রেইনট্রি বৃক্ষের দেহটা এত কালো অথচ এর পাতাগুলো কি চমৎকার সবুজ। বৃক্ষগুলোকে আবার অনেক পরগাছাও জড়িয়ে ধরে রেখেছে....বেঁচে থাকার কি নির্মম প্রচেষ্টা! পরগাছাগুলোর জন্য হঠাৎ বিনার দুঃখ পেয়ে যায়.....এদের কত কষ্ট...বৃক্ষের কাছে নত হয়ে থাকতে হয় সারাটা জীবন। ভাবতে ভাবতেই একটা সময় রিকশা চলে আসে গন্তব্যে।
বিনার ছাত্রীর বাসা.....ছাত্রী ক্লাস টেনে পড়ে। একে পড়ানো আর একটা কাঠের চেয়ারকে পড়ানো সমান কথা। কিন্তু তবুও সামান্য কিছু টাকার আশায় এই কষ্টটুকু সহ্য করে যেতে হবে। মাস শেষে বেতনটা পেলে কষ্ট অনেকটা লাঘব হয়ে যায়। সারাদিন ক্লাস করার পর দুইটা টিউশনি করে নিজের জন্য সময় পায়না সে.......যেটুকু সময় পায় তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা।
বিনা যখন নিজের আবাসস্থলে ফেরে তখন রাত প্রায় ৮টা। দরজা খুলে দিলেন মা। মায়ের দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বিনা তড়িঘড়ি করে বললো...."সারাদিন তোমাকে মিস্ করেছি মা!"
রাতে বিনা মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। মা যতবার হাত সরিয়ে দেন বিনা ততবারই আরও শক্ত করে ধরে রাখে। মা মেয়ের মধ্যে চলতে থাকে ছেলেমানুষী খেলা। এসময় দুজনের কারোই মনে থাকেনা যে তারা আশ্রিতা.....বিনার মামার বাসায়....বিনার বাবা নেই, মারা গিয়েছেন সেই কবে, বিনা যখন এতটুকুন। মামার বাসায় তাদের মা মেয়ের সম্পূর্ন আলাদা একটা জগৎ আছে। কেউ সেই জগৎ দেখেনি...সেই জগতে এত আনন্দ এত সুখ কিন্তু কোথা থেকে যেন একটা ঝড় এসে বারবার সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। তবুও বিনা স্বপ্ন দেখে লেখাপড়া শেষ করে সে একটা চাকরী করবে তারপর মাকে নিয়ে একটা চমৎকার বাসায় থাকবে.....সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের বাসা।
সকালে রান্নাঘরে যখন মা বাড়ির সবার জন্য নাস্তা বানাচ্ছিলেন তখন বিনা এসে বললো..."তুমি সর। আমি বানাই।"
মা বললেন....."তোর রুটিতো শ্রীলঙ্কার মানচিত্র হয়ে যায়। থাক লাগবেনা, যা এখান থেকে।"
বিনা মাকে বলল..."মা আজকে আফরিনাকে নিয়ে শপিংয়ে যাব। তোমার জন্য আকাশী রং এর একটা শাড়ি কিনব।"
"শাড়ি লাগবেনা। নিজের লেখপড়ার খরচ চালা।"
বিনার মনটা খারাপ হয়ে যায়। মা না চাইলেও বিনা ঠিকই কিনবে।
হঠাৎ মামী এসে ঢুকলেন...."আপা একটু তাড়াতাড়ি করেনতো, শিমুলের স্কুলের সময় হয়ে গেছে, আপনার ভাইয়ের অফিসের গাড়ি কিছুক্ষন পরেই চলে আসবে। বিনা একটু মাকে হেল্প কর।"
মা খুব দ্রুত বেলন ঘোরাতে থাকেন.......রুটিটা কি চমৎকারভাবে গোল হয়ে যাচ্ছে। বিনার মনে হঠাৎ করে প্রচন্ড ক্রোধ জন্মে। এই ক্রোধ কার উপর সে জানেনা....হয়ত তার ভাগ্যের উপর।
মামা আর অন্যেরা চলে গেলে বিনা শুনতে পায় মামী টেবিল গোছাতে গোছাতে বলছেন....."একজনের ইনকামে এত মানুষ চলবে কিভাবে! জিনিসপত্রের যা দাম! বাড়তি ঝামেলা আর সহ্য হয়না।"
বিনা তার মামীর কাছে গিয়ে বলল..." মামী আপনার পছন্দের রং কি?"
"কেন?"
"আপনার জন্য একটা শাড়ি কিনব।"
বিনা লক্ষ্য করল তার প্রিয় মামীর ভ্রুজোড়া কিঞ্চিত নেচে উঠলো।
আফরিনার চুলে একটা অচেনা ফুল গোঁজা। বিনা জিজ্ঞেস করলো...."এটা কি ফুলরে?"
আফরিনা অবাক হয়ে বললো...."চিনিস না! অর্কিড ফুল।"
-"খুব সুন্দর।"
আফরিনা বললো......"হ্যাঁ, খুব সুন্দর। রংটা দেখলে কি মায়া হয়....তাইনা!"
বিনা একটা চাপা নিঃশ্বাস ফেলে বললো...."পরগাছাতে কি ফুল হয়?"
আফরিনা বিনার প্রশ্নটা শুনতে পেলনা, সে গুনগুনিয়ে গান গেয়ে চলেছে।
আজ রেইনট্রি বৃক্ষগুলোর গায়ে জড়ানো পরগাছাগুলোর দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছেনা বিনার। সে তার বান্ধবীর চুলে গোঁজা মিষ্টি গোলাপী ফুলটার দিকে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


