকারের ডুবে আছি। মূল্য-চেতনার অবক্ষয়ে ক্ষীয়মান। নতুন-পুরানো সংস্কার এসে জমেছে সমাজের স্তরে স্তরে। গোটা দেশের অভ্যন্তরে। হাজী মুহম্মদ মহসিন, ইসমাইল সিরাজী, বেগম রোকেয়া, মুন্সি মেহেরুল্লাহ রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের মতো যুগধর বিপ্লবী ও সমাজ সংস্কারকগণ আবার এলে সত্যের ও সুন্দরের পুন:প্রতিষ্ঠা হতো। তাঁদের উত্তরসুরীগণ নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন। জীবনে-সমাজে-রাষ্ট্রে- আমি বলবো আজ সারাবিশ্বেই ‘মর‌্যালিটির ক্রাইসিস’- নৈতিকতার ক্রান্তি চলছে। বস্তুবাদী বিশ্ব কখনোই মুক্তি পেতে পারবে না। যদি মানব জীবনে নৈতিকতার অবশ্যম্ভাবিতাকে অস্বীকার করা হয়। নৈতিকতার অবমূল্যায়ন হলে মানবাধিকার ও মানবজীবনই ক্রমাগত লাঞ্ছিত হতে থাকবে। সমাজ নৈতিকতাকে বাধাগ্রস্ত করলে, সমাজ উন্নয়নে এবং মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিরাট ধস নামবে। এক কথায় সমাজের ভিতটিকেই দুর্বল করে ফেলবে। এটা সকলকেই সমভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে নৈতিকতা কখনই সমাজ-প্রগতির জন্য বাধা বা অন্তরায় হতে পারে না। আজ প্রয়োজন সমাজের জন্যে এক নতুন বিপ্লবব্রতী মশালচির। নৈতিক বিস্তারের (moral diversion) মশালটি হাতে নিয়েই পৃথিবীর সরণিতে দাঁড়াতে হবে।
প্রবচনে আছে- লোক -বাংলায় এ প্রবাদটি বিশেষভাবে প্রচলিত।
‘আসল ঘরে মশাল নাই,
ঢেঁকির ঘরে বাতি।’

নিজের দেহপ্রদীপখানি আমরা জ্বালিয়ে রাখতে পারছি কৈ? ‘ঢেঁকির ঘরে’ অযাচিত, অপ্রয়োজনীয়, একেবারেই অনাবশ্যকভাবে আমরা বাতি জ্বালিয়ে রেখে কোনো আত্মোপকারই তো সাধন করতে পারছি না। আমরা এ প্রবাদটিকে জাতীয় নিরিখে বিশ্লেষণ করতে পারি। কেননা আমাদের সমাজজীবন, যখন আষ্টেপৃষ্ঠে পীড়িত, প্রবঞ্চিত আলোর আকালে। নৈতিকতার দুর্ভিক্ষে। তখন আসল জায়গাটিতে মশালের সলতের আগুন জ্বেলে দিতে হবে।

রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি পেড়ে আজকের কলামটি শেষ করবো:

“মুক্ত করো ভয়
আপনা মাঝে শক্তি ধরো নিজেরে করো জয়।
সংকোচের বিহ্বলতা নিজের অপমান
সংকোচের কল্পনাতে হয়ো না ম্রিয়মাণ
দুর্বলেরে রক্ষা করো দুর্জনেরে হানো
নিজেরে দীন নিঃসহায় যেন কভু না জানো।”

আল মুজাহিদী
e-mail:[email protected]
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×