তীব্র গরম! তার উপর লোডশেডিং এবং মশাদের অসহ্য বন বন। ল্যেপটপ টার চার্য ও শেষের দিকে। নাহ্ চা খেয়ে আসি। সাথে ষ্টেশনে একটু গুনগুন। লুংগী পাল্টে থ্রী কোয়ার্টার, পাতলা গেন্জী, একটু সাহেবী ভাব। ষ্টেশন প্ল্যাটফর্ম এক কাপ চা নিয়ে পায়চারি শুরু।কত রকম মানুষ! দুই জন মহিলা (আসলে মেয়ে, ওরা অল্প বয়সেই মহিলা হয়ে গেছে) একে অপরের চুল ধরে টানা টানি করছে সাথে অসভ্য গালি গালাজ। পান চিবুতে চিবুতে এক বুড়ো ওদের পাশেই পানের পিক ফেল্ল সাথে তামাশার হাসি। এেহ্ !! ঘেন্না!! একটু দূরে এসে দাড়ালাম।
ইদানিং জোর করে সিগারেট টানা শুরু করেছি। জিনিসটা ঠিক বাগে আসছে না কিন্তু একজান প্রোগ্রামার সিগারেট টানতে পারে না এটা লজ্জার।এক দিন একেক ব্র্যান্ড ট্রাই করি। আজকের ব্র্যান্ড মার্লব্রো। নাহ্ বোটকা গন্ধ টা নিজেই হজম করতে পারছি না।চারপাশ কাঁপিয়ে দাড়ালো রাত ১২.৩০ এর ট্রেইন। চারপাশ থেকে সবাই উঠে বসছে, মধ্যরাত বলে হৈ হল্লা একটু কম।
আমার এদিকটায় একটু অন্ধকার। দুইটা বগির মাঝখানের জাংশনটায় যেখানে একটু আলো পড়েছে ওখানে হঠাৎ দেখি চারটি ছোট ছোট পা, পীঠ দুই পাশের বগিতে হেলান দেয়া। কি জানি গুটুর গুটুর করছে ওরা দুই জন। কত বয়স হবে ওদের? সম্ভবত একজন ৫ আর আরেক জন ৭ এর মধ্যেই।কৌতুহল নিয়ে এগিয়ে গেলাম।
--"কিরে কি খবর?"
(বড়টা আমার দিকে তীব্র অবহেলায় তাকাল, ছোটজনের চেহারায় নির্লিপ্ততা)
--"ট্রেইন ছাড়লে ত পড়ে মরবি! নাম জলদি!"
--"মরলে মরুম!"
কোনা চোখে তাকিয়ে বিরবির করে আর কিজানি বলে যাচ্ছে। চোখে মুখে বিরক্তির শেষ নাই।অবাক করার মত এক্সপ্রেশন অল্প বয়সেই।
--"নেমে যা!"
--"আরে কিছু হইবনা। কমলাপুরর থন আইছি না এইয়ানে? "
লুন্গি পরা এক ভদ্রলোক(?) এসে দাড়ালেন পাশে।
--"এগরে এমনে হইবনা ভাই।"
একটু এগিয়ে,
--"ঔ তোরা কি গেলি! নাকি 'হোগায়' দিমু দুইটা?"
আশ্চর্য! ছেলে দুইটা বিদ্যুৎ গতিতে নেমে দৌড় দিল।পানের পিকে লাল হওয়া দাঁত দেখিয়ে লোকটা কুৎসিত একটা গালি ছুড়ে দিল। তার পর হা হা হা হা..। ভীষন মজা পেয়েছে সে।
কুহু ঝিকঝিক কুহু ঝিকঝিক.... ট্রেইন কিছুক্ষন পরেই চলে গেল। আমি একটু এগিয়ে আসতেই ওই দুইজন কে পেয়ে গেলাম।
আহা! দুই জনিই ঠোট ফুলিয়ে চলে যাওয়া ট্রেনের দিকে তাকিয়ে আছে। এতক্ষন অন্ধকারে থাকায় ওদের মুখ দেখিনি, দুটি চেহারায় আশ্চর্য মায়া! বুকটা হু হু করে উঠল। হাফ পেন্টগুলির রাবারের ইলাস্টিসিটি শেষ পর্যায়ে। কোনমতে কৃমি ভরা পেট দুটিতে আটকে আছে। এগিয়ে কাছে গেলাম।
--"কিরে! যেতে পারলি না!"
--"দেহেন না কেমনে খেদাইয়্যা দেল!" (অভিমান... চোখ চলে যাওয়া ট্রনের দিকে, আরেকটু হলে অশ্রু গড়ায় সাগর দুটি চোখে।)
--"কই যাস এত রাতে?"
--"বাড়ি যামু আর কই?" (কোপা কোপা উত্তর।)
--"বাড়ি কই?"
--"নারায়নগন্জ"
--"তর পাশে এইটা কে?"
--"ছড় ভাই" ('ছড় ভাই' আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।)
--"তরা ক'ভাই বোন?"
--"আমরাই খালি"
--"হুমমম.. এখন কি করবি? ট্রেইন ত গেছেগা।"
--"কি করুম! রাইতে সেলাব (স্ল্যেব) এ থাকুম, কাইল যামুগা।"
--"তগ মা চিন্তা করব না?"
--"নাহ্। হেই বেডি জানে মাজে মইদ্যে গেন্জাম অই। কাইল যামুগা।"
--"এখানে কেন আসছিলি? কি করছ?"
--"তরকারি টুকাই মালগারির থন। পরে এই গুলান বেচি।"
হঠাৎ রেল ষ্টেশন এর দারোয়ান হাতে লাঠি আর বাঁশিতে ঈস্রফিল এর মতন ফুঁক দিতে দিতে দৌড়ে এল। বাচ্চা দুটু আমি কিছু বোঝে উঠার আগেই ভোঁ দৌড়। একজন কিছুক্ষন পরপর পেছন ফিরে দেখছে দূরত্ব কট্টুক বাড়াতে পেরেছে পেছন পেছন এগুতে থাকা লাঠির বাড়ি থেকে। একটু পরপর ঢিলে হয়ে আসা পেন্ট টাও টেনে নিচ্ছে। রাতটা কোথায় কাটাবে ওরা? শালা দারোয়ান টাকে আমার খুন করতে ইচ্ছে হচ্ছিল।
ফারিয়া বড়ভাইয়ের মেয়ে। আমার এত্ত আদরের! ৬ বছরে পড়েছে।এবার ঢাকা ফিরে আসার সময় আমার পকেটে একটা চিঠি গুঁজে দিয়েছে।
"বাপ্পি, আবার আসার সময় আমার জন্য টম এন্ড জেরির বই আনবেন।KISS "
প্রিয় ফারিয়া, আজকে ষ্টেশনে একটা বাচ্চা দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পেছন ফিরে আমার দিকে একবার তাকিয়ে ছিল।আবছা ওকে কেন জানি তোর মতন দেখাচ্ছিল। ভাল থাকিস....KISS..
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০১০ সকাল ৯:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


