somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অভিনন্দন মইন উ আহমেদ

০৭ ই মার্চ, ২০০৯ রাত ১২:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আতংক মানুষকে স্তম্ভিত করে ফেলে, চোখের সামনে অবশ্যসম্ভাবী মৃত্যু, প্রতিমুহূর্তে বেঁচে থাকবার জান্তব তাড়না এবং মৃত্যুদুতের সাথে লুকোচুরি, উদ্যত খড়্গ কিংবা রাইফেল হাতে মানুষ ছুটছে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য, মরিয়া এবং নৃশংস, ভেতরে ভীতি এবং জিঘাংসা, এবং অন্যপক্ষ নেহায়েত সাধারণ মানুষ, যাদের নৃশংসতা দেখবার অভিজ্ঞতা নেই, যারা ক্যামোফ্লেজ জানে না, তবুও পালিয়ে বাঁচতে চায়।

মানুষ এইসব জিঘাংসু মানুষের সামনে থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়, এবং প্রত্যেকের নিজস্ব মানসিক গড়ন এবং তার বেড়ে উঠবার ধরণ নির্ধারণ করে দেয় ঠিক কতটা সময় এই আতংক সহ্য করে স্বাভাবিক থাকতে পারবে।

হঠাৎ করেই সকাল নয়টা কিংবা সাড়ে নয়টায় দরবার হলে আক্রমণের প্রথম ধাক্কায় নিহত মানুষদের সেখানে রেখেই বিডিআর সদস্যরা অফিসারদের বাসার দিকে ছুটে যায়, তখনও সবাই ঘটনার চমক কাটাতে পারে নি, তখনও তাদের স্বাভাবিক বোধ জাগ্রত হয় নি, তবে যারা আক্রমণ করেছিলো, তাদের সবারই জানা ছিলো, তাদের লক্ষ্য কারা,

একজন মেজরের স্ত্রী তখন সুইমিং পুলের সামনে, সেখানে অবস্থানরত একজন বিডিআর জাওয়ান তাকে নিয়ে লুকিয়ে রাখেন সুইমিং পুলের ভেতরে, পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার আগে তাকে বের না হওয়ার অনুরোধ করে যান, সেখানে তাকে থাকতে হয়েছিলো দীর্ঘ ২৪ ঘন্টা, কিছু কম কিংবা বেশী হতে পারে। যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যুদুত হানা দিতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে সময়ের হিসেব রাখা সম্ভব না।

অবশ্য মায়ের কিছুই করার ছিলো না তখন, বাসায় তার ছেলে একা, ছেলেকে সাবধান করবার কোনো সুযোগ সে মুহূর্তে ছিলো না, বিডিআর জাওয়ানদের কয়েকজন সেখানে গিয়ে গুলিবর্ষণ করলো। ছেলেটা নিজেকে বাঁচাতে লুকিয়ে ছিলো বিছানার নীচে। সেখানেই লুকিয়ে ছিলো সকাল থেকে সন্ধ্যা। পরে রাতের অন্ধকারে ফ্রিজ থেকে কিছু খেয়ে আবারও সেই বিছানার নীচে গিয়ে লুকিয়ে থাকা,

পরদিন সকালে পরিস্থিতি অনুকূলে আসলে ছেলেকে নিয়ে মা বাইরে চলে আসলেন, তার আগেই তিনি জানেন তার স্বামী দরবার হলেই নিহত হয়েছে।

বাস্তবতা এমনই, যারা আক্রান্ত হয়েছিলো, বিডিআর সাধারণ জাওয়ান, যারা এই নৃশংসতার পক্ষে ছিলো না, এবং একেবারে গৃহিনী এবং শিশু, যাদের এসবের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিলো না, কিংবা এসবের জন্য যারা অপ্রস্তুত ছিলো, তাদের সবাই কম বেশী মানসিক পীড়ণের ভেতর দিয়ে গিয়েছে।

বয়সজনিত কারণেই হয়তো সামলে নিয়েছেন গৃহিনী, তবে ছেলেটা এখনও তীব্র আতংক কাটিয়ে উঠতে পারে নি। তারা নিজেদের এক আত্মীয় বাসাতে আছেন, তবে যেকোনো শব্দেই এখন ছেলেটা খাটের নীচে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে, একটু জোরে দরজা বন্ধ করলেই তীব্র আতংকে নীল হয়ে যায়-

এই দৃশ্যটা হয়তো এই শিশুর প্রাপ্য ছিলো না, তার নিশ্চিত জীবনে এই ছন্দপতন হয়তো আকাংক্ষিত কোনো দৃশ্য নয়, তবে বাস্তবতা হলো, ষড়যন্ত্র হোক কিংবা না হোক, পিলখানায় ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রভাবে অনেকের মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে।

যারা সেখানে উপস্থিত ছিলো তাদের মানসিক পীড়ণ এবং প্রতিহিংসাপরায়নতা, তাদের ভীতি এবং মরিয়া হয়ে উঠবার দৃশ্যের সাথে বাইরে সারি সারি ট্যাংক আর অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত সাধারণ সেনা ও সামরিক কর্মকর্তাদের দৃশ্যের আকাশ পাতাল তফাত।

হয়তো ব্যক্তিগত পরিচয়, একই প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রশিক্ষণ নেওয়ার স্মৃতির বাইরে নিজেদের উচ্চমন্যতা এবং অহমিকায় আঘাত সব মিলিয়ে বিক্ষুব্ধ একটা সময় পার করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

দায়িত্ব পালন করলেও কাউকে ধন্যবাদ জানিয়ে খাটো করবার বাঙ্গালী রীতি নেই, তবে সম্পূর্ণ ঘটনায় নির্বিকার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমি মইন উ আহমেদকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, এই সম্পূর্ণ সময়টাতে তার বিবেচক আচরণের জন্য তার প্রাপ্য সম্মান তাকে দিতেই হবে। তিনি নিজের দায়িত্ব খুব সুচারু ভাবে পালন করেছেন, এবং প্রাথমিক ঝঞ্ঝার সবটুকু তার নিজের শরীরে নিয়েছেন, সামনে দাঁড়িয়ে সমস্ত বিক্ষোভকে যতটা সম্ভব মৃদু করতে সক্ষম হয়েছেন।

আমি হয়তো তার সাথে পরিচিত হবো না কখনও তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিকদের অন্তত তার সাথে সাক্ষাত করে সামান্য কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত। বলা উচিত, জেনারেল ইউ হ্যাভ ডান এ গ্রেট জব।

এর পরবর্তী আচরণ কিংবা সেনাবাহিনী যখন শেখ হাসিনাকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করলো দরবার হলে, সেখানে কোনো মিডিয়ার উপস্থিতি না থাকলেও, সেখানের উচ্ছৃঙ্খলতার কিয়দংশ প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণ সৈন্য নয় বরং দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারদের আচরণ এবং তাদের কথা বলবার ভঙ্গির ঔদ্ধত্ব্য ক্ষমার অযোগ্য।

আশা করবো এই বিক্ষুব্ধ সময়ে যেমন দক্ষতার সাথে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, এই আপাতনিস্তরঙ্গ সময়েও তিনি তার দায়িত্ব যথাযোগ্য পালন করবেন।

তার সামনে সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের সাথে যে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, এবং এই উচ্ছৃঙ্খলতায় যারা যুক্ত ছিলো, তাদের সামরিক বাহিনীর নিজস্ব বিধি অনুসারে বিচারের ব্যবস্থা করা উচিত।

শৃঙ্খলাবোধের সাথে মানবিক আবেগের সম্পর্ক মুছে ফেলবার দীর্ঘ প্রশিক্ষত তাদের কোনো কাজে আসে নি। তাদের চেইন অফ কমান্ড অস্বীকার করে তারা যে আচরণ করেছে, সেটার জন্য তাদের যা প্রাপ্য তাই তাদের দেওয়া উচিত। অহেতুক মানবীয় আবেগ কিংবা সে সময়ে তাদের মানসিক অবস্থা বিক্ষিপ্ত ছিলো, এমন ভেবে কোনো নমনীয়তা কাম্য নয়।

মইন উ আহমেদ আশা করবো তার যোগ্যতা এবং বিচক্ষনতার প্রমাণ রাখবেন আপাত শান্তির সময়ে, তিনি অবসরে যাওয়ার আগে সামরিক বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা পুনস্থাপিত করতে সফল হউন, এই আশাবাদ আমার।
১২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×