হ্যালো!
হ্যালো শুনতে পাচ্ছিস?
হ্যা, কে ?
.........
ও আপনি! কেমন আছেন?
....................
....................
....................
তা চলে আয় তাহলে । জরুরী দরকার।
আজকেই! হুট করে আসব কেমনে। দুই একদিন পরে আসি।
আজ হলেই ভালো হতো। দেখ পারা যায় কিনা। পরশু দিন আবার আমি ঢাকায় ব্যাক করবো।
...................
....................
আচ্ছা ঠিকাছে, দেখি কি করা যায়।
এক.
ফোন রেখে চুপচাপ ধীরে সুস্থে কিছুক্ষন ভাবলাম। আজ আর ইচ্ছে করছে না। কাল খুব সকালেই উঠে দৌড় দেয়া যেতে পারে।। চেয়ার ছেড়ে আড়মোড়া ভেঙ্গে দাড়ালাম। ঝুকে পড়ে খাটের তলা থেকে জিনিষটা বের করে আনি। ইস, ধুলো জমে গেছে উপরে। লকার খুলে টিস্যু বের করে যত্ন সহকারে মুছি।
মুছলেও এখন আর আগের মত চকচক করেনা। চকচক করবেই বা কতদিন। আমার সাথে আছে প্রায় পাচ বছর। আমাদের ফ্যামিলিতে ওর আগমন তা প্রায় ১৫ বছর পার হয়ে গেছে। সেই যে আব্বা কিনেছিল ১৯৯৩ সালে। এখন ২০০৮ সাল। কত দিন পেরিয়ে গেছে, কেমন যেন একটু মায়াও ধরে গেছে প্রানহীন বাকসটির জন্য।
ব্রিফকেসটার কথা ভাবতেই আমি মাঝে মাঝে কেমন অবাক হয়ে যাই। আসলেই মজার একটা জিনিষ। মাঝারী সাইজের কালো একটা হাতলওয়ালা বাক্স। আগের দিনে ছিল স্যুটকেস, মধ্যবিত্ত স্মার্ট চাকুরীজীবীদের পাল্লায় পড়ে গায়ে মনোহর জামা পড়ে হয়েছে ব্রিফকেস। হাতে নিলেই কেমন একটা ভাব চলে আসে।
যেমন ভাব তেমন কাজও বটে। কতটুকু যায়গা অথচ দিব্যি বয়ে বেড়াচ্ছে নিত্যদিনের প্রান চাঞ্চল্য। জীবনে বহু মানুষ দেখেছি যাদের ব্যস্ত জীবনটা আটকে ছিল এমন ছোট একটি ব্রিফকেসে অভ্যন্তরে।
পাচ বছর ধরে এই ছোট ব্রিফকেস আমাকে কতই না উপকার করে বেড়াচ্ছে। মুহুর্তের নোটিশে সবকিছু ফেলে যখন ছুটে গিয়েছি কর্তব্যের টানে তখন একমাত্র সঙ্গী এই ব্রিফকেস। সবাই হুলুস্থুল কাজে ব্যস্ত, মাঝখান দিয়ে কে একজন টের পেলো আমার হাতে ব্রিফকেস। আরে শালা কই যাস প্রশ্ন করার আগেই দেখে আমি উধাও। পরের দিন আসা মাত্রই সবাই চড়াও হয়। আমার দ্বায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকান্ডের জন্য তুমুল বকাঝকা চলছে আর আমি হাসছি। আমি মনে মনে ধন্যবাদ জানাই ব্রিফকেসটাকে।
ছোট জিনিষটার মধ্যে কত দামী জিনিষ ভাজে ভাজে সাজানো থাকে। সর্বক্ষন যাদের দৌড়ের উপর থাকতে হয় তাদের সবসময়ই গোছানো থাকে একপিস শার্ট, একটা লুঙ্গি, রুমাল, একটা সাবান, ব্রাশ, চুথপেস্ট, আরো প্রয়োজনীয় যাতা। কারো জন্য ওটাই ভ্রাম্যমান অফিস। বিচিত্র কাগজের বান্ডিল, দামী খামের ভিতর গুরুত্বপূর্ন কন্ট্রাক্ট পেপার, মুল্যবান দলিল, গুরুতর ব্যবসায়ীক ডকুমেন্ট ইত্যাদি। জীবন গেলে আফসোস নাই কিন্তু ব্রিফকেস হারালে শেষ হয়ে যাবে সব।
শুধু জীবন কেন গোটা দেশই হয়তো চালাচ্ছে একটা ছোট ব্রিফকেস। দামী গাড়ির মোলায়েম সীটে হেলাম দিয়ে হয়তো বিশ্রামে আছে সে যার ভিতর লুকিয়ে আছে একটি দেশের প্রানসত্বা।
শুধু জীবনের গতিকে ধরে রাখা নয় জীবন হরনের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ন হতে পারে সাধের ব্রিফকেস। লুকিয়ে থাকা বিস্ফোরনের স্মার্ট মাধ্যম হতে পারে ওটাই যা সম্বর্ধনার আনন্দঘন মুহুর্তে সবার অলক্ষে নিজের কাজটা করে যাবে। সেকেন্ডের মধ্যেই একটি জলজ্যান্ত দৃশ্য পরিনত হবে দুঃসহ অতীতে। হয়তো ব্রিফকেসের মধ্যেই সুন্দর করে গোছানো আছে একটি অলংঘনীয় মৃত্যু পরোয়ানা, শেষ মুহুর্তের কারো কলমের খোচার অপেক্ষায়।
দুই.
ব্রিফকেসটা চোখের সামনে আসলে আমি সত্যিই ভাবনায় পড়ে যাই। তবে ব্রিফকেস আমার নিত্য সঙ্গী । ব্যস্ততাকে আমি দারুন এনজয় করি যদি হাতে থাকে একটি ব্রিফকেস। ব্রিফকেসে বন্দী জীবন আমাকে ভীষন এক গতির চক্রে দাড় করিয়ে দেয়। আমি ছুটতে থাকি পৃথিবীর প্রান্তরে প্রান্তরে।
সবাই বিশাল বিশাল ব্যাগ গোছাতে রাত পার করে দিচ্ছে ওদিকে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছি। সকালে উঠে আমি সবার আগের ট্রেনে অর্ধেক পথ চলে এসেছি আর ওরা ফোন করে জিজ্ঞেস করছে আমি ঘুম থেকে উঠেছি কিনা আমার গুছাতে কতক্ষন লাগবে। ওদের চমকে দেযার সকল কৃতিত্ব ওর্।
আসলেই তাই।
কতদিন আমার হাতে থাকবে জানিনা। দশ বছর বাবার হাতের অপরিহার্যতা কাটিয়ে এসেছে আমার হাতে। আমি কাটিয়ে দিলেম আরো পাচ বছর। অত্যাচার নির্যাতনের স্টিমরোলার চলে গিয়েছে ওর ওপর দিয়ে। এখানে ওখানে পড়ে গিয়েছে, চাপ খেয়েছে ভাগ্নেরা ওটার উপর বসে গাড়ি চালিয়েছে, ঝিনাইদহে হারিয়ে গিয়ে যশোরে উদ্ধার হয়েছে। সব ঝামেলাই মাথা পেতে নিয়েছে বেচারা।
আমি উদ্দাম যৌবনে মেতে থাকলেও আমার ব্রিফকেস এখন পড়ন্ত বেলায় উপনীত। ইতঃমধ্যে দাত পড়ে গেছে। ডেন্টাল সার্জারী করে সুস্থ করা হয়েছে। আর কিছুদিন পরে হয়তো আমার ব্রিফকেসে বন্দী জীবনের অবসান ঘটবে। আভাস পাই আমার হাত থেকে ছাড়া পাওয়া মাত্রই আরেকজনের হাতে যাবে। তার জীবনের সাথে মিশে যাবে ওর সকল সত্বা।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই এপ্রিল, ২০০৮ বিকাল ৫:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



