কোন একটা খবর আমাকে বেশ বিচলিত করেছিল; মনে হচ্ছিল আমি ফিরে গেলেই বোধহয় সবকিছু আগের মত হয়ে যাবে। মালয়শিয়ার রঙিন আলো, স্বাধীন জীবন একমুহূর্তে অর্থহীন মনে হলো। এক রাতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম ফিরে যাবো দেশে, যেতেই হবে। টিকেটও করে ফেললাম । ব্যাগ গোছানো শুরু করতেই হোস্টেলমেটরা অবাক হয়ে গেল।
ফিরে আসার সময় মেয়েরা যে যার মত করে কিছূ স্মৃতিচিহ্ন দিচ্ছিল। কেউ দিয়েছিল ছোট্র পুতুল, নুরোল এর দেয়া মাথার ক্যাপ, 'রিমেমবার মি' লিখে দিয়েছিল ও, কেউ কেউ তাদের নিজের ছবি দিয়েছিল...। আমার একটা ব্রেসলেট সিতি নামের এক রুমমেটের বেশ পছন্দ ছিল । ও সব সময় বলত আমি ফিরে গেলে ওর জন্য যেন এরকম একটা পাঠিয়ে দেই। ব্রেসলেটটা আমারও প্রিয় ছিল, কিন্তু ফিরে আসার সময় আমি সেটা দিয়ে এসেছিলাম ।
হোস্টেল ছেড়ে আসার সময় একবার সামনে দাঁড়িয়ে বাড়িটাকে শেষবার দেখলাম; কেমন জানি অন্যরকম লাগছিল। জালান সেনতোসাকে পেছনে ফেলে আমি কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দিলাম।
এতটাই হুট করে চলে আসা যে হোস্টেল সুপারভাইজারকে সামনা-সামনি জানানোর সুযোগ ছিলনা। তবে আমি বিকালের পর হোস্টেল ছাড়ার সময় সিতির টেবিলে (ও ততক্নে কাসে চলে গিয়েছিল) সুপারভাইজারের উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখে রেখেছিলাম।
সব চেকিং শেষ করে যখন শুধু প্লেনে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তখন আবাং নিজামের (হোস্টেল সুপারভাইজার) ফোন এল। আমাকে জানাল সিতি আমার চিঠি ওকে দিয়েছে এবং আমার চলে যাওয়ার কথা বলার সময় কেঁদেই ফেলেছিল। নিজাম আশা প্রকাশ করল আমি খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসব; আমি কোন উত্তর দিতে পারিনি তখন...।
---
গত বছর জুনের শেষ সপ্তাহে আমি ফিরে এসেছিলাম। অনেকদিন হয়ে আসল, কিনতু এখনও খুব মনে পড়ে ওখানকার অনেক ছোট ছোট কথা।
চলে আসার সময় ছোট-খাট অনেক কিছু নিয়ে আসা হয়নি স্বভাবতই। আমার টেবিলে হালকা নীল রঙের, সাদা লেইস এর কভার দেয়া ছিল; একটা ছোট্র, হালকা কফি কালারের ফ্লোরম্যাট কিনেছিলাম; সব্জি কাটার কাঠের হাতলওয়ালা নতুন ছুরিটা তখনও মেয়েরা মাঝে মাঝে চেয়ে নিত, এখনও ওটার পুরোপুরি ব্যবহার হয় কোন সন্দেহ নেই। আমার খাওয়ার প্লেটটার উপরটা ছিল সাদা, আর পেছনটা আকাশী-নীল- কেউ না কেউ তো সেটাতে খায় আবার ধুয়ে রাখে এখন নিশ্চয়ই।
এখন শনি-রবিবার বিকেলবেলা মনে হয় হোস্টেলের সামনে সেই ব্যাটমিন্টন, হ্যান্ডবল কিনবা ফুটবল খেলার কথা। টিভিতে হিন্দি মুভি চললে মনে পড়ে হোস্টেলমেটরা কত আগ্রহ নিয়ে দেখত; নাইজোয়া নামে এক মেয়ে ছিল ও সব সময় আমাকে ডাকতে যেতো কোন হিন্দি মুভি শুরু হলে , 'আইরিন, হিন্দুস্থানী...' আপন মনেই হেসে উঠি এখন। এখনও নিশ্চয়ই জালান সেনতোসার রাস্তা দিয়ে ছুটির দিনের বিকেল বেলা সেই আইসক্রিমওয়ালা টুংটাং ঘন্টা বাজিয়ে যায়, আর সব মেয়ে ছুটোছুটো করে বার হয়ে আসে; শুরু হয় আইসক্রিম পর্ব ।
কোন ছবি তুলে রাখা হয়নি হোস্টেলের। কিনতু আমি এখনও মনে করতে পারি এমনকি জালান সেনতোসার রাস্তার বাঁকটা পর্যন্ত। লিখতে গেলে আরো অনেক ছোট-বড় কথা লেখা যায়, তবে আপাতত আমার ভীনদেশে, ভিন্ন সংস্কৃতির, সম্পূর্ন অজানা মেয়েদের সাথে প্রথম হোস্টেল জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ননার ইতি টানছি এখানেই...।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০০৮ বিকাল ৫:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


