বেশ কয়েকজন বন্ধু ব্লগার হিস্টিরিয়া শব্দটার ব্যবহার নিয়া আপত্তি করছেন। তাদের আবারও স্যামুয়েল জনসনের বাণীটা শোনাই: Patriotism is the last refuge of a scoundrel.
তো এই স্কাউন্ড্রেলরা কেমনে দেশপ্রেমের আশ্রয় নেয়? খুব সহজে। সেইটা হৈল তারা জনগণের মাঝে ভীতি আর আশঙ্কা এমন ভাবে ছড়ায়, যে তাদের বদমায়েশীর রাস্তায় পাব্লিক অন্ধ হয়া হাটে, তাদের আকাঙ্খামত আচরণ করে।
তলস্তয়ের ওয়র অ্যান্ড পিস উপন্যাসটাতে এইটার একটা দারুণ উদাহরণ আছে। নেপোলিয়ন মস্কো আক্রমণ করল, নগর রক্ষার কোন ব্যবস্থাই করল না কর্তৃপক্ষ। দেন শত্রু যখন একবারে দরজায়, উত্তেজিত নগরবাসী ঘিরা ধরল গভর্নররে, তারে মইরাই ফালাইব এই অবস্থা। সেই গভর্নর কিন্তু একটা আজব চাল চালল, কারাগারে আটক দুই সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, রাজতন্ত্রবিরোধী বিপ্লবীকে বেধে পাবলিকের সামনে হাজির করে দিল এক নাটকীয় বক্তৃতা, তার সারমর্ম হল এই দুই লোকের চক্রান্তের কারণেই নগরের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করা যায় নাই!
গভর্নরের বক্তৃতা শুইনা পাব্লিক নিমিষে তাদের দেশপ্রমের ঝাল ওই দুই সত্যিকারের বিপ্লবীর উপ্রে ঝাড়ল, তারপর মস্কো নগর পরিত্যাগ কৈরা দলে দলে পিটার্সবুর্গে পালাইল। অথচ যারা খুন হৈল, তারাই বরং জারশাসিত রাশিয়ার ভিতরে গণতান্ত্রিক সংস্কারের কতা কৈত, দমিত জাতিগুলার মুক্তির কথা কৈত, আর কেন নেপোলয়ানের আর্মির মোকাবেলায় জারের আর্মি পারত না, সেই কথা কৈয়া পাবলিকরে সাবধান করত নতুন ব্যবস্থার পক্ষে আসার জন্য।
ওই কাহিনীটা পৈড়া জনসনের বাণীটার সত্যিকারের মর্মার্থ সহজে বুঝতে পারছিলাম। দেন ফরাসী অর্থনীতির বিকাশের উপ্রে একটা পেপার তৈরি করতে যায়া দেখি, সেই দেশের তুলনায় রাশান স্কাউন্ড্রেলরা শিশু। এইরকম গণউন্মাদনা তৈরি কইরা নেপোলিয়নের ভাতিজা লূই বোনপার্টরা যা করছিল, তা আদর্শ উদাহরণ।
ভাইবেন না, এইটা কেবল আধুনিক কালের ঘটনা। প্রাচীন য়্যাথেন্সেও এইরকম বহু উদাহরণ পাওযা যায়। চান্সমতো কারো বিরুদ্ধে কোন হুজুগ তৈরি করতে পারলেই হৈল, হিস্টিরিয়াগ্রস্ত পাবলিক তারে সাবাড় কৈরা দিত। স্পার্টার সাথে দশকের পর দশক যুদ্ধের সময় য়্যালকিবিয়াডিস নামের এক বীররে সাইজ করতে শত্রুরা দেবমূর্তির গায়ে কালিমা লেপন করে, দেন তা চালায় তার নামে। ফলাফল সবচে যোগ্য সেনাপতিটারেই আশ্রয় নিতে হয় ঐ স্পার্টাতে। আর এক নৌ যুদ্ধে হারার পর ওঠা গণউন্মাদনায় অন্যায় ভাবে তিন জেনারেলরে ফাসি দিতে বাধ্য হয় আদালত, অথচ তারা দোষী ছিলেন না। এর প্রতিবাদ করছিলেন বৈলাই সক্রেটিস এথেন্সবাসীর বিরাগভাজন হৈছিলেন।
গণউন্মাদনার আরো কিছু মজার ধরন আছে। রুশদ এর জীবনীতে পাইছিলাম, একবার রোল উঠল অমুক শুক্কুরবার জু্ম্মার পর কেয়ামত। খলিফা পর্যন্ত ডরে কম্পমান। পাবলিক পুরা মাতম তুলতাসে। রুশদ ওইটা নিয়া হাসাহাসি করায় (যদিও কেয়াত হয় নাই, তবুও) ধর্ম মানেন না এই বদনামের ভাগী ঠিকই হৈলেন। এক পর্যায়ে মোল্লাদের চাপে তার বই খলিফা পর্যন্ত পুরায়া ফেলার হুকুম দিলেন, যদিও রক্ষা যে তিনি নিজের কপিগুলা সংরক্সণ করছিলেন।
মধ্যযুগে প্লেগাক্রান্ত ইউরোপে হিস্টিরিয়ার যাতা উদাহরণ আছে। দুনিয়া ধংস্ব হয়া যাইতেসে মনে কৈরা কেউ দরবেশ হযা যাইতো, কেউ কেউ গনযৌনৎসবের আয়োজন করতো। এইগুলা মাসহিস্টিরিয়ার চরম উদাহরণ। যদিও এইগুলা সর্বদা ম্যানুপুলেটেড না।
আবার আসি জনসনের কথায়। বদমায়েশরা দেশপ্রবদমায়েশরা পাবলিকের দেশপ্রেমের সেন্টিমেন্টরে কাজে লাগায়া টিকা যায়। নিজেদের বদকর্মরে আড়াল করে। এইটার আরও কিছু উদাহরণ পাওয়া যাবে মধ্যযুগে ইহুদীদের বিরুদ্ধে চালিত রাজনৈতিক প্রচারণাগুলাতে, গোগলের লেখাতেও পাবেন, পোল্যান্ডের রাজা য়ুক্রেন দখল করছে, তো রাজারা পাবলিকের রোষটারে ডাইভার্ট করত ঐ নোংরা সুদখোর ইহুদীগুলার কারণেই যুদ্ধ হারছি বৈলা। আর যায় কৈ, মনের আনন্দে পাবলিক ইহুদীদের বস্তিগুলা লুট করত, তাদের ঘরে আগুন জ্বালাইত।তাদের মেয়েগুলারে গণিমতে নিত।
দাঙ্গা জিনিসটাও কিন্তু একটা মাসহিস্টিরিয়া না জন্ম দিতে পারলে বাধান সম্ভব না। ভাবেন না, কোলকাতার দাঙ্গায় লাখ-লাখ হিন্দু মুসলমান শিখ দা ছুরি নিয়া পরস্পররে নিধনে নামল, এইটা কত গভীর মানসিক প্রভাব ছাড়া সম্ভব হয়!
এরশাদরে দেখছিলাম বহুবার এই সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করতে। আন্দোলন জৈমা উঠছে, অম্নি ভারতে একটা ফ্রিগেট হয়তো সমদ্রসীমা। টিভিতে এরশাদের ভাষণ: ‘সার্ভভৌমত্ব বিপন্ন, এই সময়ে কারা দেশরে ভাগ করতে চায় আন্দোলন কৈরা?’ এইবার কর আন্দোলন!
তো ব্যক্তিগত পর্যায়ে হিস্টিরিয়া প্রধান বৈশিষ্ট্য হৈল তীব্র আবেগের কারণে যুক্তিসম্মত বা স্বাভাবিক আচরণে ব্যর্থতা। সাথে শারিরীক কিছু উপসর্গ। মাসের বেলায় ঘটনাটা একটা একই ধরনের অযৌক্তিক কাজে অংশগ্রহণ, হৈতে পারে সেইটা রাজনৈতিক, হৈতে পারে ধর্মীয় বা অন্য কিছু।
হিস্টিরিয়ার জন্ম দিয়া কি কৈরা কায়েমী স্বার্থবাদীরা তাদের কুকর্মের বৈধতা সৃষ্টি করে, তারই সাম্প্রতিক উদাহরণ দিয়া আমি একটা পোস্ট দিসিলাম। সদাশয় মডারেটরগণ তা ভুল বুঝে মুছে দিয়েছেন। ঠিকই আছে, মডারেশনের স্বার্থ মাঝে মধ্যে ভুল হৈতেই পারে। ভুলটা আমারও হৈতে পারে, তাই রিপোস্ট না কৈরা আমুতে
রাগ ইমনের (হিস্টিরিয়াগ্রস্ত) রাগীমনের সন্ধানে…
আর্কাইভ কৈরা রাখলাম। কারো আগ্রহ হৈলে ওইখানে পৈড়া আসতে পারেন।
আর ওই বা এই পোস্টটা কোন অর্থে মনোবিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ না, পলিমিক্যাল প্রবন্ধ। কাজেই এই অর্থে রূপক মানেটা গ্রহণ করলে পোস্টদাতা বাধিত হবেন।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মার্চ, ২০১০ সকাল ৯:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


