***
ফুটপাতের উপর বালির সারি। একটু পাশ ঘেঁষে লম্বা, একটানা দেয়াল। অন্য পাশে, একটু কোনায়, জঙ্গলের মত। প্রকৃতি এখানে ডাকে! তাই শত ব্যস্ততায়ও এখানটায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে অসংখ্য পথচারী! জলবিয়োগের ঝরণা ধারার সরু প্রবাহ চলে আসে ফুটপাত অবধি। ফুটপাতের উপর সারি সারি রং-বেরঙের, বড় বড় ছাতি দেখে ভাবার কারণ নেই এগুলো কোন দীর্ঘতম বালুকাবেলায় রোদ পোহাতে থাকা বীচ-আমব্রেলা ! ঘাস-জঙ্গলের আদিম গন্ধ আর বিয়োগকৃত জলের অম্ল-ক্ষারীয় গন্ধে ভারী হয়ে ওঠা বাতাসের মধ্যেও প্রতিটি ছাতির নীচে একটি ছোট টেবিল আর টুল নিয়ে অম্লানবদনে বসে থাকে বসে কেউ। টেবিলের উপর মেলে রাখা রঙিন সব টিকেট। এগুলো হলো একেকটি বাস কাউন্টার, আর এ দৃশ্য ঢাকার একটি বাস স্স্টপেজ এর।
ঘন্টা হয়ে এলো তবু বাসের টিকিটিরও দেখা মিলছেনা। পড়ন্ত বিকেলের রোদ চোখ-মুখ কুঁচকে দিচ্ছে। ভিড় বাড়ছে। স্টপেজে লাইনের কোন বালাই নেই। সব এলোমেলো দাঁড়িয়ে। সবারই মনে হচ্ছে , যে যেই বাসের টিকেট হাতে দাঁড়িয়ে কেবল সেই বাসটাই আসছে না !
এক সময় কাংখিত বাহনটিকে দেখা যায়, ওই যে! একটু দূরের ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে। অপেক্ষমান সবার মাঝে নড়াচড়া চোখে পড়ে। বাস আসছে! কাউন্টার থেকে চিৎকার আসে, ”বাস আইসা পড়সে, খালি বাস, পুউরা খালি...”। সর্পিল গতিতে বাস থামে স্টপেজে। আসলে থেমেও যেন থামেনা। যাত্রীরা বাসের সাথে সাথে হেঁটে হেঁটে এগুতে থাকে। যখন দেখা যায় আশেপাশের সবাই এগুচ্ছে, তখন অন্যরাও ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। সিট দখলের কোন আশা নেই, কারণ তা আগের স্টপেজগুলোতেই পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। তুমুল প্রতিদ্বন্দিতা চলে কেবল বাসের ভেতরের সেই খালি জায়গা দখলের!
মেয়েটি খুব ক্লান্ত এবং বিরক্ত। বাসে কোন সিট খালি নেই। কিন্তু রাস্তায় আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না। তাই ভিড়ের মধ্যে সেও হুড়মুড় করে বাসে উঠতে লাগল। এক হাতে বাসের দরজার হাতল ধরে শরীরটাকে টেনে ওপরে তুলতে গিয়ে শূণ্যে ধাক্কা খেল কার সাথে জানি। অন্য হাতের মুঠোয় রাখা মুঠোফোনটা ছিটকে পড়ল রাস্তায়। ঝট করে মুখ তুলে পাশে তাকিয়ে দেখল, একটি ছেলে তারই মত ঝুলছে কিন্তু ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে আছে রাস্তায়, তারপর ঝট করে লাফ দিয়ে নামল। মেয়েটিও ততক্ষণে হাতল ছেড়ে শূণ্য থেকে রাস্তায় নেমে এলো।
পড়ে থাকা মোবাইলটার কাছে গেল মেয়েটি। ব্যাটারিটা খুলে পড়ে আছে, তুলে নিলো সেটা।
ছেলেটি বুঝতে পারছেনা ব্যাটারিটা কোথায় পড়ল, এতোটা জোরে মোবাইলটা আছড়ে পড়েছে যে প্রায় ছিন্ন-ভিন্ন! তবে সিমটা আটকে আছে তখনও, তুলে নিল ভাঙ্গা সেটটা। পাঁই করে ঘুরে তাকালো পেছনে।
- ”ধাক্কা দিলেন কেন আপনি! আপনার জন্য আমার মোবাইল সেট ভেঙ্গে গেল!” গজরাতে থাকে ছেলেটি।
- ”মানে! আমি কেন ধাক্কা দিতে যাবো। আপনি ঠিক মত বাসে উঠতে পারেননা ! দেখছেন না একজন মহিলা উঠছে, আপনার কাণ্ডজ্ঞান নেই কোন?” পারলে হাতে ধরা মোবাইলটা প্রায় ছুঁড়ে মারে মেয়েটি।
- আজব ! এই ঠাসাঠাসি বাসে আপনি দাঁড়াতে পারতেন! মহিলা হয়ে ধাক্কা-ধাক্কি করে বাসে উঠতে যাচ্ছিলেন!
- বাস কি কেবল পুরুষদের জন্য নাকি! অভদ্রের মত কথা বলছেন কেন আপনি!
আশেপাশে উৎসুক লোকজন ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখা শুরু করলো ওদের। এর মধ্যে বাস নড়ে উঠল, এবার ছুটবে বলে। কোন জবাব না দিয়ে ছেলেটা সেদিকে তাকিয়ে দুই লাফে উঠে পড়ল বাসে। ভেতরে জানালার পাশে কোন মতে দাঁড়ালো, ভিড়ের চাপে শরীরটা জানালা গলে প্রায় বার হয়ে আসছে। সে অবস্থাতেও এমন শ্যেন দৃষ্টি হানলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে যে মেয়েটার শরীর জ্বলে উঠল রাগে।
***
আজোও বাসে সিট পায়নি মেয়েটি। আজকাল তিন সারি সিট বরাদ্দ থাকে মহিলাদের জন্য, কিন্তু সেগুলোর একটাও খালি নেই। সকাল সকাল বাসে মহিলাদের ভিড় বেশী- কারো কলেজ, কারো ইউনিভার্সিটি, আর কারো বা চাকরী। সকালটা এমনিতেই অফিসের সময়, তাই সবারই তাড়া। ভিড়ের মধ্যে কোন মতে দাঁড়িয়ে মেয়েটি। বাস একেক স্টপেজে থামছে, হয় কিছু লোক নামছে নয়তো উঠছে। আর সেই ওঠা-নামায় চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন।
মনে হলো কোমরে কারো হাত লাগল। ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকানোর মত উপায় নেই। তাই মেয়েটা একটু চেপে গেল সামনে। এবার মনে হলো পিঠে কেউ খোঁচা দিল। কান গরম হয়ে গেল মেয়েটির। একবার নয়, খোঁচাটা আবার দিল কেউ যেন পিঠে। চোখ-মুখ শক্ত হয়ে গেছে ততক্ষণে মেয়েটির। পেছনে তাকিয়ে এক পাশে একটি বুড়ো আর এক পাশে একটি ছেলেকে দেখলো। ছেলেটি এক হাত উপরের হাতল ধরে আছে বলে চেহারা দেখা যায় না। আরেক হাতে ফাইল ধরে রাখা। কিছু বলতে গিয়েও মুখ ঘুড়িয়ে নিল মেয়েটি।
তৃতীয়বারের মত খোঁচাটা লাগতেই রাগে কাঁপতে কাঁপতে শরীরটাকে মুচড়ে পেছন ফিরে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল পেছনে দাঁড়ানো ছেলেটার দৃশ্যমান গালে!
ঘটনায় আকষ্মিকতায় হাতল থেকে হাত ছুটে গেল ছেলেটার। সামনে-পেছনে, দাঁড়ানো কিনবা বসা সবার চোখ ঘুরে পড়ল ছেলেটি আর মেয়েটির উপর। ততক্ষণে ছেলেটির চেহারা দৃশ্যমান হলো মেয়েটির কাছে। আরে ! এতো সেই গতবারের ছেলেটা! যে তাকে ধাক্কা দিয়েছিল! মোবাইলটার শেষ পর্যন্ত কিছু হয়নি, নইলে আরেকটা কিনতে হতো তাকে। !
জ্বলতে থাকা গালে এক হাত দিয়ে, নিজের ভারসাম্য রাখতে রাখতে ছেলেটি তাকায় সামনে। আরে! এতো সেই মেয়েটি! এর জন্য গাঁটের পয়সা খরচ করে আরেকটা মোবাইল কিনতে হলো তাকে!
- ”কি সমস্যা আপনার! ” রাগে গম গম করে উঠলো ছেলেটি।
- ”সমস্যা আমার নয়, বরং আপনার। মেয়ে মানুষ দেখলেই নোংরামি শুরু হয়ে যায় ... ।” কথা শেষ করতে পারে না মেয়েটি।
- ”চড় দিলেন আপনি! আর বলছেন সমস্যা আমার! ফাজলামো করেন আমার সাথে ..”
- ”মুখ সামলে কথা বলুন। আপনি পেছনে দাঁড়িয়ে ভিড়ের মাঝে মেয়েদের গায়ে খোঁচা দেবেন আর ভাবছেন মেয়েরা লোকলজ্জার ভয়ে মুখ বুঁজে থাকবে ...”
- ”উফ! কি উল্টো-পাল্টা বলছেন। আপনি দেখেছেন আমাকে খোঁচা দিতে? দেখেছেন ?” চিৎকার করল ছেলেটি।
- ”দেখতে হবে কেন?” পাল্টা চিৎকার মেয়েটির।
- ”পাবলিক বাসে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। আর আহাম্মকি অভিযোগ করছেন! এতো শুচিবাই থাকলে প্রাইভেট কার কিনে নিন।”
এর মাঝে বাস গতি প্রতিরোধক পার হতে গিয়ে ভয়াবহ ঝাঁকি খেল যে সবাই এর-ওর গায়ে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিল। মেয়েটি একটু ভারসাম্যহীন হয়ে যাচ্ছিল দেখে পাশের বুড়োটা তাকে ধরতে হাত বাড়াতেই এক ঝটকায় বুড়োর হাত সরিয়ে পাশের সিটের হাতল ধরে নিজেই সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে।
- ”ও ম্যাডাম! পথ-ঘাট চোখ-কান খোলা রেখে চলতে শিখুন। আমি নিজেই দাঁড়াতে পারছিনা আর আরেকজনকে সামাল দেব মানে খোঁচাবো কি করে। ” বুড়োর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ছেলেটা এবার পেয়ে বসলো মেয়েটাকে। পাশের বুড়োটা একটু এদিক-সেদিক তাকিয়ে পেছনের ভিড়ে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করল যেন একটু।
- ”আপনি নিজেকে সংশোধন করুন ...আপনি পথ-ঘাট চলতে জানেন না, মেয়েদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানেননা... ” প্রায় তোতলাতে থাকে মেয়েটি।
- ”আপনি ব্যবহার শিখুন আগে। এখন যদি আপনাকে আমি চড় মেরে বসি...?” , ছেলেটির চোখ আবারও জ্বলে উঠলো যেন।
- ”কি...ইই! ” প্রায় কেঁদে ফেলবে যেন মেয়েটি অপমানে।
এতোক্ষণে সহ-যাত্রীরা ধাতস্থ হলো যেন। কেউ মেয়েটার পক্ষ নিয়ে ছেলেটাকে একটু কড়া কথা শোনাতে গেলে পাল্টা ঝাড়ি খেয়ে চুপ হয়ে গেল। কেউ একজন বলল, ”পাবলিক বাসে এমন হয়ে আসলে। ব্যাপারটা নিতান্তই ভুল বোঝাবুঝি মনে হচ্ছে।” ছেলেটিকে কেউ একজন বলল,”ভাই, আপনি না হয় স্যরি বলেন...”।
- ”আমি কেন স্যরি বলব। মেয়েরা একটু নাকি কান্না করলেই মন গলে যায় না! স্যরি যদি বলতে হয় তো উনি বলবেন ”, তেলেবেগুনে জ্বলছে ছেলেটি।
ওপাশ থেকে বাস-ড্রাইভার পেছন ঘুরে বলল, ”ভাই, আপনাদের চিল্লাচিল্লি ইকটু থামান...”। এই বলে সামনে তাকাতেই দেখলো পেছন থেকে একটা ক্যাব হুশ করে ওভার-টেক করেত চাইছে, ওটাকে পাশ কাটাতে এমন কায়দা করলো যে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা আবারও বেসামাল। মেয়েটি সিটের হাতল শক্ত করে চেপে ধরেও ঠিকমত সামলাতে না পেরে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল ছেলেটির গায়ের উপর। পিছিয়ে গেল ছেলেটি, ঠোঁটে এবার তাচ্ছিল্যের হাসি। নিজেকে সামলে নিতে নিতে চেহারায় বিব্রতবোধ ঢাকার চেষ্টা করল মেয়েটি।
এতোক্ষনে পাশের সিট থেকে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ”ম্যাডাম, আমি সামনেই নামব, আপনি বরং এখানটায় বসুন।”
***
আজ বেশ ফিটফাট করে পোষাক পড়েছে ছেলেটি। একটা অনুষ্ঠান শেষে ফিরছে। বিকেল থেকেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। অনেকক্ষণ বাস স্টপেজে দাঁড়িয়েও বাস পেলনা । আকাশের যা অবস্থা তাতে দাঁড়িয়ে থাকাটা সমীচিন হবেনা। সাথে ছাতাও নেই । একটা সি.এন.জি স্কুটার দেখার দরকার বোধ করল সে। বাস স্টপেজ থেকে একটু এগিয়ে এলো। কিন্তু বৃষ্টির সময় হলে যা হয়, কোন ড্রাইভার স্কুটার থামালোনা। একবার রাস্তার এপাশে, একবার ওপাশে, একবার মোড়ে- বহুভাবে ছুটল ছেলেটি।কিন্তু হয় কোন স্কুটার থামলোনা, নয়তো কেউ যেতে চাইলোনা, নয়তো দ্বিগুন ভাড়া চাইছে আর নয়তো তার মতো আরো যারা ছুটছে তাদের সাথে ছেলেটি প্রতিযোগীতায় পেরে উঠলনা।
বৃষ্টির তোড় বাড়ছে এদিকে। সামান্য বাতাসও। ডে-লাইট সেভিংস সিস্টেমের কারণে ইদানীং সন্ধ্যের আগমনে দেরী হলেও আজ আষাঢ়ের আকাশ একটু গম্ভীর। রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে অন্য পাশের মোড়ে একটি খালি স্কুটার থামতে দেখল ছেলেটি। ত্রস্ত পায়ে রাস্তা পার হতে লাগল, কেউ যাতে ওটাকে তার আগে বাগে না পায়। বৃষ্টির পানি জমে গেছে রাস্তায়, খাঁজে খাঁজে ভরে আছে। ”এসো না, চলো জলে ভিজি...” ফুল ভল্যিউমে গান ছেড়ে পানিতে সয়লাব রাস্তা, ভেজা চাকায় পিশে, ফুল স্পীডে একটি গাড়ি পাশ কাটালো । ছলকে উঠা নোংরা জল ভিজিয়ে দিল ছেলেটিকে! মেজাজটা সামলে সামনের লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হলো ছেলেটি। সামনেই সি.এন.জি. স্কুটার; এখনো কেউ ওটার নাগাল পায়নি!
আজ শাড়ী পড়াটা ঠিক হয়নি। বৃষ্টিতে এক হাতে ছাতা, আরেক হাতে শাড়ী সামলানো চাট্টিখানি কথা তো নয়। রাস্তার পানিতে শাড়ীর পাড় অনেকটাই ভেজা। এই অবস্থায় বাসে চড়া যাবে না, বাসায় ফেরার জন্য স্কুটার খুঁজছে মেয়েটি। সামনে একটা স্কুটার দাঁড়িয়ে আছে। ভেজা রাস্তায়, ভেজা স্যান্ডেল, ভেজা পাড়ের শাড়ী আর ছাতা হাতে দ্রুত হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে মেয়েটির। তারপরও কেউ স্কুটারটাকে ভাড়া করার আগেই পেতে হবে ওটাকে!
মোড়ে এসেই স্টার্ট নিতে সমস্যা হলো স্কুটারটার। ড্রাইভারের বার বার চেষ্টা ঘড় ঘড় আওয়াজ ছাড়া কাজে দিচ্ছে না। এসময়ই, তার দু’পাশের গ্রিল দেয়া দরজায় দু’টো মুখ উঁকি দিয়ে এক সাথেই বলে উঠল, ”মিরপুর যাবেন...?” এবং ঠিক একই সময়ই কাংখিত শব্দে চালু হয়ে গেল ইঞ্জিন। ড্রাইভার খানিকটা হকচকিয়ে গেল যেন! দু’পাশে তাকিয়ে মাথা নাড়লো। কিন্তু ড্রাইভারকে এড়িয়ে দু’টো মুখ এখন পরস্পরকে খেয়াল করল এবং এক সাথে বিরক্ত মেশানো সম্বোধন, ”আপনি!”
ড্রাইভার সেটা পাত্তা না দিয়ে বলল, ”মিটার থেকে ত্রিশ টাকা বেশী দিতে হইবো”।
ছেলেটি তৎক্ষনাত বলল, ”আচ্ছা, ঠিক আছে, ,চলেন”।
মেয়েটি স্কুটারের গ্রিল শক্ত করে ধরে বলল, ”মানে! স্কুটার আমি ডেকেছি আগে, আমি যাবো এতে।”
ছেলেটি এক লাফে স্কুটারের ভেতরে বসে বলল, ”কক্ষনো না, আমি ভাড়া ঠিক করেছি আগে, আমি যাব, আপনি অন্য কিছু দেখুন।”
মেয়েটিও কম যায় না। সেও স্কুটারের ভেতর বসে পড়ল, ”আমি নই, আপনি অন্য কিছু দেখুন, নামুন স্কুটার থেকে”, কথায় তীব্র ঝাঁঝ তার।
”কি অভদ্রের মত কথা বলছেন”, মেয়েটির বেপোরোয়া ভাবে ছেলেটি অবাক।
মধ্যস্থতায় এগিয়ে এলো স্কুটার ড্রাইভার। ”আমার গাড়ি মিরপুরেরই। আপনারা দুই জনেই যদি ওইদিক যাইবেন তো, দুইজনরেই নিয়া যাই, বৃষ্টির দিন আরেকটা গাড়ি তো সহজে পাইবেন না আপনারা”।
”আমি কেন উনার সাথে যাবো!” মেয়েটির প্রতিবাদ।
”আমিও উনার সাথে যেতে ইচ্ছুক না”, ছেলেটিও পাল্টা গজগজ করল।
মুখে পান চাবাতে চাবাতে ড্রাইভার বলে ওঠে, ”আজকাল তো মানুষজন শেয়ারে যায়ই... আপনেরা যাইবেন তো একই জায়গায়, উইঠাই যখন পড়সেন তো চলেন ”, আর কথা না বাড়িয়ে ছেলেটি এবং মেয়েটিকে অবাক করে স্কুটার স্টার্ট দিয়ে এগুতে শুরু করল ড্রাইভার। কখন আবার স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায় কে জানে, ড্রাইভার মনে মনে চিন্তিত।
বেগতিক অবস্থা মেনে নিয়ে চুপ করে স্কুটারে বসে আসে দু’জন যাত্রী। কেউ কারো সাথে কথা বলছেনা। ব্যাপারটা অস্বতিকর খানিকটা। ছেলেটি মনে মনে ভাবছে, নীরবতা ভাঙতে সেই আগে কথা বলবে কি না! মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে বাইরের অন্ধকারে বৃষ্টি দেখার চেষ্টা করছে।
”মেয়ে মানুষের তেজ বেশী, বুদ্ধি কম তো! আমিই না হয় কথা বলি। কারো ভদ্রতা জ্ঞান থাকবে না বলে কি আমারো বিবেচনা বোধ নেই নাকি!”, কথা বলার পূর্বে মনে মনে নিজেকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করল ছেলেটি। একটু কেশে নিয়ে বলল, ”মনে হয় আমরা দু’জনেই একসাথে স্কুটারের কাছে এসেছিলাম” ।
মেয়েটি মুখ ফিরিয়ে একটি শীতল দৃষ্টি হানল ছেলেটির দিকে। আধো আলোয় মেয়েটির চকচকে চোখ ছেলেটিকে একটু ভড়কেই দিল মনে হয়।
”কি মানে হয় এসবের। আমি কি ফালতু মানুষ নাকি! ”, মনে মনে এমনটা বললেও ছেলেটি মুখে বলে ওঠে, ”দেখুন, আপনি আসলে আমাকে বুঝতে ভুল করছেন। আপনার আর আমার প্রতিটা সাক্ষাতই কেন জানি ভালভাবে হচ্ছেনা, একটা না একটা বাগাড়ম্বর হচ্ছেই। কিন্তু আসলে মনে হচ্ছে আমরা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বারবার একে অন্যের সাথে রাগারাগি করছি...”, ওপাশ থেকে কোন সাড়া পাওয়ার আশায় থামলো ছেলেটি।
একেতো অন্য দিনের অপমানের ঝাল , তার উপর একটা অপরিচিত ছেলের সাথে বৃষ্টির মধ্যে বাধ্য হয়ে স্কুটারে চেপে যাচ্ছে - মেয়েটি কঠিন মুখে বসে থাকলেও আসলে বেশ বিব্রত। তবে এখন ছেলেটি যা বলল, তা শুনে একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল সে। ভাবল, ”আরেক জন যখন ভদ্রতা করছে, সেও না হয় করল, কি এসে যায় তাতে”, এমন একটা ভঙ্গি নিয়ে মেয়েটি বলল, ”ইটস ওকে”।
”এই মেয়ের কি সামান্যতম সৌজন্যতাবোধ নেই। ইঁটস ওকে - এটা কি কোন সুন্দর করে বলা হলো! আজব !”, এগুলো ছেলেটি মনে মনে ভাবল, কিন্তু মুখে বলল, ”আচ্ছা, যেভাবেই হোক, আমাদের বারবার দেখা হয়ে যাচ্ছে, যদিও ঘটনাগুলো খুব প্রীতিকর নয় এখনো, তবুও পরিচয় যখন হয়েছে, আমরা মনে হয় একজন আরেকজনের নাম জানতে পারি।”, সম্মতির আশায় তাকালো ছেলেটি। প্রত্ত্যুত্তরে আবারো কেবল শীতল দৃষ্টি। নাকি চোখের মনি একটু জ্বলে উঠলো!
ব্যাপারটাকে পাশ কাটিয়ে ছেলেটা বলে উঠলো, ”আপত্তি থাকলে আপনার নাম জানতে চাইবোনা, তবে আমার নাম বলি” , সামান্য থেমে মেয়েটির দিকে ফিরে ছেলেটি বলল, ”আমি শর্মা”।
মেয়েটি এক মুহূর্ত ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, ”আমি অগ্নি” ।
দু’জন অপরিচিত মানুষ যখন পরিচিত হয়, তখন তারা স্মিত হাসি বিনিময় করে। কিন্তু ছেলেটি এবং মেয়েটি দু’জন দু’জনের নাম জেনে একে অন্যের দিকে বোকার মত তাকিয়ে থাকল! তারপর ছেলেটিই তোতলাতে তোতলাতে বলল, ”ইয়ে, মানে...অগ্নিশর্মা!!!”
স্কুটার চালাতে চালাতে আচমকা হাসির শব্দে ড্রাইভার একটু ভড়কে গিয়ে পেছনে তাকালো ভ্রু-কুঁচকে।
এই প্রথম ছেলেটি এবং মেয়েটিকে হাসতে দেখা গেল। একজন অট্টহাসি এবং আরেকজন খিলখিলিয়ে উঠল যেন!
(এখনেই শেষ? নাকি এখানেই শুরু!)
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ২:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


