মানুষের শাররীক অস্তিত্ব, মানসিক অস্তিত্বের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তার সামাজিক অস্তিত্ব। সামাজিক অস্তিত্ব, পরিচিত জনের বাইরে গিয়ে তার গণে উপস্থিতি রাজনৈতিক উপাংশ হিসেবে। মানুষের অস্তিত্বের তুলনায় তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব একটা বাস্তবতা। একজন রাম শ্যাম যদু মধু, রহিম করিম সবাই স্বশরীরে বর্তমান থাকলে তার একটা রাজনৈতিক অস্তিত্ব থাকে। সেই রাজনৈতিক অস্তিত্বে তার অবস্থান কোথায় হবে, সামাজিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে সে কোন পক্ষ গ্রহন করবে এসব বিচারবিবেচনার জন্য ৫ বছর পর পর ভোটের রাজনীতিতে নেতৃত্ব গ্রহন আর নেতৃত্ব বর্জনের প্রক্রিয়া বিদ্যমান আছে।
মানুষের সামাজিক অস্তিত্ব, গণে অস্তিত্ব এবং তার সম্প্রসারণ ঘটেছে বাংলা ব্লগে এসে। এখানেও রাজনৈতিক উপাদান প্রবল। রাজনৈতিক ক্ষেত্র আছে, প্রবল ভাবেই আছে।
এখানে রাজনীতি চর্চা থেমে নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করবার প্রক্রিয়াটাতে অনেক সময়ই মাত্রাছাড়া আক্রমন, মাত্রাছাড়া বর্ণবাদের প্রকাশ ঘটে যাচ্ছে।
এবং এই যুথবদ্ধতাকে আমার নিজের বিচারে একটা ক্ষতিকারক উপাদান মনে হয়েছে। সংঘবদ্ধ মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তি চমৎকার কাজ দিতে পারে, আর সংঘবদ্ধ মানুষের নষ্টামি ঘোরতর অনর্থ ঘটাতে পারে। সংঘবদ্ধ মানুষ যখন কোনো অন্যায় কাজে আনন্দ পেতে থাকে। সেই মবের []সামনে কোনো শুভবোধের অস্তিত্ব থাকে না। সাম্প্রতিক কালে ব্লগের হাল দেখে মাঝে মাঝে সেই বোধশক্তিহীন মবের কথাই মনে পড়ছে।
মব মেন্টালিটি আমরা ধারণ করি, সামষ্টিক অর্থে আমাদের নিজেদের শুভবোধ- অশুভবোধ পরের প্রতিক্রিয়ার উপরে নির্ভর করে। পার্শবর্তী মানুষের প্রতিক্রিয়ায় আমরা চাইলে পিটিয়ে লাশ ফেলতেও দ্বিধা করবো না। অপরাধ করবার সময় মানুষের শাররীক অনুঘটকের অনুপাতের পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে সেই অনুঘটকটা উত্তেজনার অংশ হয়ে যায়। এইসব দুর্ভাগা মানুষ পরিশেষে অপরাধপ্রবন হয়ে উঠে, কিংবা যারা সিরিয়াল কিলার হয়ে যায় তাদের মতোই ধারাবাহিক অপরাধি হয়ে উঠে।
সামহোয়্যার ইনে এই প্রবনতার শুরু এখন থেকে না। অনেক আগে যখন বাঁদরের হাতে বেসবল ব্যাট তুলে দেওয়া হলো সেই আন্দোলনের সময় আমিও সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিলাম। তারও আগে মাসুদা ভাট্টির তরবারীর ছায়াতলে উপন্যাসে মোহাম্মদের হস্তমৌথুন জনিত বিভ্রাটের কবলেও সংঘবদ্ধ একটা আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো।
সেসব সংঘবদ্ধতার পরেই আবার ব্লগ নিজের মতোই সচল ছিলো। তবে কখনই গোষ্ঠিগত জিঘাংসাপ্রবনতা ছিলো না প্রকাশিত। এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক বর্নবাদ চলছে এখানে। মতাদর্শিক বর্ণবাদ, মতাদর্শিক শুদ্ধতা চাপিয়ে দেওয়ার তীব্র প্রবনতা এখন ব্লগের বাস্তবতা।
মানুষের চরমপন্থী মনোভাব কখনও কোনো শুভ আন্দোলন জন্ম দিয়েছে কিংবা কখনও মানুষের উপকারে এসেছে এমনটা আমার মনে হয় না। ক্ষাণিক বিরতির পরে এই সংঘবদ্ধতা অনায়াসে মব ক্যারেক্টার পেয়েছে। এবং মবের বিষয়ে একটা কথাই বলা যায়- এদের পরবর্তি আক্রমনের পরিণতি কি হবে, পরবর্তী শিকার কে হবে এটা পুর্বেই অনুমান করা অসম্ভব।
আমি নিজে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিপক্ষে, জামায়াতের রাজনীতির বিলোপ চাই, তবে এখানে জামায়াতের রাজনীতির বিরোধিতা করে ব্লগকে জামায়াতমুক্ত করে ফেলবো এবং মানুষের ভেতর থেকে জামায়াতি ধারণা মুছে ফেলবো কি বোর্ড চেপে এটা ভাববার মতো মুর্খ এখনও হয়ে উঠতে পারি না।
হয়তো এ টিমের সার্বক্ষণিক টহলদারিতে এখন জামায়াত মনস্ক ব্লগারেরা আলাদা নামে, আলাদা ভাবে বিচরণ করছে এখানে। হয়তো তারা প্রকাশ্যে জামায়াতের লিফলেট তুলে দিচ্ছে না এখানে, কিশোর কণ্ঠের প্রকাশিত নিবন্ধ আর গল্প কবিতা এখানের পাতায় চলে আসছে না স্বনামে, তবে যারা এই টহলদার পুলিশের ভুমিকায় নিয়োজিত তারা সবাই কি কিশোর কণ্ঠ আর দৈনিক সংগ্রামের পাঠক? তারা কি সোনার বাংলা পড়েন নিয়মিত? নয়া দিগন্তের পাঠক শ্রেণীতে কি টহলদার পুলিশেরা আছেন?
জামায়াতের অস্তিত্ব বিলোপ করতে গিয়ে এরা যা করছে সেটা আদতে জামায়াতের উপকারে আসছে। তাদের এই প্রবণতাকে আমার ক্ষতিকারক মনে হয়েছে। তাদের জামায়াতবিরোধী আন্দোলন যদি জামায়াতকে ক্ষীণধারা না করে বরং জামায়াতের সপক্ষে চলে যায় সেটা সম্পর্কে তারা অনবগত থাকবেন। তাদের নিজস্ব কেপি টেস্ট, তাদের নিজস্ব রাজাকারশনাক্তকরণ প্রকল্প নিয়ে তারা ব্যতিব্যাস্ত থাকিবেন।
অহেতুক কারো উপরে ঝাপিয়ে পড়ে রাজনৈতিক জিঘাংসার প্রকাশ কখনই বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষের মতো আচরণ হতে পারে না।
ব্রাত্য রাইসুর গিমিক আমার নিজের পছন্দ নয় , মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তার যে অবস্থান সেটাও আমার কাছে সক্রিয়তার অভাব মনে হয়। অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তার অনাগ্রহ নিয়েও আমার তেমন বক্তব্য থাকতে পারে না। তবে ওয়ামির ব্যান হওয়া এবং এ সংক্রান্ত একটা পোষ্টে তীব্র ভাবে মানসকে আক্রমনে করে যাওয়া মানুষদের দেখে হঠাৎ মনে হলো আদর্শ মানুষকে কতটা প্রতিহিংসাপরায়ন করে তুলতে পারে। আদর্শের বাঁদরামি পেয়ে বসলে মানুষ মানুষের মতো আচরণ ভুলে গিয়ে মুখ ভেঙচি দিতেই ব্যস্ত থাকে।
মানসের সেই পোষ্টের অবস্থান মানসকে কতটা প্রভাবিত করেছে কে জানে? তবে মানসের প্রতি বিরুপতা জমেছে অনেকের, সেটার প্রকাশ দেখলাম একদিন, কোনো এক সম্মানিত ব্লগার কোলকাতায় মানসের পিতার আবাসন নিয়ে কুরুচিকর প্রশ্ন তুলেছেন। এটা যে একটা রাজনৈতিক জিঘাংসা এটা বুঝবার বোধও তার ছিলো না।
অতিরিক্ত গোষ্ঠীপ্রবন হয়ে যাওয়া কাজের কিছু না। সামষ্টিক মানুষের শুভবোধ নিয়ে সংশয়টা বাড়তেই থাকে। হয়তো এটিমের আদর্শগত আচরণ নিয়ে অনেকের ভেতরে কোমল একটা অবস্থান আছে, এই রবিন হুড হয়ে যাওয়া এ টিমের ভেতরে যদি মব মেন্টালিটি জন্মে যায় সেটার দায় তাদের হিরো মনে করা মানুষের উপরেও পরে।
কালপুরুষ লোলপুরুষ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক দেখে পুনরায় বুঝলাম মানুষ সংঘবদ্ধ অবস্থায় সব সময়ই অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠে। কাল পুরুষের মন্তব্যটা তার বিরোধিপক্ষকে উত্তেজিত করেছে, সেটা মোটেও তার উপযুক্ত মন্তব্য হয় নি। তার নারীর প্রতি আণতি, তার কিশোরীর প্রতি অনাবশ্যক স্নেহ প্রদর্শন বিষয়ক এলার্জি অনেকের থাকতে পারে, তবে তাকে নিয়ে লোলপুরুষ সাহিত্যসমগ্র তৈরি করা মানুষেরা কি এটাকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে কোনো সহায়তা করছে?
থাকতে হইলে এইভাবেই থাকতে হবে নইলে ফুট, এই ইজারাদার মানসিকতা কিংবা এই সামন্ততান্ত্রিকতাকে কি দিয়ে প্রতিরোধ করবো? একটা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেয়ে যাওয়া এই সামাজিকতার কিংবা অসামাজিকতার চর্চায় এর প্রতিক্রিয়ায় যে প্রতিরোধী অংশ সৃষ্টি হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে রাজাকার তকমা লাগিয়ে দেওয়া, তাদের পেডিওফাইল চিহ্নিত করবার প্রবনতা, তাদের কোনো না কোনো ভাবে হেনেস্তা করবার প্রবনতা থেকে বাইরে আসতে কি পারবে এই সংঘবদ্ধ দলটি?
অনেকের অনেক রকম ব্যক্তিগত পছন্দ এবং ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থাকতে পারে, অনেক পছন্দ অপছন্দ থাকতে পারে, তবে শেষ পর্যন্ত মানুষের বিবেচনায় যখন তার রাজনৈতিক আনতিই প্রধান উপকরণ হয়ে যায় তখন সেখানে চলমান রাজনীতির সকল ব্যধিই চলে আসে।
গোষ্ঠি প্রবনতার সবচেয়ে বড় সমস্যা মানুষের কোমল অনুভুতি, দলের সদস্যদের নিজস্ব ভুল ভ্রান্তিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা এবং তা অবজ্ঞা করে যাওয়া। তবে এসব ভুল তিল তিল করে জমে জমে অনেক বড় অঘটনের সুচনা করে। হয়তো এ টিমের অতিরিক্ত কর্মতৎপরতা সামহোয়্যারে একদিন বিপরীত ভাবে আঘাত হানবে, সেদিন রাজাকার নিধন আর রাজাকার খেদানো আন্দোলনের দোহাই দিয়ে অনেকের সমর্থনই পাবে না এই গোষ্ঠি।
আর সামহোয়্যারকে রাজাকারছানাদের কলুষমুক্ত রাখলেই কি ইন্টারনেটে জামায়াতের প্রচারণাকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে? উন্মুক্ত সাইবার সংস্কৃতির যুগে কখনও কি কোনো কিছু চেপে রাখা যায়?
বর্তমানের উন্মুক্ত পরিসব বিবেচনা করে শুধুমাত্র রাজাকার বুলি আউরে জামাতকে ঠেকানো যাবে এমন ভাববিলাসিতায় মগ্ন মানুষদের জন্য অনুকম্পা রইলো।বোগদাদি হাকিমের একটা পোষ্ট দেখলাম, এর ভঙ্গি গলির মাস্তানের মতো, আর কয়টা বাকি আছে, সবাইরে লইয়া আয়- এই আচরণ দেখে লজ্জিত হই- রাজনৈতিক জিঘাংসা এবং বর্ণবাদ দেখে আশ্চর্য হই না, আশ্চর্য হই এর প্রাতিষ্ঠানিকতা দেখে।
এটাকে সমর্থক করতে মন সায় দেয় না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


