পরিস্থিতি গতবারের তুলনায় ভালো, হঠাৎ করেই চালের দাম কমছে, তেলের দাম কমছে, আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা হস্তান্তরের আগেই বাজারে সীমিত পর্যায়ে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলেও, মোটেও উপরে বাজার দর বিবেচনায় পরিস্থিতি ডিসেম্বর ২০০৮ এর তুলনায় ভালো।
বাজার দরের আকস্মিক পতন দেখে মনে হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলেই ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রন করতে ব্যর্থ হয়েছিলো, বিশেষত ১১ই জানুয়ারী ২০০৭ এর পরে যখন এই সদ্য বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাগ্রহন করলো, তখন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ,কিংবা মজুতদারীর বিরুদ্ধে চালানো অভিযান, এরপর নতজানু হয়ে ব্যবসায়ীদের কতৃত্ব মেনে নেওয়া, এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিতেই ব্যবসায়ীদের স্বেচ্ছাচারিতার উস্কানি ছিলো।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে, বিশ্বব্যপী মন্দা দেখা দিয়েছে, তবে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বাজারে এটার প্রভাব পড়ে নি। বিশ্বব্যাপী জ্বালানী তেলের মূল্য প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কমেছে, তবে দেশের জ্বালানী তেলের মূল্যে এটার প্রভাব পড়ে নি।
ভোজ্য তেলের দাম কমে অর্ধেক হয়েছে, সেটাও ৪ মাস আগের ঘটনা, কিন্তু দেশের বাজারে কেনো ভোজ্য তেলের দাম ছয় ভাগের এক ভাগও কমলো না গত ৪ মাসে? ব্যবসায়ীদের উত্তর, এই তেল উচ্চমূল্যে কেনা হয়েছিলো, তাই তারা চেষ্টা করলেও দাম কমাতে পারবে না। তবে ৪ মাস আগে কেনা তেল বন্দর থেকে খালাস হয়ে বাজারে এসে, মানুষের কড়াইয়ে উঠেছে, দেশের দৈনিক চাহিদা বিবেচনা করে চট্টগ্রাম বন্দরে কবে কোন চালান খালাস হলো এটা দেখে এই সংবাদ জানা যেতো। কিন্তু বাজার তদারকি ব্যবস্থা উন্নত না হলে এটা সম্ভব হবে না।
নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার এক সপ্তাহের ভেতরেই লিটার প্রতি তেলের দাম কমেছে ২০ টাকা। এখনও আন্তর্জাতিক বাজার বিবেচনা করলে এই ভোজ্য তেলের দাম অন্তত লিটার প্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশী। যদি পরিবহন খরচ, প্যাকেটজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাত করণের খরচও আমরা লিটার প্রতি ১০ টাকা ধরে নেই, এরপরও আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বাজারে ভোজ্য তেলের দাম প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশী।
সব কিছু বিবেচনা করলে এখন বাজারে এক লিটার সয়াবীন তেলের দাম হওয়া উচিত লিটার প্রতি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, কোনো ভাবেই সেটা ৯০ টাকার আশে পাশে থাকা উচিত না।
গতকাল এক মুচির সাথে কথা হলো, ব্যস্ত এবং ভ্রাম্যমান মুচি। বয়েস খুব বেশী হলে ২০। ভ্যানে করে চাল বিক্রী হচ্ছে, প্রতি কেজি ২৭ টাকা, তবে তার দাবি এই দাম আসলে ২৫ টাকা হওয়া উচিত। আওয়ামী লীগ তো আমাদের সরকার। গরীবের দুঃখ বুঝে।
দেশের সবাই বিগত দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এটা উপলব্ধি করেছে তাদের সুশাসন কিংবা স্বচ্ছতা কিংবা জবাবদিহিতার চেয়ে বেশী প্রয়োজন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম হাতের নাগালে থাকা। মুদ্রাস্ফ্রীতি, আন্তর্জাতিক বাজার, দুর্নীতি কিংবা লবিং গ্রুপের প্রভাব, এইসব উচ্চমধ্যবিত্ত শিক্ষিত মানুষের বাগবিধি বুঝে না তারা। তারা নিজের রসুইয়ে কড়াই উনানে আহার্যের কদর বুঝে।
আচ্ছা আমরা যারা জয় বাংলা, আওয়ামী লীগকে সমর্থন করি তারা এখন ভালো থাকবো?
আমার কাছে এই প্রশ্নের উত্তর নেই কোনো। নির্বাচনের আগে আগে ধোলাই খালের এক রিকশাওয়ালার সাথে কথা হচ্ছিলো, অবশ্যই খেটে খাওয়া মানুষের মতোই সেও রাজনীতি সচেতন।
দেশের বাসা কোথায়?
আমার দেশের বাসা শরীয়তপুর-
ঐখান থেকে কে দাঁড়াইছে?
আওরঙ্গ
ভোট কোথায় দিবেন?
ঢাকায় থাকবো, লালবাগে ভোট দিতে যাবো।
সঙ্গী বললো, শরীয়তপুরে কি আওয়ামী লীগ যাবে না বিএনপি?
বিএনপি হারবে না, বিএনপি মানুষের জন্য কাজ করে।
রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের এই বিশ্বাস সব সময়ের জন্যই, রাজনৈতিক দলের মানুষেরা তাদের জন্য কাজ করে। তার অনুমান ছিলো, ঢাকায় অন্তত ৩ টি আসনে, যেখানে রিকশাচালকেরাই সংখ্যাগরিষ্ট ভোটার, সেখানে বিএনপি জিতবে।
তার পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক, কিন্তু একমাত্র সেই বিএনপির কট্টর সমর্থক। আমাকে বললো , জানেন আমি কেনো বিএনপিকে সমর্থন করি? এইটারও একটা ইতিহাস আছে।
আমি তখন ধোলাইখালে নতুন আসছি, কাউকে চিনি না, গ্যারেজে রিকশা রাখতে পারি না, রাস্তায় রিকশার উপরে ঘুমায় আছি। হঠাৎ মাঝ রাইতে ধুমধাম মারতেছে। আমি এত কইরা কইলাম আমি কাউরে চিনি না। কিন্তু সেই কথা শুনলো না কেউ। ওরা আওয়ামি লীগের ক্যাডার আছিলো। আমার শরীরে এখনও সেই দাগ রইয়া গেছে।
নিজের জমানো টাকায় চিকিৎসা করে ভালো হইছি, কোনো আওয়ামী লীগের নেতা আইসা আমার চিকিৎসার টাকা দেয় নাই। আমার কি দোষ আছিলো বলেন?
প্রথম বার ক্ষমতায় আসবার পরে আওয়ামী লীগ যে ভুলগুলো করেছিলো, যেভাবে স্বেচ্ছাচারিতার নিমগ্ন ছিলো, এটা তার সামান্য একটা উদাহরণ হয়তো। এমন অনেক আওয়ামী লীগের নিরব সমর্থক অত্যাচারিত হয়েই ঘৃণার কারণেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে ২০০১ এর নির্বাচনে।
রিকশাওয়ালার বক্তব্য- এখন আমি রাজনীতি করি না, কে খাড়াইলো, কে খাড়াইলো না এইটা দিয়া আমার কি? বিয়া করছি, তিনটা ছেলে মেয়ে হইছে, তাদের আর নিজের পেটের রাজনীতি করি এখন।
শেষ পর্যন্ত আমাদের সকল অনুভবই উদরগামী। উদরেই যাবতীয় বিদ্রোহ আর বিপ্লবের জন্ম হয়। তিন ছেলে মেয়ের শিক্ষা আর চিকিৎসার জন্য সরকারী হাসপাতালের উপরে নির্ভরশীল না হয়ে উপায় নেই শ্রমজীবি মানুষের। যদি আওয়ামী লীগ এই নির্ভরশীলতার উপযুক্ত প্রতিদান না দিতে পারে, তবে আওয়ামী লীগ পরবর্তী নির্বাচনে জিততে পারবে না।
যদি আওয়ামী লীগে এই বার ক্ষমতায় আসে পুর্বের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সামান্য হলেও নিজেদের ক্ষমতার চর্চা এবং চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে, যদি দ্রব্যমূল্যকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারে, তবে কোনো একদিন শরীরের ক্ষতের দাগ ভুলে এই রিকশাওয়ালাই নৌকায় ভোট দিবে।
পরিস্থিতি যেমন দেখা যাচ্ছে তাতে এই বিষয়ে সামান্য সংশয়ী আমি। নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় এখহন পর্যন্ত ৭টা মানুষ খুন হয়েছে, আহত হয়েছে প্রায় ৫০ জন। সন্ত্রাসীরা ফিরে আসছে লোকালয়ে, আত্মগোপন করে থাকা সন্ত্রাসী, গত ২ বছর বিদেশে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসী, সবাই দেশে ফিরছে। এদের নিয়ন্ত্রন করা, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা অপরাধের পৃষ্ঠপোষকদের নিয়ন্ত্রন কিংবা নির্মূল করার দক্ষতার উপরেই নির্ভর করবে বর্তমানের অধিকতর অযোগ্য প্রার্থীকে বর্জনের প্রক্রিয়া থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি কতটুকু যোগ্য মানুষকে বাছাই করে নেওয়ার গণতন্ত্রে পরিণত হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


