আমাদের দারিদ্র এবং আমাদের অসহায়ত্বের গল্পগুলো জুড়ে জুড়ে এক একটা মানুষ সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে অন্য কোনো দেশে গিয়ে স্বেচ্ছায় দাসত্ব শৃঙ্খল পড়ছে গলায়। মানুষ পাচারের প্রধান প্রধান কারণগুলো পূর্বেই বলা হয়ে গেছে-
সস্তায় শ্রম কিনে নেওয়া- একজন মানুষ যে জেনে শুনে কিংবা প্রতারিত হয়ে অন্য কোনো দেশের মাটিতে পৌঁছেছে তাকে শোষণ করা সহজ। তার পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে তাকে মেরে ফেললেও আসলে কেউ কিছু বলতে আসবে না। মেক্সিকো- আমেরিকা সীমান্তে কিছু মানুষ সারা রাত রাইফেল হাতে পাহাড়া দেয়। সেখানের এক সীমান্তবর্তী নদী ডিঙিয়ে মেক্সিকোর দরিদ্র মানুষেরা আমেরিকা ভূখন্ডে প্রবেশ করে-
তবে আইন পালনে এরা খুব সচেতন, একবার কেউ যদি এখানে আমেরিকার সীমান্তের কাঁটা তার ডিঙিয়ে ভেতরে চলে আসে তাহলে তাকে হত্যা করার উপায় নেই, তাই নদীর মাঝখানেই এইসব ভাগ্যান্বেষী মানুষদের পাখির মতো মেরে ফেলা হয়। নদী দিয়ে লাশ ভেসে চলে যায় একটা স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে।
আমাদের শ্রমিক কিংবা আমাদের যুবকেরাও একই ভাবে বিভিন্ন সীমান্ত পেরুতে চায়। ভারতের সীমান্তে নিয়মিত বিএসএফ এর গুলিতে মানুষ মরে, সীমান্তে বিডিআর শিশু আর মেয়েদের চালান আটক করে, ঢাকার হোটেলে মেয়ে শিশুর চালান আটক হয়, তবে এসবের বাইরেও ভ্রমন ভিসায় বিভিন্ন দেশে গিয়ে স্বচ্ছলতা কেনার নেশায় মরিয়া যুবকদের হারিয়ে যাওয়ার হার কমে না।
ইতালি, স্পেন, লিথুনিয়া, মরোক্কো, কেনিয়া, উরুগুয়ে, লাটভিয়া, মালোয়শিয়া, সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশের উদ্যমী যুবকেরা কোথায় না ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ছুটে যাচ্ছে। এদের কতজন বৈধ বাগজ পেয়ে যাচ্ছে, আদম ব্যাপারী এদের প্রতারিত করতে পারছে কারণ এরা যেকোনো মূল্যেই প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাংলাদেশের সীমান্ত ডিঙিয়ে পালাতে চায়।
আমাদের দেশের বৈধ শ্রমিকেরা ঠিক একই কারণে বঞ্চিত হয়। আমাদের আন্তর্জাতিক সুনাম , আমাদের দেশ থেকে অধিকাংশ মানুষই অবৈধ ভাবে অন্য দেশে প্রবেশ করতে মরিয়া। আমাদের সাথে এইসব উন্নত দেশের অভিবাসন কর্মকর্তাদের অবজ্ঞা আর হেনেস্থার শিকার হচ্ছে সবুজ পাসপোর্টেধারী মানুষেরা কারণ ভাগ্যান্বেষনে মরিয়া আমাদের যুবকেরা। তারে যেকোনো উপায়েই সেখানে বসতি গড়তে তৎপর।
আমার আশ্চর্য লাগে এই ভেবে যে এইসব যুবকেরা উন্নত দেশে গিয়া যেকোনো কাজ করতে আগ্রহী, ঘন্টা হিসেবে শ্রম বিকোতে আগ্রহী হলেও এইসব যুবকেরা দেশের মাটিতে একই কাজ করতে তেমন আগ্রহী না।
অবশ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও বিবেচনা করতে হবে, এখানে অর্থনীতি মোটামুটি স্থবির, অনেক দিন ধরেই বেসরকারীকরণের ভুত, ব্যবসা সঙ্কোচন আর মূদ্রাপাচারের লোভে নতুন চাকুরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না তেমনভাবে।
আমাদের ২০ হাজার লোকের জীবিকা ধবংস করে ১০০০ মানুষেরা চাকুরির সুযোগ উন্মুক্ত হয়, পাট কল বন্ধ হয়ে যায়, এক সাথে কয়েক হাজার পরিবার পথে বসে, এবং এইসব শ্রমিককে আত্তীকরণের কোনো উদ্যোগ থাকে না সরকারের, সরকার বেসরকারীকরণ করেন নিজের দায়মুক্তির আনন্দে উন্নয়নের গল্প শোনায় আমাদের।
এইসব শ্রমিকেরা কি করবে, কোথায় নিজের শ্রম বিক্রী করবে এই বিষয়ে আদতে কোনো মাথা ব্যাথা নেই, অনেক কল কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ পড়ে আছে। অনেক বিনিয়োগকারী কল কারখানা তৈরি করে বসে আছে, এ গুলো শুরু হলেও কিছু মানুষ এখানে শ্রম বিক্রি করতে পারতো।
সমন্বিত কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। তাই এইসব যুবকেরা ,যারা চুরি করতে পারে না, যারা ডাকাতি করতে পারে না, কোনো ছলচাতুরি করতে পারে না, তারা ছলনার শিকার হচ্ছে।
সরকারের সকল উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত অবাস্তবায়িত থেকে যাচ্ছে, এইসব অভিবাসী শ্রমিকদের সকল অধিকার অর্জিত হচ্ছে কি না, তাদের কর্মক্ষেত্রে তারা কোনো রকম নির্যাতনের কিংবা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে কি না, এসব তদারকির দায়িত্ব যাদের সেইসব উচ্চমন্য সরকারী কর্মকর্তাগণ এইসব শ্রমিকদের খোঁজ খবর রাখতে অনাগ্রহী, সে কারণেই এদের নির্মম নির্ভেজাল শোষণ আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। আদমব্যাপারীদের আমরা ঘৃণার চোখে দেখি না এখন, বরং এরা এইসব ভাগ্যান্বেষী শ্রমিকদের শোষণ করে নিজেদের বিত্ত বৈভব বৃদ্ধি করলেও বছরে বছরে এরাই আমাদের রেমিটেন্স আয়ে প্রত্যক্ষ ভুমিকা রাখছে।
সাম্প্রতিক কালে মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক কিংবা গৃহপরিচারিকা পাঠানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে নারী গৃহপরিচারিকাদের জীবনযাপন, তাদের উপরে অব্যাহত শাররীক ও যৌননিপীড়নের সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে, শ্রীলঙ্কার একজন নারী শ্রমিকের দেহে পেরেক ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো জঘন্য আচরণও করেছে মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবেরগণ, সেখানে নারী গৃহপরিচারিকা পাঠানোর আগে তাদের নিরাপত্তা ও বীমার বন্দোবস্ত করা হয়েছে কি না এটা কে তদারক করবে আমার জানা নেই।
লিবিয়ার সাম্প্রতিক যুদ্ধে দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে, সেখানেও নির্মান শ্রমিক, হাসপাতালের সেবিকা এবং অন্যান্য শ্রমঘন কাজে লিপ্ত ছিলো বাংলাদেশের অসংখ্য শ্রমিক, তাদের কেউ কেউ বেশ বড় অংকের অর্থ দিয়ে, প্রয়োজনে জমি বেচে ঋণ করে সেখানে গিয়েছে, এইসব মানুষেরা দেশে ফিরতে চায় না। এদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কোনো আনন্দের সংবাদ নয় বরং একটি পরিবারের আশা ও স্বপ্নভঙ্গের গল্প এইসব পরাজিত প্রত্যাবর্তন , মরিয়া এইসব অভিবাসী শ্রমিক জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ছে ইউরোপের ভূখণ্ডে, তারা সমুদ্রে আত্মহত্যা করছে কিন্তু তাদের পরাজিত মুখ দেখাতে চাইছে না পরিবারকে, তারা পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের কারন হতে চাইছে না।
শুধু লিবিয়ায় নয় বরং সরোকার উদ্যোগ নিয়েছে আফ্রিকার বিস্তৃত ভূখন্ডে তারা জমি ইজারা নিয়ে বাংলাদেশী কৃষকদের দিয়ে চাষাবাদ করবে, এই বিষয়ে মধ্য আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের, এক বছর অতিক্রা্ন্ত হওয়ার পরও এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি সাধিত হয় নি।
দেশের ভূখন্ড বাড়ছে না, জনসংখ্যা বাড়ছে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এবং শিল্পায়নের হার এমন নয় যে এখানে বর্তমানে শিক্ষিত সকল ব্যক্তির কর্ম সংস্থান অতি অল্প সময়ে সম্ভবপর হবে, অপরিকল্পিত শিক্ষাবিস্তারের ফলে আমাদের যোগ্য এবং উচ্চ শিক্ষিত অধিকাংশ শ্রমিক কিংবা গ্রাজুয়েটদের আমরা কোনো ভাবেই আমাদের উন্নয়নের কাজে সম্পৃক্ত করতে পারছি না, একই সাথে আমাদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের গড় বয়েস বাড়ছে,
সেসব অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং আমাদের অপরিকল্পিত রাষ্ট্র পরিচালনার কারণে অভিবাসনের হার বাড়ছে, এই ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল বিস্তৃত কারাগার ভেঙে পালিয়ে যেতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে, মধ্যম মানের শিক্ষার্থী ব্যতীত উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষেরা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে স্বেচ্ছায়, স্কিলড মাইগ্রেশন প্রকল্পের আওতায় এইসব শিক্ষিত স্বচ্ছল মানুষ দেশত্যাগ করছে, আর আনস্কিলড লেবার পাচার হচ্ছে, এরা বিদেশ যাচ্ছে কারণ দেশে এদের চাহিদা পুরণের মতো যথেষ্ট বড শ্রমবাজার নেই, এদের কায়িক শ্রম কাজে লাগানোর মতো অবকাঠামো বিকশিত হচ্ছে না, সুতরাং অদক্ষ, অল্প দক্ষ এইসব শ্রমিকেরা বিদেশে ঝুকিপূর্ণ শ্রমঘন কাজে যোগদান করতেই বিদেশে চলে যাচ্ছে, আর এদের একাংশ প্রতারিত হচ্ছে ভয়ংকর ভাবে, এইসব ভাগ্যাহত মানুষদের বেচে দেওয়া হচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে, তাদের হত্যা করে এদের হৃদপিন্ড, কিডনী, লিভার, কর্নিয়া, এবং অন্যান্য প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রত্যঙ্গ কেটে নিয়ে তাদের অশণাক্ত লাশ হিসেবে ফেলে দেওয়া হচ্ছে,
যারা বিমানে চেপে পরিবারের ভাগ্য বদলাতে বিদেশে যাচ্ছেন তাদের কতজন এমন ভাবে মাঝপথে হারিয়ে যাচ্ছেন সেটার পরিসংখ্যান আমাদের অজানা, মালোয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে এভাবে কতজন প্রতারিত মানুষ ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন আমরা জানি না।
সরকার জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে কিন্তু কতজন এইভাবে সচেতন হয়ে নিরাপদ অভিবাসী হতে পারছেন , হতাশা ব্যর্থতাবোধ, পরিবারের বোঝা হয়ে অপমানিত হওয়ার বদলে মৃত্যু শ্রেয় এমন মরিয়া মানুষদের অধিকাংশই সরকারী সাবধানতার বানী উপেক্ষা করেই নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াই করছেন, আমরা আশা করবো তারা প্রত্যেকেই নিজেদের ও পরিবারের স্বপ্ন পুরণে স্বার্থক হয়েছেন, নিরাপদ অভিবাসনের জন্য আমাদের সচেতন প্রয়াস অব্যাহত থাকুক, ট্রাফিকিং রোধে আন্তরিক হয়ে উঠুক সরকার।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে এপ্রিল, ২০১১ রাত ১০:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




