কানাবাবার সাথে একটা প্যাঁচ খাইয়া ফেলছি। প্যাঁচটা হইল দুর্নীতি আর মূর্খতা নিয়া।
বিষয়টা আসলে প্যাঁচ খাওয়ার মতই। আমারো মনে হইলো এইটা নিয়া ভাবার আছে। সব সৎ মানুষ জ্ঞানী না, সব মূর্খও অসৎ না। আবার সততাও চূড়ান্ত কিছু না, বহু সৎ মানুষ বিশেষ কোন বিষয়ে ধরা খাইয়া বইসা আছেন; ওদিকে জ্ঞানও চূড়ান্ত কিছু না,- সমাজবিজ্ঞানে বাঘা বহু মানুষ কোয়ান্টাম মেকানিক্স দেখলে পাশ কাটান, গণিতে মারদাঙ্গা অনেকেরই রাষ্ট্রনীতি নিয়া কমেন্ট শুনলে হাসি পাইতে পারে।
কিছু দিন আগে এই ব্লগে একজন ঘোষণা করলো দুনিয়া আজ দুই ভাগে বিভক্ত- আস্তিক আর নাস্তিক। আস্তিকরা সব নীতি-নৈতিকতার ধারক, নাস্তিকরা যা তা; এই তার প্রতিপাদ্য।। কি বলবেন তারে! সে কি খেয়াল করছে যে যদি এইটারে দুনিয়ার প্রধান ভাগ করা হয়, সে আর জর্জ বুশ একই দলের কমরেড হয়!! এইটা হইল সৎ মূর্খতা, যেহেতু তার অসততার আপাততঃ আর কোন নিদর্শন পাই নাই।
আবার ধরেন, আহমদ ছফা থেকে উদ্ধৃত করি, আবুল ফজল ছিলেন মহাজ্ঞানী, ছফা’র মত অনেকেই তার গুনমুদ্ধ ছিলেন। জেনারেল জিয়ার আমলে ক্ষমতার কাছে যাইয়াই তিনি প্রদর্শনী করে ওয়াজ শুনতে যাওয়া শুরু করলেন। এইটা হইল অসততা, যদিও জ্ঞানী লোকের কাজ। ছফা ভাই আরেকখানা মজার লেখা লিখছিলেন, টিভিতে কাবা শরীফের চতুর্দিকে শেখ হাসিনার সাথে কবীর চৌধুরিরে ঘুরতে দেইখা। এইটাও একই পদের উদাহরণ হইলো।
মওদুদী জ্ঞানী লোক ছিলেন, কিন্তু অসততায় ভরপুর, সবচেয়ে বড় কথা সাম্রাজ্যবাদের দালাল। তার লেখার সুক্ষ রাজনৈতিক বিচারেই অসততা ধরা যায়, ওদিকে তারই সাক্রেদ দেলোয়ার হোসেন সাইদী ওয়াজে যা বলে, মূর্খতার প্রবল শক্তিতে বলীয়ান না হইলে তা সম্ভবপর হইতো কিনা আল্লা মালুম! শ্রোতা আর বক্তার পারস্পরিক মূর্খতার (প্রয়োজনে পরস্পরের মূর্খতাকে ছাড় দেয়ার) আয়োজনেই এই অসত প্রচারণা যজ্ঞ সুসম্পন্ন হয়।
মাওলানা ভাষানী আরবীও ভাল জানতেন না, কিন্তু সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে ছিলেন অসাধারণ, আর সৎ। আল্লামা শিবলী নোমানী- তার মত একাধারে জ্ঞানী আর সৎ মানুষ পাওয়া দুষ্কর। আবুল হাশিমের ব্যাপারেও সেই কথা খাটে। এই সব লোকদের যে সব কাজের সাথে আপনি একমত হতে পারবেন না, সেখানেও অসততার ছাপ পাওয়া যাবে না। আবার ঘোর নাস্তিক আহমদ শরীফও এই সৎ তরিকাভূক্তই হবেন। নিউটন পণ্ডিত ছিলেন অনেক বড়, আস্তিক হিসেবেও নামজাদা, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক সততার দিক থেকে খুব উচ্চস্তরের ছিলেন না।
কিন্তু কথা আসলে এইগুলা না, এইগুলা কথাপ্রসঙ্গ। মূল বিষয় হইলো; কানা বাবা ঠিকই যেমন বলছেন, কাউরে মূর্খতার জন্য অসত বলা ঠিক না।
খোদা আমারে মাফ করুন মূর্খতার জন্য কাউরে যদি আমি গালি দেই অসত বইলা!
আমিও সেই চেষ্টাই করি। কিন্তু এমনও সময় আসে যখন মূর্খতার সাথে অসততার এমন জড়াজড়ি থাকে যে আলাদা করাই মুশকিল হয়। আমি বলতে চাই এমনও সময় আসে, যখন কেউ মূর্খতার কারণে অসততায় ধরা খায়, আর চতুর অসৎরা পার পায়। ব্লগে এমন বহু লোক আছেন, যাদের বিষয়ে মাঝে মাঝে এমন সন্দেহ হয়ও, যে তারা (ছদ্মবেশী অর্থে) ছুপা রাজাকার, ছুপা দালাল। তাদের কথা আপাতত ছাড়ান দেই। মহিয়সী সিমন দ্য ব্যুভয়া যেমন বলছিলেন, কেউ যদি নারী বিদ্বেষ গোপন রাখতে বাধ্যও হয়, ক্ষতি কি! ধরে নেব সেইটুকু বিজয় আমাদের আন্দোলনের হয়েছে।
কিন্তু কেউ যদি মূর্খতাবশতঃ তেমন প্রকাশ্য অসততার প্রদর্শনী করেন, তখন কি করা যাবে? তখন আপনি যে সমালোচনাটা করেন, তাতে তার মূর্খতার জন্য উপহাস থাকতে পারে, কিন্তু মর্মবস্তুটা অসততার প্রতিই নিক্ষিপ্ত থাকে।
কানাবাবা যেমন ঠিকই বলেছন, খারেজি ধর্ম সম্পর্কে না জানাটা অজ্ঞতা হইতে পারে, কিন্তু দুর্নীতি না। তবে আমার পয়েন্ট এই- কানাবাবা চক্ষুষ্মানতা নিয়া কেউ নাই জানেত পারে, খারেজি ধর্ম নিয়াও একই কথা, কিন্তু কেউ যদি এই অজ্ঞতা সত্বেও বাজারে যাইয়া কয়, খারেজি সিঁধেল চোর, আর কানাবাবা ডাকাতি করতে গিয়া কানা হইছে, তখন শুধু অজ্ঞতার দায়ে মাফ পাওয়া যায় না। এর মধ্যে পরিস্কার অসত মোটিভ আছে, আমাদের আলোচ্য লেখকও এমন মূর্খতাপ্রসুত দুর্নীতির স্বাক্ষর রাখছেন।
ধরেন, একটা প্রবল অসত এবং মূর্খতায় ভরপুর লেখা দৈনিক সংগ্রামে ছাপা হইলে খবরই পাইতাম না, পাইলেও পাত্তা দিতাম না, পাত্তা দিলেও হয়তো উত্তর দিতাম না। সেই পত্রিকায় কিন্তু পারস্পরিক মূর্খতাযোগে অসততা-যজ্ঞ চলতেই থাকতো। কেউ চরম মূর্খ হইলেই তার অসততার নিদর্শন অন-লাইনে নিয়া আসে, যেইটা কিনা বারোয়ারী জগত, সব পদের মানুষই যেখানে আছে। সেই কারণেই এইটারে মূর্খতাবশঃ অসততা বলা, যেইখানে অসততাই প্রবল গুন, মূর্খতা অলঙ্কারমাত্র। আলোচ্য ব্যক্তি সৎ হইলে নিজের পোষ্টে উত্তর দিতে পারতো, কিংবা (উচিত মনে হইলে) ভুল স্বীকার করতে পারতো। কিন্তু নীরবতার আড়ালে পাশ কাটানোও নির্লজ্জ অসততা। জনগণের স্মৃতিভ্রষ্টতার গুনের ওপর এদের আস্থা প্রবল।
আরেকট কথাও এই সুযোগে কওয়া যায়, সৎ মানুষ সাধারণত সীমানা ডিঙিয়ে খুঁটি গাড়েন না, কাটলেও জিভ কেটে বেরিয়ে আসেন। বহু ক্ষেত্রেই আপনার সততা ভুল করার হাত থেকেও আপনাকে রক্ষা করে, যদি ওই নির্দিষ্ট বিষয়ে আপনি জ্ঞানী নাও হন। সৎ যে কেউ কারও বিরুদ্ধে কুৎসা করার আগে যথাযথ খবর নেন। সে কারণেই বুদ্ধিবৃত্তিক অসততাও দুর্নীতি।
"বস্তুত চক্ষু নয়, অন্ধ তো তোমাদের হৃদয়।" হৃদয় যাদের রুদ্ধ, তারা মূর্খ কি জ্ঞানী কিছুই আসে যায় না। তারা সর্বদাই অসত।
ফুট নোট: কানাবাবার বিরুদ্ধেI আপনাদের কাছে একখানা নালিশ আছে! জিগায়া দেইখেন তারে জিগাইছিলাম কিনা, কানা কেন রাস্তায় বাত্তি নিয়া হাঁটে? ধান্ধাটা ছিল সে উত্তর জিগাইলে এই মওকায় আপনাদের পাঁচজনরে একখান আররদেশের উৎকৃষ্ট গল্প বলা। কিন্তু সেই কানাবাবা এত্ত কথা কইলো, এই সওয়ালের ধারকাছ দিয়াও গেল না! জিগানোর ব্যাপারটা না ঘটলে এমনিতেই কিস্সা কইতাম, কিন্তু এখন গায়ে লাগছে। তাই ঠিক করছি, ওইডা আর কমু না। কিন্তু লোকসান তো আমার হইলো, গল্প কইতে না পাইড়া পেট কামড়াইল, তাই নালিশ করলাম। আর লোকসান হইলো যারা গল্পপছন্দ আদমী, এখন তাগোরে জানাইলাম কি ক্ষতি তাগোর হইছে, (আমার না হয় পেট কামড়ানি সাইরা গেছে!), তারা বিচার কইরেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




