
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯০৮ সালে প্রথম নারী দিবসের সূচনালগ্নে নারীর দাবি ছিল নারীর শিক্ষা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। সেই দাবি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের স্বাধীন ভূখন্ডে ৩৮ বছর ধরে পালিত হচ্ছে এ দিবসটি। এই দীর্ঘ সময়ে নারী আন্দোলনের আছে সফলতা ও দুর্বলতা। কিন্তু এই ৩৮ বছরে বাংলাদেশের নারীদের যে অগ্রগতি হয়েছে তাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। ঘরের চার দেয়াল ভেঙে হাজার বছরের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে প্রমিলার আবরণ থেকে বের হয়ে এসেছে এদেশের নারী। ঘরে-বাইরে, জীবনের সব ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারী রেখে চলেছে তার অবদান। কোন কাজ করে না নারী? সন্তানের লালন-পালন থেকে শুরু করে সমাজের সবখানেই সফল নারী। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের নারীরাও এখন বিচরণ করছে শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি গণমাধ্যমসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। স্বাধীন হওয়ার পর গত ৩৮ বছরের অন্তত ১৫ বছর এই দেশ শাসিত হয়েছে নারীদের নেতৃত্বে। তৈরি হয়েছে একটি নারী নীতি, যা অনেক অগ্রসর চিন্তা ধারণ করে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে :
বেগম রোকেয়া এক সময় আন্দোলন করেছেন মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার জন্য। কারণ শিক্ষাই সব কুসংস্কার থেকে মুক্তি দিতে পারে একজন মেয়েকে। স্বাধীনতার পর খুব অল্পসংখ্যক মেয়ে সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নিয়েছে শিক্ষা। বিপ্লব ঘটতে থাকে ১৯৮৯ সাল থেকে। ১৯৮৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী ছেলেদের শতকরা ৯০ জন বিদ্যালয়ে শিক্ষারত ছিল। মেয়েদের বেলায় এ হার ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু পরের দেড় দশকে এ চিত্র পাল্টে যায়। সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০০৭ সালের রিপোর্ট অনুসারে ১৯৯৫ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ছেলে ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মেয়ে ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০০২ সালে এ হার প্রায় সমান হয়ে দাঁড়ায় ছেলে ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মেয়ে ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ। আর বর্তমানে এই হার সমান সমান। শুধু তাই নয়, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার হার ২০০১ সালে ছিল ১৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০০৩ সালে এসে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ ও ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ। আর বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকে এই ঝরে পড়ার হার ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা যায় ১৯৯৫ সালে মাত্র ৫ শতাংশ মেয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতো। বর্তমানে এই হার বেড়ে হয়েছে ১৯ শতাংশ।
কর্মক্ষেত্রে :
শিক্ষকতায় সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে নারীদের। ১৯৯৫ সালে নারী শিক্ষকের হার ছিল ২৫ শতাংশ। ২০০২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আর বর্তমানে এই হার ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ। এই নারী শিক্ষকরা পুরুষের পাশাপাশি গড়ে তুলছে আমাদের আগামী প্রজন্মকে। প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড অফিসার পদে ১০ শতাংশ এবং অন্যস্তরে ১৫ শতাংশ নিযুক্তির ব্যবস্থা করা হয় সরকারিভাবে। ২০০৭ সালের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৯৪ সাল থেকে ২০০২ সালে প্রথম শ্রেণীর নারী আমলাদের অনুপাত ৫ দশমিক ২ শতাংশ থেকে তা বেড়ে হয় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, তৃতীয় শ্রেণীতে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং চতুর্থ শ্রেণীতে ৩ দশমিক ১ থেকে বেড়ে হয় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০০৭ সালে প্রথম শ্রেণীতে এই হার বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ, দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ, তৃতীয় শ্রেণীতে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ, চতুর্থ শ্রেণীতে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০০০ পাবলিক ও স্বায়ত্তশাসিত সেক্টরে ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ পুরুষের পাশে মেয়েদের নিযুক্তি ছিল ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। বেসরকারি পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক সেক্টরে ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশ পুরুষের পাশে মেয়ে ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ। অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে এ হার ছিল পুরুষ ৭৭ দশমিক ৩ শতাংশ, মেয়ে ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। লাভজনক প্রতিষ্ঠানে এ হার ছিল ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ পুরুষের পাশে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ নারী। বর্তমানে এই হার বেড়েছে সব ক্ষেত্রে। ২০০৭ সালে সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী পাবলিক ও স্বায়ত্তশাসিত সেক্টরে মেয়েদের নিযুক্তি ১১.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৯.৭ শতাংশ। বেসরকারি আনুষ্ঠানিক সেক্টরে ৬.২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১.৪ শতাংশ। অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে ২২.৭ থেকে ৩১.৩ শতাংশ। লাভজনক প্রতিষ্ঠানে এ হার ৪৪.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫২.৮ শতাংশ। ওই একই রিপোর্টে সেনাবাহিনীতে ৭৬ জন, বিমানবাহিনীতে ৩৫ জন এবং নৌবাহিনীতে ২০ জন নারী পদাধিকারীর পদে রয়েছে। পুলিশ বিভাগে কনস্টেবল ও কর্মকর্তা মিলে কর্মরত আছেন এক হাজার ৯২ জন নারী। সিভিল সার্ভিসে ৭ হাজার ৫৭৪ জন নারী এবং পররাষ্ট্র দফতরে ২৬ জন নারী কর্মরত আছেন। অতিরিক্ত সচিব দুজন, যুগ্ম সচিব ১১ জন এবং ডেপুটি সেক্রেটারি রয়েছেন ৪৬ জন।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে :
দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর পোশাক শিল্পে কর্মরতদের প্রায় ৭৫ শতাংশই মেয়ে। এ সংখ্যা অন্তত ১৮ লাখ। হাজার বছর ধরে যেসব নারীকে রাখা হয়েছিল মূল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বাইরে- এখন তারাই হয়ে উঠেছে বিদেশি মুদ্রা অর্জনের প্রধান শক্তি। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে এই গার্মেন্টস শ্রমিক এবং গ্রামের অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত নারীদের অবস্থান অসামান্য। শহর থেকে যে অর্থ গ্রামে যায় তার সিংহভাগটাই পাঠায় এ নারী শ্রমিকরা। চা ও চামড়া শিল্পেও কাজ করছে মেয়েরা। দেশের ৬২ শতাংশ মেয়ে অর্থনীতিতে সক্রিয়। দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ এই হার। আর ৫০ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে বেশিমাত্রায়। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্রে ৫৯ শতাংশ নারী কাজ করছে। মাঠ থেকে শুরু করে খাদ্যশস্য প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য উপযোগী করে তোলা এবং তা বাজারজাত করার কাজও তারা করছে। বাংলাদেশের প্রায় ৩২ দশমিক ৫ মিলিয়ন নারী দেশের অর্থনীতিতে শ্রম দিচ্ছে। পুরুষের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর এই বিপুল পদচারণার ফলে বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হওয়াটা প্রভাব ফেলেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষা উন্নয়নের ক্ষেত্রে।
রাজনীতিতে :
রাজনীতির পটভূমিতে দীপ্ত পদক্ষেপ রেখে চলেছে নারী নেতৃত্ব। স্থানীয় প্রশাসনের ইউপি থেকে শুরু করে সংসদ পর্যন্ত সবক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ দৃপ্ত। ইউপি, উপজেলা, জেলাসহ তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব তাদের সৃজনশীলতা দ্বারা, তাদের সঠিক বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করে চলেছে সাধারণ জনগণের নানা সমস্যার। দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছে দেশের নারী নেতৃত্ব।
এ ছাড়া গণমাধ্যমে বেড়েছে নারীদের পদচারণা। সাংবাদিকতার মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে অসংখ্য নারী। আমরা পেয়েছি নারী উন্নয়ননীতি, যা ৩৮ বছরের নারী আন্দোলনের অনেক বড় প্রাপ্তি। পেয়েছি সিডও ও নারীর মানবাধিকার। এ প্রাপ্তি সমগ্র নারী সমাজের।
এ প্রসঙ্গে স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার বলেন, আমাদের স্বাধীনতার পর বড় প্রাপ্তি সংবিধানের অঙ্গীকার নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করা। সেই অঙ্গীকারকে সামনে রেখে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি আমরা। আমাদের সফলতা ও দুর্বলতা আছে। কিন্তু অগ্রগতি বিস্ময়কর ও বৈপ্লবিক। নারীরা উন্নয়নের সমঅংশীদার। তারা উন্নয়নের ফল ভোগকারী নন, উন্নয়নের অবদানকারী। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী তার অবদান রেখে চলেছে। আমি মনে করি, নারীদের এখন দিতে হবে তাদের অবদানের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন। জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে তাদের এগিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। নারীর জন্য সহযোগী কর্ম পরিবেশ অর্থাৎ সংবেদনশীল পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, কোথায় নেই মেয়েরা? আইন, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, খেলাধুলা সব ক্ষেত্রে মেয়েরা তাদের দক্ষতা দেখাচ্ছে। বেগম রোকেয়া বলেছিলেন, ছেলেরা যাহা যাহা করে মেয়েরা তাহা তাহা করতে পারে। আজ মেয়েরা তা করে দেখাচ্ছে। তবে তাদের জন্য সহজ স্বাভাবিক যে মবিলিটি দরকার তা পুরোপুরি এখনো হয়নি। আমরা যা পেয়েছি তা আমাদের অর্জন। তবে এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে আমরা এগোতে পারবো না। তাই তাদের এই অর্জনকে এগিয়ে নিয়ে পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে কাজ করার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, এ অগ্রগতি সামগ্রিকভাবে সংখ্যাবাচক, কিন্তু গুণবাচক নয়। কারণ নারীরা এখনো স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তবে অর্থনৈতিকভাবে এখন মেয়েরা অনেক স্বাবলম্বী। নারীরা এগোচ্ছে, কিন্তু আমি শঙ্কিত। কারণ নারীদের এই অগ্রগতিকে রুখতে ধর্মান্ধতার একটি গোষ্ঠী তৎপর। তাদের ব্যাপারে এখনই সচেতন হতে হবে। কারণ এই গোষ্ঠী নারীকে আবার অবরোধবাসিনী করতে চায়।
বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, আমাদের অগ্রগতি হয়েছে। সংসদে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছি। সমাজের সব ক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছি। তার পরও আমাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। আমরা দুই পা এগোই আর আমাদের পারিপার্শ্বিকতা পাঁচ পা পিছিয়ে দেয়। এখনো নারীরা সবচেয়ে বেশি ভিকটিম। তাই এই অগ্রগতিকে শক্তি করে এগোতে হবে সব প্রতিকূলতার মধ্যে।
বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপিকা অপু উকিল বলেন, দেশের অর্ধেক নারী। দেশের উন্নয়নের জন্য নারীকে এগিয়ে নিতে হবে। আমি মনে করি, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বিশেষ অবদান রাখবে। সচেতন নারী অবচেতন নারীকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এটাই নারী দিবসে আমাদের প্রত্যাশা।
লেখিকা: সুলতানা কনা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


