somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

> সমান্তরাল গল্প:1 (প্রকাশিত নতুন ছোটগল্প)

২২ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৫:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

1।

মাঝে মাঝে এমন হয় যে, গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে চোখ দুটো না খুলেই যখন অন্ধকারের গায়ে কান পাতি, নিস্তব্ধ রাতের ভিতরের কোন একটা উত্স থেকে খুব মৃদু ভাবে তবলার বোলের মত শব্দ ভেসে আসতে থাকে। একটা বা দুটা আঙুল দিয়ে খুব আদুরে ভঙ্গিতে যদি বাজানো হয় - সেটা ঠিক তেরে কেটে ধিন হয় না, বদ্ধ ঘরের দরজার এপাশ থেকে ভেতরের গুম-গুম শব্দ শুনতে পেলে যেমন লাগে, অনেকটা সেরকম।

প্রথম প্রথম হৃৎপিন্ডের শব্দ ভেবে ভুল করতাম; পরে বুঝেছি, ওটা আসলে রাতেরই নিজস্ব শব্দ। দেয়ালের গায়ে অবিচল বসে থাকা টিকটিকি যেমন শুধু রাত হলেই টিকটিক করে উঠে; অথবা দেয়াল ঘড়িটা, সারাদিন চুপচাপ অবিরাম ঘুরে যায়, শুধু রাত গভীর হলেই যেন সেটাও টিকটিকির সাথে গলা মেলায়, তেমনি করে শুধু রাত হলেই যেন অন্ধকারের শব্দ শুনতে পাই আমি।

এখন যদিও বিকেল, আকাশে মেঘ তাই সন্ধ্যে বলে ভুল হয়। অবিরাম ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে- থামবার লক্ষণ নেই দেখে খানিকটা অপেক্ষা করার পর হাল্কা পায়ে দৌড়ে আমরা ক'জন প্রায় ধ্যানমগ্ন মানুষ এই গাছটার তলায় এসে আশ্রয় নিয়েছি। সামনে তাকালে কেবলই বৃষ্টি, চেয়ে থাকার কোন মানে হয় না, তবু আমরা সবাই সেদিকে তাকিয়ে থাকি। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকায় হঠাত্ করেই বৃষ্টির ফোঁটা গুলো খুব বড় মনে হয়। আমার এমনও মনে হতে থাকে, যেন অনেক ওপর থেকে আমি একটা বিশেষ কোন ফোঁটাকে চোখে চোখে রেখে নীচে নামতে দেখছি, খানিকপর সেটা মাটিতে পড়ে ছিটকে উঠছে যেন। আমি ঠিক এমন করেই অনেক- অনেকগুলো বৃষ্টির ফোঁটাকে অনুসরণ করতে থাকি, এব ংএমনটা করতে করতে যেন এর মাঝেও সেই নিস্তব্ধ রাতের তবলার বোলের শব্দের যে ছন্দ, আমি সেটা খুঁজে পাই।

আমি আনমনে, বৃষ্টি বাঁচিয়ে ঠোঁটে একটা সিগারেট গুঁজে দেই, তারপর লাইটারটা বের করবার জন্যে পকেট হাতড়াই। ঠিক সেই সময় আমার বন্ধু দীপু হঠাত্ করে আমার কাঁধে হাত রাখে। কখন যে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, কোন ফাঁকে, আমি টেরই পাইনি। ওর মাথায় একটা লালটুকটুকে রুমাল বাঁধা। আমি একটু থমকে যাই। লাইটার হাতে নিয়ে বৃষ্টি বাঁচিয়ে আমি যেই মুহুর্তে আগুন ধরাই - ঠিক তখুনি গভীর পানির তলদেশ থেকে ক্রমশ বড় হতে হতে উপরে উঠতে থাকা বুদবুদের মত অনেক আগের একটা ঘটনা আমার মনে পড়ে যায়।

আমি আর দীপুই ছিলাম সেবারও। দুজনেরই বয়স তখন দশ, কিংবা এগারো হবে। ছাদের পাশের সিঁড়ির ঘরটায় গিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া আধ-খাওয়া একটা সিগারেটের টুকরাতে আগুন ধরিয়ে টানছিলাম আমরা। একেকবার টান দেবার সাথে সাথে ঐ সিগারেটের চেয়েও বেশি লাল হয়ে উঠছিল আমাদের মুখ। কাশির দমক আটকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘরটায় আমরা দুই কিশোর যখন অনভ্যস্ত ভঙ্গিতে একের পর এক টান দিয়ে চলেছি সিগারেটে- আর ফিসফিস করে ঠিক করছি- বন্ধুদের কাছে কেমন করে এই বীরত্বের গল্প করা যায় - ঠিক সেই মূহুর্তে বাবা এসে দরজা খুলে দাঁড়ান।

বাবাকে সেদিন শীতের কুয়াশা কেটে কেটে নদীর ওপার থেকে ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসা ডিঙি নৌকার মাঝির মত লাগছিল আমার কাছে - মনে আছে।

দীপু একটুও দেরি করে নি। ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল ও। আর বাবা, চোখে অবাক দৃষ্টি নিয়ে আমার কাছে এসে হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপরে আচমকাই প্রচন্ড জোরে চড় মেরেছিলেন আমাকে। আমি ছিটকে পড়েছিলাম মেঝের ওপর। কোনো কথা না বলে তিনি নীচে নেমে গিয়েছিলেন সেদিন।

আগে পরে অনেকবারই মার খেয়েছি, কিন্তু সেদিনের কথা মনে আছে বেশ। খুব ব্যথা পেয়েছিলাম এটা ঠিক, তবু সেদিন একটুও রাগ করিনি বাবার ওপর - কারণ, বাবা আমার এই কীর্তির কথাটা মাকে কখনো বলেন নি।


2।

আমার মা। প্রায় সারাটা জীবন দেখেছি তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন। কি একটা অসুখ ছিল মায়ের - তিনি খুব বেশি নড়াচড়া করতে পারতেন না। এমন নয় যে সারাদিন কাশতেন বা খুব জ্বরে ভুগতেন- সেরকম কিছু নয়। প্রায় সুস্থ মানুষের মতনই দেখাতো তাকে। পার্থক্য এই যে তিনি বিছানা শুয়ে থাকতেন সারাদিন।

ভীষন ফর্সা ছিলো তার গায়ের রঙ- চোখ দুটো- মনে আছে- ছিল আশ্চর্য রকমের গভীর আর কালো। মা যখন মাঝে মাঝে কাছে ডাকতেন আমাকে, আমি বিছানার পাশটিতে চুপ করে বসে থাকতাম আর শুরু হত তার রাজ্যের সব গল্প। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকতাম সেসব, আর মনে মনে ভেবে যেতাম আজগুবি সব ভাবনা।

কখনো কিছু লুকোতে চাইলে মায়ের চোখের দিকে তাকাতাম না কখনো। অন্যদিকে চেয়ে থাকতাম। মা কেমন করে যেন বুঝে যেতেন, মায়েরা যেমন করে বুঝে যান। আমাকে বলতেন তার দিকে তাকাতে। আমি তাকিয়ে দেখতাম- পাথরের মত কালো দুটি চোখ, কিন্তু কি গভীর আর কি স্বচ্ছ তারা! খানিক তাকিয়েই মা বুঝে যেতেন কোথাও গোপন কোন কথা আছে আমার, সযত্নে লুকোনো। তারপর গলায় আদর নিয়ে তিনি কেমন করে যেন আমার কাছ থেকে সে খবর ঠিকই বের করে নিতেন।

মায়ের বিছানার পাশে দেয়াল ঘেষে একটা মাকসার জাল ছিল, মাঝে মাঝে সেখানে কালো রঙের একটা মাকড়সা এসে বসতো। মা সেটাকে বলতেন তার বন্ধু। আমরা যখন থাকি না বাসায়, মা নাকি সেই মাকড়সার সাথে গল্প করেন। আমাদের কাজের বুয়া সেসব শুনেছে মাঝে মাঝে।

মাকড়সার চোখ কোথায় থাকে জানি না, কিন্তু প্রায় প্রতিবারই মনে হত, মাকড়সাটা যেন আমার দিকেই কঠিন মুখ করে চেয়ে আছে। যেন বা আমার এখানে, এই ভাবে মায়ের কোল ঘেষে বসে থাকাটা তার পছন্দ হচ্ছে না। কখনো কখনো শিউরে উঠে আমি সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে মনে মনে ভাবতাম, আচ্ছা, ও কি বাবার দিকেও একই চোখ করে তাকিয়ে থাকে?


--------------------------------
মূল গল্পটি আজ প্রকাশিত হয়েছে অনলাইন ম্যাগাজিন [link|http://www.guruchandali.com/guruchandali.Controller?portletId=1&porletPage=1&porletSubPage=9|MyiyP
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৫:২০
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×