দেশে জামাতের রাজনীতি থাকুক কি না থাকুক। যে দর্শন তারা এদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র ঘাড়ে চাপিয়ে গেছে। সেটাই ভবিষ্যতে জামাতের জন্য উপকারী হয়ে আসবে বার বার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গিয়ে অনেকে একে রাজনৈতিক বিচার বলছেন। কেউ বলছেন নাটক। এমনটা তারা বলতেই পারেন। বলার পেছনে তাদের যুক্তি অবশ্যই আছে। একটা যুক্তি ছিলো এরকম। রাজাকারদের গুরু গোলাম আযমকে কেনো গ্রেফতার করে না সরকার। ১৯৭১ সালে ষড়যন্ত্রের হোতা তো এই নাটের গুরু। তাকে আরাম আয়েশে রেখে সরকার কেনো জামাতের শীর্ষ নেতাদের জেলে আটকে রাখছে। এসব বাস্তবতা দেখে অনেকে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের মধ্যে রাজনীতি হচ্ছে বলে মনে করতে পারেন।
অন্যদিকে সমাজের আরেকটি বিশাল অংশ মনে করে, সরকারের তিন বছর কেটে গেলো। অথচ বিচার শুরু হয়েছে মাত্র একজনের। তাই যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে চলছে এক ধরনের প্রহসন। ইংরেজিতে একটি কথা আছে মর্নিং শো’স দ্যা ডে(সকাল দেখেই বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে)। লম্বা সময় নিয়ে যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলো, তাদের একজন দেলোয়ার হোসেন সাঈদী। সাঈদীর বিরুদ্ধে ৫০০০ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্ট সাথে কিছু রেফারেন্স বই ও পুরানো পত্রিকা। তদন্ত কর্মকর্তারা সাঈদীর বিষয়ে কাজ করার আগেই ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও কিছু দৈনিক চিহিৃত রাজাকারদের সম্বন্ধে তথ্য উপাত্ত দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের কাজ সহজ করে দিয়েছে। যে কারণে দেখা যায় রাজাকারদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে আসা লোক সাক্ষ্য প্রদান কালে যা বলছে সে সব তথ্য সরকারের মুখপত্র দৈনিক ১০-১২ বছর পূর্বে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতো। যদিও সত্য সব জায়গায় এক। এখন লাখ টাকার প্রশ্ন হলো, সরকারের তদন্ত টিম দীর্ঘ দিন অনুসন্ধান করে নতুন কি তথ্য পেলো ?সাক্ষী ও তথ্য খোঁজাখুঁজির জন্য যে সময়টি নেয়া হলো। তা কি সত্যিই তদন্ত কাজে লেগেছে? বিচার দেখে তো তা মনে হচ্ছে না। সরকারে গ্রিন সিগনাল অনুসারে তদন্ত চলেছে মনে হচ্ছে। এই যদি হয় সরকারের তদন্ত কমিটির তদন্ত, তাহলে এই দীর্ঘ সময় নেওয়ার প্রয়োজন কি ছিলো? তাদের রিপোর্ট গুলো বাইনডিং করে(বাধাই করে) সুন্দর মলাটে ছাপাতে কি তিন বছর? যে পর্যন্ত না সাঈদীর বিরুদ্ধে নতুন তথ্য শোনা যাচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আমরা তদন্ত কমিটির কাজ গুলোকে এভাবেই মূল্যায়িত করবো।
সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে যুদ্ধাপরাধে অভিযোগে অভিযুক্তদের যে আইন দিয়ে বিচার করা হচ্ছে তার প্রয়োগ দেখে। সাধারণ প্রচলিত আইন এখানে প্রয্যেজ্য নয়। অর্থাৎ ফৌজদারি কার্য বিধি, সাক্ষ্য আইন এখানে কার্যকর নয়। ১৯৭৩ সালে প্রণীত যুদ্ধাপরাধ আইন ও সে অনুসারে প্রণীত কার্যবিধি যা ২০১০ সালে সংশোধিত আকারে তৈরি করা হয়েছে। এসব আইন দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বিচার প্রক্রিয়া। এর ফলে মামলা পরিচালনায় আসামী পক্ষের আইনজীবীদের ক্ষেত্র বিশেষে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জেরা প্রসঙ্গে যে নীতিটি এখানে প্রয়োগ করা হচ্ছে তা দেখে। সাক্ষী যে বিষয়ের ওপর সাক্ষ্য দিচ্ছেন তার ওপর জেরা না করলেও এখানে চলে। যার ফলে প্রতিটি সাক্ষীকে এখানে অবান্তর ও উদ্ভট সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় । জেরায় যেসব প্রশ্ন করা হচ্ছে, তার প্রাসঙ্গিকতা এখানে তোলা যাবে না। চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিম নিজেই এটি আদালত কক্ষে বলেন। এই স্পেশাল নীতিটি প্রয়োগের ফলে বহু অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন জেরায় চলে আসছে। ফলে একজন সাক্ষীকে জামাতের দুই-তিন জন আইনজীবী দুই দিন, তিন দিন লাগিয়ে জেরা করছেন। সেই অপ্রাসঙ্গিক জেরা থেকে চলে আসছে কেউ বিদ্যুৎ চোর, কেউ ব্যাংকে ডিফল্টটার খাতায় নাম, কারোর শাশুড়ি ভিক্ষুক, কেউ দুই বউ রেখেছেন, কেউ যৌতুকের বা নারী নির্যাতনের জন্য মামলা খেয়েছেন এসব। আর সেসব বিষয়কে জামাতি বুদ্ধিজীবী ও বিএনপি মনোভাবাপন্ন পত্রিকা গুলো রিপোর্ট লেখার শুরুতে নিয়ে আসছেন। প্রচলিত আইনের ফৌজদারি কার্যবিধিতে সাক্ষীর চরিত্র বিবেচ্য একটি বিষয়। কিন্তু এখানে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযেজ্য নয় বলে জানিয়েছেন খোদ ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান। এ কারণে এসব জেরায় আসামী সাঈদীর অপরাধ মিথ্যা প্রমাণে কি ভূমিকা রাখবে তা আমরা বুঝে উঠতে পারছিনা। মৌখিক সাক্ষীকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য আসামি পক্ষের হাজির করা মৌখিক সাক্ষীই যথেষ্ট। তা না করে সাক্ষীকে বিদ্যুৎ চোর, গম চোর, ভিক্ষুক প্রমাণে অভিযুক্ত আসামী সাঈদীর কি লাভ? এসব দেখে মনে হচ্ছে এ আমলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে না। বিচারের নাম করেই সময় পার করে দেবে সরকার। সেটাই এখন দিবালোকের মত পরিষ্কার।
যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবে না। জনমনে যখন এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছিলো তখনই অনেকটা তাড়াহুড়ো করে গোলাম আযমকে গ্রেফতার করা হলো। সবাই ভেবেছিলো, আরাম আয়েশে থাকা নাটের গুরু গোলাম আযম কে সরকার( ট্রাইব্যুনাল) জামিন দেবে। যেহেতু অন্য এক অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী আবদুল আলীমকে ট্রাইব্যুনাল(সরকার) জামিন দিয়েছে । সে ভরসায় গোলাম আযমের আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে তার জন্য জামিন আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তা হয়নি। গোলাম আযমকে জেলে ভরা হলো। এখান দেখার বিষয় এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি পরিবর্তন আনে।
মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরোধিতা করায় গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর গোলাম আযম এদেশে ফিরে আসেন পাকিস্তানি ভিসা নিয়ে। প্রথমে জিয়া সরকার, পরবর্তীতে এরশাদ সরকার গোলাম আযমকে বিনা ভিসায় ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত এদেশে অবস্থান করার সুযোগ দেন। পরে গোলাম আযমের নাগরিকত্বের ব্যাপারে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়। তৎকালীন বিএনপি সরকারের রাজাকার সহানুভূতিশীল বিচারপতিরা গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়। তাইতো মাঝে দেখা যায় উচ্চ আদালতের বিচারপতিরা গোলাম আযমের সাথে সভা করছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন।
অনেক রাজাকার ও তাদের সমর্থনকারীরা গোলাম আযমকে ভাষা সৈনিক হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু যারা ভাষা আন্দোলনের অগ্রপথিক ছিলেন সেই তারা গোলাম আযমকে ভাষা আন্দোলন করতে দেখেননি। বাংলা ভাষার দাবিতে কুমিল্লার বীর পুত্র ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে দাবি তুলছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে রচিত হয় ভাষা আন্দোলন। সেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৭১ সালে বুড়ো বয়সে রাজাকারদের হাতে এক পুত্র সহ নিহত হন। অন্যদিকে গোলাম আযমরা পায় পাকিস্তানের মেডেল পরবর্তীতে এদেশের সামরিক বাহিনী খেতাব স্বরূপ পুত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল।
১৯৭১ থেকে ২০১২ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪১ বছর কেটে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বহু যুদ্ধাপরাধী বিচার না হওয়ার কারণে তাদের বংশ বৃদ্ধি ঘটেছে। এই বংশ বৃদ্ধিতে পোষক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে স্বাধীনতার পক্ষ শক্তির দাবিদার লোকজন। যুদ্ধাপরাধীদের সাথে আত্মীয়তার যে নিবির বন্ধন তৈরি হয়েছে। তাতে ঢিল মারবে কে? সত্যি সত্যি যদি কেউ তাতে ঢিল মারে তবে দলবেঁধে সবাই তাকে মারতে আসবে। তখন তাদের আক্রমণে হয়ত রচিত হবে আরেকটি ১৫ আগস্ট। অতীত ইতিহাস বলছে ১৯৭৫ সালে এই যুদ্ধাপরাধীরাই জেলে থাকা অবস্থায় স্বাধীনতার পক্ষ শক্তিকে নির্মূল করে দিয়েছিলো। আজও সেই একই প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে। সরকারকে ফেলে দেবার বিএনপির হুংকার কি সেই আলামত?
চট্টগ্রাম রোডমার্চের ভাষণে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সেনাবাহিনী নিয়ে যে উস্কানি মূলক বক্তব্য দিলেন। তাতে মনে হচ্ছে তিনি এই মুহূর্তে বাংলাদেশে একটি সামরিক ক্যু চান। যেই সামরিক ক্যু তার প্রিয় আলবদর, রাজাকারদের বাঁচাবে। পাশাপাশি তাকে ক্ষমতায় নিয়ে যাবে। সেনাবাহিনীর অফিসারদের বদলী, অব্যাহতি, চাকুরী কখনও রাজনীতির বিষয় বস্তু হতে পারে না। সেনাবাহিনী চালাবে সেনাবাহিনীর লোকেরা। রাজনীতিবিদদের সেনাবাহিনী নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নাই। সেনাবাহিনীর কেউ যদি অপকর্ম করেন তবে তার বিচার সেনা আইনে হবে। তাদের নিয়োগ, বদলী, বরখাস্ত, প্রতিটি বিষয় দেখার জন্য একটি নীতি মালা আছে। কিন্তু এটি নিয়ে রাজনীতি চলে না।
এই প্রজন্ম দেখতে চায়না রাজাকারদের বাঁচানোর জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কতিপয় অফিসার ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্টের মত রাজনীতির মাঠে নেমেছে। অতীতে এই দৃশ্য দেখা গিয়েছিলো। এজন্য বাংলাদেশের গণতন্ত্র মনা একটি বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের সেনাবাহিনীকে নেতিবাচক ভাবে মূল্যায়ন করে। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত যে বিএনপি নেতা দেশের সেনা বাহিনীকে “সোনা বাহিনী বলে” কুরুচি পূর্ণ মন্তব্য করেন। তার বিচার হয়না। দেশের ভিতর ঘাপটি মেরে বসে থাকা পাক বাহিনীর ওই আল বদর রাজাকার বাহিনীর অস্তিত্ব থাকার কারণে তিনি যাকে তাকে এসব বলতে সাহস পান।
পরিশেষে বলতে চাই বিরোধী দলের প্রতিটি ইস্যুকে যেভাবে সরকারের ব্যর্থ মন্ত্রীরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র বলে গলা ফাটাচ্ছেন। তাতে জনগণের মনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সন্দেহ দানা বেধে উঠছে।বিচারের মত এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সচেতন জনগণের নিকট সরকারের সস্তা রাজনৈতিক বুলি বলে মনে হচ্ছে। যে সরকারের সময় হত্যা মামলার এক আসামী এবং এলাকার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রাষ্ট্রপতির মার্জনা পান। ভূমি দস্যুর পুত্র পলাতক থেকে নিম্ন আদালতে বেকসুর খালাস পান। তারা করবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার? এটা কস্মিণকালেও না। খবরের সূত্র এই লিংকে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




