somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আবারো মালয়শিয়া !!! (পর্ব-৪) : উড়াই চলো স্বপ্ন ডানা, আকাশ ছুঁতে নেই যে মানা...

২৮ শে মে, ২০০৮ রাত ১:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম পর্ব : Click This Link
দ্বিতীয় পর্ব : Click This Link
তৃতীয় পর্ব : Click This Link


নীচে তাকালে বিশাল বিশাল নাম না জানা গাছ- যার গোড়া দেখা যায়না, আশেপাশে জংলা পাহাড় কিনবা টিলা - আচমকা সামনে এসে পড়ছে যে বুক ঢিপ ঢিপ করে উঠে। একটু পর পর দাঁড়িয়ে থাকা থামগুলোর সাথে লাগানো সার্চ লাইটের তীব্র আলো গাঢ়, ঘন কুয়াশার বুক চিরে সন্ধ্যের পরিবেশটাকে এমনিতেই রহস্যময় করে তুলেছে; এইসময় Cable Car - টি যদি হুট করে বন্ধ হয়ে যায় এবং হাজার মিটার উপরে দুলকি চালে দুলতে থাকে কেমন লাগবে তখন !

গেনটিং হাইল্যান্ড এর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা বলছি । একটু শুরু থেকেই শুরু করি ।

সকাল বেলা আলসেমি, গল্পগুজব আর কাজে-অকাজে বাসা থেকে বাস স্টপেজ পৌঁছতেই দুপুর হয়ে গেল । টিকেট কেটে বাসের জন্য অপেক্ষা আরো আধ ঘন্টার মত। অবশেষে বাস ছাড়ল, যাত্রাপথ গেনটিং হাইল্যান্ড । ঘন্টা দেড়েক কি তারও একটু বেশী সময়ের এক টানা বাস যাত্রা শেষ হলো আরেকটি স্টপেজে এসে। কুয়ালালামপুরের গরম আবহাওয়ার বদলে এখানে হিম হিম ভাব জানিয়ে দিল আমরা সমতল ভূমি থেকে অনেক উঁচুতে আর গেনটিং থেকে খুবই কাছে। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে , তাই পেট পুঁজো সেরে নিলাম। টুকটাক দোকান-পসারে উঁকি দিলাম । এক বিশাল দোকানে নানা রকম শুকনা(বিশেষ উপায়ে সংরক্ষিত) ফলের সমাহার থেকে কিছু টুকরা মুখে দিয়ে দেখলাম । সময় খুব বেশী নেই হাতে; গেনটিং হাইল্যান্ড পৌঁছাতে আরো একটি বাহনে সওয়ার হতে হবে আর তা হলো - Cable Car।

খুব বেশী বড় লাইন না, তবে সবাই সারি বদ্ধভাবে হেঁটে Cable Car -এর বেদীতে উঠল । বিশাল বিশাল ব্যস্ত কলকব্জা - ঘুরছে ,শব্দ করছে। একটার পর একটা Cable Car আসছে। একেকটাতে ছ’জন বসা যাবে। ঝটপট বসে পড়লাম একটাতে।

প্রথমবারের মত Cable Car -এ চড়া, কোন ধারণাই নেই এই ভ্রমণ সম্পর্কে । Cable Car নড়ে উঠে চলা শুরু করল; মুল পাদদেশ ছেড়ে এবার পুরো শুণ্যে অগ্রসর! অনুভূতি তখন হতবিহ্ববল। নীচে তাকালে মাথা ঘুরে যায়। একটু ধাতস্থ হওয়ার আগেই সমান্তরাল যাত্রাপথের বদলে আমরা উপরের দিকে উঠতে লাগলাম; মাঝে মাঝে কোন টিলার দিকে ধেয়ে যাচ্ছে Cable Car, সেই সাথে হৃৎপিন্ডের ধুকপুক বাড়ছে, কিন্তু শেষ মুহুর্তে টিলা ছাড়িয়ে হুশ করে উপরে উঠে যাই । Cable Car কখনও দ্রুত কখনও ঢিমে তালে চলছে। গাঢ় থেকে গাঢ়তর কুয়াশার চাদর মুড়িয়ে ফেলেছে আমাদের ততক্ষণে- কিছুই দেখা যাচ্ছেনা বাইরে পরিস্কার ভাবে। শেষ পর্যন্ত মিনিট বিশেকের শ্বাসরুদ্ধকর Cable Car যাত্রার যাত্রার অবশান ঘটিয়ে আমরা পা রাখলাম ” City Of Entertainment” -এ ।

চারপাশে হালকা কুয়াশার আস্তরণ দেখে আর ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা মুখে লাগতেই মনে পড়ল সাথে গরম কাপড় আনা উচিত ছিল। তবে হিম হিম ভাবটাও বেশ লাগছিল। এবার দেখার বিষয় কোন দিকে যাবো, কিভাবে যাবো ইত্যাতি ইত্যাদি। গেনটিং হাইল্যান্ডে ইনডোর, আউটডোর গেম আছে , থাকার জন্য হোটেল আছে আর আছে জমজমাট Casino । ”আকাশে হেলান দিয়ে, পাহাড় ঘুমায় ওই ...” , কিন্তু গেনটিং হাইল্যান্ড কখনও ঘুমায়না।

পথ ঠিক করতে না পেরে কয়েক মিনিট এদিক ওদিক হাঁটাহাটিতে হাঁপিয়ে উঠে কুয়াশার মাঝেও ঘেমে উঠলাম। জিরিয়ে নেয়ার জন্য বসলাম এক জায়গায়। সামনেই দুই চাইনিজ বাচ্চা, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে, আট-নয় বছর বয়স হবে, অনেক হইচই করছিল। কিউট চেহারা, মিস্টি হাসি আর দুষ্টুমিভরা চোখের চাইনিজ মেয়েটা দৃষ্টি আকর্ষণ করল সহজেইএবং মেয়েটাও তার দুষ্টুমির ফাঁকে বাঁকা চোখে এদিকে দেখে নিল। রতনে রতন চিনে ; দুষ্টুমিতে দু’পক্ষের অংশগ্রহণ শুরু হলো- জ্যাকি চ্যাং এর ক্যারাটে স্টাইলে হাতের ইশারা আর নানা ভঙ্গি, অদৃশ্য ইন্দ্রজালিক power এর গোলা ছোঁড়াছুঁড়ি চলল। মেয়েটা পকেট থেকে কি জানি বার করল (হুইসেল কিনবা চকলেট – ঠিক মনে আসছেনা), আমি এবার একটু অভিনয় করলাম; খুব ভাব নিয়ে আমিও পকেট থেকে কিছু একটা বার করে আনার ভঙ্গি করলাম। আগ্রহী চোখ তখন আমার হাতের দিকে, শূণ্য মুঠো মেলে ধরলাম আমি । ব্যাস , আমার প্রতিপক্ষ হেসে কুটোপাটি। হাল ছাড়িনি এরকম মুখভঙ্গি নিয়ে অন্য পকেটে হাত দিলেও কাচুমাচু মুখে খালি হাত বের করে আনলাম- মেয়েটার পেট চেপে হোহো-হিহি আর ঠেকায় কে তখন ! আগ্রহের মাত্রা যখন বাড়ে, তখন মানুষ একটু কাছে আসতে চায়, একটু ছুঁতে চায়- স্বভারজাত বৈশিষ্ট্য। আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম এই মেয়ে আমার কাছে আসবে। আমি শুরু থেকেই বসে থাকলেও দুষ্টুমির ফাঁকে ফাঁকে ওপাশের বিশেষ আগ্রহেই আমাদের ইঞ্চি গত দুরত্ব কমে আসছিল । power বিনিময় খেলাচ্ছলে মেয়েটা কাছে এসে হাত ছুঁয়ে গেল । আমি মনে মনে হাসি। আমাদের মধ্যে কোন ভাষার আদান-প্রদান হয়নি ; যেটা চলছিল তা দুষ্টু-মিষ্টি ভাব তরঙ্গ। এবার ওঠা জরুরী এবং উঠে হাঁটাও দিলাম। মনে হচ্ছিল কিছু একটা হবে এবং তাই হল । পেছন থেকে চাইনিজ মেয়েটা চিৎকার দিয়ে উঠল , ”হেইইই” , সাথে সাথেই আমিও পাঁই করে ঘুরে পাল্টা চিৎকার । আমাদের দুজনের হাতই বিশেষ ভঙ্গিতে দু’জনের দিকে তাক করা । তারপর ফিল্মি এ্যাকশন স্টাইলে হাত গুটিয়ে নিলাম দুজনই। খিলখিলিয়ে হাসি অন্যপক্ষের । আমি হাত উঁচিয়ে টাটা দিতে দিতে পেছন ফিরে হাঁটা দিলাম।



ইনডোর গেম সেকশনে দু’বার চক্কর দিলাম । আউটডোর গেমস এর নানা রাইডগুলো টানেল থেকে দাঁড়িয়ে দেখলাম। অবশেষে যেখানে যেতে চাইছিলাম তার দিকনিদের্শনা পাওয়া গেল। এটাও ইনডোর সেকশন। এখানে বেশকিছু রাইড আছে, চকমকে দোকান আছে স্যুভেনির হিসেবে কেনাকাটা করার জন্য। নকল ”স্ট্যাচু অফ লিবাটি” দেখলাম। একটা মঞ্চে দেখা গেল, এ্যাক্রোব্যাট শো চলছে। সরাসরি এরকম শো কখনও দেখিনি। চাইনিজ ছেলেমেয়েদের শারীরিক কসরৎ, নানা মনোমুগ্ধকর ভঙ্গিমায় নিজেদের ভারসাম্য রক্ষা - এই শো দেখা যেন একটা বোনাস ছিল আমার জন্য।



একটা 3D শো দেখার জন্য টিকেট নিলাম। সিট বেল্ট বেঁধে, 3D শো দেখা শুরু হলো; কালো চশমা পড়তেই সবকিছু যেন চোখের সামনে উঠে এলো। চুপচাপ এই শো দেখার কোন উপায় নেই। মুভিতে কোন সিঁড়ি ঘরের ঘোরপাঁচের সাথে সংগতি রেখে দর্শকসারির চেয়ারের সারি কখনও ডানে, কখনও বামে সরতে লাগলো । কখনওবা একেকটা চেয়ার প্রায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, উলটে-পালটে যাচ্ছিল । তারস্বরে চিৎকার করতে করতে প্রায় ১৫ মিনিটের শো শেষ করলাম।

এবার আর হাতে সময় নেই। রওনা হওয়ার সময়ই ফেরার টিকেট কাটা হয়েছিল। তাই বাস মিস করা যাবেনা কিছুতেই। তবে বাস স্টপেজ যেতে হলে সেই Cable Car -এ চড়তে হবে। এত মজার ভিড়ে ভয় কেটে গিয়েছে। তাই আবারো শুণ্যে ভাসার সময় নিজেকে একটু কাবুতে রাখা গেল। সন্ধ্যেবেলা , সার্চ লাইটের তীব্র আলো কুয়াশা ভেদ করে ফেলছে। আমি বেশ স্বাভাবিক, একটু-আধটু গান ধরলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো কেবল কার চলতে চলতে থেমে গেল একদম। বৈদ্যুতিক কারণেই কিনা কে জানে সন্ধ্যের পর নাকি অনেক সময় এরকম সমস্যা হয় এবং এই যাত্রা বিরতি কতক্ষনের তার নিশ্চয়তা নেই! ঘন্টাখানেকও লাগতে পারে। আমি হতভম্ব; মনে হলো Cable Car মৃদুভাবে দুলছে-উঠছে- নামছে। হাজার মিটার উপরে শুণ্যে ঝুলে আছি - কেমন গলা শুকিয়ে গেল। দুটো Cable লাইন থাকে; দুই লাইনেই নির্দিষ্ট দুরত্ব পর পর Cable Car থাকে। পাশের লাইনটাতে স্বাভাবিক গতিতে চলাচল শুরু হলো খানিকপরেই । ভাগ্যভাল এই লাইনটাও স্বাভাবিক হয়ে গেল তার পরপরই। কিন্তু হাঁফ ছেড়ে বাঁচা গেল না । আসার সময় যেমন উঁচু থেকে উঁচুতে উঠছিলাম এবার তেমনি নামার পালা। আমি Cable Car -এর ভিতরের দেয়ালে পা চেপে বসে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত সহিসালামতে Cable Car তার বেদীমূলে অবতরণ করল।

এতক্ষনের উত্তেজনা- হাতমুখ ধুয়ে একটু হালকা হয়ে নিলাম। হাঁটলাম কিছুক্ষণ- মৃদু ঠান্ডা আবহাওয়া ভাল লাগছিল আসলেই। এর মাঝে বাস ছাড়ার জন্য প্রস্তুত। উঠে পড়লাম চটপট। কখনও মৃদু স্বরে গান করলাম, কখনও চোখ দুটোকে আরাম দেয়ার চেষ্টা করলাম- ওদিকে বাস ছুটছে, ফিরে চলেছে আবার KL এর দিকে ...।



তথ্যাবলী : গেনটিং হাইল্যান্ড cable car পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগামী cable car এবং সাউথ-ইস্ট এশিয়ার দীর্ঘতম cable car যাত্রাপথ (প্রায় ৩.৮ কি.মি.) । এখানে তাপমাত্রা সাধারণত 15 °C থেকে 24 °C এর মাঝে ওঠানামা করে।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০০৮ রাত ৯:৪৮
২১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ সুবহানার বীরত্ব

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:১০




সুবহানা খুব ছোট্ট হলেও, দারুণ মিষ্টি দেখতে,
চটপটে, বেজায় সাহসী , কেউ পারে না রুখতে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন দুপুরবেলা
অনাথ দুটি শিশু বসে করছিল কি এক খেলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দিগন্ত

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:০৯



যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।

তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×