১৯৯১ সালের কথা। আমি তখন মন্ট্রিয়লে থাকতাম। বিদেশ জীবনের শুরুর দিকে তখন আমাদের জীবন জুড়ে শুধু আড্ডাবাজি। না কোন ই-মেইল না কোন মোবাইল ফোন! জীবন তখন খুব সহজ সরল। তখনো আমরা হাতে চিঠি লিখতাম। টেলিফোনে কথা বললে মিনিট প্রতি কল চার্জ ছিল তিন ডলার। বিশ বছরের ব্যাবধানে জীবন আজ কোথায় চলে গেছে! এখন ফোনে কথা বলতে মিনিট প্রতি খরচ হয় ২/৪ সেন্ট। পার্থক্যই বটে!
যা লিখছিলাম, একানব্বুইয়ের সামার শেষ হয়ে গেছে তখন। চারিদিকে পাতাঝরা বিষন্ন সময়। আমাদের তখন বিষন্নতাও ভালো লাগে। সুখে থাকলেও পার্টি করি অসুখে থাকলেও পার্টি করি! মন্ট্রিয়ল ডাউনটাওনের আগে প্রিন্স আর্থার স্ট্রীটের আশেপশের কোথাও থাকত আমাদের এক বান্ধবী। আমার এক বন্ধুর সাথে যার ছিল যুদ্ধবিগ্রহ সম্পর্ক। কত সন্ধ্যায় বান্ধবীর এপার্টমেন্টের দোতলা'র লোহার বেলকনিতে বসে করেছি জীবনের উথালপাথাল গল্প! আমরা তখন ডুমরিয়ার রেগুলার সিগারেট টানতাম...
এমন কত সন্ধ্যায় আড্ডা শুরু হয়েছে হয়ত এক জন দু'জন করে ভোর হতে হতে সেই আড্ডা আর আড্ডা থাকত না রূপনিত একদল বন্ধুবান্ধবের চরম পার্টিতে। ভোর হতে হতে কেউ হয়ত সোফার চিপায়, কেউ বেলকনিতে, কেউ করিডোরে পরে ঘুম দিতাম! কেউ কেউ তখনও বাডওয়াইজারের গলা টিপে চালিয়ে যেত আড্ডা। যেনো জীবন ফুরাবে তবু আড্ডা ফুরাবে না!
এমনও অনেক রাত ছিল আমাদের যখন আমরা সরা রাত হেটে বেড়াতাম মন্ট্রিয়ল শহর। কোন সস্তা পাবে ঢুকে পেট ভরে টানতাম ড্রাফ্ট বীয়ার। খিদে পেলে রাস্তার দোকান থেকে কিনে খেতাম নাইন্টি নাইন সেন্ট এর স্লাইস পিজ্জা। ডাউন টাওনে পেলেস দ্যেজ আর্টস এর সিড়িতে বসে ডুমরিয়ার রেগুলার ফুকতে ফুকতে দুনিয়ার রাজা উজির মারতাম। ইচ্ছে হলে হাটা দিতাম চায়না টাউন পেরিয়ে পুরোনো মন্ট্রিয়লের নদীর ঘাটে।
এক বিকেলে আমার এক বন্ধুর ভাই জাহাজের নাবিক গ্রীস থেকে জাহাজ নিয়ে ওল্ড মন্ট্রিয়লে এক রাতের জন্য নোঙ্গর করলে আমরা তাকে আনতে ওল্ড পোর্টে যাই। সে রাতে আমি আমার বন্ধু আর তার ভাই ও আমাদের সেই বান্ধবী সারারাত শহরময় ঘুরে বেরিয়েছিলাম। ভোরবেলা যখন বন্ধুর ভাইটি জাহাজে ফিরে যায় তখন ভেবে খুব অবাক লেগেছিল, কি অদ্ভুত এ জীবন মানুষের! আজ যেখানে বসে দু'দন্ড জিরিয়ে গেল এই অগুন্তুক হয়ত সে আর ফিরবে না কখনো এই বন্দরে! পৃথিবীর কত সহস্র জনপদে কত মানুষের বসবাস, আমরা এই এক জীবনে তার কতটুকুই বা জানি! কতটুকুই বা দেখে যেতে পারি? তবুও মানুষ নিয়ত ঘর ছেড়ে বের হয় অজানার খঁোজে। এক জীবনে তার কতটুকুরইবা সে নাগাল পায়!
সে রাত পেরুনো সকালের অনুভুতি নিয়ে ১৯৯৯ সালে আমি ছোট্ট একটা ছবি তৈরি করতে চেষ্টা করেছিলাম। নাম, 'সুপ্রভাত মন্ট্রিয়ল'। তেমন আহামরি কিছু নয়। কাগজে না লিখে কিছু অনুভূতি ছবি দিয়ে লেখার চেষ্ট করেছিলাম। অনেক দিন বাদে ছবিটা দেখে কুড়ি বছর আগের কত যে স্মৃতি মনে এল...
ছবিটি ২০০০ সালের শুরুতে ন্যাশনাল ফিল্ম বোর্ড অব কানাডার মন্ট্রিয়ল থিয়েটারে প্রথম প্রদর্শিত হয়। ২০০৭ সালের ভ্যালেন্টাই ডে তে 'সুপ্রভাত মন্ট্রিয়ল' এসটিভি ইউএসএ তে প্রচারিত হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে বিদেশ টিভি তে। সম্প্রতি আমার ইউটিউব একাউন্টে আমি আপলোড করে রেখেছি। এই ব্লগে সেটি শেয়ার করে রাখলাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জানুয়ারি, ২০১১ ভোর ৪:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


