আমাদের ভাবনাগুলো প্রতিদিন নির্মিত হয়, ভাবনার উপকরণ আসে অনেক উৎস থেকেই, তবে শেষ পর্যন্ত সংশ্লেষণ, যোজন, বিয়োজন আর গ্রহনের কাজটা আমরা আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকেই করে থাকি। ভাবনা উস্কে দেওয়ার বিষয়টা মূলত আমাদের পরিচিত তথ্যের উৎস থেকেই আসে। আমাদের প্রকাশিত তথ্যের উৎসের উপরে আমাদের নির্ভরশীলতা এবং আমাদের আওতায় থাকা তথ্যের উৎসগুলো থেকেই আমরা ভাবনা নির্মাণ করে একটা সমাধাণে পৌঁছাতে শিখি।
মূলত এখানেই মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি হয়। আমাদের সবারই সসীম তথ্যভান্ডার। আমাদের অনেক মানুষেরই অবারিত তথ্যের উৎস নেই, সবাই এখনও সমান ভাবে অন্তর্জালে প্রবেশাধিকার পায় নি। তাই তথ্যের উৎস এবং মানুষের ভাবনারব বিশাল একটা জগত অনেকের কাছেই অপরিচিত।
ভাবনা নির্মিত হওয়ার পরেই ভাবনার প্রকাশের দায়টা চলে আসে। আমাদের সাম্প্রতিক অনুভব আমরা প্রকাশ করতে চাই। অন্তত আমাদের ভাবনাগুলো বিনিময় করা, আরও নতুন ভাবনাকে আলিঙ্গন করতে চাওয়া এবং অনেকগুলো ভাবনার চত্ত্বরে গিয়ে আমাদের নিজস্ব ভাবনা কতটুকু শক্তিধারণ করে এটাও যাচাই করে নিতে চাই। এটাই আমাদের অস্তিত্বের প্রয়োজন। আমাদের অস্তিত্ব নিছক শরীরের কাঠামোর ভেতরে আটকে থাকে না। অনেক দিন ধরেই নেই আদতে।
মানুষ যে মুহূর্তে শব্দ দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে শিখলো, মানুষ যখনই ভাষার ব্যবহার শিখলো এবং একটা ভাষাকাঠামো কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠিতে প্রচলিত হলো, তখন থেকেই মানুষ ভাবনার বিনিময় করছে।
যুথবদ্ধতার প্রাথমিক পর্যায়ে আদতে তেমন বড় মাপের জনবসতির অস্তিত্ব ছিলো না। কিংবা গোত্রের আকৃতি বাড়তে পারে নি তেমন ভাবে, মুলত প্রকৃতির উপরে নির্ভরশীলতাই প্রতিটা গোত্রের আকার নির্ধারণে মূল ভুমিকা রাখতো। এই অনগ্রসর জনবসতিই শেষ পর্যন্ত প্রকৃতিকে আরও দক্ষ ভাবে ব্যবহার করতে শিখলো। তারা নিজস্ব অভিজ্ঞতা অর্জন করলো হয়তো অনেক ত্যাগের পরেই, তারা যুদ্ধের কলাকৌশল শিখলো, তারা অস্ত্রের ব্যবহার শিখলো, তারা ঔষধের ব্যবহার শিখলো, তার অপমৃত্যুকে রোধ করতে শিখলো, তারা স্থিতু হতে শিখলো।
সভ্যতা তৈরি হলো, তৈরি হলো মানুষের গোত্রভিত্তিক সংস্কৃতি। গোত্রভিত্তিক ভাষা, গোত্রভিত্তিক ভাবনা। অস্তিত্বের প্রয়োজনেই যখনই কোনো গোত্রের আকার বাড়তে থাকে, তখনই গোত্র আধিপত্যবাদী হয়ে উঠে। নিজস্ব ভুখন্ডে প্রাপ্ত সকল প্রাকৃতিক উপাদানেই তার একক কতৃত্ব ধরে রাখতে চায়।
তবে কাছাকাছি ভুখন্ডেও আরও অনেক মানুষের বসবাস, তারাও একই উদ্দেশ্যে নিজস্ব ভুখন্ড পর্যবেক্ষণ করে, নিজস্ব প্রাকৃতিক উৎস উল্টে-পাল্টে দেখে। এবং এভাবেই একটা লৌকিক সংস্কৃতি, একটা লৌকিক ভাষা জন্ম নেয়।
অন্তত সংস্কৃতি, কৃষ্টি এবং সামাজিক উৎসব ও সামাজিক ভাবনাগুলো জন্মের সরল রীতি অনেকটাই এমন। সাংস্কৃতিক বিনিময় না ঘটলে ভাষা সমৃদ্ধ হয় না কোনো সময়ই। এমন কি তেমন অভাব এবং প্রয়োজন না থাকলে মানুষের প্রাযুক্তিক দক্ষতা বাড়ে না। গত কয়েক দশকে পৃথিবীতে অনেক আদিম সভ্যতার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, বিশেষত দুর্গম এলাকাগুলোতে, যেখানে তথাকথিত নগরভিত্তিক সভ্যতার কারিগরেরা যোগাযোগের দুরাবস্থার কারণে পৌঁছাতে পারে নি।
পাশাপাশি থেকেই শুধুমাত্র যোগাযোগের অভাবেই এই গোত্রগুলোর সামগ্রীক ভাবনা এবং প্রাকৃতিক পরিবর্তন সম্পর্কে তাদের বিশ্লেষণ আমাদের উচ্চতর প্রাযুক্তিক সুবিধা এবং যন্ত্রব্যবহারকারী মানুষদের তুলনায় অনেক সরল। অনেক বেশী অধিভৌতিক। দৈত্যদানো অপশক্তি এবং শুভশক্তি অধ্যুষিত ভাবনার জগতকে বিজ্ঞানভিত্তিক ভাবনায় অভ্যস্ত আমার পশ্চাৎপদ বলে স্বীকার করে নিয়েছি। সুতরাং এই আদিম সভ্যতার তকমাটুকু আমরা শিক্ষিত কিংবা অপশিক্ষিত মানুষেরা তাদের গায়ে লাগিয়ে দিয়েছি কোম্পানীর লেবেলের মতো।
তাদের ভাবনার যৌক্তিকতা, সরলতা এবং সমস্যা সমাধানের তাদের পদ্ধতিগুলোকে আমরা অনেক সময়ই অবজ্ঞা করি আমাদের উচ্চমন্যতায়। প্রশ্ন হলো তথ্যের উৎসে তাদের প্রবেশাধিকার অনেক কম, কিন্তু প্রকৃতির অনুগত থেকেই বেঁচে থাকবার কৌশলে তারা আমাদের তুলনায় অনেক বেশী অগ্রসর। অন্তত প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে তাদের দক্ষতা আমাদের তুলনায় অনেক বেশী।
এই মানুষগুলোও অবসরে নিজেদের ভেতরে ভাবনার বিনিময় করে, এই মানুষগুলিই নিজস্ব অস্তিত্বের প্রয়োজনে প্রবীনদের কাছে গিয়ে সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে। তারাও ভাবনার বিনিময় করে। প্রবীন নিজস্ব জীবনের অভিজ্ঞতায় জেনে যায় গোত্রকে যুথবদ্ধ রাখতে গোত্রে কোন কোন ভাবনাকে অনুমোদন দিতে হয়, কোন কোন ভাবনার প্রচার ও প্রসারকে বাধা দিতে হয়।
সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সামাজিক উৎসব, এবং অনিশ্চয়তার সাথে লড়াই করবার অনুপ্রেরণা এবং প্রকৃতিকে ব্যখ্যা করবার নিজস্ব পদ্ধতি এইসব নিয়েই গোত্রভিত্তিক ধর্ম নির্মিত হয়। সামাজিক প্রয়োজনেই এইসব রীতি নির্ধারিত হয় এবং এই সম্পর্কিত ভাবনাগুলো লালিত-পালিত হয়। যদি ধর্মউদ্ভবের এই পর্যায়ে সেই গোত্র অন্য কোনো গোত্রের সাথে সাংস্কৃতিক বিনিময়ে লিপ্ত না হয় তবে ভাবনার বিকাশ সীমিতই থেকে যায়। ভাষার বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। এবং যেই মুহূর্তে কোনো একটি গোত্রের ভাষার বিকাশ স্তব্ধ হয়ে যায় সেই মূহুর্তেই গোত্রটি অন্যসব গোত্র থেকে পিছিয়ে পড়তে থাকে। যোগাযোগের সুযোগ এবং দক্ষতা অবশ্যই গোত্র কিংবা জনগোষ্ঠীর ভাবনার উন্নয়নে সহযোগিতাই করে।
ধরা যাক কোনো একটা জনগোষ্ঠিতে এই প্রবণতাগুকু নেই, এমন একটা ভাবনাকাঠামোকে তারা আঁকড়ে ধরে আছে যেখানে নতুন কোনো ভাবনা প্রবেশের সুযোগ নেই, এমন কি নতুন কোনো প্রশ্নউত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। সেই সভ্যতা ক্রমশ অনগ্রসর হতে থাকবে। হয়তো তাদের ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা প্রবাদপ্রতীম হয়ে যাবে, বিন্যাস, সমাবেশে ভাষাকে যতভাবে অলংকৃত করা সম্ভব সবটুকুই করা সম্ভব হবে, তবে ভাবনাগুলো মোটামুটি মোটা দাগে একই রকমই রয়ে যাবে।
ব্রাজিলের আমাজানের গহীন জঙ্গলে তেল গ্যাসের অনুসন্ধানের সময় এমন অনেক সভ্যতার চিহ্ন আবিস্কৃত হয়েছে যা দিয়ে অনুমাণ করা হচ্ছে সেখানেও একটা সময় উন্নত একটা সভ্যতা বিকশিত হয়েছিলো, তবে সেই সভ্যতা কোথায় উবে গেলো এই বিষয়ে কোনো গ্রহনযোগ্য অনুমাণ এখনও করে উঠতে পারে নি পুরাতাত্ত্বিকেরা। বরং তার আশেপাশে বসবাসরত অন্যসব আদিবাসী গোত্র এই সভ্যতার অস্তিত্বের কিছুই জানে না। সেখানের একটি জনগোষ্ঠিতে কিংবা বলা ভালো একটা গোত্র-গ্রামভিত্তিক সভ্যতার একটা প্রতিরূপ, প্রচলিত ধর্মবোধে নির্ধারিত হয়েছে তারা একদা পাখী ছিলো, পাখি ছিলো তাদের আদিম পূর্বপুরুষ। তারা এই পাখী থেকে কিভাবে মানুষ হলো এইবিষয়েও তাদের নিশ্চিত অনুমাণ আছে, তারা পাখীর ডিম ফুটে বের হয়েছে। তবে কখনই এই প্রশ্ন তাদের আক্রান্ত করে না, কেনো পাখী থেকে জন্ম নিয়েও তাদের এবং পৌরাণিক পাখীর শরীর কাঠামোতে এত বিশাল পার্থক্য।
তাদের একটি সামাজিক রীতি হলো প্রতি পূর্ণিমায় তারা সংঘবদ্ধ যৌনতার চর্চা করে, এই বিষয়ে সেই গ্রামের পুরোহিতে ভাবনা হলো, একসাথে থাকবার সময়ে আমাদের ছেলেদের অনেক মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়, তেমন ভাবেই অনেক মেয়েরও অনেক ছেলের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। তবে আমাদের সামাজিক রীতিতে বিবাহ এবং একত্রবাসের রীতি রয়েছে। এবং আমরা কোনো রকম শঠতাকে প্রশ্রয় দেই না।
এই পূর্ণিমা উৎসবে সেইসব ছেলে মেয়েদের নিজস্ব চাওয়া পুরণ হয়, এটা সবাই মেনে নিয়েছে। সবাই খুশী। এমন একটা দিনে কোনো ছেলে কোনো মেয়েকে কামনা করলে সেই কামনায় সাড়া দিতে সেই মেয়ে বাধ্য। তেমন ভাবে কোনো মেয়ে যদি কোনো ছেলেকে কামনা করে সেটা সম্মান করতে বাধ্য সেই ছেলে। সুতরাং আমাদের গ্রামে কোনো মেয়েবিষয়ক হানাহানি নেই।
সবাই এতদিন মেনে নিয়েছিলো এটাকে সামাজিক রীতি হিসেবেই। তবে সেটা যে সবাই মানতে বাধ্য হয়েছিলো এটাও প্রকাশিত হয় যখন সেখানে মিশনারী উপস্থিত হলো। মিশনারীরা গিয়ে তাদের সভ্যতার রীতিগুলো অনুশীলন করতে শেখালো। তারা এখন কাপড় পরে, মিশনারী স্কুলে গিয়ে ইংরেজি পড়ে, চা কফি খেতে শিখেছে তারা। এবং একই সাথে তারা রোমান্টিক হয়ে উঠটে শিখেছে। হয়তো এই রোমান্টিক হয়ে উঠবার প্রবনতা তাদের রক্তে ছিলোই তবে এটা প্রকাশের কোনো ভাষা এতদিন তাদের ছিলো না।
সুতরাং নতুন ভাবনার সাথে প্রচলিত প্রথার সংঘর্ষে একজন হঠাৎ করেই অনুভব করলো সে তার স্ত্রীর একক কতৃত্ব চায়, অন্য কেউ তাকে স্পর্শ্ব করলে কিংবা কামনা করলেও সে আক্রান্ত বোধ করে। সুতরাং সে সামাজিক রীতি অনুসরণ করে এখনও পূর্ণিমা উৎসব করলেও সেটাকে সে নিজের বিবেচনায় গ্রহনযোগ্য মনে করছে না।
আদিম সমাজ হয়তো আধুনিক ধারণায় ঋদ্ধ নয়, তবে তাদের অস্তিত্বের উৎস এবং পরিণতি সম্পর্কে তাদের একটা ধারণা আছে। তাদের জন্মের কার্যকরণ, তাদের জীবনের অবসানের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে এইসব ধারণা তাদের কাছে স্পষ্ট।
যদিও আধুনিক সভ্যতার সংস্পর্শ্বে আসবার পরে তাদের এই ভাবনাগুলো বদলে যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ভাবনার সংকট উপলব্ধি করছে তারা, একই সাথে তাদের জীবনের অংশ হয়ে যাচ্ছে আধুনিকতার হতাশা। এমন এক পরিস্থিতি যেখানে নিজস্ব অস্তিত্বের উদ্দেশ্য এবং চুড়ান্ত পরিণতির কোনো স্থির চিত্রকল্প নেই।
মূলত সাংস্কৃতিক বিনিময়ে এইসব ভাবনার স্ফুরণ ও বিকাশ হলেও চুড়ান্ত পরিণতিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত এইসব হতাশার খাদ পেরিয়ে আসবার যোগ্যতা তাদের হবে না। নতুন এইসব ভাবনা শুধুমাত্র মানুষকে নিজস্ব অস্তিত্বের অসারতার সাথে পরিচিত করে, এমন কি কোন সংস্কৃতির সাথে ভাব বিনিময় ঘটছে, সেইসব সংস্কৃতি নিজেদের ব্যধিগুলো কতটা দক্ষতার সাথে চিহ্নিত করতে পেরেছে এবং এইসব ব্যধি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে শিখেছে, এইসব অসংখ্য অনির্ধারিত এবং সততঃপরিবর্তনশীল অনুভবের সাথেই তাদের সীমিত ভাবনা যোগ্যতা নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে। পরিণতি ভয়াবহ, তারা নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলছে, তারা নিজেদের ভাষা হারিয়ে ফেলছে এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এবং ভাষা ও ভাবনাবৈচিত্রের এই সভ্য- অসভ্য জগত মূলত সামগ্রীক ভাবেই একটা গোলমেলে অবস্থা তৈরি করে অনির্ধারিত কোনো গন্তব্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে।
যেই গন্তব্যের শেষে আমাদের অস্তিত্বের উত্তরণ ঘটবে না কি আমাদের সামগ্রীক পতন ঘটবে সেটা আমাদের জানা নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


