বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় এই অবৈধ বাণিজ্যে, কিডনী, লিভার, এবং কর্নিয়া এবং হৃৎপিন্ড যখন ব্ল্যাক মার্কেটে বিক্রী হচ্ছে চড়া দামে, যখন ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বচ্ছল বাসিন্দারা মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই অঙ্গপ্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াটা সমাপ্ত করতে আসছে। এই পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশ আগ্রহের স্থান নয়। তবে এই অবৈধ ব্যবসায় বাংলাদেশের ভুমিকা কতটুকু?
ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, সাউথ আফ্রিকা, ব্রাজিল, চীন, তাইওয়ান, লিথুনিয়া মূলত এই দেশগুলোই অঙ্গপ্রতিস্থাপনের ব্যবসায় জড়িত। ভারতের দরিদ্র জনগোষ্ঠির কাছে নিজের কিডনী পয়সার বিনিয়মে বেচে দেওয়াটা যৌতুক দেওয়ার একটা সহজ পন্থা। যৌতুককে যতই ঘৃন্য মনে হোক না কেনো, ভারতে এর ব্যপকতা দেখে বুঝতে পারি কন্যা দায় খুবই খারাপ একটা বিষয়। মানুষ নিজের শরীরের প্রত্যঙ্গ বেচে মেয়ের বিয়ের যৌতুক দিচ্ছে এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটাই আমার কাছে অসুস্থ মনে হয়।
একই অবস্থা পাকিস্তানে, সেখানে লাহোর, রওয়ালপিন্ডি আর কারাচিতে অবৈধ কিডনী ব্যবসা হচ্ছে। সেখানে মানুষ প্রতিষ্ঠার জন্য,, নতুন একটা ব্যবসা শুরু মূলধন হিসেবে নিজের কিডনী বেচে দিচ্ছে। আমাদের দারিদ্র আমাদের উপহাস করে, আমাদের মানবিকটা বোধকে আহত করে।
ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বস্তিতে ইসরাইলভিত্তিক এক কিডনী ক্রেতা প্রতিষ্ঠান সক্রিয় ছিলো। গত বছর তারা ধরা পরেছে, তবে আইনরক্ষাকারী বাহিনী যতই ঘোষণা করুক তারা এই অবৈধ চক্রের মূলোৎপাটন করতে পেরেছে, মূলত তারা কিডনীর দাম কমিয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে ৬০০০ ডলার পেতো কিডনি বিক্রেতা এখন সেই কিডনীর দাম হয়েছে ৩০০০ ডলার। আইনের গ্যাড়াকলে পড়বার ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে এর বেশী তারা দিতে পারছে না।
এইসব উন্নত দেশের স্বচ্ছল মানুষেরা দরিদ্র, উন্নয়নশীল দেশগুলো যাদের চকিৎসা ব্যবস্থার সুনাম আছে সেখানে গিয়ে এই অঙ্গ প্রতিস্থাপনের কাজটা করছে। বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার তেমন সুনাম নেই, এখানে হয়তো ডাক্তার কিডনী, কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করছেন সুনামের সাথে তবে যেখানে উন্নত বিশ্বেই ১০ শতাংশের বেশী মানুষ প্রতিস্থাপন জনিত জটিলতায় মৃত্যু বরণ করে সেখানে বাংলাদেশে প্রতিস্থাপনের ঝুঁকি নিবে কে?
মূলত নৈতিকতাবোধের কারণে এইসব অঙ্গ বেচাকেনা নিষিদ্ধ, অঙ্গ দান করার একটা দাবি আচে, শর্তহীন দান, যেখানে কোনো কিছুর বিনিময়মূল্য নেওয়া হবে না। তবে অব্যহত মূল্যস্ফ্রীতি, দারিদ্রদের কষাঘাত মানুষকে বাধ্য করতে এইসব অঙ্গ নিলামে তুলতে।
নতুন দাবি উঠছে, এই ব্যবসাকে বৈধ করবার। মানুষ এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে নিজের শরীরের সব কিছু সে পন্য হিসেবে তুলে ধরতে পারে এবং তাদের আগ্রহী ক্রেতাও পাওয়া যায়। যদি এটা বৈধ করা না হয় তবে যারা অঙ্গ দান করছেন তারা বেশী প্রতারিত হবেন। এবং প্রতারিত হচ্ছেন। সুতরাং দাতা কিংবা বিক্রেতাকে আজীবন সুবিধা দেওয়া, তার সন্তানদের উন্নত শিক্ষার সুবিধা দেওয়াসহ নানারকম পারিতোষিক দিয়ে হলেও এই ব্যবসা করতে বৈধ করার পক্ষে দাবী জানাচ্ছেন কেউ কেউ।
নৈতিকতার কারণে কেউ কেউ এর বিপক্ষে। তবে ব্যবসা নৈতিকতা মানে না, যারা বৈধ করবার পক্ষে তাদের যুক্তি এটাই। চাহিদাটা তৈরি করেছে আমাদের মূল্যবোধ, আমাদর নৈতিকতা, আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস। আমরা মৃত শরীর থেকে পর্যাপ্ত অঙ্গ পেতে পারতাম তবে তাদের কেউই এই কাজে আন্তরিক ভাবে আগ্রহী নয়।
সুতরাং বিকল্প হিসেবে জীবিত মানুষের অঙ্গ অবৈধ ভাবে কিনবার যে প্রবনতা শুরু হয়েছে সেটা আরও বাড়বে। প্রতি বছর প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গের জন্য নিজের নাম তালিকাবদ্ধ করছেন মানুষ, তাদের কেউ কেউ ৫ থেকে ১০ বছর অপেক্ষা করছেন কবে এ রকম একজন মানুষকে পাওয়া যাবে যার অঙ্গ তার সাথে ম্যাচ করবে।
অনেকে এই দীর্ঘসুত্রিতায় বিরক্ত হয়ে অন্য উপায় খুঁজছেন। কয়েক দিন আগে গ্রীসের ৩ জনকে অবৈধ অঙ্গ ব্যবসায় জড়িত থাকবার দায়ে গ্রেফতার করে রিমান্ড নিয়েছে সেখানকার পুলিশ।
কোথাও যখন জীবিত মানুষের অঙ্গ ক্রয়কে অবৈধ ঘোষণা করা হচ্ছে তখন মানুষের সাথে প্রতারণা করে তাকে হুমকি দিয়ে, তাকে হত্যা করে হলেও তার অঙ্গগুলো কিনে নিবে মানুষ,
একজন জাপানী এন্থ্রোপোলজিস্টের মন্তব্য মনে গাঁথবার মতোই।
আমরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এখন আর মানুষ দেখি না, তাদের সাম্ভাব্য যোগানদাতা হিসেবে কল্পনা করি, যার ভেতরে রয়েছে প্রতিষ্ঠাপনযোগ্য অঙ্গসম্ভার।
আশংকা একদিন এই ব্যবসার জন্য মানুষ মানুষকে হত্যা করতেও পিছ পা হবে না। মূলত একটা কিডনী প্রতিস্থাপনের জন্য একজন ক্রেতাকে ব্যয় করতে হয় ১ লক্ষ ইউরো কিংবা দেড় লক্ষ ডলার। যেই ব্যবসায় বছরে অন্তত ৬০০ কোটি ডলার হাত বদল হয় সেই ব্যবসাকে স্বীকার করে নেওয়া ভালো।
বাংলাদেশ এই ব্যবসার কোথায় অবস্থান করছে। বাংলাদেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য বিদেশীরা আসছেন, হতে পারে সীমিত আকারে আইনর চোখ ফাঁকি দিয়ে উন্নত বিদেশী মানের চিকিৎসা দেওয়া হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা অবৈধ ভাবে কিংবা নিজর গোচরেই এই ব্যবসা করছেন।
তবে এই দেশ এই সব অঙ্গের সরবরাহকারী। বাংলাদেশ সামাজিক মূল্যবোধের কারণে সেক্স ট্রাভেলারদের আকৃষ্ট করতে পারে নি, বাংলাদেশের নিজের দুর্বল চিকিৎসা সেবার জন্য অঙ্গপ্রতিস্থাপনে ব্যগ্র পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে নি। তবে উভয়ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ সরবরাহ করছে কাঁচামাল। এখান থেকে প্রতিবছর পাচার হচ্ছে ৪০ হাজার নারী যারা বিদেশের পতিতালয়ে বিক্রী হয়ে যাচ্ছে। এবং যেহেতু এখনও সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় নি তাই বলা যাচ্ছে না ব্ল্যাক মার্কেটে যত কিডনী আর কর্নিয়া পাওয়া যায় তার কত শতাংশের যোগান দেয় বাংলাদেশ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


