somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নাস্তিকের ধর্মকথার আস্তিকতা-নাস্তিকতার দার্শনিক বিচার ও কিছু প্রসঙ্গ

৩০ শে মার্চ, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নাস্তিকের ধর্মকথা সমপ্রতি একটি পোস্ট দিয়েছেন আস্তিকতা ও নাস্তিকতার দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিত বিষয়ে। ধর্মকথা সাবলীল ব্লগার, সাধারণত বিষয়ে সুনির্দিষ্ট থাকেন, সঙ্গতকারণেই তার অনুরাগী পাঠকের সংখ্যা বিশাল- মনে বহু দ্বিধা ও সংশয় নিয়েও এই অধম তার একজন নিয়মিত পাঠক। লেখার বিষয়গুণেই এটা হয়, আর বহু পাঠকের সাথে আমিও যতবার এ বস্তু পাই, আকণ্ঠ গিলে যাই। কিন্তু একটা পুরাতন প্রশ্ন মনের মাঝে খচ্‌খচ্‌ করে, এবার তাই সেটাকে আর বাড়তে না দিয়ে ময়দানে নিয়ে আসাই যুক্তিযুক্ত শিরোধার্য করলাম।
আমার আলোচনার দু’টি প্রসঙ্গ আছে, প্রথমটির স্বাভাবিক উত্তরণ দ্বিতীয়টি।

ধর্মকথা নাস্তিক আর আস্তিক প্রসঙ্গে যথাযথভাবেই বেদের উদাহরণ এনেছেন। সনাতনী ধর্ম অনুসারে কেবল বেদপন্থী হওয়াটাই আস্তিক হবার জন্য যথেষ্ট। এ কারণেই ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনা একেবারে অস্বীকার করেও আস্তিক দার্শনিক ঘরানা সেখানে আছে। আবার ঈশ্বরের ধারণা স্বীকার করেন এবং বেদপন্থী এমন আস্তিকও আছেন। উল্টোভাবে, ঈশ্বরে আস্থা আছে, এমন সকল দার্শনিক কিংবা ধর্মমত নাস্তিক হিসেবেই সনাতন ধর্মে পরিগণিত হবেন, যদি তারা বেদপন্থী না হন- অর্থাৎ বেদের অকাট্যতায় আস্থাহীন হন। নাস্তিকের ধর্মকথায় এ প্রসঙ্গটি যথেষ্ট ভালভাবেই আলোচিত হয়েছে, আগ্রহী পাঠকরা সেটা দেখে নিতে পারেন

..........


কিন্তু ধর্মকথা বিস্মিত এক পাঠকের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এই আপাতবৈপরিত্যের পেছনের কোন কারণ উদ্‌ঘাটক করলেন না। আমার বিবেচেনায় সে কারণের মাঝেই একটা অসাধারণ উত্তরের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। বেদসমূহের আদিরুপ লিখিত ছিল না, শ্রুতি ও স্মৃতি আকারে তা সংরক্ষিত থাকত। আসলে আর্যরা সে পর্বে লিখন সংস্কৃতির ধারে কাছেও ছিল না। ভারতে সুপ্রাচীন অনার্য সভ্যতা ধ্বংস করার বহু পরে তারা নিজেরা কৃষি সভ্যতা ও নগর সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়। তখন বেদগুলোর লিখিত রুপও তৈরি হয়। কিন্তু ধরা যাক ঋকবেদের কথা। সেটার একটা বড় অংশ তাদের যাযাবর পশুপালক পর্বের স্মৃতি। আর এটাই মজার বিষয়, সেখানে কোন সৃষ্টিকর্তাস্বরুপ ঈশ্বরের ধারণা নেই। কিন্তু সেখানে যে যাগ-যজ্ঞের বিবরণ আছে, সেটা যাদুবিশ্বাসে পরিপূর্ণ। এটা থেকে ধর্মসম্পর্কে একটা নৃবিজ্ঞানগত সিদ্ধান্তই প্রতিপাদিত হয়- ধর্মবিশ্বাসের প্রাচীন রুপটি হচ্ছে যাদু বিশ্বাস। প্রাচীন শিকারজীবী মানুষের সরল যাদুবিশ্বাসেরই আরো জাঁকাল, জটিল এবং উচ্চতর রুপ হল সনাতন ধর্মের যজ্ঞসমূহ।
এই যাদু বিশ্বাসকে প্রথম দৃষ্টিতে আজগুবি বিশ্বাসপ্রবণতা বলেই মনে হতে পারে, সেটাই স্বাভাবিক। এই বিশ্বাসের মূল বিষয় হলো কোন একটা কিছু যদি নির্দিষ্ট রীতিতে সংগঠিত করা হয়, প্রকৃতিতেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। সে কারণে শিকারের চতুর্দিকে শিকার-নৃত্যে উত্তম শিকারের আশা, উঠোনে বীজ বুনে ভালো ফলনের আশা। এমনকি আমাদের লোকজীবনের নানান মেয়েলী ব্রতঅনুষ্ঠান, কৃত্রিম বৃষ্টির ভান করে বৃষ্টি কামনা, যৌনতা সম্বলিত বহু অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে উর্বরতা কামনাসহ বহু কাজেই আদিম যাদুবিশ্বাসের টিকে থাকা রুপ দেখতে পাই।

কিন্তু যতই অবিশ্বাস্য হোক, এই যাদু বিশ্বাস কল্পনায় প্রকৃতিকে একটা নিয়মের নিগড়ে বেধে ফেলে। যদি যাদুকর্ম ও মন্ত্র পাঠ হয়, তবে প্রকৃতিতে তা ঘটতে বাধ্য, সেখানে ঈশ্বর বা অন্য কোন শক্তির কোন ভূমিকার ধারণা তখনো করাই হয়নি। আর একটি বিষয়ও একারণেই গূরুত্বপূর্ণ, আমাদের চেনা প্রায় সবগুলো লৌকিক ধর্ম বা আদিবাসী গোত্রের ধর্মের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য এটিই, সেখানে ঈশ্বর সম্পর্কে কোন দার্শনিকতা নেই, তা অনেক বেশি চাওয়া-পাওয়ার ধর্ম। এমনকি তাওরাত ও যবুর কিতাব দ্বয়েও অপার্থিব কামনার চেয়ে ধন-দওলত-ভূমির কামনাই বেশি। সে কারণেই ঋগ্বেদেরও কোথাও ‘মোক্ষ’ বা পরমমুক্তির ধারণা নেই, তা পার্থিব সুখের আশাতেই ভরপুর। ফলাফল হলো এই যে, এই যাদু বিশ্বাসের ঐতিহ্য থেকে ভারতবর্ষে এমন একটি দার্শনিক সমপ্রদায় তৈরি হলো যারা পরবর্তীতে সনাতনী ঐতিহ্যে সর্বক্ষমতাময় ঈশ্বরের ধারণা প্রবর্তনকারী দার্শনিক ধারাগুলোর জন্ম হলে ঈশ্বরের ধারণাকে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।

আমাদের খেয়াল রাখা দরকার, কালের প্রবাহে আর্য সমাজের শ্রেণীগত ঐক্য ভেঙে গেল, সামজে নতুন নতুন ক্ষমতা সম্পর্ক তৈরি হলো। ফলে আদিম যজ্ঞের লক্ষ্যও আর এক থাকল না। পুরোহিত শ্রেণীর ক্ষমতা এ পর্বে বহুগুণে বৃদ্ধি পেল। সনাতনী ধর্মে ঈশ্বরের ধারণার সৃষ্টি এই জটিল সমাজের দার্শনিক চাহিদা পূরণেসাথে যেমন, রাজা ও পুরোহিত সমপ্রদায়ের ক্ষমতাবৃদ্ধি ও পরস্পরের সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বিকাশেরও সাথেও তেমনি সম্পর্কিত। যাই হোক, একদিকে যজ্ঞ এখন অশ্বমেধ যজ্ঞের মত রাজকীয় ক্ষমতার আকাঙ্খার সাথে যুক্ত হলো, অন্যদিকে যাদুবিশ্বাসের আদিম রুপটিও তার মাঝে শক্তিশালীভাবে রয়েওগল। আমরা দেখব, উর্বরতা ও ক্ষমতা সম্পর্কিত বেশিরভাগ যজ্ঞ ও আচারের সাথে উন্মুক্ত, কিংবা সীমাবদ্ধ যৌনইঙ্গিত। এ সবই আদিম যাদুবিশ্বাসেরই ধারাবাহিকতা।

কিন্তু ভারতে ঈশ্বর সম্পর্কিত ধারণার বিকাশ একটা বড় প্রশ্নের মাঝে পড়ল এই যাদুবিশ্বাসের দিক থেকেই। কেননা প্রকৃতির সব কার্যাবলীকে যদি মন্ত্রপাঠ ও যাদুকর্মের মাধ্যমে আয়োজন করা যায়, তবে ঈশ্বর বাহুল্য; অর্থহীন ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে কোন সৃষ্টিকর্তারুপ নিয়ন্ত্রকের ধারণা। কেননা চরাচর মন্ত্রের অধীন। পূর্বমীমাংসকরা তাই জগতের সৃষ্টি ও বিলয়কে অসম্ভব বলে মনে করেন। এই বিতর্ক থেকেই ক্রমে এমন সব যুক্তি ও ধারা নির্গত হয়, যা এর আগের বিশ্বইতিহাসের যে কোন পর্বেই অদৃষ্টপূর্ব। অযৌক্তিক যাদু বিশ্বাস একটি যুক্তিবাদী-বস্তুবাদী দার্শনিক ঘরানার জন্ম দেয় যা আবার কিন্তু যজ্ঞের কার্যকারিতায় আস্থাশীল।
যজ্ঞে তাদের অসীম আস্থা, আর বেদ তো যজ্ঞশাস্ত্রই। কিন্তু যজ্ঞের মন্ত্রে যে দেবতাদের কথা আছে, তার কি হবে?
নানা যুক্তিতর্ক তুলে মীমাংসকরা প্রতিপাদন করেন, শব্দই দৈবগুন সম্পন্ন, যে নামে সুক্ত পাঠ হয় তাই দেবতা। দেবতা তবে শব্দ মাত্র!
মীমাংসকদের এই একটা অসাধারণ গুন, তারা কর্মের ঝাণ্ডা উর্ধে তুলে ধরেছেন। কেননা, ধর্মের একটা বিশাল ব্যাখ্যা যখন মোক্ষসন্ধানী হয়ে পড়েছে, তখন যাদু-বিশ্বাসের বশবর্তী হয়েও তারা কর্মকে ফলপ্রদ বলে মনে করেছেন। আর ঈশ্বর নেই বলে কর্মফল। নেই, নতুন জন্ম নেয়া এই কর্মফলের শাস্তি-পুরস্কারের ধারণাকে বাতিল করে তারা বলছেন স্বর্গ-নরক ইহলোকেই ভোগ্য, নিরতিশয় প্রীতিই স্বর্গ... ইত্যাদি ইত্যাদি।

পরবর্তীকালের চার্বাক নাস্তিকদের সাথে মীমাংসকদের কোন কোন যু্‌ক্িততে সাদৃশ্য থাকলেও চার্বাকরা যজ্ঞের কর্মফল নিয়েই মস্করা করেছেন। অর্থাৎ চার্বাকরা যাদুবিশ্বাসের কাঠামো থেকে সম্পূর্ণবাবে মুক্ত একটি দার্শনিক সমপ্রদায়, যারা বেদবিরোধী, সে কারণেই তাদের নাস্তিক আখ্যাপ্রাপ্তি, ঈশ্বরে অবিশ্বাসের কারণে নয়।

সাধারণভাবে এটা তাহলে বোধগম্য যে, সনাতনী ঈশ্বরবিরুদ্ধ আস্তিক ঘরানার জন্ম যজ্ঞের একটি বিশেষ দার্শনিক ব্যাখ্যা থেকে, যা আদিম যাদু বিশ্বাসেরই একটি পরিশীলিত রুপ।

ভারতীয় সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতির একটা অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এক একটি বিবর্তিত সমাজের স্তর এতটাই স্মৃতি পরবর্তী স্তরে রেখে গিয়েছে, তাতে তার উধাও হয়ে যাওয়াটা হয়নি পুরোপুরি। বর্ণ, পুরান ও আচার-রীতির মাঝে সেই স্মৃতিগুলো ভয়ানক ক্রিয়াশীল। বহুক্ষেত্রেই আমরা দেখব পুরোন দেবকূল নতুন দেবকূল কর্তৃক একেবারে বিনাশ প্রাপ্ত হননি। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের মত পুরুষ দেবতারা আদিম নারী-ঈশ্বরদের পুরোপুরি ধ্বংসও করেননি, গ্রিসের মত গূরুত্বহীন পাশ্বচরের ভূমিকায়ও চলে যাননি। বরং আর্য পুরুষতান্ত্রিক দেবতা কর্তৃক পর্যুদস্ত হয়্ে‌ও তারা অতি গূরুত্বপূর্ণ স্থান দেবলোকে দখল করে রাখতে পেরেছেন, বহু সংস্কৃতি ও তার আন্দোলনের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু অন্য সভ্যতগুলোতেও যে স্মৃতির উত্তরাধিকার খুব বিরল, তাও নয়। খৃস্টান ধর্মে মাতা মেরির গূরুত্ব প্রতিষ্ঠা আসলে জনসাধারণের মাঝে আদিম উর্বরতা দেবির অভাব মেটানোর বাসনাতেই, রোমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা আইসিসসহ আরও বহু প্রাচীন স্থানীয় উর্বরতার দেবিকে প্রতিস্থাপন করেন এক মাতা মেরি। ইউরোপে বহু লোকাচারে এখনও আদিম জাদৃবিশ্বাসের রুপটি বহাল, যদিও তা থেকে এমন অসাধারণ দার্শনিক ঘরানা তৈরি হয়নি।


২.
দ্বিতীয় পর্বে যাবার আগেই আমি ধর্মকথার এই পোস্টটি নিয়ে আমার মূল্যায়নটি বলি, সেটা হলো লেখার সারবস্তুর সাথে আমি একমত, কিন্তু এটা ধর্মতত্ত্ব বা থিয়োলজি, ধর্মের ঐতিহাসিকতা কিংবা ধর্মের রাজনীতি নিয়ে রচনা, আস্তিকতা ও নাস্তিকতা নিয়ে গূরুতর একটা দার্শনিক প্রসঙ্গে কিন্তু তিনি আদৌ যাননি।

সেটি হলো, দার্শনিকভাবে আস্তিকতাকে সন্দেহাতীতভাবে খারিজ করা যায় কিনা!

প্রতিটি কেতাবকে আমরা দেখেছি একটা কালপর্বে অচল হয়ে যেতে। তার মানে এক একটা টেক্সট একটা পর্বের মানসকে প্রতিনিধিত্ব করেছে।

কিন্তু টেক্সট এর এই বিবর্তন-ই যদি সৃষ্টিজাত প্রথম ঘটনার বিবর্তনের ফলাফল হয়?
জীববিদ্যা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করেছে প্রাণীজগত বিবর্তনের ফলাফল, কিন্তু ঈশ্বর যদি এভাবেই সৃষ্টি করে থাকেন?

প্রশ্নটা এভাবে দেখাটা নাস্তিক-আস্তিক কোন মহলেই খুব জনপ্রিয় না, আমাদের দেশে বিশেষ করে একেবারে না, কারণ তাতে কেতাব নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। ইসলামি দর্শনচিন্তার মাঝেই আমরা এর যথেষ্ট ইঙ্গিত পাব (বিজ্ঞানচিন্তায় নয়, বিবর্তনবাদ তুলনামূলকভাবে সেদিনের ঘটনা)। যেমন, মধ্যযুগে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন ব্যাপক আলোচিত হত: সৃষ্টি করার ইচ্ছা আল্লাহর সত্তায় কোন পরিবর্তন নিয়ে এলো কি না, কেননা এই ইচ্ছা নতুন করে জাগা মানেই একটি (ইচ্ছার) পরিবর্তন। সৃষ্টি হওয়াটা তার সত্তায় কোন পরিবর্তন আনলো কিনা। কিংবা সৃষ্টি করার পর সেটির অবস্থিতি কোথায় হল, কেননা আদিতে তো তিনিই শুধু ছিলেন, নুতন ব্রক্ষ্রাণ্ড কোন স্থানে অবস্থিত হলো? যদি সেটা তার নিজের মাঝেই, তবে তো তার পরিবর্তন হলো, কিংবা প্রতিটি জন্ম-মৃত্যু-পরিবর্তনের সাথে তারও পরিবর্তন হয় (এই অর্থে বহু সুফী ঘরানা সর্বেশ্বরবাদে বিশ্বাস করে, অন্য ধর্মগুলোতেও এর নজির আছে)। কোরআন কি অনাদি-অনন্ত? তাই যদি হয়,তবে তো আল্লাহ ও কোরআন এই দুই অনাদি-অনন্তকে পাচ্ছি আমরা! কোরআন তা হলে আল্লাহর সৃষ্টি, কেননা দু’টি অনাদি-অনন্ত সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে কোরআন নশ্বর ও সৃষ্ট! তারও বিলুপ্তি সম্ভব, কিংবা সৃষ্টি জগতের জন্য যা প্রযোজ্য, কোরআনের বেলায়ও তাই।

মোটকথা, দর্শনের এই জটিল প্রশ্নগুলো নানানভাবে উত্থিত হতে থাকে মুসলিম জ্ঞান-মণ্ডলে। (এ বিষয়ে মনে করে একটা পোস্ট দেব)। সুফীরা এক রকম সমাধানও দেন সৃষ্টিকে তারই প্রতিবিম্ব ঘোষণা করে, মানুষ তার জাগতিক চিহ্নগুলোর উর্ধে উঠতে থাকলে তার সাক্ষাৎ পাবে। অর্থাৎ বস্তুর কালিমা থেকে মুক্ত হতে পারলে মহান ভাবের সাথে মিলন ঘটবে।

কিন্তু ভাব আর বস্তুর এই সমস্যার আরেকটি অদ্ভূত সমাধান আমরা ইউরোপীয় দর্শনচর্চায় পাই। একটা সামান্য মিল পাওয়া যাবে মুতাজিলীদের বিতর্কের সাথে, ফিখটে যে প্রকল্প হাজির করলেন ভাবই আদি, প্রতিটি নতুন কর্ম আদিভাবকে পরিবর্তন করে, নতুন ভাব নির্মিত হয়। ফলে আবারও, ইগো পজিটস ইটসেলফ! এভাবে নতুন কর্ম ও উচ্চতর ভাবের বিবর্তন। হেগেল যাকে আরও সুনির্দিষ্ট রুপ দিলেন, আদিম ভাব নিজেকে বোঝার প্রয়োজনে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করল, বস্তুর জন্ম হল। এবার বস্তু আর ভাবের দ্বান্দ্বিক ক্রিয়ায় ক্রমাগত উচ্চতর বস্তুজগত, ক্রমে প্রাণীকূল ও অবশেষে বুদ্ধিমান প্রাণীর আবির্ভাব। এই বুদ্ধিমান প্রাণীও ইতিহাসের আবর্তনে নানান আদিম বিশ্বাস, পুজা, ক্রমে ঈ‌শ্বরের ধারণায় উপনীত হল। বুদ্ধিমত্তার এই স্বাভাবিক সন্ধানস্পৃহা আদি ভাবের নিজেকে বোঝার চেষ্টারই ফলাফল। অর্থাৎ এই যে বিপুল পথ আমরা পাড়ি দিলাম, তা আসলে একটি আদি কারণ থেকে উদ্ভুত। ভাব নিজেকে যথাসম্ভব সকল ধারণা, সম্ভাবনা ও পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে উপলদ্ধ করতে চান। মূঢ়তা থেকে ক্রমশঃ তিনি আত্মোপলদ্ধি করছেন।
এ্‌ অর্থে পাপ বা পুন্য বলতে আসলে কিছু নেই। সবই শুধু যে আপেক্ষিক, তাই নয়, এই গোটা আবর্তনের জন্যই প্রয়োজনীয়।
ফলাফল? হেগেল ও আত্তার এ প্রায় একই। আত্তার যেমন বলেন, সেই স্তরে আয়নায় কেবল নিজের প্রতিফলনই দেখা যাবে, আর শব্দহীন শব্দের বার্তায় শোনা যাবে আমিই সত্য। নিজেকেই নিজে চিনবে মানুষ, ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। আর হেগেল বলেন, সেই মহাসত্যের সামনে অপার সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।

হেগেল ইউরোপকেন্দ্রিক একচক্ষু, তাই ধারণা করেন পূবের লোক অন্ধ-বিশ্বাসের কারাগারে আটকা পড়েছে, সে সেই সৌন্দর্যের মুখোমুখি হতে সক্ষম নয়। পশ্চিমে যুক্তি আর দ্বান্দ্বিকতার চর্চা আছে, সমাজ ভেঙে ভেঙে এক সময় দ্বান্দ্বিক নিয়মে তারা সেই স্তরে পৌছে যাবে। পূব দর্শনের উপযুক্ত নয়, ধর্মতত্ত্বের স্তরেই তার স্থায়ী আবাস। পূব সম্পর্কে তাদের স্থিরতার ধারণা সেদিনের ওয়েবার পর্যন্ত খাটে, মার্কস্‌ও এই দোষে অনেকখানি দুষ্ট। কোসাম্বি ভারত প্রশ্নে এই ধারণায় একটা বড় আঘাত হানেন, রোমিলা থাপাররা সেই ধারাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, আমাদের দেখাচ্ছেন কত অসাধারণ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সমাজও অগ্রসর হয়ে আসছিল উপনিবেশের আগ পর্যন্ত।

পশ্চিম এক অর্থে আধুনিক জগতের শ্রেষ্ঠ ভাববাদী ও বস্তুবাদী উভয় জাতেরই জন্ম দিয়েছে। ভাববাদী হেগেল এর একেবারে উল্টোপিঠ ফয়েরবাখ। যদিও অ্যাকডেমিক পরিসরে এদের বড় অংশই নাস্তিক কিংবা সংশয়ী, কিন্তু নির্বিশেষে র‌্যাশনাল। ফ্রয়েড, তার শেষ জীবনে একবার সাক্ষাৎ দিয়েছিলেন ভারতের বিখ্যাত পণ্ডিত, ভাষাতত্ত্ববিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে। পাঠক অবাক হয়ে দেখবেন শারিরীকভাবে প্রায় নিঃশেষিত ফ্রয়েডকে একবার কোন বিশ্বঈশ্বরের সম্ভাবনা ¯^xKvi করাবার জন্য সুনীতিকুমারের কি আকুলি-বিকুলি! আমাদের অ্যাকাডেমিগুলো আসলে যথেষ্ট অ্যাকডেমিক হয়ে ওঠেনি কখনো, তাই র‌্যাশনালিটির চর্চাও এত দুর্বল।

সংক্ষেপে আমার বক্তব্য হলো এই, র‌্যাশনালিটির চর্চা থেকে কোন অ্যাকাডেমিক সত্যতা নিরুপন হতে পারে, প্যারাডাইম শিফটও হতে পারে, কিন্তু এই সৃষ্টি জগতকে আমরা সম্পূর্ণভাবে বুঝতে সক্ষম কি না, সেই প্রশ্ন বিচ্ছিন্ন শাস্ত্রজ্ঞান দিয়ে মীমাংসা নাও হতে পারে। দর্শনের সামগ্রিকতার প্রশ্নটি সর্বদাই অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে, কেননা আমরা কোন থিওরি অব এভরিথিং পাইনি, সৃষ্টির আদি কারণও খুঁজে পাইনি। পদার্থবিজ্ঞান যে পর্যায় থেকে আলোচনা শুরু করে, তারও আগের মূহুর্তের বাস্তবতা না জেনে কি করে কোন স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাই!

ধর্মকথা, আপনাদের মত মানুষদের দেখে বুঝি ভাব-দর্শনের অনুসারী না হয়েও আপনি যুক্তিতে সক্ষম, কাজেই মহামতি হেগেলও যুগের সীমায় সীমাবদ্ধ ভেবে আনন্দিত হই, ভরসা পাই। আমরাও তাহলে হেগেলের এঁকে দেয়া সীমা ডিঙিয়ে, ধর্মতত্ত্বের স্তর অতিক্রম করে দর্শনের জগতে বিচরণ করতে সক্ষম হবো একদিন! নাস্তিকের ধর্মকথা অব্যাহত থাকুক, আস্তিকেরও সেটাই প্রবল কামনা। কেননা, সে অর্থে নাস্তিকও পরমেশ্বরের নিজেকে বোঝারই একটি উপায়, একটি প্রকাশ মাত্র। প্রতি সংগ্রামেই আস্তিক ও নাস্তিক নিজেকে উচ্চতর স্থানে নিয়ে যায়।
সালাম, নাস্তিক।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৪০
২৪টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×