বেশ আগে থেকেই প্ল্যান করে রাখা সত্বেও সাধু সঙ্গের প্রথম দিন যাওয়া হলোনা হঠাৎ ঝড় বৃষ্টিতে আমার উনার বেঁকে বসাতে। একা হলে চলে যেতাম। আনুশেহ'দি রে ফোন দিয়া জিগাইলাম অবস্থা কি, দিদি বললো চলে এসো, কোন সমস্যা নাই। তারপরও আমার উনারে বুঝাইতে পারলাম না। যাইহোক রওনা দিলাম পরদিন ভোরবেলা। ঘুম থেকে উঠলাম সকাল সাড়ে পাঁচটায়। ঘুছিয়ে বের হতে হতে সাত টা। গাবতলী গিয়ে মাথায় হাত! কোন বাসে সিট নাই! কি অবস্থা! একটা মধ্যম মানের বাসে সিট পেলাম, রওনা দিবে পৌনে নয়টায়। এরই মাঝে সেরে নিলাম নাস্তার পর্ব।
বাস ছাড়তে ছাড়তে নয়টা। আগের রাতে ঘুমিয়েছি তিনটার সময়, বাস ছাড়া মাত্র সিট টা হেলিয়ে দিয়ে দে ঘুম! ঘুম ভাঙ্গলো বাস যখন ধামরাইয়ে। চোখ খুলে দেখি বাস দাঁড়িয়ে, একলোক উঠছে বাসে উঠে সুপার ভাইজারের সাথে তর্কাতর্কি। ভাব চক্কর দেখে বুঝলাম ড্রাইভার কে পিটাবে। দুই লাফে সামনে গিয়েই লোকটারে এক হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম, ড্রাইভার কে মারতে যাচ্ছিলো তখন। সাথে সাথে ঐলোকের সাথের আরো তিনজন উঠে এলো। ঐ লোক গালি দিতে থাকলো আর আমাকে মারতে আসতে গেলো। (শালার যেইখানে যাই সেইখানেই ক্যাচাল
পৌঁছে গেলাম ফেরীঘাটে। আরিচার পাটুরিয়া ফেরীঘাট। লাইন অনেক বড় ফেরীতে ওঠার। আর সব ফেরীগুলা ঐপারে ছিলো। যখন ফেরীঘাটে তখন বাজে সাড়ে ১১টা। পাক্কা দুইঘন্টা বসে থাকলাম! গরমে অবস্থা কাহিল!
দুইঘন্টা পর উঠলাম ফেরীতে। আহ! শান্তি! খোলা নদীর আউলা বাতাসে খুব ভালো লাগছিলো।
সামনে দিয়েই যাচ্ছিলো আরেকটা ফেরী- (বাই দ্যা ওয়ে, আমি এই পথেই বাড়ি যাই)
ফেরীর তিনতলায় উঠে নদীর বাতাস পেয়ে খুশ হয়ে গেছি!
নদী পার হয়েই গাড়ি আবার চলা শুরু করলো, আর মাত্র একটু...তারপরই সাধু সঙ্গ। রাজবাড়ী পার হয়ে পাংশা নামিয়ে দিলো বাস। রিক্সায় করে সরদার বাসস্ট্যান্ড থেকে গেলাম অতনু দত্ত মার্কেটের সামনে। ওখান থেকে অটোরিক্সায় চড়ে একটা হাটে গেলাম (নাম ভুলে গেছি!)।
এইবার হৈলো বিপদ! একটা ব্রিজের গোড়ায় নামিয়ে দিলো। এইখান থেকে হেঁটে যেতে হবে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার! আগের দিন বৃষ্টি হওয়ায় জায়গায় জায়গায় কাদা!
খেয়াল করলে দেখবেন দুইটা শালিক আর একটা বক বসে আছে রাস্তার ওপর! যেতে যেতে রাস্তার পাশে আমরা ঘুঘুও দেখেছি!
৫০০ গজ মতো সামনে এগুতেই পেছন থেকে একটা করিমন আসতে দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আমি আর আমার উনি উঠে বসলাম করিমনে।
মাটির রাস্তার করিমনে চড়া আর রোলার কোস্টারে চড়া মুটামুটি একই কথা! এর মাঝে করিমন গেলো কাদায় ফেঁসে! কি অবস্থা! চাকা ঘুরে, মাগার গাড়ি চলে না! নেমে দুইজনে হাঁটা দিলাম। কিছুদূর হাঁটার পরই আবার করিমন ওয়ালা ডাক দিলো পেছন থেকে, সে ঠেলে ঠুলে গাড়ি কাঁদা থেকে তুলছে, মনে মনে বললাম, আরে বেটা আমারে কৈলেই পারতি! আমিও হাত লাগাইতাম! শহুরে বাবু মনে করেই কয়নায় মনে হয়! এইসব কান্ড কির্তী করে যখন পৌঁছুলাম লালন ভক্ত ধামে, তখন চলছে অনুষ্ঠান শেষের অনুষ্ঠান! বাজে তখন বিকাল তিনটা! বসে পড়লাম অনুষ্ঠানে। লাইভ স্ট্রিমিং করার আশা ছিলো, ল্যাপি বের করে নেট কানেক্ট করতে গিয়ে আক্কেল গুড়ুম! লাইভ স্ট্রিমিং করবো কি! নেটই থাকছেনা ঠিক মতো! (শালার জিপি!!) যাইহোক, বেশ কিছুক্ষণ গুতাগুতি করে একটা পোস্ট দিয়েই ক্ষ্যান্ত হলাম। পোস্টের কমেন্টের এন্সার দেয়ার আর সাহস হয়নি! বেশ কিছুক্ষণ পর মনে হলো, এম্নি ভিডিও করে রাখি! যাহ! ততক্ষণে অনুষ্ঠান শেষ হতে আর এক মিনিট! তাড়াহুড়া করে রেকর্ড করলাম। সেই একমিনিটের সাইজ গিয়া দাঁড়াইছে এক গিগার বেশি! এই শালারে কেমতে সাইজ করুম বুঝতাছিনা, পারলে কেউ উপায় কৈয়া দেন।
অনুষ্ঠান শেষ হতে আনুশেহ'দির সাথে কথা বলতে এগিয়ে গেলাম, দেখি সাধুরা তাঁকে একে একে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। আনন্দে তখন আনুশেহ'দির চোখে পানি!
পানি মুছতে মুছতেই হেসে ফেলে বললেন কথা-
জানালেন, গতকাল সন্ধ্যাটা ছিলো অপার্থিব, মাঠে বসে বাউল গান শুনতে শুনতে সন্ধ্যার আকাশে মিল্কিওয়ে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিলো!
আরো জানালেন, খুব সফল হয়েছে অনুষ্ঠান, খুব শান্তিপূর্ণ ভাবে। বাউলরা সবাই খুব খুশি। এরই মাঝে একজনের কাছে সুব্রতদা এসেছেন কিনা জিজ্ঞাসা করতেই ধরে নিয়ে গেলেন সেবা করতে (খাওয়াতে)। গিয়ে দেখি এলাহী কারবার! দুই তিন হাজার মানুষের খাবার দেয়া হয়েছে এখান থেকে।
খাচ্ছে সবাই প্লেট হাতে নিয়ে-
খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই দেখা বাউল মোহাম্মদ আলী ফকিরের সাথে। দেখা হওয়ার সাথে সাথেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন। খুব কষ্ট হলো তার পানে চেয়ে, ৩০ বছরের রাখা চুল-দাঁড়ি কেটে তাকে একপ্রকার নেংটা করে দিয়েছে শয়তানের বাচ্চাগুলো! কি অপমান, কি অপমান!
এবার ফেরার পালা। আবার রোলার কোস্টার! থুক্কু করিমন!
সাথে পেছন পেছন আসছিলো সাইকেল চালিয়ে এক গ্রাম্য ছেলে-
রোলার কোস্টারে চড়ে আমার অবস্থা কেরোসিন!
তারপরের কাহিনি খুব সহজ সরল। পাংশা রেইল স্টেশনে ঢাকার কোন ট্রেইন আছে কিনা জিগাইতে একটা ট্রেইন দেখায়া দিয়া বলা হইলো অইটাতে রাজবাড়ি যাইতে, অইখান থিকা বাসে ঢাকা। ট্রেন ছেড়ে দিবে এমন সময় স্টেশনে পৌছেছি, টিকিট কোথায় কাটবো তা এক পুলিশকে জিজ্ঞাসা করতে বললো লাগবে না, উইঠা পড়েন!
রাজবাড়ী পৌঁছে কোন ঢাকার বাস পাইলাম না, ওইখান থেকে গোয়ালন্দ মোড়, ওখান থেকে বাস, তারপর সোজা ঢাকা! রাত ১টায় বাসায় ঢুকলাম। তারপর আর কিছু জানিনা, ঘুমে অজ্ঞান ছিলাম।
বিঃদ্রঃ পথ নির্দেশ দিয়ে সহায়তা করেছে বন্ধু ও ব্লগার গ্যাব্রিয়েল সুমন । এবং আমার সবকাজে সহায়তা করেছে আমার হবু সহধর্মিনী রুপালী।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে আগস্ট, ২০১৫ রাত ১:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




