somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আহমদ শরীফ- ভাব-বুদ্বুদ

২৬ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ৯:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আহমদ শরীফের ভাব-বুদ্বুদ পড়ছি, সময় নিয়ে পড়ছি এমন না, তবে তার দিন যাপনের চিত্র তেমন নেই বলেও এই দিনলিপির খন্ডিত অংশ আমার কাছে তার দিনযাপনের সামান্য অংশই তুলে ধরতে পারছে। তার পরিবারের সদস্যদের সামান্য বর্ণনা আছে, আমি পড়বার সাথে সাথে তাদের সামান্য পরিচয় পাচ্ছি, কিন্তু সম্পূর্ণ ছবিটা আঁকতে পারে শুধুমাত্র তারাই।

তার দিনলিপি অবতারণিকা থেকে যতটুকু বুঝলাম, ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৯এর ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সময়কালে লিখিত এবং তার অবসর কিভাবে কাটছে তার একটা দৃষ্টান্ত।

তিনি বন্ধ্যা অবসর কাটান নি, এমনটাই আমার অনুমাণ,এই পর্যায়ে এসে তার গ্রন্থ পাঠের অবসর বেড়েছে, তিনি নতুন করে পড়ছেন রবীন্দ্রনাথ, পড়ছেন বঙ্কিম, নজরুল, পড়ছেন সমকালীন সাহিত্য, ইতিহাস এবং নিজস্ব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে সেগুলোর ব্যখ্যা নির্মাণ করছেন।

এই সময় কালে লিখিত তার প্রবন্ধগুলোর নির্যাসও উঠে আসছে তার দিনলিপির খন্ডিত অংশে। তবে সব মিলিয়ে তার কাজ করবার ধরণটা গোছানো। একটা ভাবনা মাথায় আসবার পর সেটা লিপিবদ্ধ করা এবং পরবর্তী কোনো এক সময়ে সেই ভাবনার সম্প্রসারণ করা, নিয়মিত পর্যালোচনা লিখে রাখা, এবং সেসব পুনরায় পাঠ করা।

তার আগ্রহও নানাবিধ বিষয়ে হলেও শিল্প সাহিত্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের জায়গা নিয়ে তার আগ্রহ ছিলো এটুকু বুঝতে পারছি দিনলিপি পড়ে।

আপাতত লক্ষ্য হলো সেইসব ভাবনার যেগুলো আমার নিজের পছন্দ সেগুলো ধাপে ধাপে টুকে রাখা। সম্পূর্ন বইটা পরবর্তীতে পড়বার কোনো আগ্রহ থাকবে না-

০৮.০২.৮৯
আমাদের কর্তব্য কি? ২১শে ফেব্রুয়ারীর গৌরবের রোমন্থন, না সমকালীন সংকটে -সমস্যায় ২১শের সংগ্রামের অনুসরণ? বা কর্তব্য কি?
২১শের গৌরবের রোমন্থন , না সংগ্রামের অনুসরণ?

০৬.০২.৮৯
জীবন-প্রয়াসের ও জীবন -সংগ্রামের প্রসুন ও উপজাত হচ্ছে সংস্কৃতি, প্রাত্যহিক জীবনে সত্তার সংরক্ষণের ও সম্বিৎ সম্প্রসারের প্রয়াসেই সংস্কৃতির সৃষ্টি ও পুষ্টি। সংস্কৃতি তাই যুগপৎ ব্যক্তিক ও সামাজিক সৃষ্টি।

২২.০২.৮৯
পাকিস্তানীদের ইসলামী দৌরাত্ম্য একবার আমাদের বাঙালী ও সেক্যুলার করেছি. এবার স্বদেশী ও স্বধর্মীর ইসলামী হামলা আমাদের নাস্তিক বা শাস্ত্রদ্রোহী করবে।

২৬.০২.৮৯
প্রাণিজগতে খাদ্য-খাদক সম্পর্ক রয়েছে বলে দুর্বলকে দেখলে তাড়া করে আর প্রবলকে দেখলে পালায় মানবে বাস্তিত অনুশীলিত গুণের অভাবে সাধারণ মানুষও তার হাত রাখে প্রবলের পায়ে আর দুর্বলের ঘাড়ে।

০১.১০.৮৯
আধুনিকতার সংজ্ঞা
বিষ্ময়, কল্পনা-ভয় ভক্তি-ভরসাজাত লৌকিক, অলৌকিক, অলীক ও শাস্ত্রিক সংস্কা বিশ্বাসকে এক শব্দে প্রেজুডিস বলে সংজ্ঞায়িত বা অভিহিত করলে এ প্রেজ্যুডিস বর্জন করে ভাব-চিন্তা-কর্ম-আচরণে ও আচারে -বিচারে জ্ঞান ও যুক্তি প্রয়োগই হচ্ছে ' আধুনিকতা'।

২০.১১.৯০
আমাদের প্রথম পরিচয় - আমরা মানুষ, আমাদের শেষ পরিচয়- আমরা মানুষ, আমাদের লক্ষ্য হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান-মুসলমান থাকা নয়- মানুষ হওয়া।

০৭.১২.৯০
নাস্তিকের কারো কৃপার প্রত্যাশাও থাকে না, মৃত্যু-উত্তর ভয়েরও আশঙ্কা থাকে না। সে থাকে ভয় ভরসার উর্ধ্বে নিশ্চিন্ত।

১৫.০৩.৯১
মানুষে মানুষে রয়েছে, কাঁটাতারেরবেড়া, সে বেড়া শাস্ত্রের, স্থানের, ভাষার, মতের, পথের, বিত্তের, বিদ্যার বিশ্বাসের, সংস্কারের সাংস্কৃতিক ও আচারের পার্থক্যজাত ঘৃণ্য অবজ্ঞা, স্বাতন্ত্র‌্যচেতনা প্রসুত। তাই মানুষ মিলতে পারছে না কোথাও।

০৮.০৩.৯৩
কোরআন-হাদিসপন্থি নিষ্ঠ মুসলিমের সংস্কৃতি-সভ্যতার বিকাশে, আবিস্কারে ুদ্ভাবনে সৃষ্টিতে কোনো অবদান নেই। কোনো আরবই[ আল কিন্দি ব্যতীত] সংস্কৃতি সভ্যতার বিকাশে কোনো ভুমিকা রাখেনি। সব ইমাম পবিত্র শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞান চিকিৎসা শাস্ত্রের স্রষ্টাি ব্যবিলনীয় ইরানি, মধ্য এশীয় এবং ক্বচিত মিশরীয়। মুক্তবুদ্ধির গাজ্জালী, ইবনে রুশদ, ইবনে সিনা প্রমুখ অনেকেই নিরীশ্বর-নাস্তিক কিংবা ইসলামে আস্থাহীন ছিলেন, পরে প্রাণ হারানোর ভয়ে মুসলিম হয়ে যান বাহ্যত। আজও কোরআন-হাদিস নিষ্ঠ মুসলিম মাত্রই বৃত্তাবদ্ধ, গতানুগতিক, রক্ষণশীল বন্ধ্যা জীবনই যাপন করে। ফেরাওর আমলে মিশরিয়রা সংস্কৃতি সভ্যতাকে যেমন গতানুগতিক আচারে-অভ্যাসে পরিণত করেছিলো, মুসলিমরাও তেমনি ধার্মিক হলেই বান্দা বা আবদ হয়ে যায় মনের দিক দিয়ে। আজকের সৌদি প্রভৃতি রাজ্যের আরবও এর প্রমাণ। মন-মননের স্বাধীন অনুশীলন নেই বলেই মুসলিম মতবাদের ক্ষেত্রে পরমত-অসহিষ্ণু।

২৯.০৮.৯৩
আস্তিক মানুষের শেষ জীবন বড় অসস্তিকর উৎকন্ঠায় কাটে। মৃত্যুভয়ে কাতর পাপের শাস্তিভয়ে ভীত মানুষগুলো জাগ্রত মুহূর্তগুলোতে ইশ্বরের কৃপা-করুণা-প্রশ্রয়-ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে, প্রায় সর্বক্ষণ আসন্ন পরীক্ষার মতো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মন্দ-মাঝারি ছাত্রদের মতোই তাদের বাহ্যাচরণের অন্তরালে ফল্গুধারার মতো তাদের এ শঙ্কাকাতর উৎকণ্ঠ জীবন বড়ই করুণ। এঁরা আসলে তখন ফাঁসির হুকুমপ্রাপ্ত কয়েদীর জীবনই যাপন করতে থাকে কিংবা ক্যান্সাররোগীর নিশ্চিত মৃত্যুর শঙ্কিত প্রতীক্ষায় দিন কাটান- বৃথা হয় বেঁচে থাকা।
২৭.০৯.৯৩

প্রলোভন প্রবল হলে আস্তিক মানুষ করে না হেন অপরাধ অপকর্ম নেই। তবু তাদের শাস্ত্রভীতি এতো প্রবল কেন, বোঝা যায় না। আশৈশব শোনা কথার বিশ্বাস-ভয়-ভক্তি- ভরসা এতো গাঢ় গভীর ও ্যাপক কেনো, যুক্তি-বুদ্ধি প্রয়োগে এক্ষেত্রে তাদের এতো অনীহা কেন বোঝা ভার। লাভে-লোভে স্বার্থে অপকর্ম অপরাধপ্রবণ হওয়া সত্ত্বেও তারা মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তি যোগে কালের দাবি, হৃদয়ের চাহিদা, যুক্তির ন্যায্যতা স্বীকার করলেই তাদের মানসিক জীবনও সমকালীনতার প্রসাদপুষ্ট হত। যুক্তিতেই মানসমুক্তি, বিজ্ঞানের তত্ত্বে, তথ্যে ও সত্যে আস্থাই জীবনের ঋজু পথের দিশারী- এ তত্ত্ব বোধগত হলেই কেবল একজন মানুষ যুক্তিবাদী বিবেকবান আধুনিক বা সমকালীন চেতনাসম্পন্ন মানুষ হতে পারে।

০৯.১০.৯৩

শাস্ত্রনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বদ্ধচিত্তের রক্ষণশীল বা গোঁড়া বা অর্থোডক্স হয়। এরা শাস্ত্রের বিধি-নিষেধ লঙ্ঘন ও লঙ্ঘনকারীদের সহ্য করতে পারে না, তারা ঘুষখোরের মেয়ে বিয়ে করে না, সুদখোরের বাড়িতে খায় না, বেনামাজীকে ঘৃণা করে। এরা অনুদার অসহিষ্ণু, নিষ্ঠুর ও ক্ষমাহীন, এরা ঐহিকজীবনকে তুচ্ছ এবং পারত্রিক জীবনকেই পরম ও সত্য আর স্থায়ী বলে জানে। এরা শাস্ত্রানুগারী লে এরা নতুন চেতনা-চিন্তা-আচার-আচরণ নীতি-নিয়মের বিরোধী। এক কথায় একা পরিবর্তন বিবর্তন বিরোধী, আবর্তিত জীবনকে এটা শ্রেয় ও প্রেয় বলেই জানে এবং চিরন্তর কল্যানকর বলেজ ানে ও মানে। অর্থোডক্স ধার্মিক মানুষের বিশ্বাস ও চরিত্র অত্যন্ত দৃঢ়। কেবল দেশ-কাল, প্রয়োজন-প্রগতি চেতনারিক্ত অসহিষ্ণু অনুদার বলেই তাদের কোন সংস্কৃতি থাকে না- আচার-আচরণ নিষ্ঠাতেই এরা নিবদ্ধ দেহে-প্রাণে-মনে-মগজে-মননে। এ কারণে এরা যান্ত্রিক এবং প্রাণীর জীবনই যাপন করে। মনুষ্যত্ব এদের প্রসারমান নয়, মানবতা এদের বিকাশমান নয়। এদের চিন্তা-চেতনা আচার-আচরণ জ্ঞান-বুদ্ধি-যুক্তি চিরকালই আবর্তিত হতে থাকে।

মৌলবাদীদের সঙ্গে গোঁড়ারক্ষণশীল শাস্ত্রনিষ্ঠ অর্থোডক্সদের পার্থক্য হচ্ছে মৌলবাদীরা ঐহিক জীবনে সুবিধেবাদী, রাজনীতিসচেতন এবং কোনো নীতিনিয়মের আদর্শে আন্তরিকভাবে নিষ্ঠ নয়, কেবল শাস্ত্রধ্বজী হয়ে পার্থিব সুখ-সিবিধা যাঞ্চা চালিত হয়। এদের মধ্যে ধার্মিক এবং পারত্রিক জীবনে গুরুত্ব ও আস্থাশীল লোকের একান্ত অভাব, এদের শাস্ত্র, সত্য, আদর্শ ও চরিত্রনিষ্ঠা কম বা নেই। ফান্ডামেন্ডালিজম কথাটির উদ্ভব ফ্রান্সে, রাজনীতিক লালন ইংল্যান্ডে এবং রাজনীতিক-কুটনীতিক প্রচার-প্রয়োগ- মার্কিন সরকারের।
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ক্রাউড ফান্ডিং-এর সুযোগ তৈরি করে সরকারী লাভজনক প্রজেক্টে জনগণের বিনিয়োগ নিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৩১

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, তা বুঝা যাচ্ছে। নাহলে, খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে জনগণকে অনুরোধ করতেন না। আমার মন হয়, দেশের মানুষের কাছেই অনেক সম্পদ আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×