আমার বিভীষিকাময় আওয়ামী কারাগার যাত্রাঃ
Click This Link
জামিন না মন্জুরঃ
১৩ ফেব্রুয়ারী -২০১০ জামিন না মন্জুর হওয়ার পর চট্টগ্রাম জজকোর্ট থেকে আমরা বের হলাম । রীতিমত পুলিশের বড় পিকআপ বাস আমাদের নেয়ার জন্য দাড়িয়ে আছে। এবার আমার মনে হল পৃথিবীর বড় রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করছি । নাটক সিনেমায় যেভাবে দৃশ্য চিত্রায়িত হয় আমরা ও কোন অভিনয়ের শুটিং স্পটে। হায়াতে জিন্দেগীর কোথাও জেলখাটার মত অপরাধ না করাতে আমার বারবার মনে হচ্ছিল আমি জেলে যাচ্ছিনা অভিনয় করছি মাত্র। কিছুক্ষন পরেই বাসায় চলে যাব । ভাইবোন নিয়ে হইহুল্লোর করব। আমরা ২ ভাই এক বোন মিলে এতই মজা করি যে একসাথে হলেই কৌতুক সমৃদ্ধ মজার পরিবেশ হযে যায় এতে অনেক সময় আমার কাজিনরা ও যোগ দিত।
মূল জেলে ঢুকার পূর্ব মূহুর্তঃ
নাহ ! জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় শুটিং স্পটের বাস্তব অভিনয় আর শেষ হয়নি। রাত ৮ টা নাগাদ পৌছে যায় জেলগেটে। বিশাল বড় বাউন্ডারী ওয়াল । সরু একটি দেড়হাতের গলি । সাইমুম সিরিজ বা মাসুদ রানা সিরিজ হয়তো রোমেনা আফাজের গোয়েন্দা উপন্যাসের কোন দৃশ্য ! নাহ , এটি ও দেখি বাস্তব। টাকা পয়সা যা ছিল কাউন্টারে জমা দিলাম।
ঢুকে গেলাম আর একটু ভিতরে। বসলাম ৪ জন করে সারি করে । গননা করা হল । আশে পাশের কেহ কেহ আমাদের গরু বলে সম্বোধন করছিল । বুঝলাম না কারন কি? মিয়া সাব (জেল পুলিশ) এসে আমাদের বিব্রতকর পরিবেশের সম্মুখীন করে চেক করল । একটি বাজে অভিজ্ঞতা হল।
এবার আসল রিলাক্স মোডের কিছু জেল পুলিশ । তারা আমাদের অভয় দিল আর বলল জেলে এসেছ ?এটা কোন ব্যপার না ! তোমরা সবাই স্টুডেন্ট। এটা শিখার একট বড় জায়গা। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জেল খেটে বের হওয়া মানে নেতা হওয়া । আর এমনিতেই ভয়ের পরিবর্তে আমার থ্রিল থ্রিল মনে হচ্ছিল।
মূল জেলখানায় আমরাঃ
পদ্ধা , মেঘনা , কর্নফুলী , যমুনা , সাঙ্গু , মেডিকেল ওয়ার্ড , আমদানীতে (বন্দীরা প্রথম দিন থাকার কষ্টকর একটি জায়গা যেখানে থানা হাজতের পরিবেশ বিদ্যামান ) আমাদের ভাগ করে দেয়া হল। প্রত্যেকটি রুমে ২/৩ জন করে দেয়া হল । ভাত খাওয়ার টাইম চলে যাওয়াতে কাচামরিচ ও পেয়াজ দিয়ে অল্প পান্তাভাত খেলাম। চোখে রাজ্যের ঘুম। এশার নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে গেলাম ।শরীরে অসম্ভব ব্যথা । ১৪ কি ১৬ ইঞ্চি থাকার জায়গা পেলাম। আমরা হলাম জেলের ভাষায় নতুন গরু। কি যত্ন জেলের ওয়ার্ড মেটদের (সাজাপ্রাপ্ত আসামী যারা ওয়ার্ড পরিচালনার টেন্ডার নেয়) ! মনে হল (সুরা ইনশিরাহ) সুখের পরে দুঃখ আসে। মন শক্ত করে কষ্ট ও দু:খের জন্য অপেক্ষা করলাম।
সাক্ষাত প্রার্থীদের দেখতে না পারার কষ্টঃ
একদিন পরে (১৪ ফেব্রুয়ারী )কারা যেন আমায় দেখতে আসল । কিন্তু দেখা পেলাম না ।অঘোষিত আইন করা হল আওয়ামী বিরোধী বন্দীরা আগত আত্বীয় স্বজনদের সাথে ১৫ দিন পরপর দেখা করতে পারবেন। ১৪ ফেব্রুয়ারী দেখা হলনা তাই ১৫ দিন পর্যন্ত এক কাপড়ে কোনধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ ছাড়া থাকতে হয়েছে। সাবান ,বালতি , লুঙ্গি , গেঞ্জি , গামছা, মাজন , শার্ট কিছু নাই । মানবেতর অবস্থা। উত্তর ফটিকছড়ির বন্দীরা ইতিমধ্যে জেনে যায় আমি জেল খানায়। সবাই খোজ নিয়ে আমার নিকট বিশেষ পদ্ধতিতে আসতে লাগল আর এক অদ্ভূত ভালবাসায় আমাকে সহযোগীতা করে চিরঋনী করে ফেলল। এমন ভালবাসা পাওয়া বিরল বৈকি। জড়িয়ে ধরে পরম মমতায় আদর করা । সঙ্গ দেয়া , সব প্রয়োজনীয় জিনিষের ব্যবস্থা করে দেয়া। স্নেহ ও ভালবাসায় বিডিআর আনছার , নানাবাড়ী এলাকার সেলিমকে স্মরন করছি।
১৫ দিন পর মায়ের দেখা :
১৫ দিন পর মা এল । পুত্র ও মায়ের মিলন দিন । আম্মার কান্না বহু কষ্টে সহ্য করে হাসলাম । হাসার অভিনয় করলাম। মাকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম সুখে আছি। কোনভাবেই মাকে বুঝ দিতে পারি না । কোন দিন না কোন দিন প্রেফতার হতে পারি এমন মানসিক প্রস্তুতি ছিল । আম্মাকে সবসময় বলতাম যারা রাজনৈতিক বন্দী তাদের ভিতরে কোন কষ্ট হয়না । প্রিয় মা বুঝেনা । বলে তারেক জিয়ার যদি জেলখানায় এমন অবস্থা হয় না জানি আমার ছেলের কি অবস্থা! আমিজোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি মাকে স্বাভাবিক করতে না জানি বাড়িতে গিয়ে আবার স্ট্রোক করে। সাথে আসা নিকটাত্বীয়দের বললাম মাকে জেলখানায় না আনতে। মায়ের সাথে আসা সবাই আমাকে দেখে কাদঁছিল আর আমি হাসছিলাম। শেষ হল সাক্ষাৎ। ফিরে এলাম সাঙ্গু ওয়ার্ডের ৯ নম্বর কক্ষে। এবার আমি কাদঁলাম অনেকক্ষন। জেলে আছি তার জন্য নয় । প্রিয়জনদের ভালবাসায় কাদঁলাম । আমি তো জানি আমরা ভাইবোনরা এক অপরকে কত ভালবাসি। আমাদের ভালবাসা ছিল অদম্য। আল্লাহর রহমতে এখনো আছে।
আম্মুর বারবার দেখতে আসা ও আমার হাসা , ছোট ভাইয়ের কষ্টঃ
গ্রাম থেকে ১৫ দিন পরপর মা চলে আসেন দেখতে আমাকে। আমি হেসে হেসে বারন করি আসতে আর মা কাদেঁন। আমি বারবার হাসি আর মা বারবার কাদেঁন। মা জানেন আমি খুব ভাল করে রান্না না করলে খেতে পারিনা । অতি আদরে মানুষ হয়েছি।মায়ের কান্না দেখে আমার ভিতরটা কাদেঁ আর চোখমুখ হাসে। ছোট ভাই এমরান । প্রতি সপ্তাহে জেলখানায় এসে আমার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে যেত। পড়ালেখা । দুরে গিয়ে র্ভাসিটিতে ক্লাশ করা। ১৫ দিন পরপর গ্রামে গিয়ে অসুস্থ আম্মুকে আনা । শহরে বাসার খরচাপাতি করা । আমার জন্য জেলখানায় ওষুধ পাঠানো। আইনজীবির সাথে দেখা করা। দলের নেতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা। ছোট্ট ছেলের অনেক কাজ। ছোট ভাইটি আমার জন্য অনেক করল ।
জেলখানায় আমার দৈনন্দিন রুটিনঃ
১দিন ,২ দিন ,১৫ দিন, ২০ দিন যায় জামিনের খবর আসেনা । ২ দিন রিমান্ড মন্জুর করছিল । রিমান্ডে ও নেয়না। আমার স্মরন পড়ল বিখ্যাত ব্যক্তিদের যারা জেলে ছিলেন। আমি জেল লাইব্রেরী থেকে বই এনে পড়া শুরু করলাম এবং সবাইকে পড়তে তাকিদ দিলাম। সবাই আমার দেখাদেখি বই পড়া শুরু করল। তখন আমার সবে মাত্র বিএসসি ইন্জিনিয়ারিং শেষ । আমি জবের পড়া কি পড়া যায় চিন্তা করতে থাকলাম । এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষার্থীদের থেকে গ্রামার বই নিয়ে preposition , phrase , noun-adjective-adverb এর রুপান্তর ও vocabulary enrich করতে থাকলাম । পুরো জেল জীবনে ২৫০০ এর মত ওয়ার্ড মুখস্ত করে ফেললাম। আমপারা থেকে সুরা মুখস্থ, জুমা ,ঈদ ও বিয়ের খুতবা ও মুখস্থ করলাম। তাসলিমা নাসরিন ও হুমায়ুন আজাদের লেখা পড়তে থাকলাম। নিয়মিত কুরআন হাদীস সাহিত্য ও দৈনিক পত্রিকা পড়তে থাকলাম। বিশেষ করে হুমায়ুন আজাদের নারী বইটি খুটিঁয়ে খুটিঁয়ে পড়েছি।
সকালে উঠতাম নামাজ পড়ে ঘুমাতাম । আসত জেল পুলিশ বন্দী গননা করতে । গননার পর নাস্তা সেরে গোসল । তারপর চলত আমার পড়া ও খেলা । যুহরের নামাজ পড়ে খেতাম । তারপর আড্ডা । আড্ডার পর পড়া ও আসরের নামাজ ।এর পর বিল্ডিং এর নীচে হাটঁতে যাওয়া । মাগরিবের সময় মাগরিব নামাজ । আবার বন্দী গননা । আবার পড়া , টিভি দেখা , সুখদুখের গল্প , রাতের খাওয়া ও ঘুম এভাবে চলে জেল জীবন প্রিয়জনের বিরহে প্রতিটি মূহুর্ত এক মাসের সমান সময় যেন! যেখানে নেই ইচ্ছার স্বাধীনতা । গরীব ,ধনী , জ্ঞানী , মূর্খ , সব মতের রাজনীতিক , ভয়ংকর সব গুন্ডাপান্ডা মিশ্রিত এক জগাখিচুরী পরিবেশ । সংশোধন হওয়ার চাইতে অপরাধের সামাজিকীকরনের উত্তম এক বাসস্থান হল বাংলাদেশের জেল খানা ।
চলবে..........
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ রাত ৯:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



