মানুষ আগে গেলে বাঘে খায়! কিন্তু যখন বাঘই আগ বাড়িয়ে এগিয়ে আসে তখন ...?
আজকাল যেখানে বন-জঙ্গলই থাকছে না তো বনের বাঘ আর বনে থাকবে কিভাবে আর কি করতেই বা! ওরা প্রায়ই লোকালয়ে উঁকি দিচ্ছে। কারো ঘরের চালে ঘুমিয়ে থাকছে। কারো রান্নাঘরে ঢুঁকে পড়ছে। কিন্তু বন্যপশু জানেই না, এখন জঙ্গল থেকে লোকালয়ে যাত্রার নিয়ম কানুন অ-নে-ক কড়া। একদমই ওয়ান-ওয়ে টিকেট । একবার এলে আর ফেরা যাবে না! লোকালয়ের মানুষ স্বজাতীয় সন্ত্রাসীদের ভয়ে ঘরে খিল এঁটে বসে থাকলেও বাঘকে তারা থোড়াই কেয়ার করে। মানুষের গতি এখন বাঘের চেয়ে ক্ষিপ্র। ফটাফট দু’চারটে বাঘ মেরে শুইয়ে, গাছে ঝুলিয়ে দিতে পারে এই আশরাফুল মাখলুকাত। মানুষের লোভ বাঘের খিদের চেয়েও ভয়াবহ। মৃত বাঘ মাটি চাপা দেয়ার আগে গায়ের চামড়া ছিলে নিতে ভুল হয়না তাদের। কি করে হবেই বা! এক চামড়া বেচেই যদি কড়কড়ে নোটের নগদ ১৫ লাখ টাকায় নিজের মনুষ্য শরীরটা মুড়ে নেয় যায় তো মন্দ কি!
গত বছরের জুন/জুলাইয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে এবং বাগেরহাটে শরণখোলার গ্রামবাসীরা দুটি বাঘকে পিটিয়ে হত্যা করে। এ বছরের জানুয়ারিতে সাতক্ষীরায় গ্রামবাসী পিটিয়ে, বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে লোকালয়ে ঢুকে পড়া এক বাঘকে। যদিও বাঘটি কাউকে আক্রমণ করেনি এবং শেষ পর্যন্ত আক্রমণ করার কোন সুযোগই পায়নি।
গত জানুয়ারিতেই ১৩টি দেশের (টাইগার রেঞ্জ কান্ট্রি) সাথে বাংলাদেশও অংশ নেয় থাইল্যান্ডে আয়োজিত প্রথম এশীয় বাঘ সম্মেলনে। এই সম্মেলনের লক্ষ ছিল ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা বর্তমানের দ্বিগুণ করা। সেই জানুয়ারিও পার হয়নি খুব বেশীদিন আগে। তবে ২০২২ আসতে আরো বছর দশেকেরও বেশী বাকি নিঃসন্দেহে। ফলে পত্রিকায় মৃত বাচ্চা চিতাবাঘকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাওয়ার ছবি উঠে আসে আবার। ঘটনাটি বরগুনা জেলার। বাঘহত্যার পুনরাবৃত্তি যদি এই হারে হয় তো, ২০২২ সালে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার কোনরূপ সম্ভাবনা তো নেই -ই, বরং তা অর্ধেকে এসে ঠেকবে, অথবা আরো ভয়াবহ ভবিষ্যৎ বাণী করতে গেলে বলতে হয় বাঘ প্রজাতি শূণ্যের কোঠায় এসেও দাঁড়াতে পারে!
পরিসংখ্যান বলে বর্তমানে পৃথিবীতে বাঘের সংখ্যা তিন হাজার দুইশটি। আর বাংলাদেশে? জানুয়ারিতে এশীয় বাঘ সম্মেলনে সরকারি তথ্য মতে সুন্দরবনে বাঘ রয়েছে ৪৫০টি। ১৯৯৯ সালে ব্রিটিশ জীববিদ ও ব্যাঘ্র-বিশেষজ্ঞ টিসা ম্যাকগ্রেগর অবশ্য দাবি করেন সুন্দরবনে ২০০টির বেশী বাঘ নেই। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাঘশুমারিতে পায়ের ছাপ (Pugmark; "Pug" means foot in Hindi) গণনা পদ্ধতিতে বাংলাদেশে ৪১৯টি এবং ভারতে ২৭৪টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ সনাক্ত হয়।
হাতি মরলে যেমন লাখ টাকা, বাঘ মরলেও কম কিছু নয় মোটেও। বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে রমরমা ব্যবসা রয়েছে বাঘের চামড়া ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের। সবচেয়ে বড় বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করে চীনের ঐতিহ্যবাহী ওষুধশিল্প। বাঘের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে তৈরী এসব ওষুধের বাজার জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ইউরোপেও বিস্তৃত। এরফলে পোচিং (বন্যপ্রাণী অবৈধ শিকার/হত্যা) এর অন্যতম সহজ লক্ষ হয়ে উঠছে বাঘ প্রজাতি। শিকারী বাঘ নিজেই শিকারে পরিণত।
[শরণখোলার দক্ষিণ রাজাপুরে গ্রামবাসীর পিটুনিতে নিহত রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে রেঞ্জ অফিসে নেয়া হচ্ছে]
বনের বাঘ প্রতিবার লোকালয়ে চলে আসছে কেন? খাদ্যের সন্ধানে। এর অর্থ হলো বনে খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। পূর্ণ বয়স্ক বাঘের দৈনিক গড়ে প্রায় ৭-৮ কেজি মাংসের প্রয়োজন। বছরে প্রায় মোট ২৬০০ কেজি মাংস (যা ৫০ থেকে ৫৫টি হরিণ বা বন্য শুকরের ওজনের সমান) প্রয়োজন খাদ্য হিসেবে। ৩০-৪০ কেজির বেশী শিকার করলে সপ্তাহে একবার শিকার করাই যথেষ্ট বাঘের জন্য। খাদ্য সংকটের হেতু কী? এর অর্থ খুবই সুষ্পষ্ট যে বনের পরিবেশ যথেষ্টই ভারসামস্যহীন। এমনকি অধিকহারে বন উজাড়, বনের কাছাকাছি ভূমি দখল হওয়ার কারণে লোকালয় আর বনের স্বাভাবিক দূরত্বের ব্যবধান কমে আসছে। এতে বাঘ সহজেই লোকালয়মুখী, বিপরীতে লোকালয় বরাবরের মতই আক্রমনাত্মক বন্যপ্রাণীর প্রতি।
সংঘবদ্ধচক্রের দ্বারা বনে বাঘ হত্যা ছাড়াও লোকালয়ে যতবার বাঘ খাবারের সন্ধানে এসেছে, কম-বেশী ততবারই আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং মারা পড়েছে। বাঘের ভয়ে মানুষ ভীত হবে, ফলে তাদের আত্মরক্ষার্থে ব্যবস্থা নেয়াটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে বাঘ বা যে কোন বন্য জানোয়ারই যে কেবল খাদ্যের জন্যই হিংস্র হয়ে আক্রমণ করে তা নয়। তারাও মানুষের মতই আত্মরক্ষার্থেই আক্রমণ করে। তবে আজকাল হয় বাঘ তার হিংস্রতা ভুলতে বসেছে, নয়তো মানুষ হিংস্রতার কলাকৌশল করায়ত্ব করেছে পুরোপুরি। হয় বাঘের নখের ধার কমে গেছে, পেশীতে জোর কমে গেছে, নয়তো মানুষের ধমনীতে বর্বরতার জোশ বেড়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। নয়তো ভাবুন, মানুষের ভয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগার কখনো খেজুর গাছে, কখনো তাল গাছের মাথায় উঠে বসে আছে! গাছের মাথায় উঠে থাকা বাঘকে পরবর্তীতে বনবিভাগের কর্মীরা এসে ট্রাংকলাইজার দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে নামিয়ে আনে। দু’তিনবার ঘটা এইরকম ঘটনায় প্রতিবারই প্রয়োজনীয় সেবার পর বাঘগুলোকে বনের দিকে ছেড়ে দেয়া হয়। এই ঘটনা অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ এলাকার। আমাদের দেশে বাঘএকবার মানুষের মাঝে এসে পড়লে প্রাণ নিয়ে ফেরৎ গিয়েছে কমই।
[ছবিসূত্রঃ ১৯শে মার্চ ২০১০, দৈনিক প্র্রথম আলো; পিটিয়ে হত্যা করার পর চিতা শাবকটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ]
আমাদের দেশে বাঘের মৃত্যুর হার সম্পর্কে জানতে চান? ১৯৬০ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সুন্দরবনে ১০০টি বাঘ হত্যা হয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ পর্যন্ত প্রায় ২৪টি (২৩ অথবা ২৪) বাঘের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে ২০০০ সালের প্রথম তিন মাসেই দুটি বাঘ মারা পড়ে। ২০০৪ এবং ২০০৫ সালে তিনটি বাঘ মারা যায় সাতক্ষীরা রেঞ্জের সুন্দরবনে। ২০০৯ সালে তিনটি বাঘ মারা পড়ে। স্বাভাবিক মৃত্যু এবং প্রাকৃতিক দূর্যোগ জনিত কারণের চেয়ে মূলত বাঘ শিকারীদের দৌরাত্ব এবং কর্তৃপক্ষের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার সাথে স্থানীয় জনগণের বাড়তি উগ্র আচরণই দায়ী।
পিটিয়ে (অথবা বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে বা ইট-পাটকেল ছুঁড়ে) বাঘ মারা ছাড়া কি গত্যন্তর নেই মানুষের? নিয়ম হচ্ছে, ট্রাংকুলাইজার বন্দুক ব্যবহার করা, যা দিয়ে ঘুম পাড়ানি গুলি ছোঁড়া হয়। Bangladesh Tiger Action Plan মোতাবেক বন বিভাগের সকল কর্মী এবং প্রহরীদের ট্রাংকুইলাইজার বন্দুক চালানো জানতে হবে। এর ব্যবহারে বাঘ চেতনা হারালে সহজেই তাকে ধরা সম্ভব, ফলে নিরাপদে পুনরায় বনে ছেড়ে দেয়াও সম্ভব। কিন্তু আমাদের প্রশাসনিক অপরিপক্কতার পরিচয় এখানেই মিলবে । সাতক্ষীরার চণ্ডিপুর গ্রামে ঢুকে পড়া বাঘটিকে স্থানীয় বনবিভাগ, প্রসাশনের কর্মীরা আটকাতে ব্যর্থ হলে বাঘটির মৃত্যু ঘটে এলাকাবাসীর হাতে। শ্যামনগর থানার ওসি ফজলুর রহমান জানান, ”বনবিভাগের কাছে চেতনানাশক ইনজেকশন ও সরঞ্জাম না থাকায় বাঘটি ধরা যায়নি।” বাঘটিকে হত্যার পর উক্ত ওসির সাথে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনে-কোনরূপ সাড়া দেননি! শ্যামনগরের ইউএনও সাব্বির আহমেদের ভাষ্য ছিল, বনবিভাগের কর্মকর্তারা চেতনানাশক ইনজেকশন ও বিশেষজ্ঞদের জন্য ঢাকায় খবর দিয়েছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, বাঘ যদি আক্রমণ করে তবে কি বলে কয়ে করবে! বনবিভাগের সার্বক্ষনিক প্রস্তুতি কই? তাদের সংগ্রহে পর্যাপ্ত ইনজেকশন নেই কেন? তাদের মাঝে চেতনানাশক বন্দুক ব্যবহার করার মত, বাঘ ধরার মত বিশেষজ্ঞ নেই কেন? যেহেতু কোন না কোন গ্রামে বাঘের আনাগোনা হচ্ছেই, তাই সম্ভাব্য এলাকাগুলো বন থেকে একটু দূরে রাখার কথা কি বনবিভাগ ভেবে দেখেছেন? কোনভাবেই বাঘ হত্যা না করে কিভাবে গ্রামবাসীরা কেবল আত্মরক্ষার্থে বাঘকে সাময়ীকভাবে দ্রুত বন্দি করতে পারে অথবা এলাকা থেকে বনের দিকে তাড়িয়ে দিতে পারে, সে ব্যাপারে গ্রামবাসীদেরও কিছু প্রশিক্ষণ, জ্ঞান থাকা উচিৎ।এবং সচেতনতা তৈরীর এই দ্বায়িত্ব যে স্থানীয় বন বিভাগের তা কি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মস্তিস্কে উদয় হয় একবারও?
উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে আর সব রথি-মহারথিদেশের মত বাংলাদেশও ফাঁকা বুলি আওড়ানো রপ্ত করে নিয়েছে । ফলে অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রগুলোর মতই বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেবল কাগুজে গল্প। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বন ও বন্য প্রাণী রক্ষা একান্ত জরুরী বিষয় একথা বোঝার মত যথেষ্ট শিক্ষার অভাব রয়েছে আমাদের। উপরন্তু আমাদের মানবীয় গুণাবলীর চরম বিপর্যয় আমাদের মধ্যকার সুপ্ত পৈচাশিকতাকে জাগিয়ে তুলছে দিনকে দিন। বন ও বন্য প্রাণী দিনকে দিন বিপন্ন হয়ে উঠছে। কিন্তু আমাদের বনজসম্পদকে গড়ের মাঠ না করে আমরা ক্ষান্ত হবো না নিশ্চিত! আমাদের বন্য পশুদের স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ব্যাঘাত না ঘটিয়ে আমরা শান্তি পাবোনা কোনক্রমেই। বাঘ পিটিয়ে মেরে আমরা আদিম উল্লাস করতেই থাকবো যতদিন না বন থেকে বাঘের নাম ও নিশানা মুছে যায়!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

