somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গোরস্থান বিষয়ে উন্নাসিকতা- অশুভ শক্তিরা ঐক্যবদ্ধ হোন

১০ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১০:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অথৈ বন্যা, শেষকৃত্য করবার জমি নেই। স্বজনেরা লাশা ভাসিয়ে দিয়েছেন ভেলায়। ভেলা স্রোতের টানে ভাটিতে যায়। অথৈ বন্যার জলে ভাসতে ভাসতে কোথাও হয়তো শুকনো ডাঙা পায়। সমব্যথী মানুষের বদান্যতায় শেষকৃত্য সম্পাদিত হয়।

বেওয়ারিশ লাশগুলোও এমন ভাবেই শেষকৃত্যের অপেক্ষা করে। হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকে বেওয়ারিশ মানুষ। বেওয়ারিশ লাশ এমন সব মানুষের যাদের হয়তো স্বজন রয়েছে তবে স্বজনেরা এখনও অবগত নয় তাদের পরিচিত মানুষটা অন্য কোনো অপরিচিত শহরের হাসপাতালের মর্গে মৃত।

গোর দেওয়ার মাটি নেই, দাহ করবার শুকনো ডাঙা নেই, শ্মশান কিংবা গোরস্থান, কোথাও জায়গা খালি নেই। মানুষ অনেক ভাবেই অসহায় হয়ে যায়। লাশ শকুনে কুকুরে টেনে ছিড়ছে, ক্ষত-বিক্ষত লাশ ছড়িয়ে আছে মাঠে, উদ্যমী মানুষেরা আলাদা করে লাশের ধর্ম পরিচয় যাচাই না করেই দলা পাকিয়ে মাটির গর্তে পুঁতে রাখছে জানাযা করে। প্রাকৃতিক মহাদুর্যোগ এবং মানুষের তৈরি দুর্যোগে এমন দৃশ্য সব সময়ই চোখে পড়ে।

এমন সব লাশই গোর পায় না, সব লাশই দাহ হয় না, তবে হাসপাতালের মর্গ থেকে নিয়মিতই লাশ এনে গোর দেয় আঞ্জুমাল মফিদুল ইসলাম নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। তাদের এই মানবিক উদ্যোগ আমার কাছে সব সময়ই প্রসংশনীয় মনে হয়েছে।

সম্প্রতি দীপংকর নামক একজন ব্লগার শুভ শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। জানিয়ে বলেছেন, বুদ্ধিজীবি গোরস্তানের একটা অংশ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামকে প্রদান করা হয়েছে বেওয়ারিশ লাশ দাফন করবার জন্য। এটা তার কাছে আপত্তিকর মনে হয়েছে, বেওয়ারিশ লাশ মানেই যার কাছে রাস্তায় মরে পড়ে থাকা নেশাখোর, তার এই মানসিক বৈকল্য নিয়ে আঞজুমান মফিদুল ইসলামের স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমটির প্রয়োজনীয়তা অনুভুত হবে না। আমাদের নোবেল জয়ী ইউনুস যখন বলেন ঋণ মানুষের মানবাধিকার এবং ঋণ গ্রহন করে খুন হয়ে যাওয়ার এই মানবাধিকারের পক্ষে আমি নই, তবে সামাজিক কারণে, মানবিক কারণে আমি অনুভব করি প্রতিটা মানুষেরই স্বসম্মানে সমাহিত হওয়ার অধিকার আছে। জীবিত অবস্থায় তার ধর্মপরিচয় কি ছিলো, সে আদৌ কোনো মসজিদের চত্ত্বরে কপাল ঠুকেছিলো কি না, কিংবা কোনো মন্দিরে গিয়ে কোনো প্রতিমাকে পূজা করেছিলো কি না, কিংবা কোনো গীর্জা বা প্যাগোডায় গিয়ে তার নিজস্ব ধর্মের ইশ্বরে প্রণত হয়েছিলো কি না এইসব প্রশ্ন অবান্তর।
তাদের সমাহিত করবার উদ্যোগটির জন্য পর্যাপ্ত জমি নেই। বনানী গোরস্তান কিংবা আজিমপুর গোরস্তান কিংবা পোস্তগোলা, জুরাইন গোরস্তানে অনেককেই দাফন করেছে আঞ্জুমান মফিদুক ইসলাম। তবে সেসব স্থানে এখন প্রচন্ড স্থান সংকট। ঢাকা শহর আকারে আয়তনে বেড়েছে অনেকগুন, জনসংখ্যা বেড়েছে , বাংলাদেশের মৃত্যুর হার বিবেচনা করলে গোরখোদক আর শ্মশানের ডোমদের ব্যস্ততা অনেক ঢাকা শহরে। খালি জায়গা কোথায়, যেখানে আসলেই আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম নিজেদের সংগ্রহকৃত বেওয়ারিশ লাশ দাফন করতে পারে?

অনেক রকম বৈষম্যের সামাজিক স্বীকৃতি দিয়েছি আমরা। অনেক মানুষকে বিশিষ্ট করেছি, তাদের কথিত অবদানের জন্য। তবে তাদের অবদান সব সময়ই সমাজের জন্য উপকারি হয়েছে এমনও না। রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি করা কিংবা রাজনৈতিক দলের প্রপাগান্ডাকে সুন্দর বাক্যে প্রকাশ করে অনুগত সুবিধাভোগী শিক্ষিত কলমবাজ মানুষদের বাংলাদেশে সম্মান করে বুদ্ধিজীবি তকমা এঁটে দেওয়া হয়।

আকাশ সংস্কৃতির যুগে যখন প্রতিটা চ্যানেলেই রাষ্ট্র ও সমাজ বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য ভাড়াটে মানুষদের প্রয়োজন হয় তখন এই বুদ্ধিজীবিরাই এগিয়ে এসে অনেক কথা বলে ফেলেন। অনেক কথাই তার বিশ্বাস করেন না, অনেক কথাই কোনো না কোনো বাণিকগোষ্ঠির স্বার্থ সংরক্ষণ করে দেওয়া।
এইসব সুবিধালোভী এবং সুবিধাভোগী মানুষদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্মান দেখিয়ে আমজনতা থেকে আলাদা করে বিবেচনা করবার প্রবণতা রয়েছে।

এই সামাজিক বৈষম্য আমরা আনন্দে প্রতিপালন করি। তাদের মৃত্যুর পরে আলাদা একটা স্থান নিয়ে গিয়ে দাফন করি। তাদের স্মারকসম্বলিত এপিটাফ রয়ে যায়। ভক্তদের পূজা-অর্চনার সুবিধার্থে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে সস্তা পণ্য হলো বিশেষণ। নিয়মিতই অনেক বিশেষণ আর তকমা জুটে যায় জীবিত মানুষের। তাদের মৃত্যুর পরে আরও আরও বিশেষণ জন্ম নিতে থাকে, প্রতিবার স্মরণ সভায় আরও অন্য সব সুবিধাভোগীরা বিশেষণের আবর্জনায় ঢেকে ফেলেন মৃতকে।

বাংলাদেশে প্রকৃত মানুষেরা সব সময়ই উপেক্ষিত না হলেও অধিকাংশ সময়ই উপেক্ষিত । তবে অনেক খুনীই রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছে, অনেক খুনীই বিশ্বনন্দিত হয়েছে। তাদের অনেকেই বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবি এবং সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষতিসাধনের ক্ষমতা বিবেচনা করলে তাদের অনেককেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য অতীব ক্ষতিকারক চিহ্নিত করা যেতো।

সম্মানিত এবং ভবিষ্যতে বুদ্ধিজীবি হওয়ার সম্ভবনা আছে এমন সব মানুষদের অবশ্য বেওয়ারিশ মানুষদের পাশে সমাহিত হওয়ার বিষয়ে ব্যপক আপত্তি চোখে পড়ছে। সামাজিক ঘৃণার প্রকাশ এমনভাবে হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিলো না, তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতিই এমন। যে যত বেশী মানুষ নিগ্রহ করতে পারবে সে ততবেশী মানবহিতৈষি। সে ততবেশী দেশপ্রেমিক ও ততবেশী গ্রহনযোগ্য নেতা।

বিত্তপ্রদর্শনের অসুস্থ নেশায় মগ্ন মানুষেরা এবং তাদের স্তুতি করে যাওয়া পোষা বুদ্ধিজীবিরা হয়তো অনুমান করতে পারবেন না, তাদের দামি ২টা মোবাইল সেট, কথা বলবার হাজার সীম এবং বছর বছর ফয়াশন বদলে গেলে নতুন সেট নেওয়ার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের নেই। যদিও বাংলাদেশে এখন প্রায় ৪ কোটি মোবাইল সীম বিদ্যমান তবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই নিজস্ব মোবাইল ছাড়াই জীবন যাপন করে।

এদের নিজস্ব যোগাযোগ মাধ্যম চিঠি আর মানিওর্ডারের পেছনে লিখে দেওয়া টুকরো বাক্য। এভাবেই এরা সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করে প্রিয়জনের সাথে। এইসব মানুষের অনেকরই ঢাকা শহরে নিজস্ব আবাস নেই। বস্তিতে কোন মতে দিন কাটিয়ে প্রতিদিন ভোরেই জীবনের সংগ্রামে নেমে যায় রাস্তায়। তাদের সাকিন নেই, স্থায়ী বাসস্থানের ঠিকানা পকেটে নিয়ে ঘুরবার মতো বাস্তববুদ্ধিও এইসব মানুষের নেই। তারা পকেটে যদি নিদেনপক্ষে একটা চিরকুট লিখে রাখতো তাদের মৃত্যুর পরে কার কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে তবে অনেকটা সুবিধা হতো।

তবে তাদের এই অক্ষমতার কারণেই অনেক মৃত মানুষের বিশাল পরিবার থাকলেও তারা রাস্তায় বিভিন্ন অঘটনে মৃত পড়ে থাকলেও তাদের লাশের দাবিদার কেউ থাকে না। হাসপাতালের মর্গের ধারণক্ষমতা সীমিত। তারাই খবর দেয় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামকে, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের লাশবাহী গাড়ী আসে, তারাই লাশ তুলে দাফন করে দেয় ধর্ম পরিচয় বিবেচনা না করেই।

তবে বুদ্ধিজীবিদের জন্য নির্ধারিত গোরস্থানে তাদের মৃতকে দাফন করবার ভুখন্ড দেওয়ায় আমি আনন্দিত। যদি কেউ এটাকে আপত্তিকর মনে করে তবে তার মানসিক বৈকল্যের চিকিৎসা প্রয়োজন। সামাজিক ঘৃণা প্রদর্শন এবং সামাজিক সুবিধাগ্রহনে সিদ্ধহস্ত এইসব পাষন্ড অমানুষকে বুদ্ধিজীবি কিংবা হটে পার বুদ্ধিজীবি বিবেচনা করলে আমার নিজস্ব অভিমত হবে সমাজের জন্য ক্ষতিকারখ এইসব বুদ্ধিজীবি নামক প্রজাতিকে আলাদা কোনো স্থানে নিয়ে গিয়ে উন্মুক্ত ফেলে রাখা, জীবিত অবস্থায় এরা মানুষের উপকারে আসে নি, মৃত অবস্থায় যদি শেয়াল-কুকুর শকুনের কোনো উপকারে আসে।
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×