somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বু য়া স মা চা র (গল্প)

২৯ শে নভেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বু য়া স মা চা র

তারিক আল আজিজ



আমার এ লেখা ভাল না লাগলেও কেউ ভুয়া বলবেননা। এটা হচ্ছে বুয়া সমাচার। যে বুয়াদের কৃপায় আমরা নিয়মিত খেতে পাই। হ্যাঁ, নিয়মিত বলাই যায়। দু’একদিন একটু আধটু তৃতীয় হাত অজুহাত দেখিয়ে বুয়া’রা না আসলেও মাসের বেশীর ভাগ দিনই আসেন। নিয়মিত বলাই যায়। কাজেই বুয়াদের নিয়ে লেখাটা পড়ার পরে ভুয়া বলার কোন অপচেষ্টা করবেননা।
হয়তো বুয়ারা ইতোমধ্যে আমার উপরে রেগে গেছে। কানাকে যেমন কানা বলতে নেই, তেমনি বুয়াকে বুয়া বলতে নেই। এই সত্য কথাটা আমি নিশ্চয়ই জানি। এখন যদি ভাত ময়দা হয়ে যায়, কিচ্ছুই বলার নেই। এখন যদি মাছ ভাজা কয়লা হয়ে যায় তবু কিচ্ছু করার নেই। কেন নেই-বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই। আমি বুয়াদের বুয়া বলেছি। আমি ভুলে গেছি খালা সম্বোধন। আপনারা ইচ্ছা করলে মা’ও ডাকতে পারেন। এই গুরুতর অপরাধ আমি মাথা পেতে নিচ্ছি। আমি জানি শাস্তি স্বরূপ হয়তো ভিন্ন স্বাদের কিছু খেতে হবে। তবু আমি মুখে কিছু বলবনা। আমার পোড়া কপাল! এটা ওটা পুড়বেই।

আজকাল বুয়াকে ছাড়িয়ে দেবার সাহস কেউ করেনা। বুয়ারা কথায় কথায় হুঙ্কার ছাড়ে, চলে যাব; কাজ করলামনা.. একধাপ এগিয়ে বলতে পারে, এই কাজের গুষ্টি মারি। আমরা বেচারা হয়ে তাদের কথা শুনি। মিনমিনে মুখে ভুল স্বীকার করি। বলি, খালা আর হবেনা। বাজারটা এবার ঠিক সময়মতোই করব। বুয়া সম্রাজ্ঞির মতো মাথা দুলাতে দুলাতে বলে, ঠিক তো?
-জ্বি খালা।
এরপরে হয়তো করুণা করে বুয়া আমাদের মত এই মেস বাসিন্দাদের খাওয়ানোর দায়িত্বটা অব্যাহত রাখেন। যাক গে। আমাদের গেলো বারের বুয়া মহোদয়, তার কথা একটু বলি।
বেশ ক’দিন বুয়া না থাকায় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম। ক’দিন আগে এক বুয়া লেংড়ি মেরে চলে গেছেন। যাওয়ার সময় ঠিকই ‘এই কাজের গুষ্টি মারি’ বলে আমাদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন। আমাদের খাওয়া দাওয়া শিকেয় উঠলো। আমরা যে যেভাবে পারছি খাচ্ছি। আশেপাশের হোটেলে, কখনো দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায়.. যেনতেন ভাবে চলে যাচ্ছে। বাঙ্গালীর ছেলে, রান্না তো জানিনা। যেও দু একবার চেষ্টা করলাম, তাতে ভাত যে সম্পূর্ণ রুপে আটার দোলা হলো; তা বুঝতেই পারছেন। কাজেইষ সে চেষ্টায় ইস্তফা দিলাম। কিন্তু দু’তিন দিনের মাথায়ই আমাদের অবস্থা টের পেলাম। আমার পেটের তথৈবচ অবস্থা। খাই আর না খাই পেটটা ঢোলের মত ফুলে থাকে। ছোটকালে হলে না হয় ঢোল বাজানোর চেষ্টা করতাম, কিন্তু এই বয়সে..। আমার আর দুজন রুমমেট তো সিরিয়াল দিতে শুরু করলো। একজন ভেতরে তো াারেকজন অস্থির হয়ে বারবার বলে, ভাইরে একটু তাড়াতাড়ি কর। বুঝতেই পারছেন, রোগটার নাম বাংলায় বলতে একটু মুখে বাঁধে। সাহেব সুবোদের ভাষায়ই বলি, ডিসেন্ট্রি। শুরু হলো খোঁজ। করুণ মুখে একে ওকে বলছি, একটা বুয়া ঠিক করে দেন না প্লিজ..। অবশেষে পাওয়া গেলো। একজন ভদ্র মহিলা এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনাগো কি বুয়া দরকার না?
-হ্যা। আমি খুশী হয়ে উঠলাম।
-কালাম মিঞা আমারে কইছে। কাইলকা থাইকা আসুম।
-আচ্ছা। আমি আরো খুশী হলাম।
-শুনেন। আমারে কিন্তু দুই হাজার দেওন লাগবো।
-দুই হাজার! এতো?
-নাইলে পারুম না।
অগত্যা রাজি হতে হলো।
বুয়া কাজ শুরু করলো। সাথে সময় না নিয়েপ্রথমদিন থেকেই তার তৃতীয় হাতের খেল দেখাতে শুরু করলো। বুয়ার সাথে আসে তার বাচ্চা। বুয়া হয়তো তরকারী কাটছে। বাচ্চাটা চমৎকার ভঙ্গিতে হাত পা ছড়িয়ে শুরু করলো ভ্যা..ভ্যা।
বুয়া কান্না শুনে প্রথমে একটু ঝারি মারে, ঐ কান্দিস্ না।
ঝারি শুনে বাচ্চার কান্নার ভলিউম বেড়ে যায়। বুয়া এবার রাগ করে বিরক্তি সূচক কোন শব্দ ব্যবহার করে বলবে, মামা এরে রাইখ্যা আহি।
আমাদের কথা শুনার তোয়াক্কা না করেই বাচ্চাটা একটানে কোলে তুলে চলে যায়। আসতে আসতে আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা। অতঃপর বুয়া এলে বুয়ার পিছু পিছু দু মিনিটের মধ্যেই ভ্যা ভ্যা বাচ্চা হাজির। এরপর পাঠক বুঝতেই পারছেন। এই করে আমাদের দুপুরের খাবার টাইম পড়ন্ত বিকেলে শিফ্ট করে। রাতেরটা প্রায়ই বাদ যায়। আরো দু জায়গায় কাজ করা সহ নিয়মিত অজুহাত তো আছেই। বাজার আনতে আমার রুমমেট একদিন একটু দেরী করলো। বুয়া এসে বাজার নেই দেখে প্রচন্ড রেগে গেলো।
-কি হইলো, এখনো বাজার নাই কেন?
-এই এখনই চলে আসবে। আমি বললাম।
-ধ্যাত! বুয়া চরম বিরক্তি প্রকাশ করলো। জানেন না আমি আরো দু জায়গায় কাম করি। ঠিক টাইমে বাজার না আনলে আমি পারুম না।
বুয়া চলে গেলো। সেদিন আর এলোনা।
এমন চলতেই থাকলো। তৃতীয় হাতের খেলায় অসম্ভব দক্ষ এই বুয়া। আমরা তবুও তাকে ভুয়া বলতে পারিনা। আড়ালেও না। যদি বুয়ার করুণা শেষ হয়ে যায়। এখন তো তাও খেতে পাচ্ছি। কিন্তু বুয়া থাকলোনা। একটা নন ইস্যুকে ইস্যু করে বুয়া চলে গেলো। সেদিন আমারই বাজার করার কথা ছিল। কি একটা কাজে বেরিয়েছিলাম। আসতে একটু দেরী হলো। রুমে ঢুকতেই বুয়াকে দেখলাম। থমথমে মুখে বসে আছে। আমিই যেচে বললাম, খালা একটু দেরী হয়ে গেলো।
বুয়া জোরে চেঁচিয়ে বললো, কিসের দেরী? আপনাগো ফাও কাম কইরা শইলডা পানি হয়া গেলো।
আমার রুমমেট নিপুর পরীক্ষা ছিল। ও বুয়াকে বললো, খালা একটু আস্তে। পরীক্ষা আছে।
-কি আমি জোরে কথা কই? করুমনা আপনাগো কাম। বুয়ার গলার জোর আরো বেড়ে গেলো।
এরপরের কথাগুলো থাক! না বলাই ভাল। বুয়ার চিৎকারে অনেক লোক চলে এসেছিলো। চমৎকার একটা সিন ক্রিয়েট করেছিলো বুয়া।
এরপরে আমরা ভাবিনি আমরা আর বুয়া পাবো। অবশ্য তদবির চলছিল। এরই মাঝে হঠাৎ একজন বেশ ভদ্রস্থ চোখে চশমা পরা এক মহিলা এলো। আমি দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলাম, কাকে চাই?
মহিলা কিছু না বলে ভেতরে ঢুকলো। আস্তে করে বললো, তোমাদের বাসায় আমি কাজ করব।
আমি অবাক! বলার ভঙ্গীতে মনে হয় নিজের বাসায় এসে আমাকে কাজের ফর্দ বুঝিয়ে দিচ্ছে।
এই বুয়াই এখন কাজ করে। বেশ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মনে হয়। আমরা এই বুয়ার সামনে কোন উচ্চবাচ্য করিনা। গলা খাদে নামিয়ে কথা বলি। আমাদের মধ্যে নিপু দেখতে একটু ছোট। ও বুয়াকে মা ডাকতে শুরু করেছে। এর একটা কারণ আছে। আমরা জেনেছি এই বুয়া এলাকার বুয়াদের সর্দার। এই বুয়া কোন কারণে আমাদের উপর রেগে গেলে দূর ভবিষ্যতেও আমরা আর বুয়া পাব না। কাজেই আমরা খুব সাবধান। বুয়া রেগে দু একটা কটু কথা বললেও আমরা গা করিনা। একটু বেসরম হয়ে হে-হে করে হেসে কাটিয়ে দেই।

পুনশ্চ:
পাঠক! নচিকেতার একটা গান আছে। নিশ্চয়ই শুনেছেন। পুরুষ মানুষ দু প্রকার।
১.বিবাহিত।
২.জীবিত।
বিয়ের পরে বউ থাকায় একজন পুরুষ মরে যেতে পারে। সে আমি অবিবাহিত হলেও মানছি। কিন্তু বিয়ের আগে যে বুয়ার জ্বালা আছে। অবিবাহিত পুরুষ হয়েও আমরা কি জীবিত?
৯টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×