নিজস্ব প্রতিবেদক
কালের কন্ঠ(১৬/০৮/২০১১)
'আদিবাসী'র স্বীকৃতির প্রশ্নে রাজধানীসহ দেশের নানা প্রান্তের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সংগঠনগুলো এখন প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠছে। এসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল ও শিক্ষাঙ্গনে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংগঠন মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন, পথসভাসহ নানা কর্মসূচি পালন করে চলছে।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতারা বলছেন, সংশোধিত সংবিধানে দেশের প্রায় ৭৫টি ভাষাগত সংখ্যালঘু জনজাতির ৩০ লাখেরও বেশি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা মোটেই প্রতিফলিত হয়নি। উপরন্তু 'বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই, বাঙালিরাই এ দেশের আদিবাসী' সরকারি এমন বক্তব্যে ভাষাগত সংখ্যালঘু জনজাতির মুখোমুখি তাদের দাঁড় করিয়ে উভয়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা মোটেই কাম্য নয়। এ অবস্থায় একের পর এক লাগাতার আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে তারা চাইছে, সংবিধানের পুনঃ সংশোধন।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ সরেন কালের কণ্ঠকে জানান, আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে তাদের সংগঠনের উদ্যোগে আগামীকাল বুধবার রাজশাহী ও রংপুর বিভাগীয় সদরে আদিবাসী সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। এই দুটি সমাবেশে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলার শত শত আদিবাসী যোগ দিয়ে সংশোধিত সংবিধানের প্রতি তাদের অনাস্থা দেখাবে। এই সমাবেশ থেকে পরবর্তী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
রবীন্দ্রনাথ সরেন আরো জানান, পঞ্চম সংশোধনীর বিলের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন হওয়ার পর পরই এর প্রতিবাদ জানিয়ে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী দল ও সংগঠনগুলো নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে আসছে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আদিবাসী সংগঠনগুলো বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে। এসব কর্মসূচি থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সর্বত্র আদিবাসী সংগঠনগুলোর একের পর এক লাগাতার আন্দোলন সংগ্রাম চলবেই।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম' বহাল রেখে এতে দেশের অধিবাসীদের 'বাঙালি' এবং নাগরিক পরিচয় 'বাংলাদেশি' বলা হয়েছে। সংবিধানে ভাষাগত সংখ্যালঘুদের 'উপজাতি', 'ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী' ও 'ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা' অভিধায় চিহ্নিত করা হয়েছে। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি কূটনৈতিক ও গণমাধ্যমের সম্পাদকদের মতবিনিময় সভায় আদিবাসীদের 'ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী' উল্লেখ করে বলেন, 'প্রকৃত অর্থে বাঙালিরাই এ দেশের আদিবাসী।' সংবিধান সংশোধন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে আদিবাসীদের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। গত ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠানটিও অন্যান্য বছরের মতো উৎসবমুখর না হয়ে প্রতিবাদ সমাবেশে পরিণত হয়।
রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, 'সংশোধিত সংবিধানে আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি, অর্থাৎ আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিদান পুরোপুরি উপেক্ষিত। অথচ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতিদানের পাশাপাশি আদিবাসী উন্নয়নের কথা বলেছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকার সময় আদিবাসী দিবসে (৯ আগস্ট) ভাষাগত সংখ্যালঘু জনজাতিদের 'আদিবাসী' হিসেবে উল্লেখ করে একাধিকবার বাণীও দিয়েছেন। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ২০০৮ সালে আদিবাসী দিবসের সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্যও দিয়েছেন। অথচ তাঁরা এখন সবই অস্বীকার করে আদিবাসীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'সরকারকে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতেই হবে। আমরা চাই, সংবিধানের পুনঃ সংশোধন। অন্যথায় আদিবাসীরা এই সংবিধান কোনোমতেই মেনে নেবে না।'
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা কালের কণ্ঠকে জানান, সংবিধান সংশোধন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায় অসংখ্য মিছিল, সমাবেশ, পথসভা, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে এবং এখনো এসব কর্মসূচি পালন অব্যাহত রয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা নানা কর্মসূচি পালন করছে। জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে একই ইস্যুতে আরো মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে।
খাসি ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সভাপতি এন্ড্রু সলেমার কালের কণ্ঠকে জানান, বৃহত্তর সিলেটের খাসিয়া, মণিপুরিসহ অন্যান্য আদিবাসী অধ্যুষিত জেলাগুলোতে আদিবাসী ইস্যুতে মিছিল, মানববন্ধন, আলোচনা সভা হয়েছে। গত ৯ আগস্ট আদিবাসী দিবসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অনুষ্ঠানটিও ছিল একই দাবিতে প্রতিবাদমুখর। বৃহত্তর সিলেটের জেলায় জেলায় বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে নানা কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে।
এন্ড্রু সলেমার বলেন, "আদিবাসী অভিধায় সরকারের আপত্তি থাকলে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, গারো, খাসী, মণিপুরি ইত্যাদি সংখ্যালঘু জাতিগুলোকে নিজ নিজ জাতির নামেই সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া যেত। কিন্তু আমরা কোনো দিনই 'উপজাতি' বা 'ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী' অভিধান মেনে নেব না।'
-------------------------------------------------------------------------------

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


