আমাদের মায়েরা সেদিন সাদা শাড়ীতে মাথা ঢেকে
তেজগা-রেসকোর্স দৌড়াচ্ছিলেন
শহরজুড়ে বিছিয়ে থাকা বধ্যভূমির কথা ভুলে
গোটা ঢাকাই ছিলো সে-মুখী
মায়েদের দায় ছিলো,
তারা একটা প্রতিশ্রুতি শুনতে গিয়েছিলেন
যাওয়ার আগে আমাদেরও ভুলিয়েছিলেন-
বঙ্গবন্ধু আসছেন, দেখিস বিচার হবেই।
আমরা কজন দিনভর উপোসমুখে
বড়ইতলায় আমাদের খেলাটা খেলছিলাম।
আমরা মানে আমি, জিয়া, জাহিদ ও সায়মা
যুদ্ধশেষে আমাদের বাবারা লাশ হয়ে পড়েছিলেন রায়েরবাজারে
আমাদের খেলাটায় আমরা সেই কথা তুলতাম
কার বাবা বেশি কষ্ট নিয়ে মরেছেন- অভিনয় করে বলা
ছিচকাদুনে সায়মাটাই হারত, একটু বলেই ভ্যা
চোখের পানিতে বাধ লাগিয়ে চোখমুখ শক্ত করে
আমরা বাকিরা চালিয়ে যেতাম।
কখনও আমি, কখনও জাহিদ, কিংবা জিয়া
জাহিদের বাবার চোখ দুটো কোটরে ছিলো না
ধারালো করাতে দুহাত কাটা হয়েছিলো জিয়ার বাবার
বাবাকে মারার আগে কলজে খুবলে বের করে নিয়েছিলো বদরের দল
জয় বাংলা বলার কুফরি করায় কিভাবে জিভে পেরাক গাথা হয়েছিলো-
সায়মা কখনোই বলতে পারতো না সে কথা।
আমাদের মায়েরা ফিরেছিলো প্রতিশ্রুতি নিয়ে
অমি ও শমীর বাবার বিচার পত্রিকায়ও উঠেছিলো
তারপর সব সুনসান ফের।
মুজিবের সাধারণ ক্ষমার কবচ ঝুলিয়ে পাড়ায় ঢুকে পড়েছিলো সেই ঘাতকেরা
জুম্মাবারে মসজিদের খুতবায় দেখি সেই লোক!
বাবাকে বন্দুকের বাটে পেটাতে পেটাতে
টেনে হেচড়ে তুলেছিলো মাটিলেপা গাড়িতে
সে গাড়িতে জাহিদ, জিয়া, সায়মার বাবাও ছিলো।
ফিলিস্তিন, বসনিয়া আর আফগানিস্তানের মুসলমানদের রক্ষা করতে
তার আকুল আর্তিতে হাত মেলাতে খুব ঘেন্না হয়েছে আমার বরাবর
আমাদের বাবারাও তো মুসলমান ছিলেন
প্রতি শুক্রবার সে মসজিদেই জুম্মা পড়তেন
সেই থেকে আমার জানা হয়ে গেছে
ধর্মের পোষাকের তলে লুকানো এইসব ঘাতকেরা
আসলে ধর্মকে মানে না, তাদের ধর্ম ভিন্ন
ধর্মের নামে অধর্ম কায়েম করতে চায় শুয়োরের দল
সেটা ঠেকাতেই আমরা সোচ্চার হয়েছি তাদের সেই পাপের বিচারে।
এইসব পাতকেরা মুজিবকে উঠতে বসতে গালি শোনায়
কিন্তু হাত বাড়ালেই তুলে ধরে মুজিবেরই দেয়া ছাড়পত্র
জিয়া থেকে শুরু করে দীর্ঘ সামরিক শাসনেই পুষ্টিই বেড়েছে তাদের
এই ফাকে যদি চাপা পড়ে মৃতদের দীর্ঘশ্বাস
শহীদ জননীর সঙ্গে আবার তাই জেগেছিলো জনতা
নিশ্চিত জেনো সেটা কোনো রাজনীতির দাবি নয়
আমাদের বাবার খুনের বিচার চাইতে আমরা কোনো দলের ধার ধারি না
মুজিবের ছাড়পত্র, জিয়ার ইনডেমনিটিতে আমরা প্রশ্রাব করি বারবার
তিরিশ লাখ লাশের বিচার হবে বিশেষ আদালতে
এই দাবি শহীদের স্বজনের, হাসিনা-খালেদার না
এই দাবি আমি, জাহিদ, জিয়া ও সায়মার মতো অকাল এতিমের
এই দাবি আদায়ে আমরা শেষ পর্যন্ত যাব
শেষ বদরটাকে ফাঁসি না দিয়ে ঘরে ফিরবো না
এই চল্লিশে এসে আমরা এখনও সেই খেলাটা খেলি
কার বাবা কতটা নৃশংস ভাবে মরেছেন
সায়মা এখনও আগের মতোই হারে
তবে আমাকে গোপনে দেখিয়েছে এক মহড়া
ঘাতকের ফাসির দৃশ্যগুলোর জীবন্ত বয়ান
ক্রোধ রোষ ও উচ্ছাসের অবিশ্বাস্য মেল
উচ্ছাসভরা সেই জীবন্ত ধারাভাষ্যের
সায়মা অপেক্ষায় আছে প্রথম হওয়ার
তার আগ পর্যন্ত আমরা বিধবা মায়েদের সান্তনা দিয়ে
প্রতিদিন একবার মিছিলে গলা মিলাই
সেখানে ভিড় করে আমাদের মতো হাজারো এতিম
আমরা কাদতে আসিনি
যুদ্ধাপরাধীদের ফাসিতে ঝোলাতে এসেছি
সে দাবি আদায় করেই আমরা নতুন খেলা খেলবো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

