তার আচরণের পরিবর্তন কবিও খেয়াল করেছিল, কেননা হাজার হলেও সে তো কবিই ছিল। গল্প করার মাঝখানে নন্দিনী হঠাৎ আচমকা হাত ঝাঁকি দিয়ে যেন বা অদৃশ্য অপ্রীতিকর কিছু একটা সরিয়ে দিত, কিংবা একদমই অপ্রাসঙ্গিকভাবে সুগন্ধিওয়ালা কী অন্য কারো নাম নিয়ে বলত: 'কতদিন ওকে দেখিনা!' যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেদিনই হয়তো তার সাথে দেখা হয়েছে, হয়তো খাণিকক্ষণ আগেই। কবি জানত এটা আসলে মনের কোনে উঁকি দেয়া অন্য কোন কিছুকে ঝেটিয়ে দূর করা, আর দূর করে নিজেরই সম্বিত ফিরে পাবার অসচেতন চেষ্টা, তার নিজেরই তো এ অভ্যেস বহুদিনের। কিন্তু নন্দিনীর এই অভ্যাস যে বাড়তে থাকে ক্রমশ। তার মানে কী উঁকি দেয়া চিন্তাগুলো আরও আরও বেশি করে তাকে দখল করতে চাইছে? কবি চিন্তিত হলেও তাকে কিছুই বলে না; যদিও তার উদ্বেগও বাড়তে থাকে।
তার পর একদিন, সে দিন পূর্ণিমা ছিল, না অমাবস্যা ছিল, না কী কোনটাই ছিল না সবাই ভুলে গেছে; নন্দিনী গভীর ঘুম থেকে জেগে ওঠে মাঝরাতে, না কি জেগেই ছিল তখনো, তাও কেউ জানে না, তার গলা দিয়ে অদ্ভূত এক আওয়াজ শুরু করে, আহ্হ, আহ্হ আহ্হ। কেউ যেন তাকে জবাই করছে, সে নিজের গলায় হাত দেয়, নিজের চোখে মুখে হাত বুলায়, কিন্তু আওয়াজ চলতে থাকে। আহ্হ, আহ্হ, আহ্হ। কবি নিথর দাঁড়িয়ে থাকে, বোঝে আপাতত তার কিছুই করার নেই। পরদিন সকালেই সে বরং শুধোয় নন্দিনীকে:
‘কী হয়েছিল তোমার?’
‘অস্থির লাগছে, কী যে করি!’
‘অস্থির লাগে তখনি, যখন তুমি অনিশ্চিত।’
‘নিশ্চিত হবার কী উপায়?’
‘নিজে থেকে খুঁজে না পেলে আমাদের মনোবিদ আছে, মনের এই সব খোড়াখুড়ি সে ভালোই পারে।’
আমাদের নগরে ফুসরৎ যাদের খুবই কম, মনোবিদও তাদেরই একজন। নগরের শ্রেষ্ঠী, উদ্ভাবক, সংগ্রাহক, সেনাপতি, বিচারপতি, প্রাচীন অভিজাত সকলের জন্যই তার সপ্তাহের এক একটি দিন বরাদ্দ, কেবল একদিন পায় সে তার নিজের জন্য। মনোবিদের নিজের দিনটিতেই সহজকন্যা তার কাছে গেল। কবি তাকে সাথে নিয়েই গিয়েছিল। মনোবিদ অবশ্য কবিকে বাইরেই বসিয়ে রাখলো, সহজকন্যাও অবাক হয়ে দেখল কবি কেমন কাচুমাচু হয়ে তা মেনেও নিল। তা হলে এই নগরে এই সবার চেয়ে ক্ষমতাধর, সকলের মনের ওপর এরই কর্তৃত্ব!
সহজ কন্যা তাকে তার সমস্যার কথা বললো। না, বললো না, কারণ তা কী তা তো সে নিজেই ভালোমতো জানে না, আর যতটুকু বুঝে উঠতে পেরেছে ভাষাবাক্যে তো তা কুলোয় না। কাজেই সে কী কী যেন বলে বলার মত আর কিছু খুঁজে না পেয়ে চুপ করলো।
মনোবিদ কিন্তু একথা সে কথা বলে ঠিক আসল জায়গায় চলে গেল। লোকে বলে ওর নাকি কতগুলো খাপ আছে, আর জগতের সবগুলো মন নাকি সেই খাপমতো তৈয়ার। ফলে মনের কিছু ভাবনা শুনেই সে আন্দাজ করে নিতে পারে কোন খাপের উপযুক্ত মন এটা; সে অনুযায়ী বাকি সব কিছুই ছক কেটে বলে দেয়া যায়, নিশ্চিন্তি হবার জন্য মাঝে মাঝে রোগীর গল্পের সাথে মিলিয়ে নিলেই হল।
‘প্রথমে বলো চেনো এমন সবাইকে নিয়ে, সব কিছুকে নিয়ে। তারপর তুমি সবচেয়ে বেশি ভুলে থাকতে চাও এমন কেউ বা কিছু আমাদের খুঁজে বের করতে হবে!’
কন্যা বলে যায়।
তারপর সব শুনে মনোবিদ বললো ‘বাউণ্ডুলে বলে কেউ নেই। ওটা তোমার মনের অপরাধবোধ।’
বজ্র নিজেও এতটা চমকায় কী! কিন্তু সেই চমকের মাঝেও সহজ কন্যার মনের ভেতর ভাবনার অঙ্কুরের মত একটা কিছু উকি দিলো, বললো হ্যাঁ, তাইতো! তাইতো!
কিন্তু তাও বা কেন হতে যাবে? সে কী সভাকবির জমজ ভাই নয়, যাদের দু’জনের কার জন্ম আগে কেউ তা জানে না!
‘এক অর্থে কথাটা ঠিকই আছে। কবির না হোক, কবিস্বভাবের জমজ ভাই সে। কার জন্ম আগে সেটা আজও মীমাংসা হয়নি। কেউ বলে আদিপাপের কারণে অপরাধী মন, কারও তত্ত্ব অপরাধী মনের কারণে আদি পাপ। জমজ তো বটেই।’ মনোবিদ হাসেন।
‘কিন্তু অপরাধটা কী?’
‘কেউ বলে লোভে পরে ক্রমে এমনটা হয়েছে। কেউ বলে স্রেফ কামের বশ হয়েছিল, তারপর সব ছেলেখেলা হয়ে দাঁড়াল,... কেউ বলে রাষ্ট্রবিরোধিতার অভিযোগে কয়েক দিন তাকে আটকে রেখেছিল, হয়তো পীড়নও করেছিল। সত্যমিথ্যা জানি না, এরপর থেকে আগেকার সেই বেপরোয়া ভাবটা ওর থাকেনি আর। হয়তো সবগুলো মিলেই এমনটা হয়েছে। ক্ষতি কি বলো, আমাদের সভাকবির মতো নির্ভার আনন্দের কবি খুঁজে মেলা ভার,’ মনোবিদ হাসেন।
‘কিন্তু সে যদি কেউই না হয়, তবে সে আমার কাছে আসে কেন?’
মনোবিদ একটু ভেবে উত্তর দিলেন, “আচ্ছা বলো তো, তুমি কোত্থেকে এসেছো?’
‘আমাকে কবি যেখানে পেয়েছে, আমি সেখানেই ছিলাম।’
‘আমার মনে হয় না।’
‘কী মনে হয় আপনার?’ তীব্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে নন্দিনী।
‘তুমি এই নগর কী অন্য কোন নগরের মেয়ে। আর সকল মেয়েদের থেকে আলাদা কিছু তুমি নিশ্চয়ই নও। অন্যদের মতই তুমি ঠকেছ, ঠকিয়েছ, কেবল এই ঠকাঠকি খেলার ভার তোমার মন সহ্য করতে পারেনি। কোন কারণে তাই তুমি স্মৃতিহারা, অর্থাৎ তোমার মন তোমার স্মৃতি ভুলে থাকতে চায়। ফলে তোমার পক্ষেই এমন আচরণ সম্ভব হয়েছে, কবি যাকে সহজ কন্যা বলে ভেবেছে। তুমি নিশ্চয়ই স্বর্গ থেকে আসনি। তবু কবি তোমাকে দিলো খ্যাতি, সে কারণেই সকলের আরাধ্য হয়ে উঠলে তুমি। এক এক জনে এক এক গুণে তোমাকে জয় করতে চায়। এটাই নিয়ম। সর্বগুণে কে কাকে জয় করে বলো? বস্তু দখলের ক্ষমতাই অধিকারের মাধ্যম। আর তুমিও এ কয়দিনে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষমতার ভিন্ন ভিন্ন গুনে মুগ্ধ। আর সে কারণেই তোমার অপরাধবোধ। তোমার কামনা স্থায়ী হয় না বলে অপরাধ বোধ, কেননা তোমাকে মুগ্ধ করার ক্ষমতাগুলো কিসের বিনিময়ে অর্জিত, সেটা তোমার মন খুব ভাল করে জানে। তাইতো অপরাধবোধ, তাই বাউণ্ডুলের জন্ম। তুমি অন্যদের মতই, এটা সত্য, যেমন সত্য নগরের আর সব নারীর জন্যও। হতে পারে তুমিও তেমন কেউ-ই ছিলে, যার লোভে নগরের বিদ্রোহী শেষে সভাকবি বনে গেল, শুধু পীড়ন নিশ্চয়ই তার পদস্খলন ঘটায়নি। বাউণ্ডুলের দেখা তুমিই শুধু পাও, এর মানে তুমি শুধু আলাদা এ অর্থে যে তুমি বেশি দুর্বল; না, না, তোমার মনটা বেশি নরম বলে। যে কারণে আগেও একবার তুমি স্মৃতি হারিয়েছ।’
সহজ কন্যা মনোবিদের দিকে সম্মোহিতের মতই তাকিয়ে থাকে। মনোবিদের খাপে এত সহজে কি মনটা তার এঁটে গেল! তাহলেও যদি এক রকমের মুক্তি পাওয়া যায়, যত নির্মমই হোক, সত্যের স্বাদ তবু যদি মেলে! মনোবিদের যাদু কিন্তু তখনও শেষ হয়নি।
‘তোমার কামনা সত্য। তোমার অপরাধবোধও সত্য। এমনকি আমি প্রায় নিশ্চিত, তুমি কুমারীও নও, সকলেই যেটা ভাবছে, আমাদের নগরে আবার কুমারীর সাথে নিস্পাপ ভাবমূর্তির একটা সম্পর্ক আছে কী না! তাহলে স্বাভাবিক হবার কী উপায়? সমাধান একটাই; সত্যকে সঙ্গত বলে সহজে মেনে নেয়া।
‘তোমার কামনা সত্য, তুমি সহজ কন্যা; এটা মিথ্যে, বাউণ্ডুলেও মিথ্যে। যতক্ষণ না এটা তোমার মন মেনে নেবে, ততক্ষণ সে আসতেই থাকবে, আসতেই থাকবে। তোমার কামনা সত্য, কেননা সত্য তোমার শরীর, সত্য তোমার মুগ্ধ হবার ক্ষমতা, তোমার সমর্পিত হবার আকাঙ্খা, আর তোমার দখলের আকাঙ্খা। যত শক্তভাবে তুমি নিজেকে এটা বোঝাতে পারবে, তত কম বাউণ্ডুলের ভূত তোমাকে আছর করবে। সব সময় ভাববে তুমি সত্য, এই যে আমি সত্য, যা তোমাকে সত্য জানাবে তাই সত্য, বাকি সব মনের ভ্রান্তি, ক্লেশ, তুচ্ছ সব অপরাধবোধ। কেবল তোমাকে বেছে নিতে হবে কার দখলে তুমি তুষ্ট: দণ্ডের ক্ষমতা, অর্থের ক্ষমতা, খ্যাতির ক্ষমতা, সাহিত্যের ক্ষমতা, জ্ঞানের ক্ষমতা!’
মনোবিদ এবার তার বইয়ের তাক থেকে ক্ষীণকায়, জীর্ণ মলাট ছেড়া সস্তাছাপার একটা বই বের করলো, তারপর পাতা উল্টে এত সহজে একটা জায়গায় এসে হাজির হলো, বোঝাই যায় এই পাতায় অভ্যস্ত সে। তারপর পড়ে গেল:
তোমার স্তনের মত দূর শ্যামল পাহাড় ডাক দেয় ‘আয়’
সঙ্গীন উচিয়ে শাস্ত্রীরা সেইখানে থাকে তাকে পাহারায়।
আমাদের কবি লিখেছিল এ দুটো লাইন, বহু আগে। বোঝই তো, কেন সবাই তাকে এত পছন্দ করে, এত ভয় পায় আর গূরুত্ব দেয়। বহুগুন বেশি তত্ত্ব জেনেও আমি এতো সহজে এটুকু সত্য বলতে পারিনা, তাই কবিকেই ধার করতে হয়। আসল কথা এটুকুই, এই পাহারা আছে বলেই যা চাই তা বলতে পারিনা, আর যা চাই, তা বলতে পারিনা বলেই মন পাহারা মানতে আর রাজি না। পাহারার ভার টানতে টানতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে মন ভেঙে পরে।’
মনোবিদ তাকে কী বলতে চায়? এই কী জগতের স্থির সত্য? সহজ কন্যা অন্য আর কিছু ভাবতে পারে না, কেবল ভেবে চলে, কেবল-ই ভেবে চলে এর বাইরে আর কি সত্য থাকতে পারে! নিজের পুরো মনটা সে হাতড়ে নেয় এক লহমায়, না আর কিছু তো নেই। ওই লাইন দুটোও তো বাউণ্ডুলের লেখা নয়, ওইতো ওই প্রচ্ছদেই কবির নামে তা ছাপা আছে। স্পষ্ট কি মনে পড়ে যায় তার আগের জন্মের স্মৃতি!
শুধু যদি তাই সত্য হয়, বাকি সব যদি মিথ্যে, তবে আর দেরি কেন, এইখানে এই মনোবিদের কক্ষেই নয় কেন, যে তাকে সত্য জ্ঞান দিয়ে মুক্ত করল, তার সাথেই নয় কেন সেই মহাসত্যের উদ্বোধন? সে নিজেই ধীরে অনাবৃত করল নিজেকে। বহুদিন পরে এইভাবে প্রথমবারের মত হয়তো ভাল করে দেখল নিজেকে, তার কান্না পেল, করুণাও জাগল নিজের প্রতি: এই ই সব? এই যদি সব হয়, তবেও কামনা কেন জাগবে না? মনোবিদ তো তাকে কঠিন সত্যকেই ভালবাসতে বলেছে, তাহলেই তার অসুখ সুখের কাছে হেরে যাবে।
মনোবিদ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তার দিকে; তার শিকার সম্পর্কে সে ছিল একদমই নিশ্চিত। সে নীরবে সহজ কন্যার নগ্ন শরীর দেখে, সম্মতি আদায়ে নিজের জ্ঞানের ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়, আত্মবিশ্বাসী দৃঢ় পায়ে সে আগায় মেয়েটার দিকে।
তখনি অকস্মাৎ কামরার দরোজায় তীব্র করাঘাত। সহজ কন্যা (তখনো তো সে তাই ছিল) সেই শব্দে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত সেই শক্তিশালী বাহুর নীচ থেকে মুক্ত হতে চায়, ‘বলে ঐ যে, ঐ যে বাউণ্ডুলে দরজায়।’ মনোবিদ কিন্তু তাকে ছাড়ে না, বোধকরি সে এরজন্য প্রস্তুতও ছিল, বলে, এখনি ও চলে যাবে। বলে, ও তোমার কাছে শেষবারই এসেছে। তুমি আনন্দ নাও, তাহলেই তুমি ওর হাত থেকে হবে চির মুক্ত।
সহজ কন্যা আর কোন বাধা কিংবা সম্মতি নিজের ভেতর অনুভব করে না, বিপরীত দুই স্রোতের আবর্তে বুঝি তার মনটা খাবি খায়। অবশেষে মনোবিদের শরীরের ভার থেকে একসময় মুক্ত হয় সে। দরজায় করাঘাতও ধীরে ধীরে এক সময় থামে। কার চলে যাবার ধীর আওয়াজও শোনা যায়। মনোবিদ তাকে পোষাক পরতে সাহায্য করে খাঁটি ভদ্রলোকের কেতা মোতাবেক।
সহজ কন্যার ঘোর কাটাতে খানিকটা সময় লাগে, কিন্তু ঘোর কেটে প্রকৃতস্থ হয়না সে মোটেই, বরং হঠাৎই আত্মবিশ্বাসী মনোবিদকে চমকে দিয়ে দরোজা খুলে বাইরে ছুটে যায় সে, ভাঙা গলায় বলতে থাকে, আমি মানি না তুমি নেই, আমি মানি না। এরা সবাই মিথ্যে কথা বলে তোমার কাছ থেকে আমাকে সরিয়ে দিতে চায়, আমি মানি না তুমি নেই। তুমি সত্য। তুমি সবার চেয়ে সত্য।
সহজ কন্যা, যদি মনোবিদের রোগ নির্ণয় যদি ঠিক হয়ে থাকে, দ্বিতীয়বারের মত সম্পূর্ণ অপ্রকৃতস্থ হল। গোটা এক সপ্তাহ তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, হঠাৎ দেখা পেলেও ধরা যায়নি, কিন্তু অনেকেই তাকে ঐ একটি কথাই আওড়াতে শুনেছে। দিনে কী রাতে হঠাৎ হঠাৎ তাকে দেখা যেত, কী সে খেয়েছে, কোথায় থেকেছে কেউই তার কিছু জানে না, আমিই বা কি করে তা তোমাদের বলি!
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ২:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


