মারওয়া আল শেরবিনি ড্রেসডেনের আদালত কক্ষে নিহত হয়েছেন একজন উগ্রপন্থী মুসলিম বিদ্বেষীর ছুড়িকাঘাতে। তবে এই মৃত্যু নতুন কোনো সংবাদ নয়, ইউরোপে ব্যপক মুসলিম বিদ্বেষের এটা সামান্য একটা নজির।
এ মৃত্যুর দায় মুসলিম সন্ত্রাসবাদের, হয়তো মারওয়া আল শেরবিনির মৃত্যুর ঘটনার উগ্র প্রতিক্রিয়া আরও অনেকগুলো এমন নৃশংস বর্বরতার জন্ম দিবে।
এই মুহূর্তে বোধ হয় সময় এসেছে নিজেদের প্রশ্ন করার, ঠিক কোন সীমায় পৌঁছালে আমরা আমাদের নিয়ন্ত্রন করবো? ঘৃণার প্রত্যুত্তরে ঘৃণা কোনো কার্যকর সমাধান নয়, এমন কি সার্বক্ষণিক আত্মঘাতী হামলার চিত্র প্রকাশ করা, কিংবা গণমাধ্যমে এইসবের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় বিভিন্ন সামাজিক নেটওয়ার্কে মুসলিম সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন কার্যকলাপের সচিত্র বিবরণ এবং প্রতিনিয়ত দিয়ে চলা হুমকি, সব মিলিয়ে বিদ্বেষের আর ঘৃণার আগুণ সব সময়ই প্রজ্বলিত ছিলো।
ইউরোপ- আমেরিকা মুসলিমফোবিয়ায় ভুগছে, টুইন টাওয়ারের হামলা যতটা আমেরিকার অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়েছে, তার চেয়ে বেশী ক্ষতি করেছে এটা সেখানে বৈধভাবে বসবাসরত ১ কোটি মুসলিমের। তাদের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক নজরদারি হয়তো এখনও শেষ হয় নি, তবে বিগত ৭ বছর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের অর্ধেকের বেশী নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য, ফোনালাপ রেকর্ড করা হয়েছে।
স্পেনে ইংল্যান্ডে বোমা হামলা এবং কয়েকটি ব্যর্থ হামলার প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ায় মানুষের আতঙ্ক এবং বিদ্বেষ শুধু বেড়েছে। এই ঘৃণার উত্তরে ঘৃণা কিংবা তীব্র আতঙ্কিত বিদ্বেষ আসলে নিজের অসহায়ত্বের ক্ষোভের প্রকাশ।
সবাই ক্ষুব্ধ, হলান্ডে এক চলচিত্র নির্মাতাকে হত্যা করা, সাধারণ মানুষের ভেতরে সাম্প্রদায়িকতার তীব্রতা এবং মুসলিম বিদ্বেষকে ফ্রান্স রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং নিজেদের অক্ষমতা কিংবা অনীহা প্রকাশ করেছে স্কুলে ধর্মীয় চিহ্ন সম্বলিত পোশাকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিল উত্থাপন এবং সেটা অনুমোদন করে।
জার্মানীতে অবৈধ এবং বৈধ ভাবে বসবাস করছে অসংখ্য তুরস্কের নাগরিক, তাদের অনেকেই অপরাধের তীব্র ভাবে যুক্ত।
এইসব ভীতির ভেতরেই মানুষ বেড়ে উঠছে, কেউ বড় হচ্ছে খ্রীষ্টানবিদ্বেষ নিয়ে, এবং কেউ বড় হচ্ছে মুসলিম বিদ্বেষী হয়ে। এদের ভেতরে যারা অপরাধপ্রবণ এবং যারা অতিরিক্ত আতংকিত কিংবা ক্ষুব্ধ কিংবা যাদের ঘৃণার পরিমাণ অপরিসীম, তারা রাস্তায় মুসলিম নামধারী কাউকে দেখলেই তাকে সন্ত্রাসী বলে অবজ্ঞা করে কিংবা নিজের মতামত জানায়।
মারওয়া আল শেরবিনির ঘটনার সূত্রপাত এভাবেই। মিশরের মেয়েরা ধর্মীয় কারণে নয় বরং সামাজিক ভাবেই মাথায় স্কার্ফ বাঁধে, যদিও এটা নিয়ে তাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেই, তবে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টেলিভিশনে কোনো হিজাবপড়া মহিলা সংবাদ উপস্থাপনও করতে পারে না। কিন্তু অধিবাসীদের অধিকাংশই মাথায় স্কার্ফ পড়ে।
সেই স্কার্ফ কিংবা হিজাব এখন ইউরোপে মুসলিমদের চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা যদি মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের পোশাক সংস্কৃতির অংশ হতো তবে সেটা নিয়ে হয়তো এত জলঘোলা হতো না, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সূর্যের সাথে তাল মিলিয়ে নামাজ রোজা করা কতিপয় মানুষ এটাকেই মুসলিম নারীদের পোশাক চিহ্নিত করবার পরে স্কার্ফই মুসলিম নারীর পরিচায়ক হয়ে উঠেছে।
স্কার্ফ পড়ে আসবার সময় মারওয়াকে একজন সন্ত্রাসী বলে আখ্যায়িত করে, এবং মারওয়া যেকোনো আইনানুগ নাগরিকের মতোই আদালতে মামলা করেন। আদালত খুনী এক্সেল ডাব্লিওকে অপরাধী সব্যস্ত করে এবং এর বিরুদ্ধে আদালতে আপীল করে অভিযুক্ত।
সেই মামলার শুনানী চলবার সময় কোর্ট রুমে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয় মারওয়াকে।
মারওয়ার মৃত্যু আমাকে ব্যথিত করেছে, তবে আরও বেশী উদ্বিগ্ন করেছে। এই ঘৃণার শেষ কোথায়? কোনো এক পক্ষকে অন্তত সাদা পতাকা তুলতে হবে। আমি এক্সেলকে দোষ দেই না, সে উপলক্ষ মাত্র, তবে এর পশ্চাৎপট তৈরি করছে ৯০ এর দশক থেকে বাড়তে থাকা উগ্র ইসলামী ভাবধারার মোল্লা এবং কট্টরপন্থীরা। তারা নিজেদের ধর্মীয় বিশুদ্ধতা ক্ষুন্ন হওয়ার কিংবা ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগবার বিষয়গুলোকে যেমন সহিংসপন্থার প্রকাশ করেছে তাতে অন্য সব মুসলিম যারা শান্তিপ্রিয় এবং সহনশীল তাদের সবাইকেই সাম্ভাব্য সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এবং এরা প্রকাশ্যেই রাস্তায় ঘুরে, নিজেদের কাজে যায়, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেওয়া এইসব কট্টরপন্থী মোল্লাদের অবশ্য এই নিয়ে মাথা ব্যথা নেই , পেটে ভাত না থাকলেও ধর্মের বিধান ঠিক রাখা চাই তাদের।
আমি মারওয়ার মৃত্যুর জন্য মূলত দায়ী করবো তাদের।
ইউরোপ এখনও সভ্য হয়ে উঠতে পারলো না। ধর্মীয় সহনশীলতার চর্চা করতে পারলো না। রেঁনেসায় যেভাবে লোকজন চার্চের দখল থেকে মুক্ত হয়েছিলো, সাম্প্রতিক প্রবনতায় মানুষ পুনরায় চার্চে প্রত্যাগমন করছে। এবং সেখানকার সাধারণ মানুষ বর্ণ, গোত্র নয় বরং এখন মানুষকে বিবেচনা করছে তার ধর্ম দিয়ে। এই অসুস্থ প্রবনতা যদি না থামে, এমন অনেক মারওয়ার মৃত্যু অপেক্ষা করছে আমাদের সামনে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


