আমার বাংলা ছবি দেখতে খারাপ লাগে না। আবেগগুলো মোটা দাগের, স্পষ্ট বুঝা যায় ঘটনা কোন দিকে যাচ্ছে, পরবর্তী ঘটনাগুলোও অনুমাণ করা যায়।
বাংলা ছবির চিরায়ত ফর্মার একটা হলো, একজন ন্যায়নিষ্ট সৎ পুলিশ অফিসার সন্ত্রাসীর হাতে নিহত হলো, তার স্ত্রী দৌড়াচ্ছে কাঁদতে কাঁদতে, পরবর্তী দৃশ্যে সেই পুলিশ অফিসারের ছেলে, এতিম হয়ে যাওয়া ছেলেটা এঁটোকাঁটা খাচ্ছে,
পরিচালকের মর্জি হলে পুলিশ অফিসারের বৌ ধর্ষিতা হতে পারে, না ও হতে পারে, সেই স্ত্রী নিজে কোন এক সময় সেলাই মেশিন নিয়ে জীবনযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়বে, ছেলেটা লাথিগুঁতো খেয়ে এক সময় সন্ত্রাসী হবে।
বাংলা ছবির পুলিশেরা ক্যাবলাকান্ত, তারা দেখবে ৩০৩ হাতে, এক আদর্শবান সন্ত্রাসী কিংবা অপরাধী অপরাধ নির্মূল করতে সচেষ্ট। অন্য এক সৎ অফিসার তার এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে আইনতা বৈধ করবার একটা প্রচেষ্টা করবেন।
অনেক রকম ঘটনা ঘটবে, তবে বাংলা ছবির চিরায়ত ডায়লগ থাকবে একটা- তখন কোথায় ছিলো আইন, যখন আমার বাবা সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হলো, তখন কোথায় ছিলো আইন যখন আমার মা ধর্ষিত হলো, তখন কোথায় ছিলো আইন, যখন একটা এতিম ছেলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলো খেতে না পেয়ে।
দর্শকের চোখে পানি জমবে, দর্শক শার্টের হাতা এবং আঁচলের খুট দিয়ে চোখের পানি মুছে ভাববেন আসলেই ছেলেটার কিছুই করার ছিলো না, সেতো সমাজের জন্যই অপরাধী হয়েছে। একটা মমত্ববোধ জাগবে তার প্রতি।
আমাদের এই অহেতুক আবেগের উৎসরণ নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। ছবিতে যেসব মেলোড্রামাটিক চিত্রায়ন ঘটছে সেগুলোর বাস্তব প্রভাব গতকাল রাত থেকে ধারাবাহিক ভাবে দেখছি।
র্যাব হত্যাকারী, সে আইনী পরিস্থিতি উন্নতি করতে ১০০ খুন করলেও সেটা খুন। সে অপরাধ করলে সেটা অপরাধ। রাষ্ট্র কোনো বাংলা ছবি চিত্রায়নের পট নয়, এখানে আমার বাবা রাজনৈতিক কারণে নিষ্পেষিত হলেও সেটা অপরাধ এবং তার বিচার চাইতে হলেও আমাকে আইনের পথেই যেতে হবে।
আমার আবেগী মন হয়তো সামান্য বিভ্রান্ত হবে প্রচলিত বেআইনী অবস্থা দেখে, প্রতিকার না পেয়ে বাবার হতাশাও আমাকে আক্রান্ত করবে, তবে শেষ পর্যন্ত আমাকে নিজের প্ররোচনায় আইননিষ্ট থাকতে হবে।
একজন মানুষ যখন তার গায়ের জোর কিংবা অস্ত্রের জোর থাকে তখন সে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে কোনো ন্যায় বিচার করতে গিয়ে সেটা প্রচলিত আইনের পথে না করলে সেটা অন্যায়। যতই ন্যায় প্রতিষ্ঠা হোক না কেনো শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এটা অন্যায় বিবেচিত হবে।
যারা দুর্বল, যাদের তেমন ক্ষমতা নেই, তারা কুটিল পদ্ধতি অবলম্বন করবে, তারা বিভিন্ন ভাবে আইনকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করবে, যদি তার কখনও মনে হয় আসলে বর্তমান সমাজে ন্যায়নিষ্ঠতা মূল্যহীন সে অন্যায় পথে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলবে।
একজন সন্তান পিতা হত্যার বিচার পায় নি, সে বাবার শাসন পায় নি, সে অপরাধী হয়েছে, রাষ্ট্র তার বাবার বিচারের কোনো উদ্যোগ নেয় নি। সে অন্যায় করেছে, অপরাধ করেছে,
বাংলা ছবি হলে আবেগ দিয়ে বলা যায় না সে অপরাধী নয়, তাকে আইনের পথে মুক্তি দেওয়া হোক।
আমার ছোটো প্রশ্ন, এই অপরাধীর নাম তারেক জিয়া হলে আমাদের বিজ্ঞ আবেগী মানুষগুলো তার উপরে করা রাষ্ট্রীয় অবিচারের প্রতিক্রিয়ায় কি তাকে মুক্ত দেখতে চান?
স্বামীর হত্যার বিচার না পাওয়া খালেদার শাসনের প্রতি তাদের ক্ষোভ আছে, এই স্বামী হত্যার বিচার না পাওয়া মহিলা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল যদি না থাকেন, যেমনটা আপাতত ক্রস ফায়ারের সমর্থক সবাই, তার প্রতি সহমর্মিতা বোধ করবেন? তার শাসনামলে কৃত অপরাধগুলোর জন্য কোনো বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি, তার দলের ক্যাডার, আমার বন্ধু, এখন কোনো এক জেলা শহরের ম্যাজিস্ট্রেট। তার হাতে ন্যায় বিচারের ভার অর্পিত হয়েছে।
আমি এই প্রথাটাকে অন্যায় ভাবি,
বাবার হত্যার বিচার এবং জীবনের নিরাপত্তা না পাওয়া শেখ হাসিনার দুর্নীতি কিংবা তার দলীয় মানুষের দুর্নীতি এবং অপরাধ প্রবনতায় তার নিস্পৃহতাকেও আমার অপরাধ মনে হয়।
তবে র্যাবের ক্রস ফায়ারের সমর্থক মানুষেরা এটাকে কি বিবেচনায় দেখে? এরা অপরাধ করলে কি এদের অপরাধ স্খলন হয়ে যাওয়া উচিত।
এরা কেউই ন্যায় বিচার পায় নি। ন্যায় বিচার না পাওয়া কি তবে অপরাধের সমর্থক করে তুলে মানুষকে? তার সামাজিক অবস্থান যেখানেই হোক না কেনো, তার অপরাধ কি মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করা যায়? দায়স্খলন করা যায় তাদের?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



