চাঁদপুর জেলা "শিশু পরিবার"টি বাবুরহাট এলাকায় অবস্থিত। এটিকে আগে বলা হতো এতিমখানা, পরবর্তীতে শিশু সদন, বর্তমানে শিশু পরিবার। এই নাম পরিবর্তনের মধ্যে একটি মনস্তাত্তিক বিষয় নিহিত আছে। এর প্রধানতম বিষয় হচ্ছে - এই পরিবারের শিশুরা যেনো নিজেদের এতিম, অনাথ, অসহায় ভেবে হীনমন্যতায় না ভোগে। তাদের বাবা-মা যে পৃথিবীতে নেই এই অভাবটুকু যেনো তারা অনুভব করতে না পারে। বাবা-মা'র অভাব পূরণ করার মতো সম্পদ তো পৃথিবীতে নেই। তারপরও এই এতিম-অনাথ শিশুদের যারা রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভাল করবে তারা যেনো শিশুদের পিতৃ ও মাতৃস্নেহে লালন পালন করে তাদের সেই অভাব কিছুটা লাঘব করে। এই উদ্দেশ্যেই সরকারের এই শিশু পরিবার। কিন্তু বাসত্দবে হচ্ছেটা কী এই শিশু পরিবারে? এই পরিবারের শিশুদের ভাগ্যে জুটছেটা কী? এই শিশু পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা মানুষরূপী জানোয়ারদের দ্বাবা অনাথ-এতিম শিশুরা কী পরিমাণ বঞ্চনার শিকার হচ্ছে সেসব ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে এসেছে গত শনিবার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুন্নেছা খানম গত শনিবার চাঁদপুরের একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। তাঁর চাঁদপুরে এই সফর অনেকটা আকস্মিক। তিনি ওইদিন জেলা শিশু পরিবার পরিদর্শনে যান। সাথে ছিলেন জেলা প্রশাসকসহ শিশু পরিবারের উপদেষ্টা কমিটির কর্মকর্তারা। সচিব কামরুন্নেছা খানমের মুখোমুখি হন শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুর রহিম। সচিব এই শিশু পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসেবসহ নানা বিষয়ে জানতে চান। শিশু পরিবারের ১৩ একর সম্পত্তির হিসেব, এই সম্পত্তি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, ফসলী জমি কতটুকু, বিশাল দু'টি পুকুরের কী অবস্থা, পুকুরে মাছ চাষ করা হয় কিনা, মাছের হিসেবে, বছরে লীজ থেকে কত আয়, শিশুদের খাবারের মান ও সংস্কৃতি চর্চা হচ্ছে কিনা ইত্যাদি নানা বিষয়ে জানতে চান। এসবের কোনো উত্তরই তত্ত্বাবধায়ক দিতে পারেননি। শিশু পরিবারের প্রত্যেক শিশুর জন্যে যে সরকারি বাজেট তা যে কী পরিমাণ তছরূপ হচ্ছে তা সচিবের কাছ থেকে প্রকৃত তথ্য জেনে বেরিয়ে আসলো। এই শিশুদের জন্যে প্রতি সপ্তাহে একদিন জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে নাচ-গান শেখার জন্যে ব্যবস্থা করার কথা। অথচ এই তথ্য শিশুরা তো দূরের কথা খোদ জেলা প্রশাসকই জানেন না। শিশু পরিবারের বিশাল সম্পত্তি অনাবাদীবস্থায় পড়ে থাকায় সচিব ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ৮ম শ্রেণী থেকে মেয়েদেরকে কম্পিউটার শেখানোর কথা, তাও হচ্ছে না। এ ছাড়া মেয়েদের দিয়ে কাজ করানো এবং মেয়েদের সাথে অশালীন আচরণসহ নানা অনিয়মের কারণে সচিব তত্ত্বাবধায়কের উপর মারাত্মক ক্ষেপে যান। তিনি তাকে মার্জিত ভাষায় তুলোধুনো করেন। এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার জন্যে তিনি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান। সচিবের এই সততা, স্পষ্টতা ও কঠোরতা দেখে সবাই হতবাক হয়ে যান। তত্ত্ববধায়ক সচিবের তোপের মুখে বিভিন্ন সময়ে কিছুটা চালাকি করে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে অন্য প্রসঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। তিনি সবকিছুর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছেন। নীতির প্রশ্নে সচিবের রুদ্র মূর্তির সামনে দুর্নীতিবাজ তত্ত্বাবধায়ক যেনো অসহায়। সে যেনো যমদূতের সামনে বসে আছে। সত্যিই সচিবের এমন সততা, নিষ্ঠা, দৃঢ়তা, স্পষ্টতা ও কঠোরতা দেখে আমরা মুগ্ধ। আমরা গর্বিত। সিভিল প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এমন একজন সৎ ও সাহসী অফিসার একটি দৃষ্টান্ত। তাও আবার নারী। সরকারের সকল স্তরের কর্মকর্তারা যদি এমন সততা ও সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতো তাহলে স্বাধীনতার ৩৯ বছরে এই দেশটির অবস্থা এমন হতো না। আমরা প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে সৎ ও কর্তব্যনিষ্ঠ হবো এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জানুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৫:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




