আকাশ ছোঁয়া মূল্যে বিলাশ বহুল একখানা আবাসন ক্রয় করিয়া বস্তুতই তাক লাগাইলো মুহিত। তেত্রিশে পদার্পন করিলেও মুহিত এখনও ’মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলর’ -ই বটে। গৃহপ্রবেশ নিজ মত সম্পন্ন হইলেও জমজমাট একখানা আপ্যায়নের ব্যবস্থা না করিলে বন্ধু সমাজে তাকে ত্যাজ্য-বন্ধু ঘোষনা করা হইবে তাহা আর বলিতে বাকি থাকেনা। এই বন্ধু সমাজের পরিধি ব্যাপক হইলেও সমাজপতিদের অনেকেই এখন প্রবাসী উপাধি লাভ করিয়াছে। দেশে যদিওবা কিছু মুখপাত্র রইয়া গিয়াছে- আলতাফ, সারোয়ার, প্রণব, নাজির এবং আপনাদিগের সহিত সদ্য পরিচিত সেই মুহিত।
[ ইতঃমধ্যে মুহিত -কে আপনারা এই গল্পের মূখ্য চরিত্র ভাবিতে শুরু করিয়াছেন বোধকরি! প্রারম্ভেই ’ডিসক্লেইমার’ প্রদান করিতেছি যে, মুহিত গল্পের সেই কাংখিত ব্যক্তিটি নহে এমনকি অপর চার খলিফাগণের মধ্য হইতেও কেহ তাহা নহে! নেহায়েতই গৌণ কিছু রসালো আলাপ হইতে অনাকাংখিতরুপে সেই কাংখিত চরিত্রটির সাথে আপনাদের পরিচয় লাভ ঘটিবে। ]
ফি বছর অন্তত একটিবার সকল বন্ধুরা জমায়েত হইয়া তাহাদের হাল-হকিকত বয়ান করিবে - অদ্যাবধি এই রকম একটি রেওয়াজ চালু রাখিয়াছে মুহিতের বন্ধু মহল। যদিও সভায় বছর বছর জনসমাগমে ভাটা পড়িতেছে তথাপি বন্ধুমহলের মুখোরোচক গল্পের আকাল পড়িতেছে না এতটুকুও ! এইবেলা তাই সিদ্ধান্ত হইলো যে, মুহিতের গোপনে গৃহ প্রবেশের পাপ-মোচন এবং সেই বাৎসরিক বন্ধু-সভা এই পঞ্চপাণ্ডব একত্রে পালন করিবে। স্থানটি অবশ্যই মুহিতের পরিপাটি করিয়া সাজানো গৃহের সুপ্রশস্ত বসবার ঘরটি।
ছ’টার কাটা ছুঁই ছুঁই করিতেই টুং করিয়া সদর দরজার বেল খানা বাজিয়া উঠিল। ভৃত্য দরজা খুলিতে ত্রস্ত পায়ে আসিলেও মুহিত ইশারায় তাহাকে থামাইয়া ফতুয়ার ভাঁজ ঠিক করিতে করিতে চওড়া হাসি দিয়া নিজেই দরজা খুলিয়া দিল। চার বন্ধু গমগম করিয়া প্রবেশ করিলে গৃহে যেন প্রাণ ফিরিল । প্রত্যেকে এইরূপে এক অপরকে জড়াইয়া ধরিয়া এমনি ঈদের কোলাকুলিতে মাতিয়া উঠিল যে সে এক আবেগঘন দৃশ্যই বটে!
এইবার শুরু হইল গৃহ পর্যবেক্ষণ; এ ঘর, সে ঘর ঘুরিয়া, খুটিনাটি পরখ করিয়া অবশেষে বসার ঘরে হাত-পা ছড়াইয়া বসিল সবাই। মেঝেয় বিছানো চওড়া গদিতে প্রায় অর্ধশোয়া হইয়া একখানা রঙিন কোলবালিশ টানিয়া লইতে লইতে আলতাফ মুখ খুলিল, ”শালা, তোমাকে এই মুহূর্তে দূর্দান্ত হিংসে হইতেছে!”
সভাষদেরা হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল।
এরই মধ্যে ভৃত্য সবার জন্য হালকা নাস্তা আর পানীয় হাতে প্রবেশ করিল। কোমল পানীয়ের গ্লাস হাতে নাজির ভ্রু নাচইয়া বলিল- ”কিছু মিশেল হইলে কিন্তু আজকের আড্ডায় রঙ লাগিত, কি বলো হে তোমরা?” ; সম্মতির আশায় সে সকলের দিকে একবার করিয়া দেখিল। সকলের প্রশ্ন বাচক চক্ষুকে তোয়ক্কা না করিয়া মুহিত মিটিমিটি হাসিয়া বলিল,
”বেহোশীমে রাং তালাশ করনেওয়ালে এ্যায় ইনসান
কেয়সে সামঝোগে উস রাং কি গেহেরায়ি আরে নাদান
নেশেলি আঁখো মে জীওয়ান কি রাং কো পাওগে সির্ফ বেজান
জেরা হোশ ম্যায় রেহকে তো দেখ, হো খুদ পে থোরা মেহেরবান
জীওয়ান কি সাত রাং মে সামা জা-এ্যাহি হ্যায় জীওয়ান কি শান”
”ওয়াহ! ওয়াহ! ওয়াহ ! ওয়াহ !” উপস্থিত চার বন্ধু কোমল পানীয়ের গ্লাস মুহিতের ঊদ্দেশে তুলিয়া ধরিল।
”শুকরিয়া”, মুহিত তাহার মুচকি হাসিখানা অটুট রাখিল ।
”তোমার সাহিত্যচর্চার ব্যামো তাহলে এখনও বলবৎ রহিয়াছে!”, প্রণব বিস্ময় প্রকাশ করিল। তাহার মুখের কথা কাড়িয়া লইয়া সারোয়ার বলিল, ”আমরা সকলেই বড় বেশী বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছি পরস্পরের নিকট হইতে; কাহার দিন-রাত্রি কেমন যাইতেছে, চাল-চুলোর খবর কিছই খোঁজ নিয়া জানা হইতেছেনা একেবারেই! এমনকি নিজেদের অনেক শখ-আহলাদও ভুলিয়া যাইতেছি ক্রমশ” । সকলেই এক বাক্যে মাথা নাড়িয়া সম্মতি জানাইলো। বাতাসে কেমন জানি একখানা হা-হুতাশ টের পাইতেই প্রণব ফের বলিয়া উঠিল,”এইবেলা তবে জানিয়া লই নিজেদের টুকিটাকি। কি বলো হে তোমরা? ”। এইবারও সকলের সম্মতি।
”আরম্ভ না হয় আমাকে দিয়াই হোক; কারণ নিজের সম্পর্কে খুব বেশী কিছু বলিবার মত এখনও এতো গল্প জমা হয় নাই” , দুষ্টুমি করিয়া বলিল মুহিত।
”তথাস্তু”,এক বাক্যে সম্মতি আসিল।
গলা খাকারি দিয়া মুহিত শুরু করিল, ”খুব বেশী বলিবার নাই, বিশ্ব-বিদ্যালয়ের পাঠ চুকাইয়া পৈত্রিক ব্যবসায় হাত দিয়াছিলাম কিঞ্চিত পারিবারিক মর্জিতেই। তবে এদিক-ওদিক চাকরীও খুঁজিতেছিলাম। কপাল বেশ সুপ্রসনই ,একখানা জুটিয়াও গেল। কর্মস্থলে যোগদানে ব্যবসায় ক্ষতি হইবে বলিয়া এক পিসতুতো ভাই -কে ব্যবসা দেখভাল করিবার জন্য সাথে নিলাম। দু’বছরের মাথায় আরেকখানা লোভনীয় চাকরীর সুযোগ জুটিল- একেবারে ব্রাঞ্চ-ম্যানেজার! এখনো সেইখানেই কামলা দিয়া যাইতেছি; তবে পিসতুতো ভাই যথেষ্ট সততার সাথে অদ্যাবধি ব্যবসা দেখাশোনা করিয়া চলিয়াছে। চাকরীর পয়সা আর ব্যবসার সামান্যখানি লাভ- তাহা হইতেই কিছু কাঁচা পয়সা জমাইয়া অবশেষে গরীবের একখানা ঘর হইলো আর কি!”
”বিবাহের বাজারে নিজের অবস্থান পাকা করিয়া নিলে যে তা আর বলিতে বাকি থাকেনা”, ফের টিপ্পনী টিপ্পনী কাটিল আলতাফ। ”এইবার আমার জীবনগাঁথা আরম্ভ করিতেছি”, কাহারো অনুমতির পূর্বেই বলিল আলতাফ, ”ছাত্র হিসেবে তুখোড় ছিলেম না কোনকালেই, তাই কোনমতে পড়াশুনার পাঠ চুকাইয়াই চাকুরী খোঁজা শুরু। সেইখানেও ভাগ্য দেবী সহায় ছিলেন না সময় মত। ওদিকে প্রেমিকা আর ভরসা করিতে পারিল না। প্রবাসী পাত্র দেখিয়া বিবাহ করিয়া বসিল। কপাল এমনই ব্যঙ্গ করিল আমার সাথে যে, যেইদিন সে কবুল বলিতেছে, সেইদিনই আমার চাকরীর খবরখানা আসিল একেবারেই অযাচিতভাবেই! আমার চাপার জোড়ের কারণেই একখানা রিয়েল এস্টেট কোম্পানীতে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ পদখানা জুটিয়াছিল। তবে অভাগা যেইদিকে চায় সাগর শুকাইয়া যায়...” এইটুকু বলিয়া একখানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িল আলতাফ।
”সেকি হে ! কি হইলো এইবার !”, প্রণবেবর গলার উৎকণ্ঠা প্রকাশ পাইল ।
”প্রতিষ্ঠানটির নামে অনেক দূর্নীতি এবং ঠকবাজির অভিযোগ উঠিল। রিহ্যাব সদস্য না হওয়া স্বত্ত্বেও ভুয়া সদস্যপদ নম্বর, ভুয়া জমি দেখাইয়া গ্রাহকের কাছে পয়সা আদায়, এমনকি নির্মাণ সামগ্রীতে ভেজাল, নিম্নমান; মড়ার উপর খাড়ার ঘা এর মত প্রতিষ্ঠানটির চেয়্যারম্যান আত্মগোপন করিল ”, আরো একখানা বালিশ টানিয়া লইয়াছে আলতাফ ততক্ষণে, ”অবস্থা বেগতিক দেখিয়া ইস্তফা দিলাম, নচেৎ মানসম্মান লইয়া টানাটানি আর কি! ফের মাস ছ’য়েক এর বেকার জীবন! ঘরে ফিরিতেও সংকোচবোধ হইতো, পিতার ঘাড়ে জোয়ান ছেলে হইয়াও বোঝা হিসেবে দিনাতিপাত করিতেছিলাম বলা চলে; নেহায়েত দুইতলা পৈতৃক বাড়ি ছিল; নীচতলার ভাড়া হইতে ভালই আসিত, সেইসাথে পিতা তখনও রোজগার করিতেছিলেন বলিয়া সংসারে আমার অসাড় ভুমিকা চোখে পড়িয়াও পড়িতেছিলনা। শেষ পর্যন্ত পিতার এক বন্ধুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে একখানা চাকরী যোগাড় করা সম্ভব হইল, বছরের মাথায় প্রমোশন হইয়া ম্যানেজার হিসেবে কাজ করিতেছি এখনও সেখানেই। বিবাহ করিয়াছি গত বছর, সহকর্মী । আমাদের মধ্যে বনিবনার যথেষ্ট অভাব। কিন্তু তাহারপরও একে অপরকে সহিয়া যাইতেছি কোন এক বিচিত্র কারণে! এরই মধ্যে পিতা গত হইয়াছেন। মায়ের শরীরখানা তারপর হইতেই এই ভাল তো এই মন্দ। সর্বসাকুল্যে দিন কাটিয়া যাইতেছে আর কি”, একটানা বলিয়া চোখ বুঁজিল আলতাফ।
”মনে পড়িতেছে, তোমার বিবাহের মাস তিনেক পর তোমার গৃহে হানা দিয়াছিলাম। ভাবীর হাতের রান্না অসাধারণ; সেই রেজালার স্বাদ এখনো জিভে জল আনিয়া দেয়। ”, রেশ ধরিল নাজির, ”তবে এইবার আমার পালা হোক?”, সম্মতির আশায় তাকাইতেই মুহিত হাতের গ্লাস নাজিরের দিকে উঁচু করিয়া ধরিল।
”অনার্স শেষ করিয়া মাস্টার্সের জন্য বিলেত পাড়ি জমাইলাম”, শুরু করিল নাজির, ”বিলেতে সবই যে উচ্চমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠার তাহা নহে, তথাপি একখানা বিলেতি সনদপত্র আমার "কারিকুলাম ভিটে" -কে একটু ভারী করিবে ভাবিয়াই একখানা মোটামুটি মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.বি.এ শুরু করিলাম। খরচাপাতি জোগাড় করিতে স্বভাবতই আর সব বাঙালীদের মতই লেখাপড়ার সময়ের বাইরে কাজ করিতে হইয়াছে। সকালে ক্লাসের পর একখানা সুপার স্টোরে বিকেল থেকে রাত অবধি কাজ করিতাম। ঠিকমত পড়াশুনা করিতে গেলে কাজ চালাইয়া যাওয়া দুস্কর হইয়া পড়ে, তাই দেড় বছরের কোর্স সমাপ্ত করিতে দুই বছর লাগিল। ইহার পর মাস ছ’য়েক একখানা ভাল চাকরী খুঁজিতে লাগিলাম, অন্যদিকে জননী বড়ই অস্থির হইয়া দেশে ফিরিবার জন্যে পিড়াপিড়ি করিতে লাগিলেন। শেষে হাল ছাড়িয়া দিয়া ফিরিয়াই আসিলাম। তবে বিলেতি ডিগ্রী কাজে দিল বোধকরি। মাস তিনেকের মাথাতেই একখানা টেলিকম কোম্পানীতে অডিট বিভাগে জুনিয়র পোস্টে চাকরী জুটিল। তবে এখন তো পদন্নোতি হইয়াছে। বেতন বাড়িয়াছে। চাকরীতে প্রবেশ করিয়াই বিবাহ করিলাম। তোমাদের দেখা সেই সময় না পাইলেও ফয়সাল, রহমান, জয়ন্ত আমার বিবাহে আসিয়াছিল। ও হ্যা, এক বছরের একখানা শিশুকন্যা রহিয়াছে আমার। এখনো ভাড়া বাড়িতেই বসবাস করি। তবে একখানা এপার্টমেন্ট ক্রয়ের জন্য বুকিং মানি দিয়া এখন প্রতি মাসের কিস্তি চলিতেছে। বছর দু’য়েকের মাথায় নিজের গৃহের চাবিখানা হাতে পাইব আশা রাখি”, নাজিরের মুখে একখানা প্রশান্তির হাসি খেলিয়া গেল বুঝি।
”বেশ গুছিয়েই ফেলেছো জীবন দেখিতেছি”, স্মীত হাসিয়া প্রণব বলিব,”তবে আমি বাপু জীবনে হুট-হাট করিয়াই কাজ-কর্ম করিয়া আসিতেছি”।
”সে কি রকম?” সারোয়ার কিঞ্চিত কৌতুহল দেখাইল।
”বিশ্ব-বিদ্যালয়ে ভর্তির সপ্তাহ না ঘুরিতেই এক মেয়েকে ভাল লাগিয়া গেল, আরেক সপ্তাহ না যাইতেই তাহাকে হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল হইয়া পড়িলাম এবং বলিয়াই ফেলিলাম। তাহার পরের সপ্তাহে মেয়ের সম্মতি লাভ করিলাম। ছাত্র-জীবনে চুটিয়ে প্রেম হইলো। একটানেই মাস্টার্স শেষ করিলাম। পড়াশোনার দোহাই দিয়াই সে তাহার বিবাহ আটকাইয়া রাখিয়াছিল। কিন্তু এইবার আর ঠেকানো যাইতেছিলন। এই দিকে তাহার পিতা কিছুতেই আমাদের প্রেম কে মানিয়া লইবেন না। অন্য দিকে আমার পরিবার এমতাবস্থায় কন্যার পরিবারের সাথে আলোচনা করিতে রাজি হইলেন না। তবে মেয়ের মামা’র সহায়তায় আমরা বিবাহ সম্পন্ন করিয়া দুই পরিবারকে বীরবিক্রমে ঘোষণা করিয়া দিলাম। সপ্তাহখানেক লাগিল দুই পরিবারের পুরো ব্যাপারখানা হজম করিতে। আমি বেকার বলিয়া মেয়ের পরিবার গাঁইগুঁই করিলেন। যদি— জানিতেন তাহাতে কোনই লাভ হইবেনা। যাইহোক, সামাজিকতা পালন করিতে, শুভক্ষণ দেখিয়া স্ত্রী'কে ঘরে তুলিয়া লইলাম। জগতে মামা না থাকিলে যে কি হইত! এক মামা বিবাহের সময় সাহায্য করিয়াছিলেন, অন্য দিকে আমার এক মামা চাকরী দিয়া সন্মান বাঁচাইলেন। কিন্তু একদিন ম্যানেজারের সহিত বাক-বিতণ্ডা করিয়া এক বাক্যেই চাকরী ছাড়িয়া ফের ছয় মাসের জন্য বেকার বসিয়া রইলাম। ওইদিকে আমার স্ত্রী এক একখানা চাকরীতে যোগদান করিল। অতঃপর সেইখানে ম্যানেজারকে বলিয়া আমারও একখানা বন্দোবস্ত করিল। তবে চাকরীর নিয়মতান্ত্রিকতা আমার অদ্যাবিধ ভাল লাগে না। তবুও চালাইয়া যাইতেছি। স্ত্রী এখন অন্তঃস্বত্বা, তার ইচ্ছে সন্তান জন্মদানের পর সে চাকরী ছাড়িয়া পুরোদস্তর গৃহিনী হইয়া যাইবে। মনে হইতেছে সামনে আমাকে অনেক দ্বায়িত্ববান স্বামী এবং পিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হইতে হইবে”, হাসি হাসি মুখে গড় গড় করিয়া বলিয়া অবশেষে প্রবণ থামিল ।
প্রণব শেষ করিতেই সকলের চোখ এক সাথে ঘুরিয়া গেল সারোয়ারের দিকে। গোবেচারার মত একখানা হাসি দিয়া সারোয়ার বলিল, ”সর্বশেষ বলি তাহা হইলে আমিই! ”
সকলেই সমস্বরে বলিল, ”তবে আর দেরী কেন!”
শুরুতেই একখানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া সারোয়ার বলিল,”আমার পরিবার কখনই খুব স্বচ্ছল ছিলনা। বাবা-মা গ্রামেই থাকিতেন। আমিও কলেজ অবধি গ্রামেই পড়িয়াছি। তবে পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম বলিয়া অনার্স পড়িতে ঢাকায় আসি। আমাদের পরিবার বড় ভাইয়ের উপরই খুবই নির্ভরশীল ছিল। স্বল্প বেতনের হইলেও ঢাকায় চাকরীর সুবাদে তিনিই আমার অনার্স পড়ার খরচ যোগাইতে ছিলেন। তবে প্রথম বর্ষের শেষের দিকে এক সড়ক দূর্ঘটনায় তিনি মারাত্মক আহত হইলে দুই পা অকেজো হইয়া পড়ে, দীর্ঘ এক বছর উনি বিছানায় ছিলেন। এরপর ক্রাচে ভর দিয়া সামান্য চলাফেরা করিতে পারেন। সেসময় আমার পড়াশোনা খরচের কারণে বলা চলে একরকম হুমকির মুখেই পড়িয়াছিল। তবে আমি টিউশনি শুরু করিয়াছিলাম, একটু সাড়া পাইতেই ব্যাচে ছাত্র-ছাত্রী পড়ানো শুরু করিলাম। আমার সময় মূলত এতেই চলিয়া যাইতো যে বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি করিবার ফুরসৎ হইতো না একেবারেই” ।
”তোমার ভাইয়ের চিকিৎসার খরচ চলিত কিভাবে? আর সংসারই বা চলিত কিভাবে?” বেশ উৎকন্ঠা নিয়াই মুহিত জানিতে চাহিল।
এইবার হয়ত দীর্ঘশ্বাসখানা লুকাইতে চেষ্টা করিল সারোয়ার, ”ঢাকায় চিকিৎসা চালাইয়া যাওয়া সম্ভব ছিলনা, যদিও তাহার অফিস হইতে কিছু আর্থিক সাহায্য দেয়া হইয়াছিল; তথাপি ওষুধপত্র, ডাক্তার ফি এইসব সেই অর্থে খুব বেশীদিন চালাইয়া যাওয়া সম্ভব হয়নাই বলিয়া শেষে ভাইজানকে গ্রামে বাবা-মা’র নিকটেই ফেরৎ পাঠাইলাম। তবে যখন আমার টিউশনি হইতে একটু ভাল উপার্জন শুরু হইল, তখন আমি কিছু কিছু টাকা পাঠাইতাম বাড়িতে। নিজেদের একখানা জমি হইতে কিছু ফসল আসিত বলিয়াই রক্ষে। টিউশনিতে বেশ নামডাক হওয়াতে ভাবিয়াছিলাম শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেব লইব। কিন্তু রেজাল্ট সেইরুপ হইলনা। সংসারের হাল যত শীঘ্রই ধরা যায় ততই মঙ্গল ভাবিয়া মাস্টার্স পড়ার বাসনা চাপিয়া গেলাম। চাকরি খুঁজিতে খুঁজিতে হতাশ হইয়া গেলাম। যদিও তখনও টিউশনিতে বেশ পসার আমার। তবুও ভাবিলাম অন্য কিছু করা যায় কিনা। ঢাকায় আমাদের তেমন কোন আত্মীয়-পরিজন ছিলনা বলিয়া এখানে আর কোনভাবেই মন সবাইতে পারিলাম না। এক সকালে গ্রামে ফিরিয়া গেলাম। ওখানে এক কলেজে শিক্ষকতার চাকরী পাইলাম। চোখের সামনে বড় ছেলের শরীরের এই হাল বাবাকে দিন দিন দূর্বল করিয়া তুলিতেছিল। আগে নিজেই জমিতে কাজ করিতেন কিন্তু তা পরে আর সম্ভব হইতেছিলনা। আর জমিও এতো বেশী উর্বর ছিলনা। এই সময়ই পত্রিকা মারফত মাশরুম চাষের কথা জানিতে পারি। স্বল্প পুঁজি অথচ ভাল লাভ। প্রথমে ছোট করিয়া শুরু করিলেও খুব দ্রুত এই ব্যবসায়ে পয়সা আসিতে লাগিত। তবে তারজন্য আমাকে ঢাকা আসা-যাওয়া শুরু করিতে হইল। ফলে কলেজের চাকরীখানা ছাড়িয়া দিলাম সহসাই। বড় ভাইয়ের চিকিৎসা আবারো শুরু করিলাম খানিকটা। আমাদের জমিতে ঘর তুলিলাম বড় করিয়া, মাশরুম চাষের জন্য। শুরুতে মা-বাবা’ই দেখাশোনা করিত। পরে আমি গ্রামের দুই ছাত্রকে কাজে লাগাইলাম। বড় ভাই ততোদিনে ক্রাচে ভর দিয়া হাঁটাচলা ভালই করিতে পারেন। তিনিও চেষ্টা করিতেছেন মাঝেসাঝে তদারকি করিবার। আমি গত দুই বছর হইলো ঢাকাতেই থাকা শুরু করিয়াছি বিভিন্ন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে মাশরুম সরবরাহ সংক্রান্ত যোগাযোগ ধরিয়া রাখিবার জন্যে। ”
”বিবাহ নিয়া কিছু ভাবিতেছো না?”, প্রণব জিগাসা করিল ।
”জীবনের প্রয়োজনে বা সামাজিকতার প্রয়োজনে হইলেও এই কার্যটি আসলে এক সময় না এক সময় সম্পন্ন করিতেই হয়। আমার এক চাচাতো বোন আছে। ডিগ্রী পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়াছে। গত বছর চাচা পরলোক গমন করেন এবং মাস তিনের আগে তার মা। অত:পর সে আমাদের বাড়িতেই আসিয়া উঠিয়াছে। মায়ের ইচ্ছে আমি তাহাকেই জীবন সঙ্গী হিসেবে বাছিয়া লই। আমি কোন দ্বিমত পোষন করি নাই। সব কিছু ঠিক থাকিলে মাস চারেক পরেই বিবাহ হইবে। তবে আমার ইচ্ছা আছে তাহাকে স্বাবলম্বী করিয়া তুলিবার। বড় ভাইয়ের সেই দূর্ঘটনা আমাকে অহরহ ভাবায়, জীবনে কখন কি হইতে পারে তাহার কোনই নিশ্চয়তা নাই। এই মেয়ে সূচীকর্ম জানে শুনিয়াছি। তাহাতেই মনে হইল, আজকাল বুটিক ব্যবসা রমরমা। ভাবিতেছি পরবর্তীতে এলাকার কিছু মেয়েকে ব্লক সহ হাতের কাজের জন্য কিছু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করিব। রেনু , মানে যাহাকে বিবাহ করিব, সেই এই সকল ব্যাপারগুলো তদারকি করিতে পারিবে বলিয়া মনে করিতেছি”, খুক করিয়া একটু কাশি দিল সারোয়ার, ”সংক্ষেপে বলিতে চাহিয়াছিলাম; তথাপি মনে হইতেছে আমি যথেষ্ট সময় ক্ষেপন করিলাম...”।
”সে কি কথা হে”, মুহিত হা হা করিয়া উঠিল, ”জীবনের রং কে কতটা দেখিয়াছে, কে কতটা চড়াই-উৎরাই পার হইয়াছে, তাহা জানিতেই তো আজিকের এই বয়ান পর্ব ” ।
”তবে এই বেলা পাঁচ জীবন যোদ্ধার কাহিনী সমাপ্ত হইল কিনবা হইতে পারে এখান হইতে আরো নতুন কোন কাহিনীর সূত্রপাত হইলো!” , নাজির মজা করিবার চেষ্টা করিল।
”আমাদের কথা তো হইলো, কিনতু আর সব বাদ-বাকি বন্ধুদের হালহকিকত কি? অনেকের সাথেই কোন যোগাযোগ নাই আর আজকাল। আজকে যা গল্প হইল তাহাতে দেখা যাইতেছে, সবাই জীবন যুদ্ধে ঢাল-তরোয়াল নিয়া ব্যতিব্যস্ত। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এমন ছিল না। প্রতিদিন কতই না মুখোরোচক কাহিনী কানে আসিত। সব কি পরে সাধু-সন্যাসী হইয়া গিয়াছে নাকি!” , এতোক্ষণে স্বভাব সূলভ ভঙ্গিতে মুখ খুলিল আলতাফ ।
অনেকক্ষণ পর হাসির রোল উঠিল সবার মাঝে।
মুহিত খানিকটা রহস্য করিয়া বলিল, ”তাহা হইবে কেন! বরং বলিতে পারো, তখনকার অপরিণত মুখরোচক ঘটনাগুলি এখন পরিণত হইয়াছে”।
”তুমি কি কিছু খোলাসা করিবে?”, আলতাফের আগ্রহ বাড়িয়া গেল।
”মনে হইতেছে আজকের আড্ডা এইবার একটু ভিন্ন রঙের ছোঁয়া পাইবে।” , প্রণব যোগ করিল আলতাফের সাথে।
”তবে পেটে যে ছুঁচোর নর্তন-কূর্দন চলিতেছে মহাসমারোহে, তাহার কিছু ব্যবস্থা আগে হউক” , নাজির পেটে হাত বুলাইতে বলিল।
”আলবাৎ”, জিভ কাটিয়া মুহিত বলিল,”গল্পের বিরতী লইয়া ভোজন পর্ব শেষ করিয়া ফেলাই উত্তম হইবে মনে হইতেছে এখন”
টেবিলে খাবার লাগানো হইয়াছে বলিয়া ভৃত্য জানাইতেই মুহিত সকলকে খাওয়ার টেবিলে ডাকিল।
মান্না দে’র ”কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই...” গানখানা শিষ দিতে দিতে আলতাফই আগে তড়াক করিয়া উঠিয়া টেবিলের কাছে হাজির হইল। অবশ্য বাকিরাও পেছন পেছন।
[খাওয়ার টেবিলেও পঞ্চ পাণ্ডবের কথা থামিয়া থাকেনাই। যদিও তাহা বেশীর ভাগই ভোজন সংক্রান্ত ছিল। এর বাইরেও টুকিটাকি গল্প ছিল যাহা হইতে হয়ত আমরা সকলেই আপাতত বঞ্চিত হইতেছি। তবে ভোজনপর্ব সমাপনের পর তাহারা আবারো মূল গল্পের আসরে ফিরিয়া আসিবে। মুহিতের ভাব-ভঙ্গিতে মনে হইতেছে আদতেই কিছু মুখোরচোক কাহিনী বলিতে যাইতেছে সে। আমরা তাহাদের আড্ডায় ফিরিয়া আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করি এইক্ষণে...। ]
========
চলিবে ...
========

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

