প্রথম পর্ব
আমার মামা আমার স্ত্রীর খালাকে বিয়ে করেছেন। আমি এ কথাটি যে এভাবে বলেছি আমার স্ত্রী তা শুনলে ভীষণ অভিমান করে বসতে পারে। নর-নারীর সমান অধিকারের যুগে শুধু পুরুষরাই বিয়ে করে না, নারীরাও করে। তাছাড়া আমার মামা যেমন আমার মাতৃপক্ষীয় লোক, আমার বেশি আপন, আমার স্ত্রীর খালাও তার মাতৃপক্ষীয়া এবং তার অতি আপন জন। অতএব, আমার স্ত্রী কোনমতেই তার খালাকে অপরের সামনে খাট বা নিচু হতে দিতে পারে না।
অতএব, কথাটি এভাবে বলাই সবচাইতে নিরাপদ মনে করি, আমার জনৈক মামা এবং আমার স্ত্রীর জনৈকা খালা পরস্পরকে বিয়ে করেছেন।
শারমিন, আমার মামাত বোন, আবার আমার স্ত্রীর দিক থেকে শ্যালিকাও, এ গল্পটি তাকে নিয়ে।
যেহেতু গল্প, সেহেতু নায়কেরও উল্লেখ প্রয়োজন। তবে নায়ক একজন নয়, দুজন। পাঠক-পাঠিকাগণ নিশ্চয়ই একটা রসালো ত্রিভুজ প্রেমের আশায় এতক্ষণে নড়েচড়ে বসেছেন।
প্রেমের গল্প হিসাবে এটি কতখানি সার্থক হলো পাঠশেষেই পাঠক-পাঠিকাগণ তা বিচার-বিশ্লেষণ করে বের করবেন। তার আগে আমি আমার গল্প বলে নিই, আপাতত এটাই আমার প্রথম ও প্রধান কাজ।
কামাল খান ও আমজাদ খান আমার দুই গুণধর শ্যালক। (বলার অপেক্ষা রাখে না যে শ্বশুর বাড়ির লোকেরা খানের গুষ্টি।)
নায়ক-নায়িকার সাথে আরো দু-চারজন পার্শ্ব চরিত্রের প্রয়োজন। তারা যথাসময়ে গল্পে উপস্থিত হবেন বলে আশা রাখি।
আসল গল্প শুরুর আগে বলে নিই, যেভাবে শুরু করেছি তাতে এটিকে একটি রম্যগল্প মনে হতে পারে। রম্যগল্প মনে করে পড়লে পাঠক-পাঠিকা আমার অন্তরের দুঃখ বুঝতে পারবেন না কিন্তু।
হ্যাঁ, আমার অন্তরেও দুঃখ আছে বইকি। আমার মামাত বোন তথা শ্যালিকা শারমিনের বিয়ে-ঘটিত ব্যাপারে কিছু বাক-বিতণ্ডা ও ঝগড়া-ফ্যাসাদই হলো আমার দুঃখের মূল কারণ; অন্যান্য কারণগুলো অতি গৌণ যা সহজেই আপনারা উপলব্ধি করতে পারবেন। স্ত্রীর অসংযমী জেদ ও ক্ষোভের কারণে আমাদের পাঁচ বছরের অত্যন্ত সুখী ও রোমান্টিক দাম্পত্য জীবনটিতে এক সময় হিংস্র দাবানল সব শান্তি গ্রাস করে নিয়েছিল। নারীর আত্ম-গরিমা ও ক্রোধ যে কতখানি ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে তা আমি মর্মে মর্মে টের পেয়েছি। এর রেশ ধরে আমাদের একমাত্র সন্তান পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে নীলামণির জীবনটি চলে যেতে বসেছিল। আল্লাহ্ সহায়, আমরা আমাদের বুকের মানিক হারাইনি।
জ্যেষ্ঠ শ্যালক কামাল খানের জন্য একজন সুন্দরী পাত্রীর প্রয়োজন। (বলাই বাহুল্য, সবাই কেবল সুন্দরী পাত্রীই খোঁজে। তাই বলে কি কালো মেয়ের বিয়ে আটকে আছে?)
আমি দেখি, আমার একদম হাতের নাগালে একটি অতিশয় সুন্দরী পাত্রী দিব্যি ঘোরাফেরা করে। শিক্ষিত, মার্জিত; বংশ-মর্যাদা ভালো, একেবারে মণি-কাঞ্চন যোগ হয়।
শাশুড়ি-আম্মাকে বললাম, কামালের সাথে শারমিনকেই সবচাইতে মানাবে ভালো। আপনি কি বলেন?
শাশুড়ি-আম্মা মুখটা ভীষণ কালো করে এক শব্দে বললেন, না।
আমি তাঁর সাথে এ বিষয়ে আর কোন বাক্যালাপ করি না।
আমার স্ত্রী শিলা খুব মুখ ভার করে আছে। আমার ওপর তার প্রচণ্ড গোসা। কামালের সাথে শারমিনের বিয়ের কথা তুলেছি, এটা আমার অপরাধ। আমার দ্বারা এমন প্রস্তাব করা একেবারেই অন্যায় এবং অনূচিত হয়েছে।
আমি শিলাকে বললাম, চৌদ্দ গ্রাম খুঁজে তুমি কি শারমিনের মত আরেকটি সুন্দরী মেয়ে বের করতে পারবে?
শিলা তীক্ষ্ণ ঝাঁঝালো স্বরে বলে, খালি শারমিন শারমিন করো কেন? দেশে কি আর কোন ভালো মেয়ে নাই?
থাকবে না কেন? দেশের প্রায় পঞ্চাশ ভাগই তো মেয়ে। তের কোটির অর্ধেক সাড়ে ছয় কোটি মেয়ে আছে দেশে, তার মধ্যে অন্তত এর দশ ভাগও যদি বিবাহযোগ্যা হয়ে থাকে, তবে তাদের সংখ্যা পঁয়ষট্টি লাখ। তুমি কি সারা দেশে ঘুরে ঘুরে এই পঁয়ষট্টি লাখ মেয়ে দেখতে যাবে নাকি? আমি বলি কি, শারমিনের মত এমন একটা মেয়ে হাতছাড়া করা ঠিক না। পরে পস্তাতে হবে।
শিলার কণ্ঠে অসম্ভব বিরক্তি ঝরে পড়ে। সে বলে, তোমার রসকষহীন রসিকতা আমার একদম ভালো লাগছে না। পেঁচাল বন্ধ করো।
আমি পেঁচাল বন্ধ করতে পারলাম না। বললাম, সত্যিই ভেবে দেখ, তুমি কি চাও না তোমাদের বাড়িতে একটা সুন্দরী বউ আসুক?
শিলা রাগে গর্জে উঠলো, আমরা কি কালির গুষ্টি নাকি? আমরা কি কালির গুষ্টি? তুমি দেখাও তো দেখি এ বাড়ির কোন্ মেয়েটা কালো? আমাদের চেয়ে সুন্দরী মেয়ে কয়টা আছে, তুমি দেখাও। আমরা যেমন দুধের মত ফর্সা, এ বাড়ির বউও অমন ফর্সা দেখে আনবো। তোমার মামাত বোনের চেয়ে কত ভালো ভালো মেয়ে পথে ঘাটে পড়ে আছে।
শিলার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। শারমিন কি শুধু আমারই মামাত বোন? তারও তো সে খালাত বোন। শারমিনকে এভাবে আমার পক্ষে ঠেলে দেয়ার কারণ কি?
শিলার এ কথার মর্মোপলব্ধি করতে অবশ্য আমার খুব একটা সময় লাগে না। স্ত্রীরা সব সময় স্বামীর পক্ষ আর তার নিজের পক্ষ, এ দুটি পক্ষকে আলাদা করে ভাবতে বেশি ভালোবাসে। শারমিন যদিও তার খালাত বোন, কিন্তু আমার পক্ষ থেকে সে আবার আমার মামাত বোন যে! আমি শিলাদের গরিমা এবং আহ্লাদের খবর জানি, শারমিনের মা যদি আমার মামার স্ত্রী না হয়ে অন্যলোকের স্ত্রী হতেন, তাহলে এই শিলারাই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রচার করে বেড়াত আর দেমাগ দেখাত, তাদের এক খালাত বোন আছে, রূপে-গুনে যার কোন তুলনা নেই।
আমি বললাম, তোমরা যদি ঘাটে-পথে থেকে কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েকে তোমার ভাইয়ের সাথে বিয়ে দাও, তাতে আমি বরং খুশিই হবো, একটি অসহায় মেয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করায় দেশ ও জাতি কৃতঞ্চতাভরে তোমাদের স্মরণ করবে।
শিলা রুক্ষ স্বরে বলে উঠলো, আচ্ছা বলো তো, তোমার বোনকে গছানোর জন্য এত উঠে পড়ে লেগেছ কেন?
আমি স্তম্ভিত হই। আমি আমার বোনকে গছানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছি? এটা কেমন কথা? মামাও বলেননি, মামীও বলেননি, সম্পূর্ণ নিজে থেকে নিজস্ব উদ্যোগে শারমিনের সাথে কামালের বিয়ের কথাটি তুলেছি। আমার মনে হয়েছে, ওরা একটা সুন্দর জুটি হতে পারে, শুধু এজন্যই বলেছি। বোন গছানোর মত এমন অপমানকর একটি কথা যদি মামা-মামীর কানে যায় তাঁরা কি ভাববেন? তাঁদের মেয়ে কি আইবুড়ো হয়ে গেছে? এমন তো নয় যে মেয়ের বর পাওয়া যাচ্ছে না।
শিলা বললো, আমার খালা যে কি চিজ তা তুমি জানো না। সে একটা আস্ত জল্লাদনি। জল্লাদনির মেয়ে ঘরে এনে কি আমরা ভাই হারাব? আমার খালা বিয়ের পর একদিনও কামালকে এক সাথে খেতে দিবে না, ভিন্ন করে দিবে। নিজের বাড়িতে নিয়ে ঘর-জামাই করে রাখবে। তুমি আমার খালাকে চিনো না।
কয়েকদিনের মধ্যে আরো কিছু রসালো কাহিনী আমার কানে এল। তা আবার জানলাম আমজাদ খানের স্ত্রী সারার কাছ থেকে।
এখানে আমজাদ খান আর সারার একটু পরিচয় দিই। আমজাদ কামালের চেয়ে বয়সে ছোট হলেও তার বিয়েটা আগে দিতে হয়েছিল। ঘটনাটা বলি। কামাল খান ও আমজাদ খান দুজনেই বিদেশে চাকুরি করে, কামাল সৌদি আরবে এবং আমজাদ সিঙ্গাপুরে। দুজনেরই বিয়ের বয়স গড়িয়ে যায়। সেবার আমজাদ খান ছুটি নিয়ে দেশে এল। সবাই ভাবলো কামাল খানের তো দেশে আসতে আরো বছর দুই লেগে যেতে পারে। আমজাদ যদি এখন বিদেশে চলে যায়, হয়তো দেখা যাবে বিদেশ থেকে ফেরত আসতে আসতে আরো তিন-চার বছর পার হয়ে গেছে। তাছাড়া কামালও যে বছর দুই পরেই বিদেশ থেকে আসবে তারও কিন্তু কোন নিশ্চয়তা নেই। সময় এবং যৌবন ক্ষেপন করে লাভ কি? আমজাদ খানকে সাড়ম্বরে বিয়ে দেয়া হলো। চাঁদের মত সুন্দরী বউটি দেখে দেখে এ বাড়ির কারো তৃপ্তি মেটে না।
ছোট ভাইয়ের বউয়ের ছবি দেখে কামাল খান বিয়ের জন্য উন্মাদ হয়ে গেল। তার মনে আবার একটা আশংকাও দেখা দিল, আমজাদ তো যাহোক একটা দারুণ সুন্দরী বউ পেল, আমার ভাগ্যে অমন একটা মেয়ে জুটবে তো?
দু-বছর পর দেশে আসার কথা ছিল। কামাল খান নয় মাসের মাথায় বাড়ি ফিরে এসে বললো, আমার জন্য পাত্রী দেখ। সুন্দরী হতে হবে, একদম সারার মত। সেই পাত্রী যোগাড় করা নিয়েই এখন আমার স্ত্রী শিলার সাথে আমার তুমুল বাকযুদ্ধ ও ঠাণ্ডা লড়াই চলছে।
সারার কাছ থেকে খুব মজাদার ঘটনা জানতে পারলাম। ঘটনাটা এ রকমঃ
সেবার বিদেশ থেকে ফেরত আসার পর যখন আমজাদ খানের জন্য পাত্রী খোঁজা শুরু হলো, ঠিক তার আগে আগেই গোপনে গোপনে একটি প্রেম জন্ম লয়। আমজাদ খান শারমিনের প্রেমে পড়ে, সত্যি বলতে কি দুজনই দুজনকে মন দিয়ে ফেলে। প্রচুর ঢলাঢলি মাখামাখিও নাকি হয়েছিল, অবশ্য এগুলো সারার শোনা কথা, যা কিনা সে আবার আমাকে বলেছে। ঘটনার সময়ে তো আর সে সামনে ছিল না, তাই না? তো, ওরা দুজন একত্রে ঘন ঘন সিনেমা হলে ঢুকতো, বেশ কয়েকবার পদ্মার চরে গিয়ে হানিমুনের প্রাক-মহড়াও সেরে এসেছিল। আরো কত কি! সব তো আর সারার জানা নেই, জানার কথাও না। আমজাদ খান নিজে থেকে সারাকে যতটুকু বলেছে, এ হলো তাই।
শারমিনকে আমজাদ খানের খুব মনে ধরেছিল। মাকে যখন ওর সাথে বিয়ের কথাটি তোলা হলো, তিনি হঠাৎ করে লক্ষ্য করে দেখেন, তাঁর বোনঝিটি দশ গ্রামের সেরা। প্রস্তাব নিয়ে তিনি বোনের কাছে ছুটে যান।
তাঁর বোন, অর্থ্যাৎ আমার খালা-শাশুড়ি, অর্থ্যাৎ আমার মামী নাকি এ প্রস্তাব শুনে খুব হতাশ এবং নাখোশ হয়েছিলেন। কারণ, তাঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নাকি মেয়ের জামাই হিসাবে কামাল খানকে পছন্দ করে রেখেছেন। কোথায় কামাল খান, আর কোথায় আমজাদ খান। দুজনের মধ্যে আসমান-জমিন তফাৎ।
এটা সত্যি কথা, পাত্র হিসাবে কামাল খানের সাথে আমজাদ খানের কোন তুলনাই হয় না।
একবার, দুবার, তিন-তিনবার চেষ্টা করেও আমার শাশুড়ি তাঁর বোনকে রাজি করাতে পারলেন না। মায়ের সাথে শিলাও এই অনুরোধ-অভিযানে যোগ দিয়েছিল। খালার মন গলেনি।
মেয়ের বাপের কাছে তো অন্তত একবার কথাটা তোলা উচিৎ। মেয়ের বাবাও সাফ না করে দিয়েছিলেন।
এ ঘটনা অবশ্য আরো বছর দেড়েক আগে ঘটেছিল। আরাধ্য প্রেমিকাকে বিয়ে করতে ব্যর্থ হলো আমজাদ খান। বুকভরা অভিমান নিয়ে তারপর তার অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু তার মন থেকে শারমিন মুছে যেতে পারেনি। এক কান, দু-কান থেকে শেষ পর্যন্ত আমার মামার কানেও এই প্রেমের কাহিনী পৌঁছে গিয়েছিল।
আমি ব্যস্ত মানুষ, শহরে থাকি। কালে ভদ্রে অতি প্রয়োজনে গ্রামের বাড়িতে আসি। এক রাত, দু-রাত থেকে আবার কর্মস্থলে ফিরে যাই। এত রগরগে ঘটনার কথা আমার কানে আসার ফুরসৎ খুব একটা হয় না।
আমজাদ আর শারমিনের প্রেমের ঘটনা শুনে মনে হলো, আমি একটা বিশাল বড় ভুল করেছি। কামালের সাথে শারমিনের বিয়ের কথাটা তোলা একেবারে ভুল হয়ে গেছে। এর কারণ দুটি :
প্রথমতঃ, কামাল ও আমজাদ সহোদর ভাই। আমজাদের জন্য পাত্রী হিসাবে শারমিনকে চাওয়া হয়েছিল, প্রত্যাখান হয়েছে। এ অবস্থায় যদি কামালের সাথে শারমিনের বিয়ে হয়, সারা জীবনের জন্য আমজাদ খানের মনে একটা কষ্ট থেকে যাবে। সে ভাববে, ঐ মেয়েটি, যার সাথে একদা আমার মন দেয়া-নেয়া হয়েছিল, যে এখন আমার বড় ভাইয়ের বউ, তাকে আমি আমার বউ হিসাবে চেয়েছিলাম; পাত্র হিসাবে যোগ্য নই বলে ওকে আমার কাছে বিয়ে দেয়া হলো না।
দ্বিতীয়তঃ, সারার কথা ঠিক হয়ে থাকলে, শারমিন আর আমজাদের মধ্যে বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু কোন কারণে বিয়ে হতে পারলো না। আজ যদি কামালের সাথে শারমিনের বিয়ে হয়, তাহলে বাড়িময় গনগনে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠবে। নতুন সম্পর্ক মত শারমিন হবে তখন আমজাদের ভ্রাতৃবধূ, ভাবী। রসিকতার সম্পর্ক বটে। একটু হেসে, অতি নির্ভেজাল একটা দুষ্টুমির কথা বললেও তা দেখে সারার বুক জ্বলে যাবে। পরস্ত্রীর সাথে নিজের স্বামী হাসাহাসি ঢলাঢলি করে, চোখের সামনে কি মেয়েরা এসব সইতে পারে? সারাও পারবে না। তা দেখে সারার বুকে দপদপ করে আগুন জ্বলে উঠবে। এবার কামাল খানের কথাটি চিন্তা করুন। তার কানে কি এদের অতীত প্রেম-লীলার কাহিনী না পৌঁছে যাবে? সেও তখন দিবানিশি অন্তর্জ্বালায় দগ্ধ হবে।
এসব বিবেচনা করে আমার মনে হলো, শারমিনের সাথে কামালের বিয়ে হতে পারে না। কিছুতেই না। একটা শান্তিপূর্ণ পরিবারে অশান্তির আগুন জ্বেলে লাভ নেই।
শিলাকে বললাম, এ বিয়ে হতে পারে না।
কোন্ বিয়ে?
কামালের সাথে শারমিনের বিয়ের প্রস্তাবটা আমি ফিরিয়ে নিচ্ছি।
শিলা বাঁকা ঠোঁটে হাসলো। আমি বললাম, হাসছো কেন?
শিলা বললো, হাসির কথা শুনে হাসবো না? তুমি ভাবছো যে প্রস্তাব ফিরিয়ে নিলেই মেয়ের দাম বেড়ে যাবে। আমরাও আগ্রহী হয়ে উঠবো। তাই না?
ঠিক তাই না। এ বিয়ে কিছুতেই হতে পারে না। যার মাথায় এক বিন্দু বিবেক আছে, সে কিছুতেই এ বিয়েতে সায় দিতে পারে না।
শিলা বাঁকা ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। আমি তাকে বুঝিয়ে বলি কেন এ বিয়েটা সম্ভব না। আমার খুব আফসোস হয়, আমি যে জেনে শুনে এ রকম একটা কথা তুলেছি, তা আমার মামার কানে গেলে তিনি খুব কষ্ট পাবেন, এবং আমার ওপর খুবই অসন্তুষ্ট হবেন; আমি এ ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত।
আমি বলি, মামা আমাকে খুবই মন্দ ভাববেন।
শিলা টেনে টেনে বলে ওঠে, রাখো তোমার মন্দ ভাবা। কামালের কাছে শারমিনকে বিয়ে দেয়ার জন্য দিনরাত সাধাসাধি করছেন তোমার মামা। এ কথা শুনে তো উনি এমনিতেই খুশিতে লাফিয়ে উঠবেন। তোমাকে মন্দ ভাবার প্রশ্ন আসে কোত্থেকে? তুমি তো জানো না, এ বিয়েতে তাঁরা এক পায়ে খাড়া।
শিলার কথায় আমি বিস্মিত হই। শারমিনকে সাধাসাধি চলছে? বলি, অসম্ভব। মামা কখনোই শারমিনকে সাধতে পারেন না। মামা অমন মানুষই না। তাঁর বিবেক-বুদ্ধি বলে কি কিছুই নেই? তাছাড়া, তাঁর মেয়ে তো আর সাগরে পড়ে যায়নি।
আমি যতখানি জোর দিয়ে আমার বক্তব্যে অনড় থাকার চেষ্টা করি, শিলা তার চেয়েও অধিকতর শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপন করে। তবে ওর যুক্তির চেয়ে গলার জোরটা একটু বেশিই মনে হয়।
শিলা বলতে শুরু করলো, ছোটবেলা থেকেই আমার খালু মনে মনে কামালকে তাঁর মেয়ের জামাই হিসাবে ঠিক করে রেখেছেন। খালুর গরিমা খুব বেশি তো, তাই তিনি সব সময় নিজের দাম বাড়িয়ে তোলার চেষ্টায় থাকেন। এজন্যই নিজে থেকে কখনোই তিনি এ বিয়ের ব্যাপারে মুখ খোলেননি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে খালা আর খালু খুব অস্থির হয়ে আছেন, কেন আমরা কামালের জন্য শারমিনকে চাইছি না।
আমি বললাম, কামালের জন্য শারমিনকে না চেয়ে তোমরা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছ।
শিলা ঈষৎ রাগত স্বরে বলে, কি জ্বালা, তুমি আবারো সেই একই কথা বলছো? শারমিনকে আমরা চাইতে যাব কেন? দেশে কি মেয়ের আকাল পড়েছে? যদি সোনা-দানা দিয়ে ওর সর্বাঙ্গ মুড়িয়েও দেয়, তবু আমরা শারমিনকে আনবো না।
আমি বলি, তোমার এ কথাটি একটু ঘুরিয়ে অন্যভাবে বলা উচিৎ। আমার বিশ্বাস, শারমিনের গায়ের ওজনের সমান সোনা-গয়না ঢেলেও তোমরা ওকে এ বাড়ির বউ হিসাবে আনতে পারবে না।
শিলা আমার কথায় রাগে কিছুক্ষণ প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে থাকলো। দেখি ওর চোখ ঠিকরে যেন আগুন বেরুচ্ছে। এমনিতেই সে রাগলে কথা বলতে পারে না। অবশেষে আস্তে আস্তে তার মুখ ফুটতে থাকলো, এটা তোমার বড়াই। এত বড়াই ভালো না। তোমার মামারা এমন কোন জমিদার গুষ্টি না যে সেই বাড়ির মেয়ে আনার জন্য আমরা পাগল হয়ে যাব। তোমার মামার কোন্ জিনিসটা আছে? আমাদের মত গুষ্টিও নেই, ধন-দৌলতও নেই। আর আমাদের কামাল, আমার সোনামণি ভাইটি? এমন একটা সোনার ছেলে এই দশ গ্রামের মধ্যে আছে? মেয়ে দিবার জন্য মেয়ের বাবারা দিনরাত বাড়িতে এসে ঘুরঘুর করছেন। তোমার মামাও দিনে অন্তত চার-পাঁচবার আমাদের বাড়িতে যান। কি জন্য যান, বলো তো? কামালের বিয়ের কথাবার্তা হয়। উনি আশায় থাকেন, আমার মা যেন নিজে থেকে কামালের জন্য শারমিনের কথাটা তোলে। নিজের মেয়ে দিবার জন্য তোমার মামা যে উদগ্রীব হয়ে বসে আছেন, তার ভুরিভুরি প্রমাণ আছে। কত নামী-দামী বাড়ি থেকে মেয়েদের খোঁজ-খবর পাওয়া যাচ্ছে। তোমার মামা নানা অজুহাতে সেসব বাড়ির দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করতে শুরু করেছেন, যাতে বিয়ে হতে না পারে। এর মানেটা কি বুঝতে কারো অসুবিধা হয়? মানে খুব সোজা, যাতে মেয়ে না পেয়ে আমার মা শারমিনের জন্য তোমার মামার কাছে হাত পাতে। তোমার মামার তাতে দামও বাড়লো, একটা অসাধারণ জামাইও জুটে গেল।
আমার মামা দিনে অন্তত চার-পাঁচবার শিলাদের বাড়িতে যান এ কথাটি ঠিক। একই গ্রামে এঁদের বাড়ি। মাঝখানে মাত্র চার-পাঁচশো গজের ব্যবধান। কামাল খান বাড়িতে আসার পরই নাকি শিলাদের বাড়িতে মামার যাতায়াত বেড়ে গেছে। কাজেই শিলাদের সন্দেহ অমূলক নয় যে, নিজের মেয়ে গছানোর একটা ধান্ধা আমার মামার মাথার ভিতরে অনবরত চক্কর দিচ্ছে। কিন্তু আমি তো আমার মামাকে চিনি। অত্যন্ত সহজ-সরল, সৎ, প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী, তাঁর সদাচরণ এবং পরোপকারবৃত্তির কথা সর্বজনবিদিত। সেই মামার মনে এরকম ফন্দি-ফিকিরের দূরভিসন্ধি থাকবে তা আমি কস্মিনকালেও বিশ্বাস করবো না। আমার একান্ত বিশ্বাস, কামালকে যদি তিনি তাঁর মেয়ের জামাই হিসাবে পছন্দ করে থাকতেন, তবে তিনি সরাসরি আমার শাশুড়ির সাথে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করে সুরাহা করে ফেলতেন। ছেলেও তাঁদের, মেয়েও তাঁদের, ভেল-ভেজালের কোন ঝামেলা নেই। নানা অজুহাতে বিয়ে-ভণ্ডুলের অভিযোগটিও আমি কোনমতেই মানতে পারছি না। আমার শ্বশুর মহোদয় গত হওয়ার পর থেকে নানা বিপদ-আপদে আমার এ মামাটিই, অর্থ্যাৎ কিনা আমার শাশুড়ি-আম্মার বোনের জামাইটিই শিলাদের বাড়িতে কাণ্ডারীর ভূমিকা পালন করেছেন। এমন কি আজও, এখনো। আমার শ্বশুর মৃত্যুর সময় মামার দু-হাত ধরে বিনীত আরজ করে গিয়েছিলেন, তিনি যেন মিলাদের দেখে রাখেন (মিলা আমাব স্ত্রীর বড় বোন)। একজন পরলোকগত ব্যক্তির অনুরোধের কথা মনে রেখেই তিনি ওদের বাড়ির খোঁজ-খবর করেন। হতে পারে কামাল তাঁর নিজের ছেলে নয়, কিন্তু তাঁর ভালোমন্দ দেখার ব্যাপারে তিনি ওয়াদাবদ্ধ। বিয়ে-শাদির ব্যাপারটা এক দিনের মর্জি নয়। হুট করে যার তার সাথে বিয়ে দেয়া যায় না। আমার বিশ্বাস, কামালের জন্য একজন যথোপযুক্ত মেয়ের সন্ধান এখনো মেলেনি বলেই বিয়ের ব্যাপারটা বেশিদূর অগ্রসর হতে পারছে না।
শিলার রণ-রঙ্গিনী বেশ ক্রমশ ভয়ংকর রূপ নিতে থাকে। আমিও আজকাল বেশ অধৈর্য্য ও অসংযমী হয়ে গেছি। মুহূর্তে ক্রোধান্বিত হয়ে পড়ি, সামনে যা পাই ভেঙ্গে সর্বনাশ করি (মাফ করবেন)। ক্রোধে অন্ধ ব্যক্তিকে ক্রোধান্ধ বলা হয়। ক্রোধান্ধ ব্যক্তি মানুষ খুন করে ফেলতে পারেন। কারণ, ক্রোধান্ধ ব্যক্তির কোন হিতাহিত ঞ্চান থাকে না। তবে আমি ক্রোধান্ধ হলে আমার সামান্য জ্ঞান থাকে (এটা একটা আশার কথা)। সেই জ্ঞানটা হলো, আর যা-ই করি না কেন, স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা যাবে না। অবলা নারীর তুলতুলে শরীরে আঘাতের চোট বড় বেদনাদায়ক। তার বদলে আমি যেটা করি তা হলো, হাতের কাছে যা থাকে তা থেকে বেছে মনের মত একটি জিনিস, মনের মত একটি মাত্র জিনিস নিয়ে সজোরে মাটিতে ছুঁড়ে মারি, অথবা জানালা গলিয়ে ঘরের বাইরে ফেলে দিই (তার আগে অবশ্য দেখে নিই বিল্ডিংয়ের গোড়ায় লোকজন হাঁটাহাঁটি করছে কিনা)। আমার এ রকম ভাঙ-চূরের স্বভাবের জন্য শিলা আমাকে 'পোড়া-কপাইল্ল্যা জাত' বলে গালি দিয়ে থাকে। যাহোক, ভাঙ-চূরের সঙ্গে সঙ্গেই আমার সুখ চলে আসে। রাগ ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
উত্তপ্ত বাকযুদ্ধে শিরির রণ-রঙ্গিনী বেশ। আমি ক্রোধান্ধ। টেবিলের ওপর বেশ কিছু ক্রোকারি ছিল, আমি সবচেয়ে সুন্দর, ধোয়া, মাত্র কয়েকদিন আগে কেনা ঝকঝকে বড় সিরামিকের গ্লাস-কাপটি হাতে তুলে নিই। তারপর খুট করে জানালার কাঁচ খুলে উঁকি মেরে নিচে পরখ করি, তারপরই আস্তে করে ওটা হাত থেকে ছেড়ে দিই, পাক খেতে খেতে পাঁচ তলার ওপর থেকে বিল্ডিংয়ের গোড়ায় পড়ে ওটা পটাস শব্দ করে ভেঙ্গে গুঁড়ো হয়ে গেল। সিরামিকের গুঁড়োগুলো ব্যালেস্টিক গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো, আমি উঁকি দিয়ে কয়েক সেকেন্ড কান খাড়া করে থাকলাম, গুঁড়ো-বৃষ্টি পতনের ঝন্ন্ শব্দটা কানে আসে কিনা। না, এত ওপর থেকে শব্দ পাওয়া গেল না।
পুরো ঘর মুহূর্তে নিস্তব্ধ, কোন টু-শব্দটি নেই।
মনে হচ্ছে এতক্ষণ কিছুই হয়নি, এমন ভাবেই মনের আনন্দে গুনগুন করতে করতে আমি বেডরুমে গিয়ে খাটের ওপর শুয়ে পড়ে টিভি ছেড়ে দিলাম।
শিলা প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত আমার সাথে কথা বলেনি। এমনকি মাঝখানে একদিনের জন্য ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম, যাওয়ার পথে সে কথা বলেনি, বাড়িতে গিয়ে কথা বলেনি, সে সারার সাথে অন্য ঘরে রাত কাটালো। আসার দিনও পথে কিংবা বাসায় কোন কথা হলো না। আমিও প্রতিঞ্চা করলাম, দেখি কতদূর সে যেতে পারে।
আমার ভুল ভাঙলো। সে যাত্রা সে অনেক দূর যেতে পারতো, কিন্তু আমি বেশিদূর যেতে পারলাম না। বরাবরের মত আমি নিজেই দ্বন্দ্ব মিটিয়ে সন্ধি করে ফেললাম।
এর মধ্যে কামালের বিয়ে-ঘটিত ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে আমার শাশুড়ি, শিলা, এমন কি সারার সাথেও বেশ কিছু অন্তরঙ্গ আলাপ আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনা থেকে আমি আরো কিছু অজানা তথ্য জানতে পারি।
সারার কাছ থেকে আমি সবচাইতে চমকপ্রদ ঘটনার কথাটি জানতে পারলাম। এ কথাটি সারা ব্যতীত অন্য কেউ বললে আমি চোগলখোরি হিসাবে ধরে নিতাম। কিন্তু সারার ওপর আমার বিশ্বাস আছে, সে কোনভাবেই চোগলখোর নয়। কথা প্রসঙ্গে অত্যন্ত সহজ মনেই সে কথাটা বলে ফেলেছে, হয়তো সে জানেও না যে তার এ কথাটি আমার কাছে কতখানি গুরুত্ববহ।
সারা বলছিল, শারমিনকে কামাল ভাইয়ার কাছে দিবে না।
দিবে না? কে বলেছে দিবে না?
খালুর কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। খালু মানেন না।
আমি বিস্মিত হই। খালুর কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, তা নাকচ হয়েছে, আর এ খবর আমি জানি না? এটা তো সম্ভব না।
আমি জিঞ্চাসা করি, তুমি সত্য বলছো তো?
সারা অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে, সত্য বলছি মানে?
মানে, প্রস্তাবটা কে, কবে, কার কাছে দিয়েছিল তা পরিস্কার করে বলো।
আমি আর মা খালাদের বাসায় গিয়েছিলাম। খালু কিছুতেই রাজি হলেন না। খালুুর হাত ধরে মা কত কান্নাকাটিই না করলেন!
আমি মনে করার চেষ্টা করি। শুনেছিলাম যে, শারমিনের ব্যাপারে শাশুড়ি-আম্মা একবার মামার হাত ধরেছিলেন বটে। এ খবর আমার জানা আছে। তবে কামালের জন্য নয়, অনেক আগে একবার আমজাদের জন্য কথা বলাবলি হয়েছিল। সেই হাত ধরার মর্যাদা রক্ষা করা হয়নি। আমি ভাবি, লোকমুখে শোনা সেই কথা এখন আবার নতুন করে সারা আমাকে শোনাচ্ছে না তো? নিশ্চিত হওয়ার জন্য বলি, তুমি সঙ্গে গিয়েছিলে? নাকি আম্মা একা গিয়েছিলেন?
মা একা যাবেন কেন? আমি আর মা দুজনে গিয়েছিলাম।
আমি একটু মনক্ষুন্ন হয়ে বলি, কেন তোমরা গেলে বলো তো? তুমি কি ঘটনা জানো না?
হ্যাঁ জানি, তাতে কি?
তাতে কি মানে, শারমিন যদি এ বাড়িতে বউ হয়ে আসে তার পরিণতি কি হতে পারে তা কখনো ভেবে দেখেছ?
সারা হাসতে হাসতে গলে পড়ে আমার বুকে চাপড় মারে। বলে, দুলাভাইয়ের যা কথা না! আমার জামাই অন্য মেয়ের দিকে তাকাবে, আমার এমন জামাই-ই না। নিজের শালাকে মনে হয় চিনেন না। যা শরম, আমার চোখের দিকেও ঠিক মত তাকাতে শরম পায়। হাসতে হাসতে সারার অবস্থা মাটিতে গড়াগড়ি যাওয়ার মত হয়ে যায়।
আরো কয়েক সপ্তাহ পরের কথা। শিলার সাথে নিবিড় প্রেমের আলাপ হচ্ছে, যার বেশির ভাগই অতীতের স্মৃতিচারণ, এক ফাঁকে বলে বসি, চালে একটা বিরাট ভুল হয়ে গেছে।
শিলা উৎসুক চোখে আমার দিকে তাকায়। আমি বলি, আম্মা চালে ভুল করে ফেলেছেন। মামা যে আমাকে কতখানি ভালোবাসেন এটা কি তোমরা জানো না? এখনো যদি বলি, মামা, আমি আকাশের চাঁদ চাই। আমার জন্য আকাশের চাঁদ আনতে মামা প্রাণান্ত হবেন।
শিলা বলে, তোমার কথা বুঝতে পারি না।
আমি বলি, আম্মা এ কথাটি আমাকে বললেই পারতেন। অথবা আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেও হতো।
শিলা ঈষৎ রাগত স্বরে বলে, কি বলতে চাও পরিস্কার করে বলো। কথায় এত জট পাকালে আমি ধরতে পারি না।
আমি শান্ত স্বরে বলি, কথাটা শুনে আমার নিজের কাছেই খুব অপমানবোধ হচ্ছে। শারমিনের জন্য মামার হাত ধরে আম্মা কান্নাকাটি করবেন, তারপরও মামা রাজি হবেন না, এটা কত বড় অপমানের কথা তা বুঝতে পারছো?
শিলা আশ্চর্য হয়ে রাগত স্বরে বলে, মা আবার কবে কার হাত ধরলো?
তুমি হয়তো এসব জানো না। শারমিনের জন্য যে আম্মা মামার কাছে হাত ধরে ---
মিথ্যে কথা। শিলা আমার মুখের কথা শেষ হতে দেয় না। বলে, সব মিথ্যে কথা। কামালের জন্য আমরা কোনদিনই কথা তুলিনি। শুধু একবার আমজাদের জন্য আলোচনা করেছিলাম। তারপর আমরাই পিছিয়ে আসি, নিজেদের মধ্যে বিয়ে-শাদি হওয়া ঠিক না।
আমি ক্রোধান্ধ হলাম না। শিলার রাগ ধীরে ধীরে নেমে এল। সে স্বগতোক্তির মত করে বলতে থাকে, তুমি আমার খালুকে চিনো না। সে একজন মস্ত বড় ধূরন্ধর লোক। নিজের মেয়েকে গছানোর জন্য এখন নানা চাল চালছেন। এখন দেখতে পাচ্ছেন, হায় হায়, বিয়ে তো ঠিক হয়ে যাচ্ছে। নিজের দাম বজায় রাখার জন্য এখন মুখ ফুটে বলতেও পারছেন না, আবার সইতেও পারছেন না।
নানা 'ষড়যন্ত্র' সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত কামাল খানের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। রূপে-গুনে এ পাত্রী শারমিনের চেয়ে অন্তত দশগুন বড়। বাপের বংশ মর্যাদা, ধন-দৌলত কোন কিছুরই কমতি নেই। এমন একটা মেয়ে নির্বাচন করার পেছনে যার অবদান সবচাইতে বেশি সে হলো শিলা।
এক বান্ধবীর কাছ থেকে শিলা এ মেয়েটির সন্ধান জানতে পারে। সে কত বান্ধবীকেই তো ছোট ভাইটির জন্য মেয়ে খুঁজতে বলেছিল। অবশেষে মাত্র এক বান্ধবীই তাকে খবর পাঠিয়েছিল।
এ উপলক্ষে শিলা চার-পাঁচ দিনের জন্য গ্রামে বাপের বাড়িতে গিয়েছিল। সে, তার একমাত্র বড় দুলাভাই এবং তার মা, এই তিন জনে মিলে কনে দেখতে বের হয়েছিলেন। না বলে সাধারণ পোশাকে চুরি করে কনে দেখার পরিকল্পনা ছিল। বাড়িতে গিয়ে দেখেন, মেয়ে বার বাড়ির বারান্দায় এক মনে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে।
এটা কাদের বাড়ি? শিলা জিঞ্চাসা করেছিল।
সালাম মাতবরের বাড়ি।
সালাম মাতবর তোমার কি লাগে?
আমার বাবা।
তোমরা কয় ভাই-বোন?
দুই ভাই দুই বোন।
তুমি কি বড়?
না, আমি সবার ছোট।
তারপর তাঁরা তিনজনে মিলে কি কানাকানি করতে লাগলেন, মেয়ে বললো, আপনারা কোথা থেকে এসেছেন? ঘরে এসে বসুন।
না বোন, বসবো না। যাই...
প্রথম দেখাতেই পছন্দ। ম্যারেজ এট ফার্স্ট সাইট। এত সহজেই যে তারা এমন একটা সম্ভ্রান্ত ঘরের সুন্দরী মেয়ে পেয়ে যাবেন তা তাঁদের কল্পনায় আসেনি। আশ্চর্য, এতদিন তাঁরা এ মেয়ের খোঁজ পাননি কেন? এ কৃতিত্বের জন্য কেবল শিলাই এককভাবে দাবীদার হতে পারে।
শুভ বিবাহের নিমন্ত্রণ পত্র নিয়ে একদিন বিকেলে কামাল খান বাসায় উপস্থিত হলো। পরের মাসের দ্বিতীয় শুক্রবারে বিয়ে। ময়-মুরুব্বিরা অবশ্য এ মাসের শেষ শুক্রবারেই দিন ধার্য্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ে পক্ষের তাতে সামান্য অসুবিধা আছে বলে তা সম্ভব হলো না।
কামাল খান খুব খুশি। সে ইতোমধ্যে তিনবার কনে দেখে ফেলেছে। প্রথমবার এক বন্ধুকে নিয়ে চুরি করে, দ্বিতীয়বার গার্জিয়ানদের সাথে, এবং শেষবার বাকি বন্ধুদের নিয়ে। চুরি করে দেখতে গিয়েই সে সবচাইতে বেশি মজা পেয়েছে। কেমন একটা এ্যাডভেঞ্চারের ভাব ছিল তাতে।
গল্পচ্ছলে সে আমাকে আরো একটা চমকপ্রদ তথ্য জানালো। কোন এক কালে শারমিনকে তার খুব ভালো লেগেছিল। মনে বড় আশা ছিল বড় হয়ে সে শারমিনকে বিয়ে করবে। বড় হয়ে হঠাৎ সে একদিন শুনতে পায় তার শারমিন অন্য একজনের সাথে মন দেয়া-নেয়া করছে। সেই অন্যজনটি অন্য কেউ নয়, তার সহদোর আমজাদ খান। ঐ খবরে তার বুক খানখান হয়েছিল। আমজাদের যখন শেষ পর্যন্ত সারার সাথে বিয়ে হয়ে গেল, তখন তার মন আবার শারমিনের জন্য উতলা হয়ে ওঠে। সে অত্যধিক আবেগে একটা প্রেমপত্রও লিখে ফেলে। কিন্তু শারমিন কোন জবাব দেয়নি। যাক, জবাব না দিয়ে ভালোই হয়েছে। তার মনে শুভ বুদ্ধির উদয় হয়, ছোট ভাই যে মেয়ের সাথে প্রেম করেছিল, সেই মেয়ের সাথে আপন বড় ভাইয়ের প্রেম করা সাজে না। এটা প্রেমের ইতিহাসে একটা ন্যাক্কারজনক ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত থাকবে।
বাসা থেকে চলে যাওয়ার সময় কামাল আমাকে খুবই অনুনয় করে বলে গেল, আমি যেন অন্তত বিয়ের ঠিক তিনদিন আগে বাড়িতে গিয়ে পৌঁছি। যদি না যাই তবে সে বিয়েই করবে না। সে আরো বলে গেল, তার আপাকে অন্তত সাত দিন আগে বাড়িতে যেতে হবে। বিয়ে বাড়িতে আপাদের নাকি বিশেষ বিশেষ ধরণের কাজ থাকে। বড় দুলাভাই তাকে নিতে আসবেন।
শিলাকে নেয়ার জন্য সাতদিন আগেই ওর বড় দুলাভাই এলেন। উনি এসেই ঘরে আগুন জ্বেলে দিলেন।
রাত দশটা অব্দি আমি ঘরের বাইরে ছিলাম। ঘরে ঢুকেই টের পেলাম দাউ দাউ আগুন জ্বলছে। দরজা খুলে যেইবা ঢুকেছি, অমনি বেড রুম থেকে ছুটে বের হয়ে এল শিলা। ভীষণ উত্তেজিত স্বরে সে বলে ওঠে, তোমার অহংকার এখন কোথায় গেল? বলো? তোমার মামা আর মামাত বোনকে নিয়ে না এত গর্ব করলে, সেই গর্ব এখন কোথায় গেল? তুমি না বলেছিলে, তোমার মামা কিছুতেই কামালের কাছে শারমিনকে বিয়ে দিবেন না, তোমার সেই বড়াই এখন কোথায় গেল?
আমি জিঞ্চাসা করি, কি হয়েছে?
কি হয়েছে শুনবে? আমি বলি নাই, তোমার মামা একটা ভীষণ ধূরন্ধর লোক, মেয়ে গছানোর জন্য বিরাট চাল চালছেন? দেখো, আমার কথা এখন সব ফলে গেছে।
মামা কি করেছেন?
শারমিনকে এখন কামালের কাছে সাধছেন। দেখছো, কত বড় টাউট লোক? অথচ তুমি বলো সাধু।
আমি বলি, তুমি ঠিক বলছো তো?
আবশ্যই ঠিক বলছি।
কার কাছ থেকে শুনেছ?
দুলাভাই বের হয়ে এলেন পাশের রুম থেকে। বললেন, ঘটনা গত রাতের। খালুজান ফজল মামাকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন।
আমি অবাক হয়ে জিঞ্চাসা করি, তাহলে কি আগের বিয়ে ভন্ডুল?
আরে না, এসব হলো পাগল-ছাগলের কাণ্ড-কারখানা। বোঝ না?
তারপর তিনি সব বৃত্তান্ত খুলে বললেন।
ফজল মামা শাশুড়ির ভাইবোনদের মধ্যে কনিষ্ঠতম, প্রস্তাব এসেছে তাঁর মাধ্যমে। দুলাভাইয়ের মুখে বৃত্তান্ত শুনে ঘটনা যা বুঝলাম তা মোটামুটি এ রকমঃ
গত রাতের ঘটনা। রাত দশটায় ফজল মামা কামালকে তার রুমে ডেকে নেন। ঘরের দরজা-জানালা সব কিছু বন্ধ করে দিয়ে কামালকে বলেন, শারমিনকে তোর কেমন লাগে?
কেন?
আমি চাই তুই শারমিনকে বিয়ে কর।
অসম্ভব।
অসম্ভব কেন? শারমিনের আব্বার ঢাকায় সাত কাঠার একটা প্লট আছে। গ্রামে সতর বিঘা ইরি জমি আছে। আড়িয়াল বিলে পাঁচ বিঘা বোরো জমি আছে, আর বাড়িটা হলো ষাট শতাংশ। শারমিনকে বিয়ে করলে এর সব কিছুই তুই পাবি। ওর আব্বা সব সম্পত্তি তোর নামে লিখে দিবে।
আমি সম্পত্তি চাই না, শারমিনের সাথে বিয়ে হোক এটাও চাই না। ও আমার খালাত বোন, আপন বোনের মতই ওকে দেখতে চাই।
তুই কি তোর খালুর আবদার রাখবি না?
সম্ভব না মামা, যেখানে এক জায়গায় সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে গেছে, সেটা কি ভেঙ্গে দেয়া যায়?
বেকুব ছেলে, বিয়ের আসর থেকে বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে কত বর ফিরে যায়, আর তোর বিয়ের তো এখনো এক সপ্তাহ বাকি!
না মামা, সম্ভব না।
মামা কিছুক্ষণ চিন্তা করে থেকে হতাশ ও ব্যথিত স্বরে বললেন, ঠিক আছে, তুই যা ভালো মনে করিস তাই কর। তবে তোর সাথে যে আমার এ বিষয়ে আলোচনা হলো এটা যেন ঘুণাক্ষরেও কেউ জানতে না পারে। খবরদার, কাউকে কিন্তু বলবি না। কোনদিনই বলবি না।
শিলা বললো, আমার খালা-খালুর খবর আমি জানি না? সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে বিয়ে দিবে, ঠিক পরের দিন থেকেই দেখবো আমাদের ভাই আর আমাদের নেই।
হাতমুখ ধুয়ে আমি খাবারের টেবিলে বসলাম। শিলা ডাইনিং রুমে নেই। সে তার দুলাভাইয়ের সাথে পাশের রুমে কথা বলছে। শিলার কথা ধীরে ধীরে মৃদু থেকে উচ্চ নিনাদে উঠতে থাকলো। এক সময় লক্ষ্য করি সে কাঁদছে আর বলছে, জানেন দুলাভাই, ও সব কিছু নিয়েই আমার সাথে এ রকম বড়াই করে আর তর্ক করে। ওর মামাকে নিয়ে কি বড়াইটাই না করলো--শারমিনের ওজনের সমান সোনা-গয়না দিলেও নাকি তার মামা মেয়ে দিবেন না। এখন তোর সেই অহংকার কই গেল? কই গেল? এখন তো তুই নিজেই সমস্ত ধন-সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে মেয়ে গছাতে চাস? পাজি লোকের গুষ্টি!
আমি শান্ত স্বরে ডাকলাম, শিলা, ভাত দিয়ে যাও।
শিলার কোন উত্তর নেই।
আগামী পর্বে সমাপ্য
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


