প্রাযুক্তিক উন্নয়নের সুফল তৃতীয় বিশ্ব কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলো যতটা ভোগ করে তার তুলনায় এর আপদগুলোর দুর্ভোগ অনুভব করে বেশী। শিল্পোন্নয়ন ঘটে নি যেসব উন্নয়নশীল দেশে সেখানে সস্তা শ্রমের লোভে বহুজাতিক কোম্পানি প্রবেশ করছে। উন্নত চিকিৎসা সেবা এবং উন্নত শল্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা পশ্চিম গোলার্ধেই ভীড় জমিয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলো সস্তা শ্রম দিয়ে, শ্রমিক আর মেধা দিয়ে উন্নত বিশ্বের চাহিদা পুরণ করছে নিয়মিতই। ফলে মেধাশুণ্য হয়ে পড়ছে এইসব দেশ। নিজস্ব যোগ্যতায় উন্নত বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানসবসম্পদ যথাযোগ্য ব্যবহৃত হচ্ছে কি না এটা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে।
তবে একটা বিষয় প্রকট ভাবে স্পষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন, বিশ্বে ধনবৈষম্য বাড়ছে অসহনীয় হারে। ধনীরা আরও সম্পদ সঞ্চয় করতে পারছে এবং দরিদ্র মানুষেরা নিজস্ব দারিদ্রসীমা অতিক্রম করতে পারছে না। বিভিন্ন উপাত্ত ঘেটে উন্নত বিশ্বের মেধাবী সন্তান এবং মানবসম্পদ আমাদের নিয়মিত জানাচ্ছে আসলে দারিদ্র সীমা কি? দারিদ্রসীমার সংজ্ঞা এবং এর ভয়াবহতা নিয়েও গবেষণা চলছে ।
বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষ বাড়ছে। গত এক বছরের ১০ শতাংশের বেশী মূল্যস্ফ্রীতি, কল কারখানায় শ্রমের প্রয়োজন হ্রাস পাওয়া, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া এবং অব্যহত ছাটাই- সব মিলিয়ে নতুন ভাবে প্রায় ১ কোটি মানুষ দৈনিক প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ কোনো না কোনো ভাবে দারিদ্রসীমার কাছাকাছি একটা অবস্থানে রয়েছে।
হয়তো এদের ভেতরে কেউ কেউ প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারছে এই দুর্মূল্যের বাজারে, তবে তাদের বিশুদ্ধ পানীয় জল সংগ্রহ করতে সমস্যা, যাদের এই দুই চাহিদা পুরণের ক্ষমতা আছে তাদের আবাসনের সমস্যা। জেলখাটা কয়েদীর মতো গা ঘেষাঘেষি করে থাকছে , প্রয়োজনীয় স্থান নেই। এবং এদের অনেকের চিকিৎসা সেবা কেনার ক্ষমতা নেই।
ফলাফল মানুষ মরীয়া হয়ে এই ধনবৈষম্য কাটিয়ে উঠতে চাইছে। তারা সবাই পশ্চিমে ছুটবার ব্যগ্র তাড়না বোধ করছে। কাজের খোঁজে কিংবা শ্রম বিকাতে তারা বৈধ এবং অবৈধ পন্থায় উন্নত বিশ্বে যেতে আগ্রহী। এরাই প্রতারিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশী।
মানবপাচার কিংবা হিউম্যান ট্রাফিকিং এর মূল কারণ অর্থনৈতিক অসমতা। স্বচ্ছলতার খোঁজে মানুষ নিজেই নিজেকে পণ্য করছে, এমন কি জমি-বসত ভিটা বেচে হলেও তারা দেশত্যাগে প্রস্তুত। এই মরিয়া মানুষদের নিয়ে ব্যবসা করতে বাধছে না ধনীদের। তারা হিউম্যান রিক্রুটিং এজেন্সী খুলেছে। সেখানে তারা লাখ টাকার বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদী মৃত্যু বেচছে।
বাংলাদেশের নিম্ন শিক্ষিত শ্রমিকের গন্তব্য সিঙ্গাপুর, হংকং, মালোয়শিয়া এবং মধ্য প্রাচ্য। সেখানে সস্তা নির্মান শ্রমিকের কাজ করছে এরা। এইসব দেশে বাংলাদেশের শ্রমিকেরা কাজ করছে ৮০০০ থেকে ১২০০০ টাকায়। তবে এই শ্রমপ্রদানের টিকেট তাদের কিনতে হয়েছে কমপক্ষে ১ থেকে ৩লক্ষ টাকায়।
এইসব বৈধ দাসত্ব শেকল কেনার চেয়ে বড় সমস্যা হলো অবৈধ দাসত্বের টিকেট কেনা। মূলত এরাই সবচেয়ে দুর্ভাগা, এরা বিশ্বের যেকোনো স্থানে যেতে প্রস্তুত। দেশের সীমানার কাঁটাতার পেরুলেই স্বর্গ এমন বদ্ধমূল ধারণার কারণে এরা সব বিক্রী করে স্বদেশ ত্যাগ করে। পেছনে পরিজনদের হয়তো নিঃসম্বল কিংবা ন্যুনতম সম্বল রেখে চলে যায়। দেশের পরিজন আশা করে থাকে এরা প্রতিষ্ঠিত হবে।
অভাব ঘুঁচে না, এরা হয়তো অবৈধ শ্রমিক হিসবে কোনো কোনো দেশে ঢুকে পড়ে। হয়তো কেউ কেউ কাজও জুটিয়ে নেয়। তবে অধিকাংশই পুলিশের হাতে আটকা পড়ে, কিংবা সীমান্তপ্রহরীর কাছে ধরা পরে, কিংবা মাঝপথেই মৃত্যু বরণ করে।
বাংলাদেশ থেকে প্রচুর মানুষ পাচার হচ্ছে, বৈধ উপায়ে যেখানে তাদের উপরে শোষণ করা হচ্ছে, অবৈধ উপায়ে যেখানে তাদের কোনো দায়দায়িত্ব নিচ্ছে না আদমব্যবসায়ীরা।
এই মানসপাচারের মূল কারণ মূলত ৩টি। দেহব্যবসা, কিংবা পতিতাবৃত্তি, সস্তা শ্রম এবং প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রত্যঙ্গের চাহিদা।আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি উন্নত হয়েছে, এখন যেসব প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যায় সেসব প্রত্যঙ্গ পুনঃব্যবহার করা যায়। প্রতিবছর মানবপ্রত্যঙ্গের চাহিদার তুলনায় এর প্রাপ্যতা কম। যদিও মানুষের মৃত্যুর হার প্রত্যঙ্গের চাহিদার হারের তুলনায় অনেক বেশী তবে মৃত মানুষের প্রতি স্বজনের ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা এবং তার উপরে ধর্মীয় আবেগ সব মিলিয়ে খুব কম মৃত মানুষের প্রত্যঙ্গই ব্যবহৃত হয়। স্পষ্ট নির্দেশ থাকলেও অনেক সময় মৃতের স্বজনেরা মৃত দেহ কাটাছেড়া করতে দিতে চায় না।
যদি পৃথিবীতে প্রতিবছর যে পরিমান মানুষ স্বাভাবিক ভাবে মৃত্যুবরণ করে তাদের প্রত্যঙ্গগুলো আমরা পেতাম, তবে আমাদের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অনেক বেশী উদ্বৃত্ত থাকতো এই শরীরের আভ্যন্তরীন অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো।
চীনে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের কিডনী, লিভার, হৃৎপিন্ড, অগ্ন্যাশয়, সবই জনগণের সম্পদ হয়ে যায়। অর্থ্যাৎ তাদের এইসব প্রত্যঙ্গ অন্য মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। এশিয়া থেকে পাচার হওয়া অনেক দরিদ্র মানুষের কিডনী আর হৃৎপিন্ড অন্য কোনো উন্নত বিশ্বের মানুষের শরীরে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সম্মতি কিংবা অসম্মতি এটা বিবেচনার বিষয় না। প্রয়োজন আছে, ভালো দাম পাওয়া যায় তাই এইসব প্রত্যঙ্গের চাহিদা বিপুল। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যঙ্গের চাহিদা জানানো মানুষের শতকরা ৮০ শতাংশ জীবিত অবস্থায় তাদের প্রত্যঙ্গ পায় না। এদের অনেকেই কয়েকটা বাড়তি দিন বেঁচে থাকবার জন্য যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত।
তাদের স্বচ্ছলতা আছে, আমাদের অভাব, তাই সমীকরণ মিলে যায় ঠিকঠাক, দুইদিকেই সমতা চলে আসে। দরিদ্র মানুষের কিডনী আর হৃৎপিন্ড তার সম্মতি কিংবা অসম্মতিতে পাচার হয়ে যায় উন্নত বিশ্বে। ঘটনাটা কতটা ভয়াবহ একটা ঘটনা ঘটেছিলো বেশ কয়েক বছর আগে।
একজনকে উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো তার এমপ্লয়ার। তার চাকুরির বিধিতে ছিলো, তার স্ত্রী সন্তান এবং ভাইবোন সবাইকেই নিয়ে যেতে পারবে সে। সেইমতো সবার ভিসাও হয়েছিলো।
তারা নির্দিষ্ট দিনে এলাকা ছেড়ে চলেও গেলো। তার পরের সপ্তাহে তার সকল পরিজনের মৃতদেহ পরিত্যাক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলো সীমান্তের নিকটবর্তী একটি জলায়। সেখানে ছিলো তার কিশোরী দুই কন্যা, শিশুপূত্র, তার ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, এবং তার স্ত্রী। এবং তাদের প্রতিস্থাপনযোগ্য সকল প্রত্যঙ্গই ব্যবচ্ছেদ করে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিলো।
এটা সহজ কোনো কাজ না, অবিকৃত রেখে মানুষের শরীরের ভেতর থেকে প্রত্যঙ্গ খুলে নেওয়ার কাজটায় দক্ষ শল্য চিকিৎসক প্রয়োজন। এবং অর্থের লোভে কিছু কিছু মানুষ এইকাজ করছে, তারা তাদের কাছে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা দরিদ্র মানুষকে প্রতারিত করে এই অবৈধ অঙ্গ আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রী করে দিচ্ছে।
বগুড়া এবং রংপুরের কোনো কোনো এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। তখন সরকার সক্রিয় হয়ে এই চক্রকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলো। তারা অঙ্গবিকৃতি এবং অঙ্গচুরি প্রতিকারের জন্য শক্ত আইন তৈরি করেছে।
জাতিসংঘ এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এইসব মানবপাচার রোধ এবং অবৈধ অঙ্গব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করবার জন্য বিশেষ কঠোর আইন তৈরি করেছে। তবে এর ভেতরেও নাটোরের এক দিনমজুরের কন্যার শরীর থেকে খোয়া গেছে কিডনী। ২০০৬ সালে তার অপারেশন হয়েছিলো, এরপর সে সুস্থ হওয়ার বদলে অসুস্থই থাকতো বেশী।
এ বছর পরীক্ষা করে দেখা গেলো তার একটা কিডনী চুরি হয়ে গেছে।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন জানিয়েছে তারা শুধু মৌখিক সম্মতির বিনিময়ে প্রাপ্ত প্রত্যঙ্গের বৈধ্যতা যাচাই করবে না। বরং তারা দাবি করেছে যেখানেই এই ঘটনা ঘটুক না, যেখান থেকেই আসুক না কেনো এই প্রত্যঙ্গ, এটা যথাযথ কতৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে।
মূলত যারা পয়সার জন্য কিডনী বেচছে অভাবে পড়ে তারা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটা অঙ্গ হারাচ্ছে এবং এর সাথে তারা প্রতারিত হচ্ছে , কারণ তাদের শর্তমোতাবেক টাকা দেওয়া হচ্ছে না।
দেশের উত্তরাঞ্চলে মানুষের ভেতরে এই ভীতি প্রবল। যমুনা সেতু হলেও রাজধানীর আইন এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখানে তেমন সক্রিয় নয়। তাই এখান থেকে নারীরা পাচার হচ্ছে অন্য দেশে গিয়ে পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য হচ্ছে। এখানকার দিনমজুর কোনো কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা সেবা নিতেও ভয় পায়। তাদের অভিজ্ঞতা বলে এইসব চিকিৎসাকেন্দ্রে মানুষের চিকিৎসার নামে তাদের কিডনী চুরি করা হয়।
মানুষ সন্ত্রস্ত, তাই রংপুরের কাছাকাছি একটা গ্রামের এক পরিবারের ৩ সন্তান চিকিৎসার অভাবে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে এটা জেনেও তার মা এবং তার বাবা শহরের চিকিৎসালয়ে তাদের সন্তানকে পাঠাতে নারাজ। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য- যদি চিকিৎসা না করাই তাহলে ছেলের চোখ যাবে, কিন্তু যদি পাঠাই এবং তাক কিডনী , হৃৎপিন্ড লিভার চুরি করে তাদের মেরে ফেলে, এর দায়িত্ব কে নিবে। আমার ছেলে আমার চোখের সামনে অন্ধ হোক তবু অক্ষত দেহে আমার সামনে থাকুক। তার চোখ ভালো করবার জন্য তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিবো না আমরা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





