একটা মৃত্যুর পর আরো কিছু জীবন জীবন্ত লাশ হয়ে যায়; একটা যুদ্ধের পর শুরু হয় আসল যুদ্ধ - যেমন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পরও এখনও আমরা নিরন্তর যুদ্ধ করে চলেছি; আর একটা ঝড়ের পর শুরু হয় আরেক ঝড়। প্রকৃতির এক তান্ডব ঠেকাতে প্রকৃতির আরেকরূপ, সুন্দরবন, নিজেকে শ্রীহীন করে দিল আজ । তারপরও ২৫০ মাইলের গতিবেগ হাজারো মানুষের জীবন আর মৃত্যুর দুরত্বকে পলকেই পার করে ফেলল , ওলট-পালট হলো দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
পুরো দেশবাসী এখন জেগে উঠেছে সেইসব আর্তনাদরত মানুষের সাহায্যার্থে। সেদিন বাসেও দেখলাম কতগুলো ছেলে ফান্ড কালেকশনের করছে। আমাদের এলাকা থেকে দেখলাম মাইক্রোবাস ভর্তি করে কাপড় সংগ্রহ করা হয়েছে। কেউ কেউ অবশ্য বলল, এগুলো শেষ পর্যন্ত নিজেদের পকেটস্থই হবে! কিন্তু আমি খুব করে তা অবিশ্বাস করতে চাই।
আশংকা অবশ্য একটা থাকেই; কয়েকমাস আগে যখন চট্রগ্রামের ভূমিধ্বস হলো তখনও আমাদের অন্তরে হাহাকার জেগেছিল। আমার খুব মনে আছে প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়ে কোন না কোনভাবে সাহায্য করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু সেভাবে কিছুই পারিনি; শুধুমাত্র বাড়ীতে বাড়ীতে যখন ফান্ড সংগ্রহ করার জন্য একটি দল আসল, সামান্য কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়েছিলাম; কারণ ছিল ওটাই - খানিকটা অবিশ্বাস !
আমার কেন জানি মনে হয়েছিল চট্রগ্রামের ভূমিধ্বস ট্র্যাজেডি আমাদের মন থেকে খুব দ্রুত মুছে গিয়েছিল। খবরের কাগজগুলোতে ছবি/খবর কমে এসেছিল দ্রুত। এই আশংকাটা আমার এবারও হচ্ছে। সামহোয়্যার ইনের এবারের এস.এম.এসের উদ্যোগটা ভাল। আমরা অনেকেই কিন্তু ১-২টার বেশী সিম কার্ড ব্যবহার করি। কিন্তু তারপরও এর ধীর গতি আমাকে "দ্রুত ভুলে যাওয়ার" আশংকায় ঘিরে ফেলছে বারবার।
আমার এক টিচারের উদ্যোগে আমাদের ওরাকল ফোরামের পক্ষ থেকে আমরা ফান্ড কালেকশন করা শুরু করলাম। ব্যাপারটা খুব সহজ হয়নি কেন জানি আমাদের জন্য! তবে খুব সামান্য পরিমান সাহায্য হলেও প্রথমেই সাড়া পাওয়া গেল যাদের কাছ থেকে তাদের মোটামুটি বেকারই বলা চলে। অথচ যারা ভাল সংস্থাগুলোতে আছেন তারা সব জেনেও সাড়া দিতে কেন জানি ঢিলেমী !
বিদেশ থেকে সাহায্য আসছে, দেশের বিভিন্ন সংস্থাগুলো এগিয়ে এসেছে; আমরাও অনেকেই সাহায্য করছি আবার অনেকেই ঠিক বুঝতে পারিনা কোথায় যেয়ে সাহায্য দিতে হবে। কিনবা সাহয্যের পরিমান কম হলে সংকোচে আর এগুনো হয় না। এক্ষেত্রে যেটা জরুরী সেটা হলো ছোট-বড় জোট হওয়া। সবাই ব্লগ পড়েনা তাই ব্লগের এস.এম.এস এর ব্যাপারটা হয়ত সেভাবে ছড়ায়নি। তাই আপনার কলিগ, বন্ধু, শিক্ষক, আত্মীয়দের বার বার জানিয়ে দিন দেখা হলেই, কথা হলেই; মাত্র তো দু'টাকার ব্যাপার। একা একা ৫০-১০০ টাকা নিয়ে প্রথম আলো ত্রাণ তহবিলে যেতে যদি সংকোচবোধ হয় তাহলে আরো কয়েকজনকে বলুন; আপনার ওই ৫০ টাকাই হয়ত কারো এক বেলার খাবার কিবনা কোন ছোট বাচ্চার স্যালাইন কিনতে কাজে লাগবে। তাই হাত গুটিয়ে নিবেন না। লোক দেখানো নয়; মন থেকে সাহায্য করুন।
একটা বিষয় লক্ষ্যনীয়, সব অঞ্চলগুলোতে সাহায্য ঠিকমত পৌছাচ্ছে কিনা। একই জায়গাতেই যদি বিভিন্ন টিম ঘুরে ফিরে যায় তাহলে অন্যান্য অঞ্চল ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাই আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি দরকার তথ্যগত সাহায্যও।
কেউ কেউ বলছে, বিদেশ থেকে যে পরিমান অর্থ আসে তা ঠিকমত বিতরন করলে আমাদের আর উঠেপরে সাহায্য করতে লাগবেনা। এটা একটা সত্য, অনিয়ম হবেই; হয়ত কম, হয়ত বেশী। আবার কিছু পরিকল্পনার অব্যবস্থাপনা, দূরদর্শীতার অভাবও থাকবে। তাই বলে কি হাত-পা গুটিয়ে, এই শীতে লেপমুড়ি দিয়ে টিভিতে সিডর দুঃস্থদের আহাজারি দেখে আহা-উহু করলেই হবে ?
ঝড়ের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্থ এই মানুষগুলোর খাবার লাগবে, কাপড় লাগবে, আহতদের চিকিত্সা দরকার, নতুন ঘর তোলা দরকার এবং তারপর কর্মসংস্থানের দরকার। আসুন না, না হয় অল্প-স্বল্পই কিছু একটা, তবুও একটু সাহায্য করি ওদের ; নিজে সাহায্য করি এবং অবশ্যই আরেকজনকে সাহায্য করতে বলি। খুবই দ্রুত... এখনই সময়।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে নভেম্বর, ২০০৭ রাত ১০:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


