বু য়া স মা চা র
তারিক আল আজিজ
আমার এ লেখা ভাল না লাগলেও কেউ ভুয়া বলবেননা। এটা হচ্ছে বুয়া সমাচার। যে বুয়াদের কৃপায় আমরা নিয়মিত খেতে পাই। হ্যাঁ, নিয়মিত বলাই যায়। দু’একদিন একটু আধটু তৃতীয় হাত অজুহাত দেখিয়ে বুয়া’রা না আসলেও মাসের বেশীর ভাগ দিনই আসেন। নিয়মিত বলাই যায়। কাজেই বুয়াদের নিয়ে লেখাটা পড়ার পরে ভুয়া বলার কোন অপচেষ্টা করবেননা।
হয়তো বুয়ারা ইতোমধ্যে আমার উপরে রেগে গেছে। কানাকে যেমন কানা বলতে নেই, তেমনি বুয়াকে বুয়া বলতে নেই। এই সত্য কথাটা আমি নিশ্চয়ই জানি। এখন যদি ভাত ময়দা হয়ে যায়, কিচ্ছুই বলার নেই। এখন যদি মাছ ভাজা কয়লা হয়ে যায় তবু কিচ্ছু করার নেই। কেন নেই-বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই। আমি বুয়াদের বুয়া বলেছি। আমি ভুলে গেছি খালা সম্বোধন। আপনারা ইচ্ছা করলে মা’ও ডাকতে পারেন। এই গুরুতর অপরাধ আমি মাথা পেতে নিচ্ছি। আমি জানি শাস্তি স্বরূপ হয়তো ভিন্ন স্বাদের কিছু খেতে হবে। তবু আমি মুখে কিছু বলবনা। আমার পোড়া কপাল! এটা ওটা পুড়বেই।
আজকাল বুয়াকে ছাড়িয়ে দেবার সাহস কেউ করেনা। বুয়ারা কথায় কথায় হুঙ্কার ছাড়ে, চলে যাব; কাজ করলামনা.. একধাপ এগিয়ে বলতে পারে, এই কাজের গুষ্টি মারি। আমরা বেচারা হয়ে তাদের কথা শুনি। মিনমিনে মুখে ভুল স্বীকার করি। বলি, খালা আর হবেনা। বাজারটা এবার ঠিক সময়মতোই করব। বুয়া সম্রাজ্ঞির মতো মাথা দুলাতে দুলাতে বলে, ঠিক তো?
-জ্বি খালা।
এরপরে হয়তো করুণা করে বুয়া আমাদের মত এই মেস বাসিন্দাদের খাওয়ানোর দায়িত্বটা অব্যাহত রাখেন। যাক গে। আমাদের গেলো বারের বুয়া মহোদয়, তার কথা একটু বলি।
বেশ ক’দিন বুয়া না থাকায় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম। ক’দিন আগে এক বুয়া লেংড়ি মেরে চলে গেছেন। যাওয়ার সময় ঠিকই ‘এই কাজের গুষ্টি মারি’ বলে আমাদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন। আমাদের খাওয়া দাওয়া শিকেয় উঠলো। আমরা যে যেভাবে পারছি খাচ্ছি। আশেপাশের হোটেলে, কখনো দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায়.. যেনতেন ভাবে চলে যাচ্ছে। বাঙ্গালীর ছেলে, রান্না তো জানিনা। যেও দু একবার চেষ্টা করলাম, তাতে ভাত যে সম্পূর্ণ রুপে আটার দোলা হলো; তা বুঝতেই পারছেন। কাজেইষ সে চেষ্টায় ইস্তফা দিলাম। কিন্তু দু’তিন দিনের মাথায়ই আমাদের অবস্থা টের পেলাম। আমার পেটের তথৈবচ অবস্থা। খাই আর না খাই পেটটা ঢোলের মত ফুলে থাকে। ছোটকালে হলে না হয় ঢোল বাজানোর চেষ্টা করতাম, কিন্তু এই বয়সে..। আমার আর দুজন রুমমেট তো সিরিয়াল দিতে শুরু করলো। একজন ভেতরে তো াারেকজন অস্থির হয়ে বারবার বলে, ভাইরে একটু তাড়াতাড়ি কর। বুঝতেই পারছেন, রোগটার নাম বাংলায় বলতে একটু মুখে বাঁধে। সাহেব সুবোদের ভাষায়ই বলি, ডিসেন্ট্রি। শুরু হলো খোঁজ। করুণ মুখে একে ওকে বলছি, একটা বুয়া ঠিক করে দেন না প্লিজ..। অবশেষে পাওয়া গেলো। একজন ভদ্র মহিলা এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনাগো কি বুয়া দরকার না?
-হ্যা। আমি খুশী হয়ে উঠলাম।
-কালাম মিঞা আমারে কইছে। কাইলকা থাইকা আসুম।
-আচ্ছা। আমি আরো খুশী হলাম।
-শুনেন। আমারে কিন্তু দুই হাজার দেওন লাগবো।
-দুই হাজার! এতো?
-নাইলে পারুম না।
অগত্যা রাজি হতে হলো।
বুয়া কাজ শুরু করলো। সাথে সময় না নিয়েপ্রথমদিন থেকেই তার তৃতীয় হাতের খেল দেখাতে শুরু করলো। বুয়ার সাথে আসে তার বাচ্চা। বুয়া হয়তো তরকারী কাটছে। বাচ্চাটা চমৎকার ভঙ্গিতে হাত পা ছড়িয়ে শুরু করলো ভ্যা..ভ্যা।
বুয়া কান্না শুনে প্রথমে একটু ঝারি মারে, ঐ কান্দিস্ না।
ঝারি শুনে বাচ্চার কান্নার ভলিউম বেড়ে যায়। বুয়া এবার রাগ করে বিরক্তি সূচক কোন শব্দ ব্যবহার করে বলবে, মামা এরে রাইখ্যা আহি।
আমাদের কথা শুনার তোয়াক্কা না করেই বাচ্চাটা একটানে কোলে তুলে চলে যায়। আসতে আসতে আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা। অতঃপর বুয়া এলে বুয়ার পিছু পিছু দু মিনিটের মধ্যেই ভ্যা ভ্যা বাচ্চা হাজির। এরপর পাঠক বুঝতেই পারছেন। এই করে আমাদের দুপুরের খাবার টাইম পড়ন্ত বিকেলে শিফ্ট করে। রাতেরটা প্রায়ই বাদ যায়। আরো দু জায়গায় কাজ করা সহ নিয়মিত অজুহাত তো আছেই। বাজার আনতে আমার রুমমেট একদিন একটু দেরী করলো। বুয়া এসে বাজার নেই দেখে প্রচন্ড রেগে গেলো।
-কি হইলো, এখনো বাজার নাই কেন?
-এই এখনই চলে আসবে। আমি বললাম।
-ধ্যাত! বুয়া চরম বিরক্তি প্রকাশ করলো। জানেন না আমি আরো দু জায়গায় কাম করি। ঠিক টাইমে বাজার না আনলে আমি পারুম না।
বুয়া চলে গেলো। সেদিন আর এলোনা।
এমন চলতেই থাকলো। তৃতীয় হাতের খেলায় অসম্ভব দক্ষ এই বুয়া। আমরা তবুও তাকে ভুয়া বলতে পারিনা। আড়ালেও না। যদি বুয়ার করুণা শেষ হয়ে যায়। এখন তো তাও খেতে পাচ্ছি। কিন্তু বুয়া থাকলোনা। একটা নন ইস্যুকে ইস্যু করে বুয়া চলে গেলো। সেদিন আমারই বাজার করার কথা ছিল। কি একটা কাজে বেরিয়েছিলাম। আসতে একটু দেরী হলো। রুমে ঢুকতেই বুয়াকে দেখলাম। থমথমে মুখে বসে আছে। আমিই যেচে বললাম, খালা একটু দেরী হয়ে গেলো।
বুয়া জোরে চেঁচিয়ে বললো, কিসের দেরী? আপনাগো ফাও কাম কইরা শইলডা পানি হয়া গেলো।
আমার রুমমেট নিপুর পরীক্ষা ছিল। ও বুয়াকে বললো, খালা একটু আস্তে। পরীক্ষা আছে।
-কি আমি জোরে কথা কই? করুমনা আপনাগো কাম। বুয়ার গলার জোর আরো বেড়ে গেলো।
এরপরের কথাগুলো থাক! না বলাই ভাল। বুয়ার চিৎকারে অনেক লোক চলে এসেছিলো। চমৎকার একটা সিন ক্রিয়েট করেছিলো বুয়া।
এরপরে আমরা ভাবিনি আমরা আর বুয়া পাবো। অবশ্য তদবির চলছিল। এরই মাঝে হঠাৎ একজন বেশ ভদ্রস্থ চোখে চশমা পরা এক মহিলা এলো। আমি দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলাম, কাকে চাই?
মহিলা কিছু না বলে ভেতরে ঢুকলো। আস্তে করে বললো, তোমাদের বাসায় আমি কাজ করব।
আমি অবাক! বলার ভঙ্গীতে মনে হয় নিজের বাসায় এসে আমাকে কাজের ফর্দ বুঝিয়ে দিচ্ছে।
এই বুয়াই এখন কাজ করে। বেশ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মনে হয়। আমরা এই বুয়ার সামনে কোন উচ্চবাচ্য করিনা। গলা খাদে নামিয়ে কথা বলি। আমাদের মধ্যে নিপু দেখতে একটু ছোট। ও বুয়াকে মা ডাকতে শুরু করেছে। এর একটা কারণ আছে। আমরা জেনেছি এই বুয়া এলাকার বুয়াদের সর্দার। এই বুয়া কোন কারণে আমাদের উপর রেগে গেলে দূর ভবিষ্যতেও আমরা আর বুয়া পাব না। কাজেই আমরা খুব সাবধান। বুয়া রেগে দু একটা কটু কথা বললেও আমরা গা করিনা। একটু বেসরম হয়ে হে-হে করে হেসে কাটিয়ে দেই।
পুনশ্চ:
পাঠক! নচিকেতার একটা গান আছে। নিশ্চয়ই শুনেছেন। পুরুষ মানুষ দু প্রকার।
১.বিবাহিত।
২.জীবিত।
বিয়ের পরে বউ থাকায় একজন পুরুষ মরে যেতে পারে। সে আমি অবিবাহিত হলেও মানছি। কিন্তু বিয়ের আগে যে বুয়ার জ্বালা আছে। অবিবাহিত পুরুষ হয়েও আমরা কি জীবিত?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

