একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলে নয় মাসজুড়ে। মুক্তিযুদ্ধের এ পুরো সময় পৃথিবীর নানা দেশের প্রভাবশালী প্রায় সব পত্রিকায় বিশেষ গুরুত্ব পায় আমাদের গৌরবগাথার ইতিহাসের অনেক ঘটনা। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই বাংলাদেশের (সে সময়কার পূর্ব পাকিস্তান) পরিস্থিতি নিয়ে অনেক পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, শরণার্থীদের মানবেতর জীবন, বিধ্বস্ত জনপদ, আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের বক্তব্য, মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরে পত্রিকাগুলো। বিদেশি পত্রিকার এসব প্রতিবেদন তখন বিশ্বজনমত গড়ে তোলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, অন্যদিকে এখন সাক্ষী হয়ে আছে আমাদের ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের।
মুক্তিযুদ্ধের এতগুলো বছর পরেও ইতিহাস নিজের দখলে টানার রাজনীতি চর্চাটা চলছে নির্লজ্জভাবে। ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের অবসান ঘটাতে একাত্তরে প্রকাশিত এসব পত্রিকাও সত্ সাক্ষী দেবে। রাজনীতিবিদরা বিতর্ক সৃষ্টি করতে একে জিইয়ে রেখে ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা লোটার ক্ষেত্রে পারদর্শী হলেও এর নিরসনে তাদের গরজ নেই। সে জন্যই বোধহয় স্বাধীনতা লাভের ঊনচল্লিশ বছরেও এসব পত্রিকার কপি অন্তত ইতিহাস লেখার প্রয়োজনেও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংগ্রহ করা হয়নি। ইতিহাসের উপাদান, সাক্ষী—এসব প্রতিবেদনের মধ্য থেকে কয়েকটির নির্বাচিত অংশ নিয়ে লেখাটি সাজিয়েছেন হাসান শান্তনু।
* উইকলি টাইম, ১৫ মার্চ ’৭১
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত উপমহাদেশের বিভক্তির পর রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার রক্ত যখন বইছে, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর কণ্ঠে তখনই দেশটির ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কার কথা শোনা গেছে। গত সপ্তাহেও বিশ্বের পঞ্চম জনবহুল এ দেশটিতে রক্ত ঝরেছে। যার একদিকে রয়েছে দেশটির গম উত্পাদনকারী পশ্চিমাংশের লম্বা, ফর্সা মানুষ; অন্যদিকে রয়েছে পূর্বাংশের ধান উত্পাদনকারী খাটো, কালো রঙের মানুষ। বর্তমানে এ দুই অংশ দ্রুতগতিতে বিচ্ছিন্নতা বা একটি গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
* নিউজ উইক, ৫ এপ্রিল ’৭১
অখণ্ড পাকিস্তানের ইতিহাসের ২৪তম বছরে দেশটির পূর্ব ও পশ্চিমাংশের মধ্যকার শিথিল বাঁধন আলগা হয়ে গেছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার হঠাত্ করেই পূর্ব পাকিস্তানে বেতার ও বাইরের সব রকমের যোগাযোগের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করেছে। সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রাথমিক খবরাখবর খুবই সামান্য। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে পাওয়া টুকরো খবরগুলো মর্মস্পর্শী আর ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের বিবরণে ভরা।
* ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ৩০ মার্চ ’৭১
২৬ মার্চ ভোর ২টায় পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা শহরজুড়ে গুলিবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটতে থাকে। পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংলগ্ন এলাকা দখল করে নেয়। তারা সেখানে আত্মগোপনকারী ছাত্রদের হত্যা, স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উড়ানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ... এক প্লাটুন পাকিস্তানি সৈন্য ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের বিপরীত দিকের স্থানীয় ‘পিপল’ পত্রিকার জনশূন্য দফতরে হামলা চালায়। তারা ওই এলাকার অধিকাংশ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।
* টাইম, ৫ এপ্রিল ’৭১
গত সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানের আইনশৃঙ্খলার ভার ৮০ হাজার পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যের হাতে বর্তালেও তাদের রসদপত্র সরবরাহের ঘাঁটি সেখান থেকে এক হাজার মাইল দূরে। সে ক্ষেত্রে তাদের ভারতীয় উপকূলের তিন হাজার মাইল ঘুরপথ দিয়ে খাদ্য, গোলা বারুদ নিয়ে আসতে হবে। সৈন্যদের অধিকাংশই দীর্ঘদেহী মেজাজি পাঞ্জাবি ও পাঠান হলেও পূর্ব পাকিস্তানে তারা সাত কোটি আশি লাখ বৈরী জনগোষ্ঠীর দ্বারা পরিবেষ্টিত। এ গৃহযুদ্ধ যে খুবই রক্তক্ষয়ী, প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রলম্বিত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
* কাইহান ইন্টারন্যাশনাল, ১ আগস্ট ’৭১
২৬ মার্চের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুজিবকে বন্দি করে করাচি নিয়ে যাওয়া হয়। বিমানের মধ্যে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ঘুমিয়ে কাটান তিনি। কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটায় নেয়ার উদ্দেশে করাচি বিমানবন্দরে তাকে অন্য বিমানে তোলা হয়। ভিআইপি লাউঞ্জে নেয়া হয় তাকে, চা পান করতেও দেয়া হয়। তবে মুজিব কালো কফি খেতে চান। এ সময় দু’জন পুলিশকে তার পেছনে দাঁড় করিয়ে ছবি নেয়া হয়। মুজিব এখন কোথায়, কীভাবে আছেন—এ সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানেন। গত মাসে অনশন শুরু করেন তিনি। কিন্তু স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে দেয়ার পর অনশন ভাঙতে রাজি হন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে অনবরত লিখে যাচ্ছেন তিনি। কী লিখছেন, তা অবশ্য কেউ জানেন না। কেউ কেউ বলছেন, বিচারের সময় আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মুজিব।
* টাইম, ২ আগস্ট ’৭১
মার্চে সংবিধান পরিষদের অধিবেশন ঘোষণার আড়ালে ইয়াহিয়া গোপনে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে শুরু করেন। রাতের বেলা বেসামরিক পোশাক পরা সৈন্যদের বিমানে করে পূর্ব পাকিস্তানে আনা শুরু হয়। তার পরে তিনি পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।... ২৫ মার্চ মুজিবের সঙ্গে চলমান বৈঠক ভেঙে দিয়ে ইয়াহিয়া ইসলামাবাদে ফিরে যান। এর পাঁচ ঘণ্টা পরেই সৈন্যরা হাউইটজার, ট্যাংক, রকেট ব্যবহার করে ঢাকার আধাডজন এলাকায় হামলা চালালে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
* বাল্টিমোর সান, ২৯ সেপ্টেম্বর ’৭১
পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে অভিযান শুরু করার ছয় মাস পর এখনো এ পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ক্রমশ তা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। এখন পাকিস্তানের বিশৃঙ্খলার বিষয়টি জাতিসংঘের গোচরে আনা হয়েছে। বিষয়টিকে শুধু আলোচ্যসূচি হিসেবে না এনে সাধারণ বিতর্কের বিষয় হিসেবে সাধারণ পরিষদের নিয়মিত অধিবেশনেও উত্থাপন করা হয়েছে। যাতে বিভিন্ন দেশ এ বিষয়ে নিজ নিজ অবস্থান তুলে ধরতে পারে।
* অবজার্ভার, লন্ডন, ১৮ এপ্রিল ’৭১
আটশত মসজিদের শহর ঢাকার স্বাভাবিক জনসংখ্যা বিশ লাখ। তাদের দুই-তৃতীয়াংশ গ্রাম এলাকায় পালিয়েছে। এখনো যারা রয়ে গেছে, তারা সেনাবাহিনীর ত্রাসের মধ্যে আছে। বাঙালিদের এ শহরের সর্বত্র উড়ন্ত সবুজ সাদা পতাকা তাদের পরাজয়, আত্মসমর্পণের স্মারক। হুন জনগোষ্ঠীর আতিলারা কঠোরতার মধ্যেও যতটা সংযম দেখিয়েছে, কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা তাও দেখাচ্ছেন না।
* টরেন্টো টেলিগ্রাম, কানাডা, ১৩ সেপ্টেম্বর ’৭১
২৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে দেশটি বিপর্যস্ত হয়েছে। শস্য উত্পাদন উপেক্ষিত হয়েছে। সড়ক, জনপথ, রেলপথ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বাড়িঘর, দোকানপাট ও গ্রামে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, বিশ্বে খাদ্যশস্য বিশেষ করে চালের উদ্বৃত্ত আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেবল জাপানে প্রায় ৬৪ লাখ টন চালের উদ্বৃত্ত মজুদ রয়েছে। এর ৬৪ শতাংশ সরকারের হাতে রয়েছে। গত বছর ভারত, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ ভিয়েতনামে রেকর্ড পরিমাণ চাল উত্পাদিত হয়। এ দেশগুলো তুলনামূলকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের অনেক কাছাকাছি। মৌলিক সমস্যা হচ্ছে, দুর্গত দেশটিতে কখন খাদ্য সাহায্য পৌঁছবে এবং কীভাবে সেগুলো বিতরণ করা হবে।
* ডেইলি টেলিগ্রাফ, ২৯ জুন ’৭১
বাঙালি ও বিহারি মুসলমানদের উভয় তরফেই কয়েক দফা নৃশংস হামলার পর সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ আগুন, গোলা আর বুলডোজার দিয়ে চট্টগ্রামের অসংখ্য গ্রাম ধূলিসাত্ করে দিয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক ও স্থানীয় বাঙালি জনগণের মধ্যে পুঞ্জীভূত ঘৃণা, ভয় আর অবিশ্বাস খোলাখুলি এবং প্রকট হয়ে উঠছে। কার্যত সেনাবাহিনী স্বীকার করেছে, পেশাজীবী লোকজনের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি প্রত্যন্ত এলাকায় পালিয়ে গেছে। রাস্তাঘাটে লোক নেই, দোকানপাট বন্ধ। রাত্রিকালীন কারফিউ শিথিল করা হলেও রাতভর গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।
* ডেইলি মর্নিং পোস্ট, নাইজেরিয়া, ১০ সেপ্টেম্বর ’৭১
পাকিস্তানের এ যুদ্ধ এমন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে, পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমগুলোর কিছু অংশ স্পর্শকাতর ভূমিকায় নেমেছে। দেশটির পরিস্থিতি সম্পর্কে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বিবরণ দেয়ার মতোই নাইজেরিয়ার সমস্যার সময় পাঠকদের খবর দেয়া হয়েছিল। এ সাংবাদিকরা পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করার চেষ্টা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, এরকম মিথ্যে সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার বিদেশি সাংবাদিকদের সেখানে নিয়ে গেছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিহত হয়েছেন বলে কথিত অনেক বুদ্ধিজীবী ঢাকা টেলিভিশনে উপস্থিত হয়েছেন। তারা মিথ্যে খবরের বিরোধিতা করেছেন। পঞ্চাশজন বুদ্ধিজীবী এক যৌথ বিবৃতিতে তারা নিহত হয়েছেন বলে নিউইয়র্কের একটি গ্রুপের অভিযোগের প্রতিবাদও জানিয়েছেন।
* দি ডেইলি লা মঁদ, প্যারিস, ২ অক্টোবর ’৭১
বাঙালিদের বিরুদ্ধে দমন অভিযানে নেতৃত্বদানকারী জেনারেল টিক্কা খানের স্থলে একটি বেসামরিক সরকার বসানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও সামরিক ছাতার নিচে সামিল এসব মধ্য ও ডানপন্থী ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কোনো মোহ নেই।
* দি উইকলি অর্গানাইজার, দিল্লি, ২ অক্টোবর ’৭১
গণতন্ত্র হয়তো অনেক ক্ষেত্রে প্রহসনে পরিণত হওয়ায় সর্বত্রই তা পণ্ডিত লোকদের কাছে হাসির খোরাক হয়ে আছে। কিন্তু স্বৈরতন্ত্র পাণ্ডিত্যাভিমানীদের উন্নাসিক অসন্তোষের চেয়েও অমানবিক বলে প্রমাণিত। শাসক ও শাসিতের মধ্যে কী ধরনের সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে তা বিচারের একমাত্র সঠিক মাপকাঠি হচ্ছে সব মতপার্থক্য সত্ত্বেও বিদ্যমান চলমান সম্পর্কটি সময়ের দাবি ও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকতে পারে কি না। এ ধরনের পরীক্ষা থেকে প্রাথমিকভাবে বলা চলে, মর্মপীড়াদায়ক সাময়িক অখণ্ডতা সত্ত্বেও পাকিস্তানের টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই।
* দি ডেইলি আল মদিনা, জেদ্দা, ৩০ সেপ্টেম্বর ’৭১
পাকিস্তানকেই ভূখণ্ড রক্ষা, নিজ ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাত বন্ধ করতে হবে। এ জন্য তারা আগ্রাসন চালাচ্ছে না বা যুদ্ধ লাগাচ্ছে না। কিন্তু ভারত-রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করে একটা মারাত্মক পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপপ্রচারমূলক আক্রমণ শুরু করেছে। এতে মনে হচ্ছে, তারা যা করতে চায়, সে জন্য পরিবেশ তৈরি করছে মাত্র। বিরাজমান সমস্যা হচ্ছে, ভারতীয়রা পাকিস্তানের অন্তর্ঘাতমূলক কাজে সমর্থন দিচ্ছে এবং পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে মিথ্যে তথ্য দিয়ে শরণার্থীদের নিজেদের বাড়িঘরে ফিরে যেতে বাধা দিচ্ছে।
* দি সানডে টাইমস, লন্ডন, ৬ জুন ’৭১
গত মার্চে পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ২০ লাখ উদ্বাস্তু পালিয়ে ভারতে আশ্র নিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে ঠাঁই নিয়েছেন তারা।... উদ্বাস্তু জীবন তাদের মধ্যে নিজস্ব ধরনের এক নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। অন্য একটি দেশের অপরিচিত পরিবেশে শারীরিকভাবে দুর্বল লোকগুলো সারা দিন শুয়ে-বসে কাটান। বিরূপ পৃথিবীর কাছ থেকে নতুন কিছু ঘটার অপেক্ষায় দিন গুনছেন তারা। খাবারের জন্য শিশুর মতো বায়না ধরতে দেখা যায় এক বৃদ্ধকে, নিজের দেশে যিনি ছিলেন খুবই মর্যাদাবান। অর্ধপঙ্গু আর অসুস্থ লোকেরা চুপ করে একদিকে বসে থাকেন। ভাবেন, কেউ হয়তো তাদের খাবার এনে দেবেন। কিন্তু বাস্তবে কেউ দেয় না।
* দি সানডে স্টার, ওয়াশিংটন, ৩ অক্টোবর ’৭১
পূর্ব পাকিস্তানের আতঙ্কিত শরণার্থীদের প্রথম দলটি ভারতে প্রবেশ করার পর ছয় মাস গত হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধী মার্চে বলেছিলেন, ছয় মাস পর তারা ফিরে যাবেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভিন্ন রকম। এক লাখ পঞ্চাশ হাজার ছাড়া তিরাশি লাখ শরণার্থীর মধ্যে আর কেউ ফিরে যাচ্ছেন না। আরো ছয় মাস, এমনকি এরপরেও তারা ফিরে যাবেন বলে মনে হচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে ক্ষুধা, আতঙ্ক, গেরিলা যুদ্ধের ফলে এখনো স্থল ও নদী পথে প্রতিদিন প্রায় চৌদ্দ হাজার লোক ভারতে প্রবেশ করছেন।
* দি গার্ডিয়ান, লন্ডন, ৬ অক্টোবর ’৭১
পাকিস্তানের নব্বই লাখ উদ্বাস্তুর জন্য এ সপ্তাহটি অনেক বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন। ব্রাইটনে লেবার পার্টির এক বিবৃতিতে ‘বাংলার বিপুলসংখ্যক শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় বিশ্বসম্প্রদায়ের অপ্রতুল সাড়ার ব্যাপারে’ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। খোলাখুলিভাবে হতাশা নিয়ে অক্সফার্ম ঘোষণা করেছে ‘হাজারো শিশু ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’
* দি ইন্ডিয়ান নেশন, পাটনা, ২৯ সেপ্টেম্বর ’৭১
ভারত বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের করুণ পরিস্থিতির সঠিক চিত্র তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। ... অনেক দেশ পাকিস্তানের এ ভাষ্য মেনে নিয়েছে যে, ভারতে শরণার্থীর সংখ্যা মাত্র ২০ লাখ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমস্যার মূলে রয়েছে ভারত। নৈতিক অবস্থান ও সত্ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সারা বিশ্বে ভারতের বন্ধুর সংখ্যা কম।
* দি ওয়েস্টার্ন মেইল, কার্ডিফ, ২৪ সেপ্টেম্বর ’৭১
পূর্ব বাংলার শরণার্থীদের দেশে ফেরার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধীর বেঁধে দেয়া ছয় মাস পার হয়ে গেলেও ভারতের ত্রাণ কর্মকর্তারা বিশেষ সঙ্কট এবং মৌসুমি বন্যার বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে লড়াই করে যাচ্ছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নব্বই লাখ শরণার্থীর মধ্যে পঞ্চান্ন লাখই জরুরি খাদ্য, কাপড় সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এমনকি পানিবন্দি এলাকাগুলোতে দ্রুত শেষ হয়ে আসা স্থানীয় মজুদ থেকেও শরণার্থীদের কাছে সরবরাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে দুর্গন্ধ অসহ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। অসহায় আটশ’ চিকিত্সক এবং তাদের দু’ হাজার মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টের অভিযোগ হচ্ছে, দু’টি প্রধান রোগ, পেটের পীড়া এবং খোস-পাঁচড়ার ওষুধ ডিসপেন্সারিগুলো থেকে দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
* লে সোলেই, সেনেগাল, ৭ সেপ্টেম্বর ’৭১
ভারতে এখন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন নাটকের মঞ্চায়ন হচ্ছে। প্রতিদিন পঞ্চাশ হাজারের বেশি উদ্বাস্তু দেশটিতে সীমান্ত অতিক্রম করে ঢুকছে। সরকার তাদের খাওয়ানোর জন্য প্রতিদিন দুই কোটি রুপি ব্যয় করছে। এ অর্থ তাদের সমুদ্র সমান দুর্দশার মধ্যে এক ফোঁটা পানি মাত্র। পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধের এটি হচ্ছে করুণ পরিণতি।
* নিউজ উইক, ২৬ এপ্রিল ’৭১
স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য পাক সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলো একের পর এক ধ্বংস করতে থাকে। ইসলামাবাদ থেকে উপর মহলের নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র, প্রকৌশলী, চিকিত্সক ও অন্যদের নির্বিচারে হত্যা করে সৈন্যরা। তারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকুক বা না থাকুক, নেতৃত্বের কোনো সম্ভাবনাই বাঁচিয়ে রাখতে চায়নি পশ্চিম পাকিস্তান।
* ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ, ২৫ সেপ্টেম্বর ’৭১
মুক্তিফৌজ বা মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলাদল পূর্ব পাকিস্তানে রাতের সেনাবাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সেনাবাহিনী ৭৮টি বড় শহর এবং অধিকাংশ বড় গ্রাম নিয়ন্ত্রণে রাখলেও ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ত্রিপুরা রাজ্য ও নোয়াখালী এলাকায় গেরিলারা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তাদের ‘হামলা করো এবং পালিয়ে যাও’ নীতি ও অন্তর্ঘাতমূলক তত্পরতার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। এভাবেই বাংলাদেশের জনগণ তাদের ওপর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের কর্তৃত্ব নির্মূল করতে পারবে বলে আশা করছেন।
* দি উইকলি নিউএজ, নয়াদিল্লি, ২৬ সেপ্টেম্বর ’৭১
অপারেশন চালানোর সময়েও মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো ফার্স্ট এইড পাওয়া কঠিন। কোনো স্ট্রেচার বা অ্যাম্বুলেন্স নেই। কোনো বেস হাসপাতালও নেই।
আমার দেশ
১২-০৩-২০১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

